Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • ডিসেম্বর ৩১, ২০২৩

ধারাবাহিক: পাহাড়িয়া পথে পথে।পর্ব ৪

আত্ম অনুসন্ধান, জীবন জিজ্ঞাসা, নিজেকে অতিক্রম করবার অদম্য জেদ সামগ্রিক অর্থেই এক পাহাড়িয়ার যাত্রা পথ রচনা করে

ফাল্গুনী দে
ধারাবাহিক: পাহাড়িয়া পথে পথে।পর্ব ৪

১৯৫৩। এভারেস্ট জয়ের পরে তেনজিং ও হিলারি

 
ভুবন পাহাড় আর গিরিশৃঙ্গের প্রতি তাঁর দুর্ভেদ্য আকর্ষণ উৎসবমুখর করে তোলে ভূগোলের বিদ্যাযাপন । পেশা আর নেশা যখন একাকার হয়ে ওঠে, তখনই তাঁর অনুভূতিকে অন্যভাবে জাগিয়ে তোলে— ‘শেষের কবিতার’ শোভনলালের পাহাড়ের পথে পথে ঘুরে বেড়ানোর বেহিসেবিয়ানা । গন্তব্য জগতের এক শৃঙ্গ থেকে আরেক শৃঙ্গ 
 

পর্ব ৪

আমার ‘দেশবাড়ি’ এক মহাসমুদ্রের পাড়ে। হ্যাঁ, সমুদ্রই তো ! যেমনটি রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন— “মহাসমুদ্রের শত বৎসরের কল্লোল কেহ যদি এমন করিয়া বাঁধিয়া রাখিতে পারিত যে, সে ঘুমাইয়া পড়া শিশুটির মতো চুপ করিয়া থাকিত, তবে সেই নীরব মহাশব্দের সহিত লাইব্রেরির তুলনা হইত। এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, প্রবাহ স্থির হইয়া আছে, মানবাত্মার অমর আলোক কালো অক্ষরের শৃঙ্খলে কাগজের কারাগারে বাঁধা পড়িয়া আছে। ইহারা সহসা যদি বিদ্রোহী হইয়া উঠে, নিস্তব্ধতা ভাঙিয়া ফেলে, অক্ষরের বেড়া দগ্ধ করিয়া একেবারে বাহির হইয়া আসে ! হিমালয়ের মাথার উপরে কঠিন বরফের মধ্যে যেমন কত কত বন্যা বাঁধা আছে, তেমনি এই লাইব্রেরির মধ্যে মানবহৃদয়ের বন্যা কে বাঁধিয়া রাখিয়াছে !” প্রান্তিক বাংলার এই অখ্যাত রমনাবাগান অভয়ারণ্যের সবুজ নির্জনতায় এমন মহাসমুদ্রের কল্লোল ধ্বনি দুই মলাটের আশ্রয়ে আর প্রশ্রয়ে যদি গা ঢাকা দিয়ে থাকতে পারে, তবে বরফের বাঁধ ভাঙ্গা বন্যার সানন্দ লুণ্ঠন তার ভবিতব্য বৈকি !
 
‘অমরপুর নবোদয় সংঘ গ্রামীণ গ্রন্থাগার’ আমার সেই মহাসমুদ্রের পাড়ে এক নির্জন শান বাঁধানো ঘাট। যেখানে নিরিবিলি বসে একমনে পড়ে ফেলা যায় অগনিত ঢেউ-এর আসা যাওয়া। খাদ্য বস্ত্র বাসস্থানের পর লাইব্রেরি আমাদের জীবনে চতুর্থ মৌলিক চাহিদা। বহু সংগ্রাম বুক পেতে নিয়ে এবং কাঠ খড়ের খাণ্ডব দাহন পেরিয়ে গ্রামের প্রণম্য অগ্রজরা এই লাইব্রেরী উপহার দিয়ে গেছেন তাদের উত্তরসূরীদের। বসন্ত পলাশের মতো এই সম্পদ আমাদের এলাকার শেষতম অহংকার। টেলিভিশন, কম্পিউটার এবং মোবাইল বর্জিত সেই পৃথিবীতে আমরা বার্ষিক দু’টাকার বিনিময়ে লাইন দিয়ে বই তুলেছি ভাবলে বড়োই অবাস্তব মনে হয়। যুগের হাওয়া লেগে সেই শেষতম অহংকারের আসমানী আঁচলে আজ লেগেছে ক্ষয়রোগের আহত আঁচড়। তবু, কোনও একদিন, মহামানবের সাগর তীরের মতো প্রতি সন্ধ্যায় এই লাইব্রেরীতে এসে জড়ো হতেন এলাকার সুস্থ-সংস্কৃতিমনস্ক মানুষজন। যারা খবরের কাগজ আর বইয়ের পাতায় খুঁজে বেড়াতেন রূপকথার চিত্রনাট্য অথবা অমৃত জীবনের জলছবি। তাঁদের কেউ কেউ পেশায় টিউশনির মাষ্টার, নিচুতলার কমরেড, হাতুড়ে চিকিৎসক, ছবিওয়ালা, পার্টির দেওয়াল লেখক অথবা ‘তেমন কহতব্য কিছু নয়’ ধরনের মানুষজন। দৈবক্রমে এঁরা কেউ কেউ আমার মাষ্টার মশাই এবং বাবার বন্ধুও বটে! সুতরাং বিষয়টি আমার জন্য বেশ উভয় সংকটের। এঁদের কেউ কেউ আমাকে যোগ ব্যায়াম, পাটি গণিত, প্রবন্ধ রচনা, কবিতা আবৃত্তি, অক্ষ দ্রাঘিমা, গাছের পাতা, পাখির শিস চিনিয়েছেন একটি ঘোরতর ভোরের স্বপ্নের মতো। কিন্তু নির্দিষ্ট করে কোনও গন্তব্যের দিকনির্দেশনা দিতে পারেননি। হয়তো নিজেরাও জানতেন না। হয়তো বিশ্বাস করতেন গন্তব্য নয়; এই পথ চলাতেই জীবনের আনন্দ। আমি সারা জীবন ধরে তাদের সেই বিমূর্ত স্বপ্নগুলিকে বিনির্মাণ করতে ছুটে বেড়িয়েছি এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশের পথে। কর্মসূত্রে আমার ‘সাইকেল পিওন’ বাবা হলেন এই লাইব্রেরির তথাকথিত ‘বাঞ্ছারাম’ অথবা বলা যায়, এই মহাসমুদ্রের ঘাটে ঘাটে ঢেউ ভাঙ্গা নুলিয়া এক। অন্যদিকে আমার মা, কখনও শীতের রোদেলা দুপুরে এলোচুলে, কখনও মেঝেতে লুটিয়ে পড়া লণ্ঠনের মৃদু আলোয় অথবা নিমগ্ন ভাত ফোটার আধমরা ঘুঁটের আঁচে মহাসমুদ্রের ঢেউ গুনে গুনে ভেসে চলা গল্প উপন্যাসের একনিষ্ঠ পাঠক। বই পড়ার নেশায় আমি সারা জীবনে যাঁর একশো মাইলের ধারে কাছে পৌঁছাতে পারবো না। সুতরাং বইয়ের গন্ধ, বই পড়া, বই চর্চা, বইমেলা, বই গোছানো জাতীয় শব্দবন্ধগুলি দিয়ে আমার রক্ত মাংস হাড় এবং চারিত্রিক গঠন তৈরি হয়েছে।

 

শেরপা তেনজিং নোরগেকে সঙ্গে নিয়ে কিউয়ি যুবক এডমন্ড হিলারি মাত্র চৌত্রিশ বছর বয়সে পা রাখলেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট এর শীর্ষে। সাংবাদিক সম্মেলনে অনেক প্রশ্নের একটি জবাবে বললেন — “It is not the mountain we conquer but ourselves.” শুনেই বিবেকানন্দের কথা মনে পড়ে গেল। হুবহু এক কথা। এই আত্ম অনুসন্ধান, এই জীবন জিজ্ঞাসা, নিজেকে অতিক্রম করবার এই অদম্য জেদ সামগ্রিক অর্থেই এক পাহাড়িয়ার জীবনচরিত রচনা করে

 
শঙ্খের মধ্যে দিয়ে যেমন সমুদ্রের গর্জন শোনা যায়, পাথরের মধ্যে জলের স্পন্দন, তেমনি এই লাইব্রেরির মধ্যে দিয়ে জীবনের উত্থান আর পতনের শব্দ আজও আমার কানে ভেসে আসে। প্রচলিত গল্প উপন্যাস পড়ার পাশাপাশি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার ভ্রমণ সাহিত্য আমাকে সমৃদ্ধ করেছিল তাঁদের গল্পের অনিন্দ্য সুন্দর বয়নে। শরীরের অসামর্থ্য রিকেট বঞ্চনা চুঁইয়ে চুঁইয়ে আমার কল্পনার মানস ভ্রমণ শাণিত করেছিল ক্রমে উপক্রমে। সেইসব কাঁচা বয়সেই রাহুল সংকৃত্যায়নের ‘ভলগা থেকে গঙ্গা’, উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘হিমালয়ের পথে পথে’, শঙ্কু মহারাজের ‘বিগলিত করুণা জাহ্নবি যমুনা’, প্রবোধ কুমার সান্যালের ‘দেবাত্ম হিমালয়’, রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’, সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’, রাজেন্দ্র মোহন বসুর ‘কাশ্মীর কুসুম’, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের ‘পালামৌ দর্শন’, বিমল মুখার্জির ‘দু’চাকায় দুনিয়া’, অবধূতের ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’, জলধর সেনের ‘হিমালয়’, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চাঁদের পাহাড়’ ইত্যাদি নানান বই নেড়ে ঘেঁটে পড়ে শুনে আমার জীবনে এক বোহেমিয়ানের আত্তীকরণ ঘটেছিল অবচেতনে অজান্তে অস্ফুটে। সুতরাং টাকা পয়সা জমি বাড়ি নয়, ভূগোলের অমেরুদণ্ডী জ্যেঠু কাকু নয়, রাজনীতির নেতা কেতা মন্ত্রী শান্ত্রী নয়, গানের সুরসপ্তক বন্দিশ হারমোনিয়াম নয়, পাহাড়ের জুতো জামা ক্র্যাম্পন নয়, কবিতা সাহিত্যের বনেদি পরম্পরা নয়; একমাত্র বইয়ের অনুষঙ্গ এবং নতুন কিছু শেখার জানবার অসীম আগ্রহ আমার জীবনের অদ্বিতীয় পারিবারিক উত্তরাধিকার। আর রইলো যাত্রা মঞ্চে বিবেকের মতো কানের ভিতর অনুরণিত হতে থাকা বাবা মায়ের সাবধান বাণী— “জয়লোভে যশোলোভে রাজ্যলোভে, অয়ি, বীরের সদ্‌গতি হতে ভ্রষ্ট নাহি হই।”
 
অবশ্য কাঁচা বয়সের উৎসাহে এই ‘বীর’ শব্দের অপব্যাখ্যা করেছি সময়ে অসময়ে। মায়ের ‘বীরপুরুষ’টি সেজে সন্ধ্যার ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে হারানো গরু বাছুর খুঁজতে গিয়ে নিজেই গহীন অরণ্যের মায়ায় পথ হারিয়েছি কতবার, ইছাই দেউলের পাশে বয়ে চলা অজয়ের ঘূর্ণির চাপা জলে প্রায় তলিয়ে গিয়ে ফিরে এসেছি দৈবক্রমে, বটের নামাল কেটে ক্রিকেট খেলার ব্যাট বানাতে গিয়ে গভীর জঙ্গলে তান্ত্রিকের তাড়া খেয়ে প্রাণে বেঁচেছি দৈবাৎ, বন্ধুদের সাথে শর্তের বাজি ধরে মহাশ্মশানের পোড়া কয়লা আনতে গেছি নির্জন গ্রীষ্মের দুপুরে, সরস্বতী পুজোর দরকারি আমের মুকুল পাড়তে গিয়ে মগডাল থেকে মড়মড়িয়ে মাটিতে পড়ে লেঙচে বাড়ি ফিরেছি লুকিয়ে, পঞ্চলিঙ্গেশ্বর দর্শনে হাজার হাজার মানুষের লাইন টপকে একটি উঁচু ঝর্ণা থেকে পা পিছলে ধারালো পাথরের ভয়াবহ ফাঁড়া কাটিয়ে জলজ্যান্ত গিয়ে পড়েছি ভগবানের মাথায়। গল্প হলেও এমন ডানপিটে সত্যি জীবন কাটিয়ে এসেছি রূপকথার মতো।
 
আমার স্কুল দিবাকর উচ্চ বিদ্যালয় এবং অযোধ্যা উচ্চ বিদ্যালয়ে সকালের প্রার্থনা লাইনে একটি শুভ উদ্যোগ জনিত অভ্যাস আমাকে আকৃষ্ট করেছিল। ছাত্রদের চরিত্র গঠনে সেখানে ছিল শিক্ষকদের সবিশেষ নজর। এক একজন ছাত্রকে রোজ আহ্বান করা হতো মনীষীদের বাণী পাঠ করতে এবং সেটি ছিল গুরু দায়িত্ব। বই পত্তর ঘাঁটতে ঘাঁটতে একদিন আমার হাতে উঠে এলেন স্বামী বিবেকানন্দ — “All power is within you; you can do anything and everything. Believe in that, do not believe that you are weak; do not believe that you are half-crazy lunatics, as most of us do nowadays. You can do anything and everything, without even the guidance of anyone. Stand up and express the divinity within you.” আমার ভেতরেই সব শক্তি আছে ? ঘুম ভেঙে উঠে দাঁড়ালেই সব হবে ? “আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা’, করি শত্রুর সাথে গলাগলি ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা?” কিভাবে সম্ভব ! তবে এই যে চারপাশের এতো হীনতা, দুর্বলতা, ভয়, অপারগতা ! এইসব মরীচিকার আড়ালে কোথায় বাস করে ধ্যানমগ্ন সেই মহাশক্তির অমৃত কুম্ভ ?
 

অলঙ্করণ: দেব সরকার

 
উত্তর মিলিয়ে নিতে হাঁটতে হয়েছিল জীবনের আরও অনেক পথ। পিছিয়ে গেছি ২৯মে, ১৯৫৩ সাল। যখন নেপালি শেরপা তেনজিং নোরগেকে সঙ্গে নিয়ে কিউয়ি যুবক এডমন্ড হিলারি মাত্র চৌত্রিশ বছর বয়সে পা রাখলেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট এর শীর্ষে। সাংবাদিক সম্মেলনে অনেক প্রশ্নের একটি জবাবে বললেন — “It is not the mountain we conquer but ourselves.” শুনেই বিবেকানন্দের কথা মনে পড়ে গেল। হুবহু এক কথা। এই আত্ম অনুসন্ধান, এই জীবন জিজ্ঞাসা, নিজেকে অতিক্রম করবার এই অদম্য জেদ সামগ্রিক অর্থেই এক পাহাড়িয়ার জীবনচরিত রচনা করে।
 

ক্রমশ…
 
আগের পর্ব পড়ুন:

ধারাবাহিক: পাহাড়িয়া পথে পথে।পর্ব ৩


  • Tags:

Read by:

❤ Support Us
Advertisement
homepage block Mainul Hassan and Laxman Seth
Advertisement
Hedayetullah Golam Rasul Raktim Islam Block Advt
Advertisement
শিবভোলার দেশ শিবখোলা স | ফ | র | না | মা

শিবভোলার দেশ শিবখোলা

শিবখোলা পৌঁছলে শিলিগুড়ির অত কাছের কোন জায়গা বলে মনে হয় না।যেন অন্তবিহীন দূরত্ব পেরিয়ে একান্ত রেহাই পাবার পরিসর মিলে গেছে।

সৌরেনি আর তার সৌন্দর্যের সই টিংলিং চূড়া স | ফ | র | না | মা

সৌরেনি আর তার সৌন্দর্যের সই টিংলিং চূড়া

সৌরেনির উঁচু শিখর থেকে এক দিকে কার্শিয়াং আর উত্তরবঙ্গের সমতল দেখা যায়। অন্য প্রান্তে মাথা তুলে থাকে নেপালের শৈলমালা, বিশেষ করে অন্তুদারার পরিচিত চূড়া দেখা যায়।

মিরিক,পাইনের লিরিকাল সুমেন্দু সফরনামা
error: Content is protected !!