- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- নভেম্বর ১১, ২০২৫
তাইওয়ান উপকূলে ধেয়ে আসছে ফাং–ওয়ং! ফিলিপাইনে মৃত্যু ও ধ্বংসের ছাপ রেখে সাগর পাড়ি দিচ্ছে দুর্যোগের ঘূর্ণি
প্রচণ্ড বেগে ফুঁসে উঠেছে প্রশান্ত মহাসাগর। ‘সুপার টাইফুন’ ফাং–ওয়ং, স্থানীয়দের কাছে যার নাম ‘ওয়ং’, ফিলিপাইন জুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে এখন তাইওয়ানের উপকূলে। আতঙ্কে দ্বীপজুড়ে জারি হয়েছে সতর্কতা। মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজারেরও বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস, বুধবার সকালে এই ঝড় আছড়ে পড়তে পারে দ্বীপের দক্ষিণ–পশ্চিম উপকূলের কাউশিয়ুং বন্দর শহর ঘেঁষে। তার আগেই মঙ্গলবার থেকেই তাইওয়ানের পার্বত্য পূর্বাঞ্চলে শুরু হয়েছে ঝড়ো হাওয়া ও ভারী বৃষ্টি। বন্ধ রাখা হয়েছে স্কুল, সরকারি অফিস। বাতিল হয়েছে অন্তত ৬৬টি বিমান পরিষেবা।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং–তে জনগণকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘পর্বত, উপকূল ও বিপজ্জনক সব এলাকা থেকে দূরে থাকুন। নিরাপদে থাকাই এখন একমাত্র কাজ।’ হুয়ালিয়েন, ইলান, তাইতুং–সহ পূর্বাঞ্চলের বহু এলাকায় জরুরি সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়েছে। শুধুমাত্র হুয়ালিয়েনের গুয়াংফু শহর থেকেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে প্রায় ২ হাজার মানুষ। শহরের মেয়র চেন চি–মাই জানিয়েছেন, ‘ফাং–ওয়ং দুর্বল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিপদ এখনই কাটেনি। পাহাড়ে, নদীর ধারে বা সমুদ্রতটে কেউ যেন না যায়।’ এর আগে এই ‘ফাং–ওয়ং’ ফিলিপাইনের অরোরা প্রদেশে ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটার বেগে আছড়ে পড়েছিল। তছনছ করেছে অগণিত গ্রাম। উপড়ে দিয়েছে গাছ, ছিঁড়ে ফেলেছে বিদ্যুতের তার, ভাসিয়ে নিয়েছে ঘরবাড়ি। লুজন দ্বীপ থেকে রাজধানী ম্যানিলা পর্যন্ত বৃষ্টি ও বন্যার থাবায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ফিলিপাইন। সরকারি হিসাবে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১৮ জনের, তবে আহত ও নিখোঁজের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ইতিমধ্যেই প্রায় ১৪ লক্ষ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। টানা দুই ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে বিপর্যস্ত দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
ফিলিপাইন প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র বলেছেন, ‘দু-সপ্তাহের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী টাইফুনের এমন আঘাত নজিরবিহীন। কালমায়েগির ধ্বংসযজ্ঞ থেকে এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি দেশ, তার মধ্যেই ফাং–ওয়ং-এর এই বিপর্যয়।’ রবিবার রাতে ‘ফাং–ওয়ং’ যখন অরোরা প্রদেশে আঘাত হানে, তখন বাতাসের দমকা গতি ঘণ্টায় ২৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছেছিল। ভূমিধস, বন্যা, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা— একের পর এক বিপর্যয়ে বিপন্ন ফিলিপাইন। কাবানাতুয়ান শহরে চোখের সামনে বাড়িঘর জলে ভেসে যেতে দেখেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মেরসিডিতা অ্যাড্রিয়ানো নামে এক মহিলা জানান, ‘ঝড়ের আগে গাছ কেটে বাড়ি বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। ছাদ উড়ে গেল, জল ঢুকে সব শেষ।’
ফিলিপাইনে প্রায় ৪ হাজার বাড়ি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে। বহু জায়গায় এখনো জলমগ্ন। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন। কোথাও বিদ্যুৎ নেই, কোথাও পানীয় জল অপ্রতুল। কাতান্দুয়ানেস দ্বীপে জল সরবরাহ ফিরতে ২০ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। পোপ লিও রোম থেকে নিহতদের জন্য প্রার্থনা করেছেন। অনেক এলাকায় উদ্ধারকর্মীরা এখনও পৌঁছতে পারেননি। এখন ‘ফাং–ওয়ং’ দক্ষিণ চিন সাগর পেরিয়ে তাইওয়ানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সমুদ্রের ওপরে এসে কিছুটা দুর্বল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আবহাওয়াবিদদের মতে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় তাইওয়ানে ৪০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উষ্ণ সাগরের জল ঘূর্ণিঝড়গুলিকে আরও প্রবল করে তুলছে। ফলে ঝড়ের গতি যেমন বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে বৃষ্টিপাত ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও।
প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ ফিলিপাইন গত কয়েক মাসেই দেখেছে একের পর এক আঘাত— সেপ্টেম্বরে ভূমিকম্প, অক্টোবরে টাইফুন ‘কালমায়েগি’, আর নভেম্বরেই ফাং–ওয়ং-এর বিধ্বংসী ঝড়। আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের ভাষায়, ‘এটি আর স্বাভাবিক দুর্যোগ নয়, এটি এক নির্মম জলবায়ু বাস্তবতা।’ দেশজুড়ে পুনর্গঠনের কাজ শুরু হলেও বহু এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ বা যোগাযোগ নেই। ফিলিপাইন সরকার জানিয়েছে, ‘এই ক্ষতি সামাল দিতে মাস নয়, বছর লেগে যাবে।’ বিপর্যয়ের এই ছবির মধ্যে একমাত্র আশার আলো মানবিকতার হাত। হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক নেমে পড়েছেন খাদ্য, জল, ওষুধ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায়। কিন্তু প্রকৃতি যেন আর একবার সতর্ক করছে মানবসভ্যতাকে— প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত নয়, সহাবস্থানই আজ একমাত্র টিকে থাকার পথ।
❤ Support Us







