Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • আগস্ট ১৯, ২০২৫

বিশ্বভারতীতে অমর্ত্য সেনকে নিয়ে জঁ দ্রেজের বক্তৃতা বাতিল

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বিশ্বভারতীতে অমর্ত্য সেনকে নিয়ে জঁ দ্রেজের বক্তৃতা বাতিল

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনকে নিয়ে বক্তৃতা। বক্তা খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজ। জায়গা নির্ধারিত ছিল বিশ্বভারতীর সেন্ট্রাল লাইব্রেরি মিলনায়তন। কিন্তু শেষমেশ বক্তৃতা হল না বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে। মঞ্চ সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো বোলপুরের গীতাঞ্জলি প্রেক্ষাগৃহে। আর সে নিয়েই ফের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রবি ঠাকুরের বিশ্বভারতী।

‘অমর্ত্য সেন শান্তিনিকেতন লাইব্রেরির সন্তান। তাঁর উপর আলোচনার স্থান যদি হয় ওই গ্রন্থাগার, তার চেয়ে উপযুক্ত আর কী-ই বা হতে পারে! অথচ আজ সেই জায়গাটাই আমরা পাচ্ছি না। বিষয়টা কষ্টের।’— বক্তৃতার শুরুতেই আক্ষেপের সুরে বললেন জঁ দ্রেজ। তাঁর আক্ষেপ, ‘গণতন্ত্রের ভিত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। আর যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্বাধীনভাবে কথা বলা না যায়, তাহলে বুঝে নিতে হবে, বাকস্বাধীনতা বিপন্ন।’ এই বক্তৃতা সভার আয়োজক ছিল বাংলা সাহিত্য ও লিটল ম্যাগাজিন জগতে পরিচিত নাম— ‘অনুস্টুপ’। সম্প্রতি তারা বিশ্বভারতীর অর্থনীতি ও রাজনীতি বিভাগ এবং এ.কে. দাসগুপ্ত সেন্টার ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর সঙ্গে যৌথভাবে অমর্ত্য সেনকে নিয়ে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। সে উপলক্ষেই ১৪ আগস্ট শান্তিনিকেতনের গ্রন্থাগারে আয়োজিত হওয়ার কথা ছিল বিশেষ বক্তৃতার।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় শেষ মুহূর্তে সভা করতে অনুমতি প্রত্যাখ্যান করে। বিশ্বভারতীর জনসংযোগ আধিকারিক অতিগ ঘোষের দাবি, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন হেরিটেজ অনুষ্ঠান চলে, তখন ঠিক একই সময়ে অন্য কোনো অনুষ্ঠান করার নিয়ম নেই। ওই দিন সন্ধ্যা সাতটায় ‘রবীন্দ্র সপ্তাহ’ উপলক্ষে লিপিকা অডিটোরিয়ামে একটি অনুষ্ঠান ছিল। তাই লাইব্রেরি মিলনায়তনে আর কিছু করা সম্ভব ছিল না।’ তবে এই যুক্তি মানতে নারাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও শিক্ষানুরাগীরা। তাঁদের দাবি, ‘রবীন্দ্র সপ্তাহ’ শুরু হয়েছে ৮ আগস্ট, উদ্বোধন করেছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। ১৪ তারিখে প্রধান কোনো অনুষ্ঠান ছিল না, বক্তৃতার জায়গাও ছিল ভিন্ন স্থানে। এক অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘’আসলে অমর্ত্য সেন এবং জঁ দ্রেজ — দু-জনেই কেন্দ্র সরকারের চোখের কাঁটা। রাজনৈতিক চাপেই সভার অনুমতি বাতিল করা হয়েছে।’

ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো একটি পদক্ষেপ। জঁ দ্রেজের বক্তৃতা শেষ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশ্বভারতী একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে অধ্যাপক অপূর্ব কুমার চট্টোপাধ্যায়কে, যিনি ওই বক্তৃতার অন্যতম আয়োজক, এ.কে. দাসগুপ্ত সেন্টার-এর চেয়ারম্যানের পদ থেকে অপসারণ করে। ২১ মে তিনি এই পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। এ পদক্ষেপ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন অনেকেই। বিশ্বভারতীর এক প্রবীণ অধ্যাপক বলেন, ‘বক্তৃতা দেওয়া কি অপরাধ? মতপ্রকাশই কি দোষ?’ তবে, শুধু বক্তৃতা নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক নীতিও বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। ৬ আগস্ট দিল্লি পুলিশের এক চিঠিতে বাংলাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলা নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে, বিশ্বভারতী একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানায়, কোনো কর্মী উপাচার্যের অনুমতি ছাড়া কিংবা জনসংযোগ আধিকারিকের মাধ্যমে না গিয়ে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না। বিশ্বভারতীর শিক্ষকরা ওই সিদ্ধান্তকে অবৈজ্ঞানিক ও অগণতান্ত্রিক বলে মনে করছেন। তাঁদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অন্যায় নীতি’তে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্রমাগত হুমকির মুখে পড়ছে।

শান্তিনিকেতনের নতুন খোলা হাওয়ায়, রবীন্দ্রনাথের মুক্তাঞ্চলে নতুন উপাচার্যের আগমনে কিছুটা অতীত স্থবিরতা কাটবে বলে আশা ছিল অনেকের। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনা দেখে সে আশায় জল পড়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, মতপ্রকাশের উপর নিয়ন্ত্রণ, অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতার সংকোচন, এই সব কিছুর মিলিত ফলেই প্রশ্ন উঠছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী কি আদৌ আর মুক্তচিন্তার কেন্দ্র? নাকি ভয়ভীতির রুগ্ন পরিবেশে পরিণত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান?


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!