Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৫

মহীশূর দশেরায় ঐতিহ্যের দীপশিখা জ্বালালেন বানু মুশতাক। দিলেন শান্তি, সম্প্রীতি আর ঐক্যের বার্তা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
মহীশূর দশেরায় ঐতিহ্যের দীপশিখা জ্বালালেন বানু মুশতাক। দিলেন শান্তি, সম্প্রীতি আর ঐক্যের বার্তা

ধূপ-ধুনোর গন্ধে মোড়া সকাল। চামুন্ডী পাহাড়ের উপরে মায়ের মন্দিরে সমবেত জনতার সামনে দাঁড়িয়ে, কণ্ঠে শান্ত অথচ দৃঢ় উচ্চারণে বললেন তিনি— ‘এই মাটির প্রতিটি ফুল ফুটুক তার নিজস্ব রঙে, প্রতিটি পাখি গাইুক তার নিজস্ব সুরে—এই হল আমার কর্ণাটক, আমার দেশ।’

আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারজয়ী সাহিত্যিক বানু মুশতাক আজ মহীশূরের ঐতিহাসিক দশেরা উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করলেন। তাঁর হাতে আলো জ্বলে উঠল ঐতিহ্যের দীপশিখা। উপস্থিত ছিলেন কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়া, রাজ্যের মন্ত্রীমণ্ডলী, ও রাজ্যের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দল। ঐতিহাসিক চামুন্ডেশ্বরী মন্দির চত্বরে জড়ো হয়েছিল হাজার হাজার মানুষ— কেউ সাংস্কৃতিক উৎসবের টানে, কেউ রাজনৈতিক উত্তাপের খবরে, কেউ বা আবার নিছক কৌতূহলে। কারণ এবারের দশেরা, এক অর্থে অন্য রকম, কিংবা ভারতবর্ষের মতো বিবিধ বৈচিত্র্যের দেশে এমনটাই স্বাভাবিক। অথচ এ আনন্দময় দিনে আগুন ছড়িয়ে ছিল প্রবল বিতর্ক, রাজনীতির আঁচ, আদালতের দৌড়ঝাঁপ। সেসব ছাপিয়ে এ বছর কর্ণাটকের সবচেয়ে বড়ো উৎসবের উদ্বোধন করলেন একজন মুসলিম নারী, কন্নড় সাহিত্যের গর্ব, আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার বিজয়ী, সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী বানু মুশতাক।

চিরাচরিত শঙ্খধ্বনি, মঙ্গল আরতি, এবং ঐতিহ্যের দীপ জ্বালানোর মধ্য দিয়ে শুরু হল রাজ্যের ‘নাডা হাব্বা’ বা ‘জনতার উৎসব’ নামে পরিচিত দশেরা। হলুদ ও সবুজ মাইসোর সিল্কের শাড়িতে সজ্জিত মুশতাক মঞ্চে উঠে বললেন, ‘আজ মা চামুন্ডেশ্বরী নিজেই যেন আমায় ডেকে এনেছেন। একসময় এক প্রিয় বান্ধবী বলেছিলেন, তিনি আমায় চামুন্ডী পাহাড়ে নিয়ে আসবেন। আজ মনে হচ্ছে, মা নিজে আমায় ডেকেছেন তাঁর আশীর্বাদ দিতে।’ তাঁর এ বক্তব্য নিছক আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং একটি স্পষ্ট বার্তা— ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সংস্কৃতিই হতে পারে মানুষের মিলনের সেতু। সাম্প্রতিক অতীতে বানু মুশতাককে নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল তুমুল বিতর্ক। অভিযোগ ওঠে, একজন মুসলিম লেখিকা কীভাবে হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে মুখ্য ভূমিকা নিতে পারেন? রাজ্যের বিরোধী দল বিজেপি এবং কিছু ব্যক্তি হাইকোর্ট ও পরে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ভারতের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ; কোনো ধর্মের মানুষকেই জাতীয় বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখা যায় না। বিচারপতিরা মামলাকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা কি সংবিধানের প্রস্তাবনা পড়েছেন? আমরা এক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে বসবাস করি, যেখানে প্রত্যেকের নিজের বিশ্বাস, চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে, এটি সবার মৌলিক অধিকার।’

এ রায়কে পুঁজি করে কর্ণাটকের রাজ্য সরকার দশেরার অনুষ্ঠানে মুশতাকের উপস্থিতিকে আরো জোরালোভাবে তুলে ধরেন। মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়া বলেন, ‘বানু মুশতাক হয়তো মুসলিম পরিবারে জন্মেছেন, কিন্তু তাঁর আগে তিনি একজন মানুষ। আমরা যদি মানবতাকে গুরুত্ব দিই, তবে ধর্মের ভিত্তিতে কাউকে বর্জন করা যায় না।’ মুশতাকের বক্তৃতায় উঠে আসে কর্ণাটকের ঐতিহাসিক সহনশীলতার ছবি। তিনি স্মরণ করেন মহারাজা জয়চামারাজেন্দ্র ওয়োডেয়ারের সময়ের কথা, যখন সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ রাজকীয় পদে নিযুক্ত হতেন। তিনি বলেন, ‘আমার আত্মীয়, সিপাহী মোহাম্মদ ঘউস এ রাজ্যের সেনাবাহিনীতে ছিলেন। মহারাজা তাঁর উপর বিশ্বাস রেখেছিলেন, যেমন রেখেছিলেন হিন্দু, খ্রিস্টান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের উপরও। এটাই মহীশূরের সত্যিকারের ঐতিহ্য।’ বানু মুশতাক তাঁর বক্তৃতায় বারবার ফিরে যান শান্তি, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের দিকে। তিনি বলেন, ‘আজকের দুনিয়া যেখানে বিদ্বেষ, ধর্মীয় বিদ্বেষ আর ঘৃণায় বিভক্ত, সেখানে এ উৎসব হোক একতার বার্তা। সংস্কৃতি হৃদয়কে যুক্ত করে, অস্ত্র দিয়ে নয়, শিক্ষা ও ভালোবাসা দিয়ে জীবন জয় করতে হবে। আমার ধর্ম আমাকে শিখিয়েছে সহনশীলতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর মানবিকতা।’

অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকেই তিনি ঘোষণা করেছেন, আগামীকাল তাঁর আত্মজীবনী প্রকাশিত হতে চলেছে। তাতে তিনি হিন্দুধর্মের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক, অভিজ্ঞতা ও ভাবনার কথা বিশদে লিখেছেন। তিনি জানান, তিনি বারবার হৃদয়ের দীপ জ্বালিয়েছেন, পুষ্পার্ঘ্য দিয়েছেন। সে কাজগুলো তাঁর কাছে একান্তই মানবিক অভিজ্ঞতা, ধর্মীয় বিভাজনের বিষয় নয়। এদিক থেকে দেখতে গেলে বানু মুশতাকের বক্তব্য কেবল মঞ্চের ভাষণ নয়, বরং একটি চিয়ারত ভারতীয় দর্শন। এদিন তিনি তাঁর স্বরচিত কবিতা ‘বাগিনা’ আবৃত্তি করেন, যেখানে এক মুসলিম নারীর দশেরা উপলক্ষে অতিরিক্ত অর্থ পাওয়ার অনুভূতি তুলে ধরা হয়েছে। কবিতার মধ্যে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই উৎসবে কি আমি অংশ নিতে পারি না? কি আমার অপরাধ, আমার নাম, না আমার ধর্ম? এবারের দশেরার বিশেষ উদ্বোধন প্রসঙ্গে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়া বলেন, ‘যাঁরা ইতিহাসকে ভুলে যান বা বিকৃত করেন, ভবিষ্যৎ গড়ার অধিকার তাঁদের নেই। এ কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি কর্ণাটকের আত্মপরিচয়ের উৎসব।’ তিনি জানান, এবারের দশেরার সময় ১৯২৪ সালের কংগ্রেস অধিবেশনের শতবর্ষ স্মরণে একটি বিশেষ প্রদর্শনীও আয়োজিত হবে, যেখানে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হবে। এর পাশাপাশি রাজ্য সরকারের ‘৫টি গ্যারান্টি’ প্রকল্প নিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এসব প্রকল্প চালু হয়েছে। বিরোধীরা বলেছিল রাজ্য দেউলিয়া হয়ে যাবে, অথচ আমরা এখনো পর্যন্ত ১ লক্ষ কোটি টাকা খরচ করেছি গরিবদের জন্য।’

উল্লেখ্য, কর্ণাটকে এবারের দশেরা ১১ দিনের, যার পরিসমাপ্তি ঘটবে ২ অক্টোবর বিজয়া দশমীর দিন ‘জম্বু সাভারি’ শোভাযাত্রার মাধ্যমে। মাইসোর শহর সাজানো হয়েছে আলোর মালায়, ঐতিহ্যের রঙে। চামুন্ডী পাহাড় থেকে শুরু করে মহীশূর প্রাসাদ, টাউন হল, জগন্মোহন প্যালেস, এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র জুড়ে এ সময়ে চলবে গান, নাটক, কবিতা, নৃত্য আর লোকশিল্পের উৎসব। একদিকে ধর্মীয় সমারোহ, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ, এই দ্বৈত সুরে বাজছে কর্ণাটকের হৃদস্পন্দন। বিতর্ক, আপত্তি, রাজনীতি, সব কিছু ছাপিয়ে ২০২৫ সালের দশেরা যেন হয়ে উঠেছে কর্ণাটকের আত্মাকথার মঞ্চ। আর বানু মুশতাক সে মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলছেন, ‘এ ভূমি আমাদের সকলের। আসুন, আমরা জীবনের যুদ্ধ জয় করি ভালোবাসা দিয়ে। ঘৃণার নয়, হৃদয়ের আলোয়।’ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে একটাই বার্তা— ভালোবাসা জিতেছে, ঘৃণা হেরেছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!