Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • জুন ৫, ২০২২

হারমোনিয়াম

মানুষ যাকে পেলে জীবনে শান্তি পাবে? এই মানুষটা গানের ভিতর কেমন একটা পথ খুলে দিয়েছে। সাধকরা বলেন সেই মানুষ নাকি মনের ভিতরেই থাকে

উৎপল মান
হারমোনিয়াম

অলঙ্করণ: দেব সরকার

হালকা ঘুম ছুঁয়েছিল চোখ। ধীরে ধীরে নম্র হয়ে আসছিল চারপাশ। কেমন একটা প্রশান্তি। ঠিক তখনই হারমোনিয়ামের সুর ভেসে এল। সঙ্গে বৃদ্ধ-র কণ্ঠ- সা রে গা মা পা ধা নি সা…সা নি ধা পা মা গা রে সা…। ক’টা আর বাজবে! মোবাইলে দেখল সবে সাড়ে দশটা। মিতা ন’টায় বেরিয়ে গেছে। আজ থেকে শোভনের একলা বন্দিদশা শুরু। চার-পাঁচ দিন ছুটি নিয়েছিল মিতা। আজই জয়েন করছে স্কুলে। মিতা চলে যাওয়ার পর হঠাৎ কেমন ফাঁকা লাগতে শুরু করেছিল শোভনের।

অথচ একা কি বাড়িতে থাকেনি এর আগে? কতবার থেকেছে। কিন্তু এবারটা যেন আলাদা। খুব অসহায় লাগছিল ওর। মিতা যাওয়ার আগে ওর চুলে হাত ঢুকিয়ে বিলি কেটে দিয়ে বলেছিল, ‘আসি। টেবিলে সব খাবার রাখা আছে। সময় মতো খেয়ে নিয়ো। চান করতে দেরি কোরো না যেন।’ শোভন শান্ত ছেলের মতো মাথা নেড়েছিল। তারপর কখন ঘুম আসতে শুরু করেছিল সে জানে না।

যন্ত্র আর কণ্ঠের সাথে তাল মিলিয়ে যেন কোনও বাড়ির কল থেকে জল পড়ছে। বৃদ্ধকে শোভন বেশ কয়েকবার দেখেছে। মাঝে মাঝে আসেন এখানে ছেলের কাছে। এখন ছেলে-বউ কোথাও বেড়াতে গেছে সম্ভবত। ঘর পাহারা দিতে এসেছেন হয়তো বুড়োবুড়ি। তবে বুড়ো বেশ শৌখিন। গোলাপি বলে দিন-রাতের টেস্ট ক্রিকেট দেখে ফেলেছেন কলকাতায় ইডেন গার্ডেনস-এ। বছর-দুয়েক আগে উনি নাকি গ্র্যাজুয়েশনে ভরতি হয়েছিলেন। কিছুদিন পড়াশোনার পর শখ মিটে গেছে। এখন গান শেখার ইচ্ছে গেছে। দুই ছেলে এবং এক মেয়ের বাড়িতে নাকি তিনটে হারমোনিয়াম কিনে রেখেছেন। যখন যেখানে যান সেখানেই গানের রেওয়াজে বসে পড়েন।

শোভন চোখ বুজে শুয়ে রইল। জানলার কাচ দিয়ে রোদ আসছে বিছানায়। পুরোটা খুলে দেওয়া যায়। কিন্তু বাইরে শনশনে বাতাস। ডিসেম্বরের শেষ থেকে ঠাণ্ডাটা ভালই পড়েছে। নতুন বছরের শুরুতে তা আরও বেড়েছে। শোভন ডান পা-টা সাবধানে সরিয়ে রাখল একটা নরম বালিশের ওপর। ব্যথা ভালই আছে। ডাক্তার বলেছেন, এর একমাত্র ট্রিটমেন্ট হল রাইস। অর্থাৎ রেস্ট অ্যান্ড আইস। মানে আঘাতের জায়গায় দিনে তিন-চারবার বরফ ঘষো আর বিশ্রাম নাও। বেশি মুভমেন্ট চলবে না। খাও-দাও আর চুপ করে শুয়ে-বসে থাকো। কার ভাল লাগে! অফিসে ও কতদিন যেতে পারবে না, কে জানে। সুস্থ হতে হয়তো পনের কুড়ি দিন লাগবে। হয়তো-বা তারও বেশি। ডাক্তারবাবু তেমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন। সামান্য একটা ভুলের জন্য ইতনা বড়া খেসারত! মানা যায় না।

শোভন প্রায়ই একটা দৃশ্য দেখে। প্রতিবার একই রকম। ঘুমটা ধরে আসছে, একটা পরম ঘোর তৈরি হচ্ছে চোখে, আর সেই আবেশ-জালিকায় ভেসে ওঠে চলমান ছবিটা- সে বাইক নিয়ে একটু একটু করে স্পিড বাড়াচ্ছে, আর হঠাৎই একটা লরি এসে ওকে ধাক্কা মারছে। ঘুমটা ভেঙে যায় শোভনের। অস্থির হয়ে ওঠে। পাশে শুয়ে থাকা মিতাকে কতবার বলেছে দুঃস্বপ্নটার কথা। মিতা ওকে জড়িয়ে দু’হাতের শক্ত বেষ্টনী দিয়ে ঘুমধরা গলায় বলেছে, ‘এবার ঘুমোও। বড্ড আজেবাজে ভাবো তুমি।’ অনুযোগে মৃদু আদর মাখিয়ে বলে, ‘একদিন পাগল না হয়ে গেলে হয়!’

কিন্তু স্বপ্নটা আসে। ফিরে ফিরে আসে। এবার কি ওটারই আংশিক সত্যি হল? স্বপ্ন কি সত্যি হয় নাকি? সে কি কুসংস্কারগ্রস্ত হয়ে পড়ছে? অফিসের দু’একজনকে বলাতে পরামর্শ দিয়েছিল বাইক খুব একটা না চালাতে। কারণ ওর নাকি ওটাতে ভীতি আছে। দিনটা ছিল শুক্রবার। অফিস থেকেই ফিরছিল শোভন। ডিভিসি মোড়ের কাছে বাঁকটায় চাকা স্কিড করে গেল। দু’দিন আগে বৃষ্টি হওয়ায় কাদার মতো হয়ে গিয়েছিল জায়গাটা। আস্তে আস্তেই পেরোচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ সামনের চাকাটা স্কিড করতেই হাত দিয়ে সামনের ব্রেক কষে ফেলেছিল। তাতেই বিপত্তি। টাল সামলাতে পারেনি শোভন। পড়তেই ডান পায়ের পাতা ও গোড়ালিটা বাইকে গেল চাপা। আঘাতটা জোর, তবে ভাঙ্গাভাঙ্গি হয়নি। দুর্ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার পর অবশ্য এই কদিনে ওই দুঃস্বপ্নটা আর একবারও ফিরে আসেনি।

দরজায় বেল বাজল। এই এক ঝামেলা। জামাকাপড় আয়রন করার জন্য লোক আসে। দুধ দেওয়ার লোক আসে। সবজিওলা অবশ্য হাঁক পাড়ে। মিতা থাকতে থাকতেই কাজের মাসি কাজ করে চলে গেছে। তবে? শোভন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এসে দরজা খুলল।
কেউ নেই। দরজায় নিজের শরীরের ভার কিছুটা ছেড়ে দিয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল শোভন। বারান্দায় নেমে উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখতে ইচ্ছে করল না কে বেল বাজাল। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। ভাবল কে হতে পারে? বাতাস? বাতাস তো দরজায় কড়া নাড়তে পারে। মনে পড়ল ছোটবেলায় পড়া কবিতাটা। বাতাস কে দেখেছে? না তুমি, না আমি…। হু হ্যাজ সিন দ্য উইন্ড, নিদার ইউ নর আই…। কিন্তু বাতাস কি বেল বাজাতে পারে নাকি? এসব ভাবছে, তখনই ওর সামনে এসে দাঁড়াল দাড়িওলা একটা মানুষ। হাতে একতারা। দু’একটা রবিবারে ওকে দেখেছে শোভন। ওদের বাড়িতেও এসেছে। একবার গানও শুনেছে ওর। আজ লোকটা বুঝি দেবদূত হয়ে এসেছে ওর কাছে ওর একাকিত্বে সঙ্গ দিতে। একমুখ হাসি। কিন্তু শোভনের পায়ের দিকে চোখ পড়তেই লোকটার হাসি কেমন কর্পুরের মতো উবে গেল। ওর পায়ে ক্রেপ ব্যান্ডেজ বাঁধা। লোকটাকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শোভন বলল, ‘আরে ও কিছু না। শোভন একটা চেয়ার দেখিয়ে বলল, ‘এসো, রোদে বারান্দায় বসো।’

লোকটার মুখে দৈন্য, তবু একটা সৌম্য ভাব। আগে ওর গান খুব মন দিয়ে শোনেনি শোভন। শোনার সময়ই-বা কোথায়! এই ক’টাদিন একা থাকতে থাকতে বুঝেছে- একাকিত্ব কাকে বলে। কাজকর্মহীন একা থাকার যন্ত্রণা। শোভন বলল, ‘জল খাবে?’ লোকটা বলল, ‘না থাক, আপনার পায়ে চোট, বসুন।’

সেই মানুষের খোঁজ কেউ কি পায়? সে কেমন মানুষ যাকে পেলে জীবনে শান্তি পাবে? এই মানুষটা গানের ভিতর কেমন একটা পথ খুলে দিয়েছে।

শোভন বারান্দায় দরজার কাছে একটি চেয়ারে বসল। আর লোকটি তখনই গান জুড়ে দিল- ‘বাড়ির কাছে আরশি নগর…।’ শীর্ণকায় লোকটি উদাত্ত গলায় একমনে গাইতে লাগল। মুখের লম্বা ফিনফিনে দাড়ি গানের মৃদু কম্পনে কেঁপে কেঁপে উঠছে। গ্রাম হলে রাস্তার পাশে লোক জড়ো হয়ে যেত হয়তো। কিন্তু এখানে ঘর থেকে কেউ উঁকি পর্যন্ত মারে না। কণ্ঠের সুললিত তরঙ্গ উঠোনের গাছে-গাছে পাতায় রঙ্গন ফুলে যেন হিল্লোল তুলছে। শোভন কতদিন যে উপভোগ করেনি এমন গান! এতদিন ব্যস্ততাকেই ভেবেছে জীবন। কিন্তু এখন মনে হল, এই জীবনটা কেমন যেন মেকানিক্যাল হয়ে গেছে। ভাল ছবি নাটক সঙ্গীত- এসবের সঙ্গে তেমন কোনও নিবিড় যোগ নেই তার। ‘পড়শি যদি আমায় ছুঁতো, যম যাতনা সকল যেত দূরে’ শুনতে শুনতে শোভনের চোখে জল চলে এল। লোকটা গানের লাইনগুলো রিপিট করছে। ‘গেরাম বেড়ে অগাধ পানি/ নাই কিনারা নাই তরণী পারে/ বাঞ্ছা করি দেখব তারে/ আমি কেমনে সেথা যাই রে।’ শোভনের বুকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগল যেন। মনটা হুহু করে উঠল। নিজেরও মনে হল সেই মানুষের খোঁজ কেউ কি পায়? সে কেমন মানুষ যাকে পেলে জীবনে শান্তি পাবে? এই মানুষটা গানের ভিতর কেমন একটা পথ খুলে দিয়েছে। সাধকরা বলেন সেই মানুষ নাকি মনের ভিতরেই থাকে।

অলঙ্করণ: দেব সরকার

বারান্দায় ঝলমলে রোদ। আর প্রাণের গান। চোখ বুঝে আছে মানুষটা। কিন্তু একতারায় আঙুল ছোঁয়া আছে ঠিক। গানের ভেতর মানসভ্রমণ। গান শেষ হলে শোভন ঘরের ভিতরে এল। মানুষটার জন্য কিছু আনতে। রান্নাঘর থেকে যখন হাতে মিষ্টির প্লেট নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আবার বারান্দায় এল, দেখল লোকটা নেই। চলে গেল নাকি? না বলেই চলে গেল! কিছু নিল না পর্যন্ত!
শোভন বারান্দার চেয়ারে রোদে এসে বসল। মনে পড়ল কিছুদিন আগে ওর বান্ধবী পর্ণা ফোনে বলছিল তার একা লাগার কথা। ওর স্বামী বাইরে থাকে চাকরিসূত্রে। মেয়ে স্কুল বা টিউশন চলে গেলে সে ঘরের মধ্যে একা। এখন এই ক’টা দিনে সে মালুম পাচ্ছে ঘরে একলা বসে থাকার ক্ষয়। কিছুই যে ভাল লাগে না ছাই! পর্ণা বা অন্য কোনও বন্ধু বা তেমন কোনও আত্মীয়স্বজন শোভনের এই পায়ে আঘাতের কথা জানে না। কিন্তু মিতার দাদা-বউদিদের সাথে বছরের প্রথমে দেশের বাড়িতে মাঠে পিকনিক করতে যাওয়ার কথা ছিল। ওদেরকে জানাতে হয়েছে ব্যাপারটা।

লোকটা কি আর আসবে না- এমন ভাবছে আর ঠিক তখনই ওর গানের গলা শোনা গেল। কাছে কোথাও গাইছে। সেই একই গান। শোভন কান পেতে চোখ বুজে বসে থাকল।
‘এই যে শুনছেন?’
শোভন চোখ খুলল। একটি বছর-কুড়ির মেয়ে। জানতে চাইল, ‘কিছু বলবে?’
‘ফুল নেব?’
‘নাও। দরজা খুলে ভেতরে এসো।’
‘কী ফুল নেব?’
‘যা ইচ্ছে।’
মেয়েটি গেট খুলে ভিতরে এল। ‘ওগুলো কী ফুল?’ একটি টবের গাছে সাদা কিছু ফুল দেখিয়ে জানতে চাইল।
‘কুন্দ ফুল। নিতে পার। বুদ্ধজুঁই-ও আছে।’
‘আচ্ছা’, ফুল নিতে নিতে বলল, ‘জানেন তো শীতের এই মরশুমি ফুলে পুজো হয় না। অবশ্য এত সুন্দর ফুল আমি তুলতামও না। কয়েকটা গাঁদা নিচ্ছি কিন্তু।’
‘হ্যাঁ, যা ইচ্ছে নাও।’

শোভনের মনে আছে গাছের ফুল বাঁচানোর জন্য আগে কেমন মরিয়া ছিল সে। শেষে স্বার্থপর দৈত্যের কায়দায় দেয়ালের গায়ে লিখে রাখতে বাধ্য হয়েছিল- বিনা অনুমতিতে ফুল তুলবেন না। একবার এক ফুলচোরকে হাতেনাতে ধরেও ছিল। বেচারা বৃদ্ধা। শোভন নিজেই লজ্জিত হয়েছিল। অসুখ-বিসুখ হলে কি মানুষের ভিতরটাও নরম হয়ে যায়! মেয়েটি কিছু ফুল তুলে নিয়ে দরজা ঠেসিয়ে চলে গেল। যাবার আগে ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলতে ভোলেনি।

শোভন ঘরে এল। পিছনের বাড়িতে তখনও সেই বৃদ্ধ গেয়ে চলেছেন- সারেগা রেগামা মাপাধা ধানিসা…।
এত এনার্জি পান কোথা থেকে ভদ্রলোক! কলকাতায় বাড়ি আছে। এই তো কদিন আগে ওখানে বন্ধুদের সাথে গেট-টুগেদার ছিল। নিজের বাড়িতেই পার্টি দিয়েছেন। তবে বছরের অনেকটা সময় কাটিয়ে দেন ছেলেমেয়েদের কাছে। কুম্ভমেলা, গঙ্গাসাগর মেলা কোনও কিছুই বাদ নেই।

শোভন এখন কী করবে? হঠাৎ চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল। বৃদ্ধ চুপ করে গেছেন। কেমন একটা শান্তিকল্যাণ। শোভনের আরও বেশি করে মনে হতে লাগল- এখন সে কী করবে? ওর বন্ধু ধ্রুব আসবে বলেছে। কখন আসবে? সারাদিন ঘুরে ঘুরে কাজ ছেলেটার। একটি সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন সংগ্রহের কাজ ওর। ব্যবসায়ী, রিয়েল এস্টেটের অফিস, শপিংমল, বিউটি পার্লার, জ্যোতিষীর দরবার, হোটেল- আরও নানা জায়গা চরকির মতো ঘুরে বেড়ায়। টার্গেট ফুলফিল করা চাই। কখন আসবে ধ্রুব? ও এলে বলবে ওকে একবার নদীর ধারে নিয়ে যেতে। মাত্র এই কয়েকটা দিনকে ওর অনেকগুলো বছর মনে হচ্ছে। বহু বছর যেন আটকে আছে নির্জন সেলে। ধ্রুব কি সময় পাবে আসার?

বিছানায় শুয়ে আবার ঘুম পেতে লাগল। এখনও চান-খাওয়া বাকি। পায়ে বরফের সেঁক নিতে হবে। কিন্তু ঘুম পাচ্ছে যে! লেপটা টেনে শুয়ে পড়ল শোভন। মিহি এক অন্ধকার কে যেন বুলিয়ে দিচ্ছে ওর চোখে পালকের মতো। কী হালকা তার টান। চোখে আরাম লাগছে। একেই কি তবে ঘুমের পূর্ব-মুহূর্ত বলে। মাহেন্দ্রক্ষণ!

একটা ঘোরের মধ্যে কত কী বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আবার ফিরে আসছে কত পুরনো সব ছবি। গ্রামের শেষে বন, বাড়ির সামনে ক্রিকেটমাঠ, পুজোর আগে খড়িমাটি-নিকোনো ঝকঝকে ঘরের দেয়াল। সুর্যাস্তের আগে মাথায় লেবুরঙা রোদ মেখে মাঠ বরাবর হেঁটে আসছে শ্যামকাকা, কাঁধে ভিক্ষের ঝুলিটি। শোভন ও পাড়ার ছেলেরা তখন খেলা-শেষে ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঘরে ফিরে হাতমুখ ধুয়ে অল্প খেয়ে হ্যারিকেন নিয়ে পড়তে বসত। একটু রাত হলে বস্তা দিয়ে আটকানো খোলা বারান্দার একদিকে ঠাকুরমা উনুন জ্বালিয়ে বসতেন। বাড়ির বাচ্চারা উনুনের চারপাশে গোল হয়ে বসে আগুন পোয়াত। ছায়াছবির মতো সব চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে। একসময় অতল এক সমুদ্রের মতো শান্ততা চোখ জুড়ে নেমে এল। শোভন ডুবে যেতে লাগল প্রশান্ত মহাসাগরের ভিতর।

দুই

দরজায় শব্দ হতে ধড়মড়িয়ে বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে পায়ে ব্যথা লাগল। সামলে নিয়ে ওখান থেকেই চেঁচিয়ে জানতে চাইল, ‘কে?’
‘দরজা খোলো।’ বাইরে থেকে আওয়াজ।
শোভন ধীরে ধীরে গিয়ে খুলল। মিতা ঝাঁঝিয়ে উঠল, ‘উহ, কী করছিলে বলো তো? বেল বাজালাম। শেষে দরজায় জোরে আঘাত করতে হল!’
‘ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম।’
‘সাড়ে তিনটে বাজে। তুমি তো জানো আজ শনিবার, আমি তাড়াতাড়ি ফিরব।’
‘খেয়াল ছিল না। ঘুমিয়ে…’
‘আজ একটা নতুন রান্না করেছিলাম, খেয়েছ? সিম সেদ্ধ করার পর পেস্ট করে ওতে…’
‘খাইনি।’
‘ভাল লাগেনি?’
‘ঘুমোচ্ছিলাম। চান-খাওয়া কিছুই হয়নি।’
‘মাই গড, সে কী! শরীর খারাপ নাকি গো?’
‘নাহ, ঠিক আছি।’
মিতা বাথরুমে ঢুকে গেল। শোভন ভাবল এই ঠাণ্ডায় একদিন চান না করলে কী এসে যাবে। এখন বরং খিদেটা পেয়েছে। মিতা বাথরুম থেকে বেরোলেই খেয়ে নেবে। বাথরুমে মিতার একটু বেশি সময় লাগে। কী যে করে এতক্ষণ! ঠাকুরমার কথা মনে পড়ল শোভনের। গ্রামের বাড়িতে তখন আড়ালহীন কুয়োতলায় স্নান করতে হত সকলকে। বাথরুম বলতে যা বোঝায় তা তখন ছিল না। শোভন দেখত সেই ঠাকুরমা নিজেই কুয়ো থেকে জল তুলে প্রচুর জল ঢালতেন গায়ে। শেষই হতে চাইত না স্নান। মা-কাকিমা বিরক্ত হত। এখন নিজের স্ত্রীকে দেখে। সকালে কমপক্ষে চল্লিশ মিনিট। এখন হয়তো কিছুটা কম সময় নেবে।
শোভন মুখহাত ধুয়ে বসে ছিল টেবিলে। মিতা বেরিয়ে খাবার বেড়ে দিল। নিজেও নিল। শনিবার সকালে মিতা রুটি বা হালকা কিছু খাবার খেয়ে স্কুল বেরোয়। তিনটে বা তার পরে বাড়িতে এসে ভাত খায়। খেতে খেতে মিতা জিগ্যেস করল, ‘খুব বোরিং লাগছিল, না?’
শোভন চেপে গেল। লাগলেই বা কী! মিতা তো আর সমাধান করেতে পারবে না সমস্যার। বলল, ‘না, বই পড়ে, ঘুমিয়ে, ফোন করে কেটে যায়।’
‘কাকে এত ফোন কর গো? তোমার সেই পর্ণাকে?’
শোভন বিরক্ত বোধ করল। ‘তোমার’ শব্দটির ব্যবহার ওকে খুব আশ্চর্য করল। এসব বলে-টলে নিজেও কি কোনও ছাড়পত্র চায় মিতা? মাঝে মাঝে অনিন্দ্য-র সাথে কি দেখা হয় না মিতার? ফোনেও কি কথা হয় না? মিতাকে বলল, ‘পর্ণা আমাদের অফিসে নেই আর। বদলি হয়ে চলে গেছে। মাস-খানেক হল। তাছাড়া…’
মুখে খাবার তুলতে তুলতে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হেসে মিতা বলল, ‘ফোন হয় না বলছ? ইটস এ গুড অপরচুনিটি।’
‘তার মানে তোমার ধারণা এই অ্যাক্সিডেন্টের ফলে ঘরে থাকাটা আমি উপভোগ করছি! তাহলে বলব, ইউ টু।’
‘বাহ, এটা মনে হল তোমার! আমি তো তোমার জন্য আরও কয়েকদিন ছুটি নিতে চেয়েছিলাম। তুমিই তো মানা করলে। আজও আমি বড়দি’কে বলে এসেছি যে তোমার খুব অসুবিধা হলে…’
‘আমি তো বলেছি মিতা, আই অ্যাম ওকে। ইউ নিড নট বি ওয়ারিড।’
খাবার টেবিলে আর তেমন কোনও কথা হয়নি। কিন্তু তারপর বেশ কিছুটা সময় একটা ছায়াযুদ্ধের মতো কেটে গেল। রাতেও খাবার সময় তেমন কথা হল না। শুধু শোয়ার সময় লেপটা নিজের দিকে টানতে টানতে বলল, ‘সেই ছেলেটা কী কাণ্ড করেছে শুনেছ?’
‘কোন ছেলেটা?’
‘সেদিন তুমি যার সাথে গল্প করছিলে। প্লাস্টিকের বোতল রাস্তা-বাজারে কুড়িয়ে কেজি দরে বিক্রি করে বলছিল, মনে নেই? তুমি তো ওকে এমনি-এমনি টাকাও দিলে।’
‘হ্যাঁ, তো কী হয়েছে?’
‘ও চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে।’
‘কোথায়? আমাদের পিছনের স্ট্রিটে। মোবাইল রাখা ছিল জানালায়। পকেটে ঢুকিয়েও ছিল। তখনই দেখে ফেলেছে ঘরের লোক। যাই হোক, তুমি আর ওকে প্রশ্রয় দিয়ো না যেন।’
‘কিন্তু আমার মনে হয়েছে…’
শোভন কথাটা শেষ করল না। এ নিয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। কারণ এখন ওই ছেলেটার ব্যাপারে কথা তোলার উদ্দেশ্যটা হঠাৎই ওর কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল। একটা গুমোট শ্যাডো ওয়ারের মতো চলছিল সারাদিন। মিতা আসলে ওসব কথা বলে একটু হালকা হতে চাইছে।
শোভনও সঙ্গত দিল, ‘আজ কিন্তু সেই বুড়ো মানুষটা এসেছিল।’
‘কোন বুড়ো?’
‘ওই যে গো বাউলগান করে।’
‘তুমি যা ভুলোমনা, সাবধানে থেকো বাপু। ঘরের দরজা যেন খুলে দিয়ো না। যা বলার বাইরে থেকে বোলো।’
‘কী যে বল না! মানুষটা গরিব কিন্তু শিল্পী, মনে রেখো।’
‘তোমার মতো, বলো! বলতে বলতে মিতা শোভনের দিকে সরে এল। তুমিও তো কত ভাল ছবি আঁকতে একটা সময়ে। এখন এত সময় পাচ্ছ, আঁকতে তো পার গো।’
‘ধুর, ধৈর্য নেই আর। এখন বেঁচে থাকার লক্ষ্যটাই বুঝতে পারি না। গ্রামের কথা মনে পড়ে খুব। হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর কথা। বন্ধুদের কথা। ওরা এখন ধূসর কুয়াশা। ওই যে অপরচুনিটি বললে না, তা একটা পেয়েছি বটে।’
বুঝতে পারল খুব ঘুম পাচ্ছে ওর। চোখের পাতা আবার সেইরকম আবিষ্ট হয়ে আসছে। আর সেই আবেশের ভিতর ভেসে উঠল ওই ছেলেটা। ওকে ইশারায় ডাকছে। বলছে, ‘এসো, আমাদের সাথে বোতল কুড়োবে চলো।’ শোভন ঘরের দরজা খুলে রেখে বেরিয়ে পড়ে। ওর কাঁধে বস্তা। ঝোপে নর্দমায় নোংরার স্তূপে খুঁজে বেড়াচ্ছে প্লাস্টিকের বোতল। কুড়োতে কুড়োতে ছেলেটা ওকে নিয়ে চলে এসেছে একেবারে ওদের গ্রামে। কিন্তু শোভন হঠাৎ ছেলেটার চোখে চোখ রেখে চমকে গেল। এ যে ওর নিজেরই চেহারা!
‘কী গো, কী হল, চিৎকার করছ যে!’ মিতা শোভনকে ঝাঁকিয়ে দেয় জোরে।
‘না, কিছু না। গ্রামের স্বপ্ন দেখছিলাম।’ ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে শোভন। আবার শুয়ে পড়ে।
‘যাবে?’
‘গ্রামে! কেউ তো নেই আর তেমন। মা-বাবা চলে যাওয়ার পর কতদিন যে যাইনি! বন্ধুদের সঙ্গেও যোগাযোগ নেই আর। গিয়ে কী হবে। কার কাছে যাব?’
‘কেন, তোমার কাকার কাছে! কাকার ছেলেদের তো বেশ ভাল অবস্থা শুনেছি। কাল একবার ফোন করে দেখোই না। গাড়ি ভাড়া করে যাব। কয়েকটা দিন ছুটি নিয়ে নেব। তাছাড়া তোমাদের বাড়িটাতো ওরাই ব্যবহার করছে। চাষের জমি, পুকুর- সবই। যেতে চাইলে না বলবে না নিশ্চয়।’
শোভন টের পেল মিতা ওকে জড়িয়ে ধরেছে। একটা হাত ওর বুক আর উরু দিয়ে নেমে যাচ্ছে। শেষে চোট পাওয়া পায়ে হাত রেখে বলল, ‘ব্যথা আছে খুব?’
‘একটু। গ্রামে যাবে বলছ? তুমি যাওয়ার কথা বলার পর থেকেই আমার মনটা…’
শোভন আর মিতা অন্ধকারে লেপের তলায় একে-অপরের দিকে তাকাল। হারমোনিয়ামটা বেজে উঠেছে। সা রে গা মা পা ধা নি সা… সা নি ধা পা মা গা রে সা…। এত রাতে বৃদ্ধের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছেন বৃদ্ধাও। জীবনের এতটা পথ একসাথে কীভাবে হেঁটে পেরিয়ে এলেন এঁরা! এখনও এত সুর!
মিতা বলল, ‘জানো, সেই ছেলেটার চুরি করার গল্পটা তোমাকে বানিয়ে বলেছি।’
শোভন বলল, ‘জানি।’

♦–♦♦–♦♦–♦

লেখক পরিচিতি: পেশায় শিক্ষক। দূর্গাপুরের বাসিন্দা। 

গল্পের সমস্ত চরিত্র এবং ঘটনা কাল্পনিক । বাস্তবের সাথে এর কোন মিল নেই, কেউ যদি মিল খুঁজে পান তাহলে তা অনিচ্ছাকৃত এবং কাকতালীয় ।



❤ Support Us
error: Content is protected !!