- খাস-কলম পা | র্স | পে | ক্টি | ভ
- সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২২
হাজার বছরের সেতু
একটি পালাবদলের সময়কে কেন্দ্র করে বাংলায় বৌদ্ধ প্রভাবের বিলয় ও হিন্দু ব্রাহ্মণ্য প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার জটিল সামাজিক ইতিহাসের পটভূমি
সেই গ্রামে সব আছে। ধান ক্ষেতে আছে ধান, গাছে গাছে ফুল, পাকা ফল, পুকুরে, নদীর জলে ঘাই মারে মাছ, মাঠে চড়ে গরু, উঁচু নিচু টিলা, টিলা জুড়ে কার্পাস ফুল। গ্রামে যারা থাকে তাদের চাঁচর বেড়ার বাড়ি। তাদের রান্নাঘরে হাঁড়ি আছে, ভাত নেই। পরনের কাপড় জুটলে পাতে জোটে না ভাত। নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। অভাব, অসুখ, ক্ষুধার জ্বালার সঙ্গে তাদের প্রতিদিনের লড়াই। পেটে যেমন খিদে মনে তেমনি ভয়, শঙ্কা, পাপবোধ। প্রায় প্রত্যেকেই নিজেদের দুর্ভাগ্যকে মেনে নিয়েছে মাথা নত করে। মেনে না নিয়ে উপায়ই বা কী? অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষ তারা। সমাজের নিচু তলায় ঠাঁই। তাদের সবচেয়ে বড় পাপ তারা ছোটলোক।
গ্রামে চাঁচর বেড়ার বাড়ি ঘরে থাকে দেশাখ, ধনশ্রী, বিশাখা, রামক্রি, ডোম্বি, কাহ্নুপাদ-রা। এদের সকলের জীবন বয়ে চলে একই খাতে।
দেশাখের দাদা ভুসুকু রোজগারের তাগিদে গ্রাম ছেড়ে বাণিজ্যে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। বাড়িতে বৃদ্ধ, অসুস্থ বাবা, মা, ছোট ছোট ভাই বোন আর বৌদি সুলেখা। সাতজনের সংসারের জোয়াল সুলেখার একারই কাঁধে। বেতের চাঙারি বুনে দেশাখকে দেয় শহরে গিয়ে বেচে আসতে। দেশাখের শখ শিকার করা। তিরধনুক হাতে বনের খরগোশ, শজারু, হরিণ মারা। শিকারে গেলে যদি বা মাংস পাওয়া যায়, পাতে তো ভাত জোটে না। অগত্যা বনে না গিয়ে তাকে ছুটতে হয় শহরে। হাঁটে গিয়ে চাঙারি বিক্রি করতে পারলে তবেই পাবে কড়ি, কিনতে পারবে চাল।
সকালে গরু দুইয়ে পাওয়া সের কয়েক দুধ বিক্রি করে চাল আনার চেষ্টা করে ধনশ্রী। কিন্তু তার মন পড়ে থাকে দাবা খেলায়। তার স্ত্রী ভৈরবী। রোগা দুটি শিশু। সংসারে তীব্র অভাব আর স্বামীর খামখেয়ালিপনার সঙ্গে অনবরত যুদ্ধ করে চলে ধৈর্যশীলা, অতিথিপরায়ণ, অসহায় ভৈরবী।
বিশাখার বাবা খুব গরিব। বহুদিন রোগে ভুগে শয্যাশায়ী। এক গাদা ভাই বোনেদের মধ্যে সবার বড় বিশাখা। ঠিক মতো খাওয়া জোটে না, রোগা শরীরের মধ্যে জ্বল জ্বল করে তার চোখ জোড়া। বাড়ি সুদ্ধ সবার যাতে উপোস করতে না হয় তাই সারাদিন খুঁজে খুঁজে সে শাড়ির আঁচলে বেঁধে আনে শামুক।
রামক্রি আর দেবকীর সংসার তুলনায় সচ্ছল। গাছের বাকল শুকিয়ে বা ভাত গেঁজিয়ে মদ চোলাই করে তারা। খদ্দের এলে মদ দেয় ছোট ছোট ঘড়া আর নলে কিম্বা বেলের খোলে করে। দোকানে বিক্রিবাট্টা ভালোই হয়। কিন্তু নিম্নবর্ণের জীবনের গ্লানি মোছে না তাতে। রামক্রি দম্পতি একে ভাগ্যের দোষ বলে মেনে নিলেও তাদের সন্তান ছুটকির মনে প্রশ্ন জাগে। ছোট ছেলেটি জানতে চায়, ‘কেমন করে আমরা ছোটলোক হলাম?’
কাহ্নুপাদ কবি। তাই গ্রামবাসীর মাথার মণি। সকলের গর্ব। তার হাতে জাদু আছে–মুখের ভাষাকে সে করে দিতে পারে বুকের ভাষা। শবরীর সঙ্গে ঘর বেঁধেছে কাহ্নু। টিলার ওপর চাঁচর বেড়ায় ঘেরা তাদের ছোট সংসার। রোজগারের তাগিদে রাজবাড়িতে পাখা টানার কাজ করে কাহ্নু। ব্রাহ্মণ সমাজের সঙ্গে আপোস করে চলেছে বৌদ্ধ রাজা বুদ্ধমিত্রের রাজত্ব। মন্ত্রী, রাজকর্মচারী, সভা পণ্ডিত– সকলেই ব্রাহ্মণ। রাজ্যে সর্বেসর্বা মন্ত্রী দেবলভদ্র। মন্ত্রীর কথাই শেষ কথা। কাহ্নু দেখে জমি কর্ষণ করে ধান চাষ করে তার গ্রামের মানুষ। ওদেরই ঘরের ছেলেরা নদীতে জাল ফেলে ধরে মাছ, বনে গিয়ে করে শিকার। অথচ সব ধান ওঠে রাজা, মন্ত্রীর গোলায়। জালে মাছ উঠলে আগে যায় রাজা, মন্ত্রীর হেঁসেলে। খেয়াঘাট, অরণ্য, হাটবাজার থেকে রাজার লোকেরা আদায় করে কর, রাজকোষ ফুলেফেঁপে ওঠে। কর না দিলে, অথবা সামান্য কোনো অপরাধে নেমে আসে ভয়ানক শাস্তি। রাজসভায় তুচ্ছতাচ্ছিল্য, অপমান, গালমন্দের গরল হজম করে চাকরি করতে হয় কাহ্নুকে। পাখা টানতে টানতে কাহ্নুপাদের হাত যখন অবশ হয়ে আসে তখন তার মনের মধ্যে কবিতার পংক্তি গুনগুনিয়ে ওঠে। কখনো সে পংক্তি ভালোবাসার, কখনো প্রতিবাদের। ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রবল প্রতাপের বিরুদ্ধে, রাজসভার ভাষা সংস্কৃত নয় মুখের ভাষা বাংলায় কবিতা লেখার দাবিতে গর্জে উঠতে চায় কাহ্নুর স্বর। কিন্তু মন তোলপাড় করা, বুকের ভেতর গুমরে মরা কথাগুলো সরাসরি লিখতে পারে না বলে কবিতার গায়ে দিতে হয় আবরণ।
দিনের বেলা যাদের কাছে তুমি অস্পৃশ্যা, রাতের অন্ধকারে তোমার শরীরটা ওরাই খুবলে খায়। ওই এক জায়গায় বামুনদের ছোটলোকের শরীরের কথা মনে থাকে না। আগে যদি বা কিছু লুকোছাপা করতে হত, এক সময় আইন করে ব্রাহ্মণদের দেওয়া হলো ব্যভিচারের অধিকার। ডোম্বি, হাজার বছরের সেতু পেরিয়ে তুমি কি দেখতে পেয়েছিলে গুজরাতের দাহোড় জেলার সেই তরুণীকে, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় যাকে কোলের শিশু, মা, বোন সহ পালাতে হয়েছিল প্রাণ হাতে করে ?
গ্রামের প্রান্তে ডোম্বির কুড়ে ঘর। তার বাড়ির পর আর কোনো বাড়ি নেই গ্রামে, আছে শুধু বাবলা কাঁটায় ঢাকা বিস্তীর্ণ পতিত জমি। ডোম্বি নৌকা বেয়ে রোজগার করে, নাচ করে, গান করে। লম্পট ব্রাহ্মণেরা রাতের অন্ধকারে ওর একচালার দোরে এসে টোকা দেয়। দিনের বেলায় ডোম্বির ছায়াও মাড়ায় না ঘৃণায়। গ্রামের লোকেরাও ডোম্বির দিকে বাকা চোখে তাকায়। শুধু একজন ওকে সম্মান করে, ভালোবাসে। সে কাহ্নু। ডোম্বির কষ্ট তার বুকের গভীরে বাজে বলেই কাহ্নুপাদ লিখতে পারে–
‘নগর বাহিরিরে ডোম্বি তোহোরি কুড়িআ
ছোই ছোই জাই সো ব্রাহ্ম নাড়িআ…’
ডোম্বির প্রাণশক্তি, আত্মবিশ্বাস, সাহস তাকে করে তোলে অনন্যা। কাহ্নু তার নাম দিয়েছে মল্লারী। তার সৌন্দর্যের সঙ্গে মিশেছে মানসিক শক্তি, মনের গভীরতা। সেই গভীর বোধ, স্থির বিশ্বাস থেকে মল্লারী কাহ্নুপাদকে বলে- ‘মুখের ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া গর্বের। যাকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসো তার জন্য মরতে পারো না?’
সেই গ্রামে সব আছে। কিন্তু গ্রামের মানুষের মুখের ভাষার দাম নেই, সমাজে ঠাঁই নেই, ফলানো ফসলে দাবি নেই, পাতে দু মুঠো অন্ন নেই। অন্যায়ের প্রতিরোধে রুখে দাঁড়ানোর মনোবল নেই। তাই হয়তো গ্রামটিরও কোনো নাম নেই।
♦♠♦♦♠♦
হাজার বছর পিছিয়ে ওই মাঠ, ওই নদী, ওই উঁচু টিলা, বন, পাহাড়ে ঘেরা লোকালয়ে দেখা হয় কাহ্নপাদ, ডোম্বি, কুক্কুরীপাদ, ভুসুকু—চর্যার কবিদের সঙ্গে। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের ‘নীল ময়ূরের যৌবন’ উপন্যাসে। চর্যাপদের পটভূমিতে রচিত এই উপাখ্যান। কেমন ছিলেন আমাদের আদি কবিরা ? কেমন ছিল তাঁদের সময়, তাঁদের যাপন? পাথুরে প্রমাণে সেই ইতিহাস যেটুকু লেগে আছে তাকে আশ্রয় করে বাংলা ভাষায় নানা সময়ে নানান উপন্যাস লেখা হয়েছে। সিদ্ধাচার্যদের সময় ধরা আছে সে সব কাহিনীর পাতায়। এর মধ্যে হয়তো সর্বপ্রথম লেখা হয়েছে চর্যাপদের পুঁথির আবিষ্কর্তা হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর উপন্যাস ‘বেণের মেয়ে’। একজন একনিষ্ঠ গবেষক ও ইতিহাসবিদের লেখা সেই গল্পে প্রাচীন বাংলা যেন ধুলো ঝেড়ে উঠে কথা বলেছে। একটি পালাবদলের সময়কে কেন্দ্র করে এই কাহিনীর বিস্তার– বাংলায় বৌদ্ধ প্রভাবের বিলয় ও হিন্দু ব্রাহ্মণ্য প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার জটিল সামাজিক ইতিহাসের পটভূমি।
‘বেণের মেয়ে’ সেই সে কালের কথা যখন বাংলায় কোনো অভাব ছিল না। হাতিশালে হাতি ছিল, আস্তাবলে ছিল ঘোড়া, ব্যবসা, বাণিজ্য, শিল্প কলা সব ছিল। ‘বেণের মেয়ে’র কথা যেখানে ফুরোয়, সেখানে শুরু হয় ‘নীল ময়ূরের যৌবন’। তখন আর বাংলার সে শ্রী নেই। কিছু মানুষ খেতে পরতে পায় না, আর এক দল ফেলে, ছড়ায়। অর্থ, মান, প্রতিপত্তি সব এক শ্রেণীর কুক্ষিগত আর এক শ্রেণী অত্যাচারিত, লাঞ্ছিত হতে হতে স্বপ্ন দেখে মাছ-ভাত খাওয়ার। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষকে এক সময় রুখে দাঁড়াতেই হয়। কয়েকজনের সাহসী প্রতিজ্ঞার আঁচে গ্রামের মানুষের ঘুমন্ত চেতনায় প্রোথিত হয় লড়াই করার প্রতিজ্ঞা। ‘তোমার দেশ আমার দেশ বাংলাদেশ’ বা ‘জান দেবো তবু জবান দেবো না’–জাগরণের মন্ত্রের বীজ হয়তো বোনা হয়ে গিয়েছিল সেই সময়েই। কাহ্নুপাদের কলমের ডগায়, ডোম্বির ছুরির ফলায় কিম্বা দেশাখের ধনুকের ছিলায়।
‘নীল ময়ূরের যৌবন’ পড়তে পড়তে যদিও প্রত্যক্ষ করার কথা বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, গণহত্যা, মুক্তি যুদ্ধকে, তবু কেন কে জানে মনে উঁকি দিল এখনকার ভারতবর্ষ।
অট্টহাসি হাসতে হাসতে যখন মন্ত্রী দেবল ভদ্র বলে, ‘সমাজ? সমাজ তো আমরাই। যাদের হাতে আইন তৈরি করবার ক্ষমতা আছে তারাই এ সমাজ। আমরা ভোগ করব, ওড়াব, তছনছ করব, যা খুশি তা করব, বাকি সব কীটানুকীট’ তখন মনে পড়ে একালের এক মন্ত্রীকে, অভিবাসীদের যিনি মনে করেন উইপোকা।
কাহ্নুপাদ যে আরও একশজনের মতো নয়, বিনা প্রশ্নে সব কিছু সে মেনে নেয় না, ভাবতে জানে, ইচ্ছে অনিচ্ছের কথা প্রকাশ করার ক্ষমতা রয়েছে কাহ্নুর মধ্যে, এ কথা দেবল ভদ্র জানে বলেই কাহ্নুকে নিয়ে তার ভয়। কাহ্নুর লেখা গীত গাঁয়ের লোকের মুখে মুখে ফিরছে এ কথা কানে আসা মাত্র তাই কাহ্নুপাদকে কয়েদ করা হয় চুনের ঘরে। কাহ্নুর কণ্ঠ বিপজ্জনক, অতএব অবিলম্বে তা রুদ্ধ করা চাই। কাহ্নুপাদের কথা পড়তে পড়তে কেন ভেসে ওঠে এক অশীতিপর তেলুগু কবির মুখ?
আর ডোম্বি! দিনের বেলা যাদের কাছে তুমি অস্পৃশ্যা, রাতের অন্ধকারে তোমার শরীরটা ওরাই খুবলে খায়। ওই এক জায়গায় বামুনদের ছোটলোকের শরীরের কথা মনে থাকে না। আগে যদি বা কিছু লুকোছাপা করতে হত, এক সময় আইন করে ব্রাহ্মণদের দেওয়া হলো ব্যভিচারের অধিকার। নিম্নবর্গের স্ত্রীলোককে ভোগ করার ব্যাপারে ব্রাহ্মণদের আর কোনো বাধা রইল না। ডোম্বি, হাজার বছরের সেতু পেরিয়ে তুমি কি দেখতে পেয়েছিলে গুজরাতের দাহোড় জেলার সেই তরুণীকে, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় যাকে কোলের শিশু, মা, বোন সহ পালাতে হয়েছিল প্রাণ হাতে করে? সেই নারীদের দেহ ছিন্নভিন্ন করা হয়েছিল। আক্রান্তরা প্রায় সকলেই খুন হয়েছিলেন। সাড়ে তিন বছরের শিশুও রক্ষা পায়নি। তরুণীটির দুর্ভাগ্য যে তিনি প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। একে একে সনাক্ত করেছিলেন ধর্ষক খুনিদের। আদালত তাদের দোষী সাব্যস্ত করেছিল, তাদের জেল হয়েছিল। সেই গণধর্ষণকারী, হত্যাকারীরা আজ মুক্ত। তাদের গলায় পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে মালা, মিষ্টি মুখ করানো হচ্ছে তাদের। এখানেই শেষ নয়। অপরাধীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বিধায়ক মশাই। বলছেন, “ওরা ওই অপরাধ করেছে কিনা সেটা তিনি জানেন না। তবে দেখতে হবে উদ্দেশ্য কী ছিল। ওরা ব্রাহ্মণ। আর তাই ওদের স্বভাব চরিত্র ভালো।” এর চেয়ে বড় ছাড়পত্র আর কী হতে পারে? দেখ ডোম্বি, তোমার সময় আমার সময় মিলেমিশে কেমন এক হয়ে যাচ্ছে।
❤ Support Us








