Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • অক্টোবর ২২, ২০২৫

দেশ জুড়ে প্রান্তিক মানুষের ওপর নির্যাতন বাড়ছে ! উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ সহ বিভিন্ন রাজ্যে ধর্মের নামে হেনস্থা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
দেশ জুড়ে প্রান্তিক মানুষের ওপর নির্যাতন বাড়ছে ! উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ সহ বিভিন্ন রাজ্যে ধর্মের নামে হেনস্থা

সমাজের দলাপাকানো, মজ্জায়-মজ্জায় ঢুকে যাওয়া ‘অন্ধকার’ কি বাইরের আলোতে উদ্ভাসিত হয়ে নতুন দিনের সূচনা করতে পারে? ভারতীয় শাস্ত্র আর দর্শনের ছত্রে ছত্রে রয়েছে মনের অন্ধকার দূর করবার, অন্তরের আলো জ্বালানোর অন্তহীন প্রয়াস। কিন্তু নয়া ভারত যেন ক্রমেই তলিয়ে যাচ্ছে আরো অন্ধকারে, তার গায়ে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরছে কুসংস্কার আর ভেদাভেদের অমোঘ শিকল। দীপাবলির সন্ধ্যায়, যখন গোটা দেশ মাখছে আলোর রোশনাই, তখন ‘অসাবধানতাবশত’ মন্দির চত্বরে প্রস্রাব করে ফেলেছিলেন বছর ষাটের এক প্রবীণ। আর সে ‘অপরাধের’ শাস্তি স্বরূপ তাঁকে নাকি মাটিতে মুখ ঠেকিয়ে নিজের মুত্র চাটতে বাধ্য করা হল। ঘটনাস্থল লখনৌ শহরের কাকোরি। অভিযোগের তির এক ‘স্বঘোষিত ধর্মরক্ষকের’ দিকে। যিনি আবার দলিত প্রবীণকে জাতপাতের গালিগালাজ করতেও পিছপা হননি বলে অভিযোগ। ঘটনার খবর প্রকাশ্যে আসতেই উত্তাল উত্তরপ্রদেশের রাজনৈতিক মহল। শাসক বিজেপির বিরুদ্ধে একজোট বিরোধীরা। অভিযোগ, ‘মনুবাদী’ মানসিকতাই এর নেপথ্যে। অন্যদিকে, পুলিশ বলছে, ‘তদন্ত চলছে। অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’

একবিংশ শতকের ভারতে জাতপাতের দাপট কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তার নগ্ন প্রমাণ আবার দেশের সামনে। জানা যাচ্ছে, ষাটের কোঠায় পা দেওয়া দলিত বৃদ্ধ, রামপাল রাওয়াত, অসুস্থতার কারণে, অসাবধানতাবশত কিছুটা প্রস্রাব করে ফেলেন। ঘটনাটি ঘটে মন্দির চত্বরের এক কোণে, যা মূল মন্দির ভবন থেকে প্রায় ৪০ মিটার দূরে বলে নির্যাতিতের পরিবারের দাবি। আর এই ‘অপরাধেই’ তাঁকে চরম অপমানের শিকার হতে হয়। অভিযোগ, স্বামী কান্ত ওরফে পাম্মু নামে এক ব্যক্তি তাঁকে জাতপাত নির্ভর গালিগালাজ করতে করতে চিৎকার করে বলেন, তিনি মন্দির অপবিত্র করেছেন। এরপর তাঁকে জোর করে মাটিতে মুখ ঠেকাতে, এমনকি চাটতেও বাধ্য করা হয়। অপমানের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেও রামপাল কোনো প্রতিবাদ করতে পারেননি। ভয়ে স্তব্ধ হয়ে যান। বাড়ি ফিরেও রাতভর চুপ ছিলেন, পরিবারের কাউকে কিছু জানাননি।

পরদিন সকালে তিনি তাঁর নাতি মুকেশ কুমারকে পুরো ঘটনাটি খুলে বলেন। মুকেশ জানান, তাঁর দাদু দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ । শারীরিক কারণেই অনিচ্ছাকৃতভাবেই প্রস্রাব হয়ে যায়। এমন শারীরিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একজন ব্যক্তি যে ভাবে তার দাদুকে নীচুতার চরম পরিণতির দিকে ঠেলে দেন, তা অকল্পনীয়। এরপরই, কাকোরি থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত পাম্মুকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধানের সংশোধিত রূপ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার অধীনে ১১৫ (২) বা স্বেচ্ছায় আঘাত করার শাস্তি, ৩৫১ (৩) বা অপরাধমূলক ইঙ্গিতে ভয় দেখানো, ৩৫২ বা অসম্মানজনক আচরণ ও উসকানিমূলক অপমান ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। সঙ্গে প্রয়োগ হয়েছে তফসিলি জাতি ও উপজাতি (অত্যাচার প্রতিরোধ) আইন। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত চলছে। যদিও অভিযুক্তের দাবি, তিনি নাকি কেবলমাত্র ওই বৃদ্ধকে ‘মাটি ছোঁয়ার’ নির্দেশ দিয়েছিলেন, চাটতে বলেননি।

ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই তা নিয়ে চরম রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধীরা শাসক বিজেপি ও আরএসএস-এর বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, কারো অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য এমন অমানবিক শাস্তি মানবতাকে লজ্জিত করে। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি আরএসএস-এর সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের অভিযোগ, বিজেপি ও আরএসএস মিলে দলিত-বিরোধী মনোভাব নিয়ে কাজ করছে, সংবিধান তুলে দিয়ে ‘মনুবাদ’ প্রতিষ্ঠা করার দিকে এগোচ্ছে। যদিও পুলিশ স্পষ্ট জানিয়েছে, অভিযুক্তের সঙ্গে আরএসএস-এর কোনো প্রত্যক্ষ সংযোগ মেলেনি।

এদিকে, লখনৌ-এর এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মধ্যপ্রদেশের ভিন্ড জেলা থেকে উঠে এসেছে দলিত নির্যাতনের আরো এক ভয়াবহ ছবি। গিয়ান সিং জাটব নামে এক ২৫ বছর বয়সী দলিত যুবক অভিযোগ করেছেন, পূর্ব পরিচিত ৩ জন ব্যক্তি তাঁকে অপহরণ করে প্রথমে মারধর করে, তারপর জোর করে তাঁকে মদ খাওয়ানো হয় এবং প্রস্রাব পান করানো হয়। ঘটনাটি ঘটে তাঁর প্রাক্তন মালিক সোনু বরুয়ার নেতৃত্বে। গিয়ান সিং কিছুদিন আগেই ওই ব্যক্তির গাড়ি চালানো ছেড়ে দেন। এরপর একদিন তাঁকে ফোন করে আবার গাড়ি চালাতে বলা হয়, কিন্তু তিনি অস্বীকৃতি জানালে অপহরণ করে ভিন্ডে নিয়ে গিয়ে এই নির্মম অত্যাচার চালানো হয়। সেখানেও তাঁকে শিকল দিয়ে বেঁধে ফের প্রস্রাব পান করানো হয়। বর্তমানে গিয়ান সিং জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মধ্যপ্রদেশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ৩ অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে জেল হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ও তফসিলি জাতি ও উপজাতি (অত্যাচার প্রতিরোধ) আইনের অধীনে মামলা রুজু হয়েছে।

রাজ্য আলাদা হলেও, দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান দলিত ও সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার, হেনস্তা যেন এক অশুভ যোগসূত্র তৈরি করছে। জাতপাতের ঘৃণা, ক্ষমতার দম্ভ, এবং মানবিকতার চূড়ান্ত অবক্ষয় সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে। এগুলি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। জুলাই ২০২৩-এ মধ্যপ্রদেশের সিধি জেলায় এক ব্যক্তি প্রকাশ্যে এক অন্তজ শ্রেণির ব্যক্তির গায়ে প্রস্রাব করেছিলেন। সে ঘটনা নিয়েও দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়েছিল। সম্প্রতি, মধ্যপ্রদেশের কাটনি জেলায় এক দলিত ব্যক্তিকে বেআইনি বালি উত্তোলনের প্রতিবাদ করায় মারধর ও তাঁর গায়ে প্রস্রাব করার অভিযোগও উঠেছে। জাতীয় অপরাধ পরিসংখ্যান ব্যুরো- ২০২৩-এর তথ্য বলছে, ভারতে তফসিলি জাতির বিরুদ্ধে অপরাধের সংখ্যা ৫৭,৭৮৯টি। শুধু মধ্যপ্রদেশেই ঘটেছে ৮,২৩২টি ঘটনা, যা দেশে সর্বোচ্চ। রিপোর্টে আরো উঠে এসেছে, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দলিতদের বিরুদ্ধে অপরাধ ৪৬ %, আর উপজাতিদের বিরুদ্ধে ৯১ % বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রান্তিক থেকে শহুরে, আইপিএস অফিসার থেকে শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারক, জাতিগত সংকীর্ণতা আর সে দম্ভে বলিয়ান হয়ে আক্রমণের হাত থেকে রেহায় পাচ্ছেন না কেউই।

বর্তমান সরকারের সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক কৌশল এবং হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের উস্কানির কারণে সংখ্যালঘুদের ওপর হিংসা বাড়ছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর দলবদ্ধ হামলা, গরু চুরি, পাচার কিংবা মাংস খাওয়ার সন্দেহে নিরীহ মানুষের উপর নিগ্রহের সংখ্যা বাড়ছে। হরিয়ানায় ২৬ বছর বয়সী মুসলিম শ্রমিকের বিরুদ্ধে এমন ‘অভিযোগ’ তুলে তাঁকে খুন করা হয়েছে, মহারাষ্ট্রে ৭২ বছর বয়সী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক বৃদ্ধকে পিটিয়ে মারার ঘটনা সামনে এসেছে। রাজ্য বা কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে এই হিংসাত্মক ঘটনায় সঠিক তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া, বরং ভুক্তভোগীদের উপর মামলা চাপানো এবং অবৈধভাবে সংখ্যালঘুদেরে সম্পত্তি উচ্ছেদের ঘটনা, যা এখন ‘বুল্ডোজার জাস্টিস’ নামে পরিচিত — এর মাধ্যমে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি নিগ্রহকে সরকারী বৈধতা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। চলতি বছরের জুনে মধ্যপ্রদেশের মণ্ডলা জেলায় ১১টি সংখ্যালঘু পরিবারের ঘর ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে উত্তরপ্রদেশের এক কিশোরকে জোরপূর্বক প্রস্রাব পান করানো হয়েছে বলে অভিযোগ। মধ্যপ্রদেশে এক দলিত মহিলাকে এবং তাঁর নাতিকে পুলিশি লাঠিচার্জের শিকার হতে হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের একটি প্রাইভেট হাসপাতালের এক ডাক্তার ২০ বছর বয়সী এক দলিত নার্স যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। উপজাতি সম্প্রদায় ও আদিবাসীদের বিরুদ্ধেও অবিচার কমেনি, ছত্তিশগড়ের বিজেপি শাসিত এলাকায় মাওবাদী বিদ্রোহ দমন অভিযানে গ্রামীণ জনগণের উপর অতিরিক্ত বল প্রয়োগ, হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। মানবাধিকার কর্মীদের উপর রাজনৈতিক চক্রান্তমূলক অভিযোগও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশজুড়ে বাড়ছে মহিলাদের উপর যৌন ও শারীরিক অত্যাচার।

তালিকা দীর্ঘ। তবে স্বল্প এ পরিসংখ্যানই জানান দেয়, আজকের ভারতে নির্যাতন কেবল ঘটনাচক্র নয়— এটি একটি প্রবণতা, একটি রূঢ় বাস্তবতা। অন্যদিকে এটি এও প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এখনো সাংঘাতিক ঘাটতি ও পক্ষপাতিত্ব বিদ্যমান। আর এই বাস্তবতা পরিবর্তনের দাবি শুধু আইন বা শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। একটি সমাজ কেমনভাবে তার দুর্বলতম ও প্রান্তিক মানুষদের সঙ্গে ব্যবহার করে, তা দিয়েই আসলে একটি সমাজের সামগ্রিক চেহারার তূল্যমূল্য বিচার করা যায়।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!