- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- মার্চ ২৫, ২০২৬
ক্ষমতার রাজনীতিতে আজও ‘নিখোঁজ’ নারীরা ! ৫ রাজ্যের বিধানসভা ভোটে মহিলা প্রার্থী ২০ শতাংশের নিচে
পশ্চিমবঙ্গ, অসম, তামিলনাড়ু, কেরালা ও পুদুচেরিতে ভোটের নির্ঘণ্ট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। ইতিমধ্যেই রাজ্যগুলোতে ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রাজনৈতিক দলগুলি দফায় দফায় প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে। এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তাঁরা। প্রকল্প, প্রতিশ্রুতি আর নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, ভোট শতাংশের নিরিখে মহিলা ভোটারের আধিক্য নারীর ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গ আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। এই মহাযজ্ঞের আবহে বিধানসভায় নারীদের প্রতিনিধিত্ব-এর দূর্বল অবস্থান নতুন করে বিতর্ক ছড়াচ্ছে। ভোটার তালিকায় নারীদের অংশ প্রায় সমান, অনেক ক্ষেত্রে বেশি হলেও, আইন প্রণয়নের মঞ্চে তাঁদের উপস্থিতি এখনো সীমিত, প্রবল বৈষম্যের শিকার। বিগত কয়েক দশকে দেশের অধিকাংশ রাজ্য বিধানসভায় নারীদের প্রতিনিধিত্ব ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যেই ঘোরাফেরা করে। কোনো রাজ্যেই তা ২০ শতাংশ অতিক্রম করেনি। ব্যতিক্রম হিসেবে ছত্তিশগড়ে ১৮ শতাংশ নারী বিধায়ক রয়েছেন, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যাটা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকলেও, আশাপ্রদ নয়। অন্যদিকে হিমাচল প্রদেশে মাত্র ১ জন নারী বিধায়ক, আর মিজোরামে দীর্ঘদিন কোনো নারী প্রতিনিধিই নেই।
রাজনীতিতে মহিলা প্রতিনিধিত্বের বৈষম্যের ইতিহাস নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই বিধানসভাগুলিতে নারীদের সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে কম। স্থানীয় স্তরে, পঞ্চায়েত বা পুরসভায় সংরক্ষণের ফলে নারীদের অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে বটে, কিন্তু সে সাফল্য রাজ্য ও জাতীয় স্তরে প্রতিধ্বনিত হয়নি। ফলে তৃণমূল স্তরে রাজনৈতিক চর্চায় নারীদের উপস্থিতি থাকলেও, ক্ষমতার উচ্চস্তরে পৌঁছতে গিয়ে তাঁরা বাধার মুখে পড়ছেন। রাজনৈতিক দলগুলির প্রার্থী নির্বাচনের ধরনও এ সমস্যার অন্যতম কারণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীদের প্রার্থী করা হয় সীমিত সংখ্যায়, অনেক সময় প্রতীকী উপস্থিতি হিসেবে। ‘জয়ের সম্ভাবনা’ বা ‘উইনেবিলিটি’-র যুক্তি দেখিয়ে তাঁদের পিছিয়ে রাখা হয়, যদিও পরিসংখ্যান বলছে, নারী প্রার্থীদের জয়ের সম্ভাবনা পুরুষদের থেকে কম নয়। তবুও দলীয় কাঠামোর পুরুষতান্ত্রিক প্রভাব, আর্থিক ও সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা, এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, সব মিলিয়ে নারীদের পথচলা কঠিন হয়ে ওঠে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সংস্কার—প্রায় প্রতিটি সূচকেই দেশের অন্যতম অগ্রগণ্য রাজ্য কেরালা। নারী শিক্ষার হার থেকে শুরু করে সামাজিক ক্ষমতায়ন, সব ক্ষেত্রেই উপকূলীয় রাজ্যটি বহুদিন ধরেই দেশের বাকি অংশের কাছে অনুকরণীয় উদাহরণ। অথচ সে রাজ্যেই যখন ক্ষমতার রাজনীতির দিকে চোখ ফেরানো যায়, তখন ছবিটা সম্পূর্ণ বিপরীত।
বিধানসভার ইতিহাসে নারী প্রতিনিধিদের উজ্জ্বল উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও, বর্তমান রাজনীতিতে তাঁদের অংশগ্রহণ আশঙ্কাজনক ভাবে কমে এসেছে। রানি গৌরি লক্ষ্মী বাঈ, ডা. মেরি পুনেন লুকোসে, আম্মু স্বামীনাথন, কুট্টিমালু আম্মা, আচ্চাম্মা চেরিয়ান, ডাকশায়নী ভেলায়ুধন, ও. আয়েশা বিবি, কে. আর. গৌরি আম্মা— এই নামগুলি শুধু ইতিহাস নয়, কেরলার সমাজ-রাজনীতির ভিত গড়ে তোলার প্রতীক। কিন্তু সেই উত্তরাধিকার বর্তমান প্রজন্মের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আর প্রতিফলিত হচ্ছে না। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ১৪০টি আসনে মোট ৪৫৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে মহিলা প্রার্থী মাত্র ৫৪ জন এবং একজন তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থী। অর্থাৎ মোট প্রার্থীর মধ্যে নারীদের উপস্থিতি মাত্র ১০.৫ শতাংশ। সংখ্যার নিরিখেই স্পষ্ট—ভোটারদের মধ্যে নারীর সংখ্যা অর্ধেকের বেশি হলেও প্রার্থীপদে তাঁদের অংশগ্রহণ সীমিতই থেকে গিয়েছে।
বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট, যুক্ত গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট— তিন প্রধান রাজনৈতিক জোট মিলিয়েও মাত্র ৩৯ জন মহিলা প্রার্থী ভোটে লড়ছেন। তাঁদের মধ্যেও সবার জয়লাভের সম্ভাবনাও নেই। বর্তমানে কেরালার বিধানসভায় ১১ জন নারী সদস্য রয়েছেন—যাঁদের মধ্যে ১০ জন বাম শিবিরের এবং একজন যুক্ত শিবিরের। বামদের মধ্যে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র ৮ জন এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ২ জন রয়েছেন। যুক্ত শিবিরের একমাত্র নারী সদস্য এসেছেন রেভলিউশনারি মার্কসিস্ট পার্টি থেকে। তবে, এ পরিস্থিতি নতুন নয়। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের বিধানসভায় ১৪০ জন বিধায়কের মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র ১২ জন। ২০১৬ থেকে ২০২১-এ এই সংখ্যা ছিল ৮। তারও আগে ২০১১ ও ২০০৬—দুই বিধানসভাতেই নারী বিধায়কের সংখ্যা ছিল মাত্র ৭। ২০০১ সালে ছিল ৮ জন। গত ছয় দশকের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, কোনো সময়েই নারীদের প্রতিনিধিত্ব ১০ শতাংশের গণ্ডি অতিক্রম করতে পারেনি। সর্বোচ্চ সংখ্যা ছিল ১৯৯৬ সালে, তখন ১৩ জন মহিলা বিধায়ক ছিলেন।
এই দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্যের বিরুদ্ধে বহু বছর ধরে সরব ‘তুল্য প্রতিনিধিত্ব প্রস্থানম’ নামের একটি সামাজিক সংগঠন। সংগঠনের আহ্বায়ক কে. এম. রেমা ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘আমরা কেরলকে প্রগতিশীল রাজ্য বলে গর্ব করি। কিন্তু নারীদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে আমরা আজও অনেকখানি পিছিয়ে। এবার, ক্ষমতাসীন সিপিআইএম মাত্র ৪ জন নারী প্রার্থী দিয়েছে।’ সংগঠনের তরফে আরও জানানো হয়েছে, যদিও এবারে বিজেপি সংখ্যার হিসেবে সবচেয়ে বেশি মহিলা প্রার্থী দিয়েছে, তবুও ‘ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান’-এর কারণে তারা জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটকে বিবেচনায় নেয়নি। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মঙ্গলবার সংগঠনটি নারী ভোটারদের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়েছে— যেখানে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট বা যুক্ত গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি, সেখানে যেন তাঁরা ‘কোনো প্রার্থী নয়’ বিকল্পে ভোট দেন।
নির্বাচনী রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব প্রশ্নে আবারও ব্যতিক্রমী তৃণমূল কংগ্রেস। রাজ্যে মহিলা ভোটারের সংখ্যা ৩,৪৪,৩৫,২৬০ জন। ২৯১ জনের প্রার্থী তালিকায় এবার ৫২ জন নারীকে জায়গা দিয়ে প্রায় ১৮ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেছে বাংলার শাসকদল। সংখ্যার নিরিখে এ সিদ্ধান্ত নিছক নির্বাচনী সমীকরণ নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এক রাজনৈতিক অবস্থানেরই প্রতিফলন— এমনটাই মত রাজনৈতিক মহলের একাংশের। একই সঙ্গে বয়সের নিরিখেও তালিকায় ধরা পড়েছে ভারসাম্যের স্পষ্ট ছাপ—৩১ বছরের নিচে তরুণ মুখ যেমন রয়েছেন, তেমনই ৬০-উর্ধ্ব অভিজ্ঞ নেতাদের উপস্থিতিও লক্ষণীয়। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে নারী প্রার্থী তুলে ধরা তৃণমূলের কাছে এখন আর কৌশলগত সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দলের রাজনৈতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে।সংগঠনের নীচুতলা থেকে শীর্ষস্তর—বুথকর্মী, ছাত্রনেতা, মন্ত্রী কিংবা সাংসদ সব ক্ষেত্রেই নারীদের ক্রমাগত এগিয়ে আনার একটি সুস্পষ্ট প্রবণতা লক্ষ করা গিয়েছে গত কয়েক বছরে। ফলে এমন এক সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে উঠেছে, যেখানে নারী নেতৃত্ব শুধু উপস্থিতই নয়, বরং দৃশ্যমান এবং প্রভাবশালী। এবারে বিজেপির মহিলা মুখের সংখ্যা মাত্র ১১। অপরদিকে, বামেদের মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা ৩০-এর বেশি।
অসমে নারী ভোটারের সংখ্যা প্রায় মোটের অর্ধেক, সংখ্যায় ১.২৪ কোটিরও বেশি। শুধু সংখ্যায় নয়, ভোটদানের হারেও পুরুষদের ছাপিয়ে গিয়েছেন তাঁরা। ২০২১ সালে ৮২.৪২ শতাংশ, ২০১৬-য় ৮৪.৭২ শতাংশ। অথচ নির্বাচনী রাজনীতির ময়দানে নারীরাই থেকে যাচ্ছেন অনিশ্চয়তার প্রান্তে। ক্ষমতাসীন বিজেপির মহিলা প্রার্থী মাত্র ৭ জন। হাফলংয়ের বিধায়ক তথা মন্ত্রিসভার সদস্য নন্দিতা গোরলোসার হঠাৎ করে বিজেপির প্রার্থী তালিকা থেকে বাদ পড়া এবং পরে কংগ্রেসে যোগ দিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে টিকে থাকার চেষ্টা— তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত। কোকরাঝাড়েও প্রায় একই ছবি। প্রবীণ নেত্রী প্রমিলা রানি ব্রহ্ম, যিনি নিজেই শেষবারের মতো লড়ার ইচ্ছা জানিয়েছিলেন, তাঁকে সরিয়ে বোড়োল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট প্রার্থী করেছে সেওয়ালি মহিলারিকে। ২০১৬ সালে জয়ী হয়ে বিজেপির তরুণ মুখ হিসেবে উঠে আসা অঙ্গুরলতা ডেকার রাজনৈতিক পথচলাও অনিশ্চিত। ২০২১-এ পরাজয়ের পর আর ভোটের ময়দানে ফেরেননি তিনি। অন্য দিকে, অজন্তা নেওগের মতো ব্যতিক্রমী উদাহরণও রয়েছে, টানা ষষ্ঠবার নির্বাচনে লড়তে নামা এই প্রবীণ নেত্রী রাজ্যের দীর্ঘতম সময়ের নারী বিধায়কদের মধ্যে অন্যতম। আগের প্রজন্মের বিজয়া চক্রবর্তী বা সুশ্মিতা দেবের মতো নেত্রীরাও দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিসর গড়ে তুলতে পেরেছেন।
তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মধুরিমা গোস্বামীর পর্যবেক্ষণ, ‘আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নারীরা এখনো নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা পুরোপুরি পান না। কয়েকজন সফল নেত্রীর উদাহরণকে সামনে রেখে সামগ্রিক নারী প্রতিনিধিত্বের অভাব আড়াল করা হয়।’ সংখ্যার হিসেবও সেই কথাই বলছে। ২৬-এর নির্বাচনে কংগ্রেস ১৪ জন মহিলা প্রার্থী দিয়েছে, বিজেপি ৭ জন। এআইইউডিএফ মাত্র ২ জনে পৌঁছলেও অগপ ও বিপিএফ—দু-দলই একজন করে নারী প্রার্থী রেখেছে। ২০২১ সালে ৭৬ জন নারী প্রার্থী থাকলেও জয়ী হন মাত্র ৬ জন। ২০১৬ সালে ৯১ জনের মধ্যে জয়ী ছিলেন ৮ জন। পরিসংখ্যানের এই বৈপরীত্যই দেখিয়ে দিচ্ছে—ভোটার হিসেবে শক্তিশালী হলেও প্রার্থী ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে নারীরা এখনও প্রান্তিক।
তামিলনাড়ুতে মোট ২৩৪টি আসনে নির্বাচন হওয়ার কথা, নারী ভোটাররাই সংখ্যাগরিষ্ঠ—প্রায় ২.৮৯ কোটি নারী ভোটার রয়েছেন রাজ্যে । কিন্তু প্রার্থী তালিকা ঘোষণার প্রাথমিক পর্যায়ে বড়ো দলগুলির মধ্যে নারীদের প্রতিনিধিত্ব সীমিত বলেই ইঙ্গিত মিলছে। যেমন এআইএডিএমকে-এর প্রথম দফার ২৩ জন প্রার্থীর তালিকায় অভিজ্ঞ নেতাদের প্রাধান্য থাকলেও নারী প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য নয় । একই ভাবে ডিএমকে -সহ প্রধান দলগুলিও এ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ তালিকা ঘোষণা না করায় সামগ্রিক চিত্র স্পষ্ট হয়নি, তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর দাবির তুলনায় বাস্তব সংখ্যা এখনো অনেক কম। অন্য দিকে পুদুচেরি-র ৩০ আসনের নির্বাচনে ছবিটা কিছুটা আলাদা হলেও, সেখানেও নারী প্রার্থীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এখানে নারী ভোটার পুরুষদের তুলনায় বেশি । তবু দলগুলির প্রার্থী তালিকায় নারীদের উপস্থিতি সীমিত।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সমস্যার শিকড় রাজনৈতিক কাঠামোর গভীরে। প্রচারে নারীদের সামনে রাখা হলেও দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক বিনিয়োগ বা নির্বাচনী নিরাপত্তা তাঁদের ক্ষেত্রে খুব কমই নিশ্চিত করা হয়। তবে রাজনৈতিক চিন্তায় কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দলগুলির নির্বাচনী ইস্তাহারে এখন নারীদের পরিবার-কেন্দ্রিক পরিচয়ের বাইরে এনে স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। লেখক ও সমাজ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক জে. দেবিকার মতে, ‘বিহারের বিধানসভা নির্বাচনের ফল থেকে শিক্ষা নেওয়ার আছে। আগে নীতিনির্ধারণে পরিবার ছিল কেন্দ্রবিন্দু। এখন মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে বাসযাত্রা বা মাসিক আর্থিক সহায়তার মতো প্রকল্প দেখা যাচ্ছে, যা নারী ভোটারদের গুরুত্বকে তুলে ধরছে।’ তাঁর মতে, কেরলেও নারী ভোটাররা নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন। বাস্তবিকই, ভোটারদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ৫০ শতাংশেরও বেশি। তবু সে অনুপাতে প্রার্থীপদে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব নেই।
উল্লেখ্য, এই প্রেক্ষাপটে ২০২৩ সালের সংবিধানের ১০৬তম সংশোধনী আইন, নতুন আশার সঞ্চার করেছে। লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভায় এক-তৃতীয়াংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষণের প্রস্তাব রয়েছে এই আইনে। তবে তা কার্যকর হওয়ার আগে জনগণনা এবং আসন পুনর্বিন্যাসের মতো শর্ত পূরণ প্রয়োজন, যা এখনো সময়সাপেক্ষ। আসন পুনর্বিন্যাস বলতে বোঝায় লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভাগুলির আসন সংখ্যা এবং সীমানা নির্ধারণের প্রক্রিয়া। এর মধ্যে তফসিলি জাতি ও উপজাতির জন্য সংরক্ষিত আসন নির্ধারণও অন্তর্ভুক্ত। সংবিধানের ৮২ এবং ১৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিটি জনগণনার পর আসন সংখ্যা ও সীমানা পুনর্নির্ধারণ করার কথা বলা হয়েছে।
জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও নারী সংরক্ষণ নিয়ে টানাপোড়েন স্পষ্ট। কংগ্রেস বুধবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কড়া সমালোচনা করে তাঁকে ‘ইউ-টার্ন উস্তাদ’ বলে কটাক্ষ করেছে। তাদের অভিযোগ, জনগণনা ও আসন পুনর্বিন্যাস সম্পূর্ণ না করেই নারী সংরক্ষণ আইন কার্যকর করার কথা বলে তিনি মূল সমস্যাগুলি থেকে নজর ঘোরানোর চেষ্টা করছেন। কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ জানান, ২০২৩ সালে নতুন সংসদ ভবনে ‘নারী শক্তি বন্দনা আইন’ পাশ হয়েছিল, যা সংবিধানের ১০৬তম সংশোধনী। এতে লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভায় এক-তৃতীয়াংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। তবে তা কার্যকর হওয়ার শর্ত ছিল জনগণনা ও আসন পুনর্বিন্যাস। তাঁর অভিযোগ, ‘এখন হঠাৎ করে সে শর্ত পূরণ না করেই আইন কার্যকর করার কথা বলা হচ্ছে। এটি গণবিভ্রান্তির অস্ত্র।’ তিনি আরও জানান, সরকার লোকসভা ও বিধানসভার আসন সংখ্যা ৫০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনাও করছে, যা নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন।
সূত্রের খবর, লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮১৬ করা হতে পারে, যার মধ্যে ২৭৩টি নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। তফসিলি জাতি ও উপজাতির জন্য সংরক্ষিত আসনেও একই অনুপাতে নারী সংরক্ষণ থাকবে। আসন পুনর্বিন্যাস হবে ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে। এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হলে ২০২৯ সালের ৩১ মার্চ থেকে আইন কার্যকর হতে পারে। তবে আপাতত সংশোধনী বিল আনার সম্ভাবনা কম বলেই জানা যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০১১ সালের তথ্যের উপর নির্ভর করে ডিলিমিটেশন করা হলে এক দিকে নারী সংরক্ষণ দ্রুত কার্যকর করা সম্ভব হলেও, অন্য দিকে প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কারণ, গত এক দশকে দেশের জনসংখ্যার বিন্যাসে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে এই সংবেদনশীল বিষয়ে সর্বদলীয় ঐকমত্য ও সুপরিকল্পিত রূপরেখা ছাড়া এগোনো কঠিন বলেই মত সংশ্লিষ্ট মহলের। বিরোধী দলগুলি ইতিমধ্যেই সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুকে চিঠি দিয়ে সর্বদলীয় বৈঠকের দাবি জানিয়েছে।
❤ Support Us






