Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ
  • ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬

মহানগরের যাত্রাবিভ্রাট

শেখ মহম্মদ হাবীব
মহানগরের যাত্রাবিভ্রাট

কলকাতার ট্রাফিক সমস্যা নতুন কিছু নয়। ইদানীং সেটি কেবল যানজটের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই, নগর শাসনের সামনে গভীর সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন মহানগরবাসী বুঝতে পারছেনযান চলাচলের স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে পড়বার কারণে তিলোত্তমার অর্থনীতিকর্মসংস্কৃতিসামাজিক নিরাপত্তা সবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে

কলকাতার পরিবহন কাঠামোয় অটো-রিকশা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার অভাবে এমন প্রয়োজনীয় পরিষেবাই বহু ক্ষেত্রে সমস্যার উৎস হয়ে উঠছে। চলন্ত রাস্তায় হঠাৎ থেমে যাত্রী তোলাসংকেত ছাড়া রাস্তা বদলযত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা বা বেপরোয়া রেষারেষি— এমন দৃশ্য নিত্যদিনের বাস্তবতা। ট্রাফিক নিয়ম যেন বা বাধ্যবাধকতায় নয়। এর ফল, কেবল গভীর যানজট নয়এক ধরনের উগ্র স্থবিরতা। একটি গাড়ির অনিয়মিত থামা বা ঘোরার ফলে মুহূর্তের মধ্যে পিছনে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়বাসের গতি কমে যায়মোটরবাইক সরে যেতে গিয়ে ঝুঁকিতে পড়েপথচারীর চলাচল অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। নগর পরিকল্পনাবিদেরা যাকে ফ্যান্টম জ্যাম’ বলেনঅর্থাৎ কোনো দুর্ঘটনা বা নির্মাণকাজ ছাড়াই বিশৃঙ্খলার কারণে সৃষ্ট জটকলকাতার বহু রাস্তায় যখন তখন ঘটছে।

এই পরিস্থিতির অর্থনৈতিক প্রভাবও কম নয়। কর্মঘণ্টার অপচয়জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহারঅনিশ্চিত যাতায়াতবাণিজ্যিক সরবরাহে দেরি— সব মিলিয়ে শহরের উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যে কলকাতা নতুন বিনিয়োগ ও শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছে,  তার জন্য এরকম অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ সমস্যার আরেকটি দিক সমান গুরুত্বপূর্ণসরকারি বাস পরিষেবার ঘাটতি। পর্যাপ্তনিয়মিত ও সাশ্রয়ী বাস না থাকলে সাধারণ যাত্রী বিকল্পহীন হয়ে পড়েন। তখন অটো-নির্ভরতা বাড়েরাস্তায় প্রতিযোগিতা তীব্র হযবাড়ে বিশৃঙ্খলা। অর্থাৎ সমস্যাটি একক নয়; পরিবহন ব্যবস্থার সামগ্রিক ভারসাম্যহীনতায় এর ব্যপ্তি বহুমাত্রিক। 

শহরের দুর্বলতম অংশপথচারীপ্রবীণ মানুষস্কুলপড়ুয়া বা সাইকেল আরোহীরা এ অস্থিরতার সবচেয়ে বড়ো শিকার। হঠাৎ ব্রেক বা মোড় নেওয়ার ঝুঁকি প্রতিদিনের চলাচলকে আরও অনিরাপদ  করে তুলছে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো বিলাসিতা নয়এটি এক মৌলিক দায়িত্ব।

এ অবস্থায় প্রয়োজন দ্বিমুখী উদ্যোগ। ট্রাফিক আইন প্রয়োগে দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ কঠোরতাঅন্যদিকে সরকারি গণপরিবহন— বিশেষ করে টাউন বাসের সংখ্যা ও নিয়মিততা বাড়ানো। সুশৃঙ্খল ও নির্ভরযোগ্য বাস পরিষেবা থাকলে রাস্তায় চাপ কমেঅপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা হ্রাস পায় এবং নাগরিকদের চলাচল সহজ হয়।

নগর উন্নয়নের প্রকৃত পরিমাপ কেবল নতুন সেতু বা মেট্রো লাইনে নয়বরং শহরের দৈনন্দিন চলাচলের স্বাভাবিকতায়। বিশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থার উপর দাঁড়িয়ে আধুনিক নগর গড়া যায় না। কলকাতার সামনে তাই স্পষ্ট প্রশ্নশৃঙ্খলাবদ্ধ চলাচলের পথে এগিয়ে যাওয়া, না কি ধীরগতিকে মেনে নেওয়া। শহরের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এ সিদ্ধান্তের উপরেই।

সব অটোরিক্সা চালককে দায়ী করছি না, নিয়ম মেনে যাত্রী পরিবহণে সনিষ্ঠ বহু পেশাদার আছেন, যাঁরা যাত্রীদের নিরাপত্তা রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ। তাঁদের কর্মদ্যোগের লক্ষ্যকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। কতিপয় অতিব্যস্ত, ভ্রুক্ষেপহীন চালকের জন্য গোটা ব্যবস্থাকে দায়ী করা উচিত নয়। এক্ষেত্রে সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি। দরকার অটোচালক, প্রশাসন আর সচেতন যাত্রীদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস। তাহলে এড়ানো যাবে দুর্ঘটনা, বাড়বে নগরের গতি। বাড়বে সামাজিক নিরাপত্তা।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!