Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • ডিসেম্বর ৪, ২০২২

বাঁক

নদীর বুকে যেমন পলি জমে মানুষের সম্পর্কের মধ্যেও সেরকম পলি জমে । সম্পর্কে ভালোবাসা না থাকলে একটু একটু করে বুঁজে আসে । পাড় ভাঙার মতো ভাঙতে থাকে সম্পর্কের বাঁধন । তারপর একদিন সে সম্পর্কের মৃত্যু হয় ।

সৌরভ হোসেন
বাঁক

অলঙ্করণ: দেব সরকার

চামটা নদীর বুকে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে বাঁশের মাঁচাটা । অঘ্রানের পিতল রঙা রোদ খিলখিল করছে সে শুকনো বুকে । নদীতে এখন হাঁটু জল । কোথাও কোথাও সে জল শুষে চিকচিক করছে সাদা বালি । পশ্চিম পাড়ে যেখানে মাঁচাটা শেষ হয়েছে তার টিকি ছুঁয়ে কলাগাছের ঝাড়টা গায়ে সবুজ রঙের সিল্কের শাড়ির মতো পাতা বিছিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে নদীপাড়ের আঁকাবাঁকা যে রাস্তাটা চলে গেছে গঙ্গাধারী গাঁয়ের দিকে সেখানেই আখের রস বিক্রি করছে ইয়াছিন । একখানা দু ফাংড়ির পাকুরগাছটার নিচে । একগাছ অঘ্রানের ছায়া ঝুপ মেরে নেমে এসেছে তলায় । রস নিংড়ানো মেশিনের ভটভট শব্দ নদীর দুই পাড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে । অঘ্রানের হাওয়া ভটভট শব্দ ঘাড়ে করে রোদ মেখে ঢেউ তুলছে পাকা ধানের শিষে । দামোসের পাড়ে বিঘে বিঘে ধানি জমি । ইয়াছিনের বউয়ের সোনার কানের দুলের যে রঙ পাকা ধানগুলোরও সেরকম রঙ । ইয়াছিন তার বউকে ঠাট্টা করে, ‘ দামোসের পাড়ে আমার যদি বিঘেখানেক ধানের জমি থাকতো তাহলে সুনা লয় পাকা ধানের শিষ তুমার কানে ঝুলিয়ে দিতুস। সুনার দুলের চেহিও তুমাকে বেশি মানাতোস।‘ মুরশিদা স্বামীর ভীমরতি ধরা কথা শুনে বলে, ‘শুদু কানে ক্যানে ঝুলি দিবা ? গুটা গাখানডাই পাকা ধান দিয়ি ঢেকি দিবা, লোকে বুলবে, ইয়াছিন তোর বউর গায়ে কত সুনা রে ! তোর মুতন আমরা আধখানাও বউকে ভালবাসতে পান্নু না !’

‘ও মন রে আমার……’ গানটা কেবলই ধরেছিল ইয়াছিন অমনি নড়বড় করতে করতে একটি এলেবেলে সাইকেল এসে থামল । ব্রেক কষার একটা মিহি ‘ঘ্যাঁচ’ শব্দও হল । মেশিনের ভটভট শব্দে সে শব্দ অত কামড় দিয়ে উঠতে পারল না । ‘ রস দিও তো ।’ সাইকেলের লোকটি বলল । লোকটির মুখে পাকা দাড়ি । দাড়িগুলো ঘন নয় । হালকা ফিনফিনে । তবে লম্বায় বুক ছুঁয়ে আছে । যেন এক ঝোড় ধানের শিকড় তার মুখে লাগানো আছে । জড়সড় চামটা মুখ । দুই গাল বসে হাড়গুলোয় গেঁথে আছে । আর সে চামটা মুখের ওপরে দুটো কুতকুতে চোখ । দুই খুঁটলে কুতকুত করছে । কাঁচাপাকা চুলের মাথায় সাদা গোল টুপি । শুধু মাথায় আর মুখেই নয়, লোম ছড়িয়ে আছে পায়েও । পরনের নীল-সাদা চেকের লুঙ্গিটা গোড়ালির ওপর পর্যন্ত ঝুলছে । লোকটির গায়ে সাদা রঙের পাঞ্জাবি । পাঞ্জাবিটা ঢলঢল করছে । যেন মানুষের দেহে নয় একটা মরা ঢোল কলমির গাছের ওপর পাঞ্জাবিটা পরানো ! সাইকেলটার হ্যান্ডেলের দুই দিকে দুটো ব্যাগ। একটা প্লাস্টিকের একটা নাইলনের । দুটো ব্যাগ ভর্তি । ছিবড়া ছাড়ানো আধখানা আখ হেঁসোর কোপ দিয়ে কেটে প্রথমে দু ভাগ পরে সেগুলো থেকে কিছুটা রস নিংড়ালে সেগুলোকে ভেঙে চার ভাগ করে মেশিনে দিল ইয়াছিন । মেশিনের ভটভট শব্দের সঙ্গে আখ থেকে রস বের হওয়ার শব্দও বেজে উঠল । ইয়াছিন আগে হাত দিয়ে রস নিংড়ানো মেশিনের চাকা ঘোরাত। তখন তার হাতের কব্জি আর বুকের ছাতির সব বল বেরিয়ে যেত । দরদর করে ঘামত গা-গতর । ঘুঁত ঘুঁত করে দম ফেলত । এখন সে হ্যাপা বিদেয় হয়েছে। ইয়াছিন গাড়িতে ইঞ্জিন লাগিয়েছে । রস নিংড়ানোর ঘোড়া আর চাকা এ মেশিনেই ঘোরায় । মেশিনে ছিবড়া ছাড়ানো আখের ডাটি দিয়ে খোশ মনে গান করে ইয়াছিন । অবশ্য আখের ছিবড়া হেসো কিংবা পাশনি দিয়েই ছাড়াতে হয় । ‘ ক-গিলাস দিব মুজাম চাচা ?’ জিজ্ঞেস করল ইয়াছিন ।

‘এক গিলাস ।’ বৃদ্ধলোকটি বলল । মুজাম লোকটি ইয়াছিনের চেনা । কেটলি থেকে কাগজের গিলাসে রস ঢালতে ঢালতে ইয়াছিন বলল, ‘ বিটির বাড়ি যাচ্চো নাকি, চাচা?’

‘ হ্যাঁ গ বাপ ।’

‘ তা এদিক দিয়িই ক্যানে যাও ? সাজদাপুরের ভিতর দিয়ি মালোপাড়ার ঘাট পেরি যাবা। তুমাধের গজনিপুর থেকি কাছে হবে।’ ‘ মাঠের রাস্তা, খারাপ হবে বুলি গেনু না। আর ইদিকটার রাস্তাঘাট ভালো।’
‘ কিন্তুক ঘুত্তে যে হবে ম্যাল্লাখান! গঙ্গাধারীঘাট পেরি উত্তর গরিবপুর পেরি মধ্যগরিবপুর পেরি তবেগা শিবনগর!’ যেভাবে পাকে পাকে আখের রস বের করে ইয়াছিন সেভাবে পাকে পাকের রাস্তা দেখায়। মুজাম শেখ সে দূরকে দূর ভাবে না। বলে, ‘ শিবনগরের ভেত্তরে বিটির বাড়ি লয়, দামোসের মুখেই বাড়ি। ইদিক দিয়ি গেলিই সুবিদা।’

‘এই ল্যাও।’ রসের গিলাসটা মুজামের হাতে দিয়ে ইয়াছিন বলল, ‘এই বুড়হে বয়সে ছাইকেলে চেপি আসো ক্যানে চাচা ? রাস্তাঘাট লিরাপদ লয়। এত্ত গাড়ি-ঘোড়া বেড়িচে ! কখুন কী হয়ি যায় বুলার জো নাই !’

‘ কথাডা তুমার চাচিও বুলচিল । আমি দেখনু, লিজের বাহন মানে লিজে স্বাধীন। ইখেনে থামব ওখেনে থামব কুনু ঝামেলা নাই । আস্তে আস্তে যাব । লিজের মুতন যাব । কাহুর তাড়া দ্যাওয়ারও নাই কাহুর ছেড়ি যাওয়ারও নাই। এই ধরো, তুমার আখের রসডা, বাসে কিংবা ট্রেকারে করি গ্যালে খাতে পাত্তুক? পাতুক না।’

‘ কথাডা তো ঠিক। তবে দিনকাল যা পড়িচে কিছু বুলার নাই চাচা।’
‘ সেজন্যি আল্লা আছে। হায়াত-মহুতের মালিক আল্লা।’ তিন চুমুক দিয়ে রসটা পান করল মুজাম। যে কোনও পানিও খাবার তিন বারে পান করা সুন্নত। মুজাম সে সুন্নত মানল। ইয়াছিন জিজ্ঞেস করল, ‘ তা চাচা আছো কেমুন ? মেল্লা দিন পর বিটির বাড়ি যাচ্চ !’

‘ অসুকে পড়িছিনু বাপ। এই কেবলই অসুক সেরি উঠনু। মুন ভালো নাই বাপ।’
‘ ক্যানে, চাচা, মুন ভালো নাই ক্যানে ? অ্যাখুন তো বসি বসি খাওয়া আর লাতিপুতিধের সাথে খেলা করার সুমা ?’
‘ সে সুখ আমার কপালে নাই, বাপ।’
‘ ক্যানে, কী হয়েছে ?’

বেলা তখন চিথোল ভৈরবের পাড় বেয়ে নামছে । দু পারের পাকা ধান আর রাইয়ের হলুদ ফুলে অপরাহ্ণের মিঠে রোদ ঝিলমিল করছে । মুজাম নদীটাকে দেখছে আর ভাবছে এই নদীর মতো মানুষের সম্পর্কগুলোও একটু একটু করে মরে যাচ্ছে ।

‘ ঘরের কথা কী আর গাহাব বাপ। বুলতেও লজ্জা লাগে। আবার না বুল্লেও লয়। আমার দুই ব্যাটা এক বিটি। বড় ব্যাটার বিহি দিনু ধুমধাম করি। দেখিশুনি বউ আন্নু ঘরে। কিন্তুক সে বউ আমার সুজা লয়। বছরখানেক পরে ছোট ব্যাটারও বিহি দিনু। সে বউও ব্যাঁকা। সব লাট সাহেবের বিটি ! সুয্যু উঠি রোদ পাকলে পড়ে গা বিছনা থেকি উঠে। আর তুমার চাচি সেই ফজরের লমাজ পড়ি লেগি পড়ে কাজে। গুহাল থেকি গরু বের করে নানপাড়ে বাঁধে। গোবর তুলে। হেঁসেল-গুহাল ঝাড়ঝুড় দেয়। গরুডার লেগি আমি শানি কাটি। ত্যাখুন লাটসাহেবের বিটিরা জানালার ফাঁক দিয়ি টুকি মেরি দ্যাখে কাজকামগুলা হল কি না। হলে পরে দড়বড় করি এঁটো থালাবাসনকডা লিয়ি কলতলায় যায় ।’

‘ বউরা কি চাচিদের মুতন হবে? হবে না। আজকালকার বউরা হল আধুনিক। উসব গোবরটোবর লাড়ে ?’
‘ আর বুলো না । সবসুমায় ওই মুবাইল লিয়ি পড়ি থাকে। কীসব হাবিজাবি দ্যাখে। আলগা পোশাকের নুংড়ামিপনা আর গাইলমুন্দ।’

‘ উসব দেখিই তো ঝগড়াঝামেলা শিখচে।’
‘ আচ্চা, বুলো তো বাপ, মুবাইলে ভালো কিছু কি নাই ? এই তো কত্ত মলবি-মৌলানারা ভাষণ দ্যায়। হাদিস-কুরআন বুলে। জান্নাত-জাহান্নামের কথা বুলে। সেসব দেখবে না, দেখবে যত কেচ্ছা-কেলেঙ্কারি ।’

‘ উসব মানি লিতে হবে চাচা, কিচ্চু করার নাই, ওইসবই এখুন দুনিয়া ।’
‘ উসব কিয়ামতের আলামত । দুনিয়া আর বেশিদিন টিকবে না । দুনিয়ার মানুষের ইমান বুলি আর কিছু নাই। দুংখের কথা কী আর বুলব, আমার দুই ছেলি একবারও বাপ-মাডার খোঁজ লেয় না ! একবারও মুখের কথা শুদায় না, আব্বা ক্যামুন আচো !’
‘ দুই ব্যাটাই ভিনো ?’

‘ সে কথা আর বুলো না বাপ, ভিনো হওয়ার লেগি বউগুলেন ক-দিন ঝিম ধরি থাকল। খালো না কথা বুলল না। কিছু বুলতে গেলিই খ্যাঁক করি উঠতে লাগল ! দুই ভাইয়ে পিরাইই মারামারি লেগি যাতে লাগল। একজুনা বুলে, তোর বউ বেশি খায় তো আরেকজুনা বুলে, তোর বউ বেশি খায়। আমি আর সহ্য কত্তে পান্নু নে। ভিনো কোরি দিনু।’

‘ তাতে তুমারই তো ভালো হল। একবেলা ই ব্যাটার কাছে আরেক ব্যালা উ ব্যাটার কাছে খাবা । বিন্দাস থাকবা ।’

‘ সে সুখ কি আমার কপালে লিখেচে আল্লা! মুখের কথাডাই বুলে না তো প্যাটের ভাত?’ চোখ ছলছল করে ওঠে মুজামের। মুখ লুকিয়ে সে ভেজা চোখ মোছে। তারপর বুকটাকে হালকা করে বলে, ‘ বিটিডা ছিল বুলি জানে বেঁচি আছি। বিটি আমার দুব্যালা তোখিদ করে। অসুখ বিসুখ হলি ডাক্তার দ্যাখায়। বিটিই ভালো ।’ চোখে এবার আনন্দ খিলখিল করে মুজামের । অথচ মেয়েটা যখন জন্ম নিয়েছিল তখন অত আনন্দ হয়নি মুজামের মনে । সেরকম বড়ো কোনও পশুও আকিকা দেয়নি । বাড়ির তিন বিহেনের ধাড়ি ছাগলটা জবেহ করেছিল । বড়ো মসজিদের ইমাম বলেছিলেন, ‘ আকিকাতে খাসি দিলে আরও ভালো হত মুজামচাচা !’ কথাটা অত গ্রাহ্য করেনি মুজাম । অথচ বেটাদের বেলায় ঘাড় উঁচু বকন আকিকা দিয়েছিল মুজাম। গোটা পাড়া খুশির শিন্নি বিলিয়েছিল। আফসোস করে মুজাম বলল, ‘ দুটে ব্যাটা না দিয়ি আল্লা যদি আরও দুটে বিটি দিতোস, ভালো হতোস !’

‘ বিটি হল আল্লার বরকত ।’ বলল ইয়াছিন । সে লুঙ্গির গিঁট থেকে বিড়ি বের করল । ‘ বিড়ি খাও চাচা’ বলে মুজামকে একটা দিল আরেকটা নিজে ধরাল । ইয়াছিন সুখটান দিল । মুজাম ফুঁক ফুঁক করে দুবার ফুঁকল । তারপর বলল, ‘ বাপ-মায়ের চোখে পানি ঝরলে আল্লা অদের ক্ষমা করবে? করবে না ।’

‘ সেজন্যি তো আল্লা বুলিচে, বাপ-মায়ের পায়ে সন্তানের বেহেশত ।’ আরও একবার সুখটান দিল ইয়াছিন। তারপর ধোঁয়ার আউরিবাউরির মধ্যে ইয়াছিন বলল, ‘ হাজার হোক ওরসের ছেলি । বদ দুয়া দিও না চাচা ।’ কথাটা খেয়াল করেও খেয়াল করল না মুজাম । আনমনা হয়ে উঠল । বিড়িটায় লম্বা টান দিয়ে নদীর পাড়ে হেঁটে গেল । বেলা তখন চিথোল ভৈরবের পাড় বেয়ে নামছে । দু পারের পাকা ধান আর রাইয়ের হলুদ ফুলে অপরাহ্ণের মিঠে রোদ ঝিলমিল করছে । মুজাম নদীটাকে দেখছে আর ভাবছে এই নদীর মতো মানুষের সম্পর্কগুলোও একটু একটু করে মরে যাচ্ছে । নদীর বুকে যেমন পলি জমে মানুষের সম্পর্কের মধ্যেও সেরকম পলি জমে । তারপর সে সম্পর্কে ভালোবাসা না থাকলে একটু একটু করে বুঁজে আসে । পাড় ভাঙার মতো ভাঙতে থাকে সম্পর্কের বাঁধন । তারপর একদিন সে সম্পর্কের মৃত্যু হয় । কত কষ্ট করে ছেলেগুলোকে মানুষ করেছিলাম ! নিজে না খেয়ে না পরে ওদের খাইয়েছি পরিয়েছি । অভাব সংসারে গেঁড়ে থাকত । সপ পেড়ে শুইয়ে থাকত দাওয়ায় । মুজাম নদীতে নিজেকে দেখতে পাচ্ছে । নদীটা গরিবপুরের দিকে বেঁকে চলে গেছে । সে বাঁকের দিকে তাকিয়ে দামোসের পাড়টা দেখতে পেল মুজাম । মুজাম দেখল, দামোসের পাড়েই তার একমাত্র মেয়ে হাসিনার বাড়ি । বাপের আসার খবর পেয়ে এতক্ষণ মেয়েটা হয়ত বেড়ার কাছে দাঁড়িয়ে আছে । মুজাম পৌছলেই বলবে, ‘ আব্বা, আসতে কষ্ট হয়নি তো ?’

♦––♦

সৌরভের অন্যান্য গল্প:  ভাংড়িওয়ালা প্রকৃতির পাঠশালা   একটি বিলের আত্মকথা                                                    আব্বা পাতান শেখের দুনিয়াদারি


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!