- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুন ২৩, ২০২৫
‘চুপ! বিধানসভা চলছে’- রাজ্য বিধানসভায় বিরোধী কণ্ঠরোধের অভিযোগ তুলে তীব্র প্রতিবাদ বিজেপির। সাসপেন্ড ৪ বিধায়ক, লবিতে পড়ে গেলেন মনোরঞ্জন ব্যাপারী
বিধানসভায় কার্যত যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি। কক্ষে ধাক্কাধাক্কি, মার্শালের হাতে বিজেপি বিধায়কেরা ঘেরাও, বাইরে প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ—তুমুল গোলমালে সোমবার সাসপেন্ড হলেন বিজেপির ৪ বিধায়ক। অন্যদিকে, লবিতে আচমকা পড়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন তৃণমূলের প্রবীণ বিধায়ক মনোরঞ্জন ব্যাপারী।
গত বৃহস্পতিবার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিলে অংশগ্রহন ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত। সেদিন একাধিক প্রশ্ন তুলেছিলেন বিজেপি বিধায়কর, তবে রাজ্য সরকারের জবাব না শুনেই সভা ত্যাগ করেন তাঁরা। অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় সিদ্ধান্ত নেন, কার্যবিবরণী থেকে বিজেপি বিধায়কদের বক্তব্য বাদ যাবে। এই ঘটনার প্রতিবাদে বিজেপি সদস্যরা কক্ষের ভিতরে ও বাইরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। সোমবার বিধানসভা শুরু হতেই এই বিষয়ে ‘পয়েন্ট অফ অর্ডার’ তোলেন বিজেপি বিধায়ক অশোক লাহিড়ি। জানতে চান, কোন বিধিতে তাঁদের বক্তব্য বাদ দেওয়া হল। উত্তরে মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য বক্তব্য রাখতে শুরু করলেই পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শুরু হয় বাগ্বিতণ্ডা। ঘটনার জেরে বিজেপির ৪ বিধায়ক — অগ্নিমিত্রা পাল, মনোজ ওঁরাও, দীপক বর্মন এবং শঙ্কর ঘোষকে চলতি অধিবেশনের পুরো সময়ের জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছে।সাসপেন্ড হওয়া বিধায়কদের বাইরে বার করতে মার্শাল ডাকা হয়। সে সময় বিধানসভা চত্বরে বিজেপি বিধায়ক মনোজ ওঁরাওকে পাঁজাকোলা করে বের করে দেওয়া হয়, আর শঙ্কর ঘোষ পড়ে যান ধস্তাধস্তির সময়। বিজেপির অভিযোগ, মার্শালরা ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁদের উপর বলপ্রয়োগ করেছে। শঙ্করের চশমা ও ঘড়ি ভেঙে যায় বলেও অভিযোগ। পাল্টা অভিযোগ ওঠে মার্শাল ও নিরাপত্তারক্ষীদের দিক থেকেও—তাঁদেরও কেউ কেউ আঘাত পেয়েছেন।
যখন এই উত্তেজনা চলছে, তখন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণ দিবসের কর্মসূচিতে ছিলেন। পরে বিধানসভায় ফিরে এসে সাসপেন্ড বিধায়কদের কাছ থেকে গোটা ঘটনার বিবরণ শোনেন, এরপর সোজা চলে যান অধ্যক্ষের চেম্বারে। শঙ্কর ঘোষের ভাঙা চশমা, ছেঁড়া জামা নিয়ে অভিযোগ জানান। অধ্যক্ষের সঙ্গে তুমুল তর্কাতর্কিতে জড়িয়ে পড়েন শুভেন্দু। অধ্যক্ষ বারবার সতর্ক করেও তাঁদের থামাতে পারেননি। শেষে বিজেপির বিধায়করা ওয়াকআউট করেন। বিধানসভা ভবনের বাইরে এসে হাতে নেন প্ল্যাকার্ড—‘চুপ! বিধানসভা চলছে’। তখন যেন কক্ষের মধ্যেই প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল বিজয় তেন্ডুলকরের বিখ্যাত নাটক ‘চুপ! আদালত চলছে’-র প্রেক্ষিত। নাটকে যেমন ব্যক্তিগত অভিমতকে আদালতের শৃংখলার নামে স্তব্ধ করা হয়, এদিন বিধানসভায়ও বিরোধীদের বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে বাদ দিয়ে ও প্রশ্ন তোলার অধিকার খর্ব করে যেন প্রতিষ্ঠানের নামেই কণ্ঠরোধ করা হল—এমনটাই অভিযোগ বিরোধী শিবিরের। পাল্টা তৃণমূল শিবিরও প্রতিবাদে নেমেছে। পরিস্থিতি চরমে ওঠে যখন দীপক বর্মন সভার মধ্যে কাগজ ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানান, এবং তৃণমূল বিধায়ক তিলক চক্রবর্তী বিদ্রুপ করে বলেন, ‘কালীগঞ্জে হারল কে?’ পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠে নামেন রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস আর বিজেপির কয়েকজন মধ্যপন্থী বিধায়ক। কিন্তু ক্ষোভ তাতেও কমেনি বলে জানা যাচ্ছে।
এদিকে, বিধানসভা কক্ষে বিক্ষোভ যখন তুঙ্গে, তখন লবিতে পড়ে যান বলাগড় কেন্দ্রের প্রবীণ বিধায়ক মনোরঞ্জন ব্যাপারী। একা হেঁটে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিলেন। আচমকাই ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অচৈতন্য হয়ে পড়েন তিনি। প্রথমে ছুটে আসেন বিধায়ক নওসাদ সিদ্দিকি। পরে কুলটির চিকিৎসক-বিধায়ক অজয় পোদ্দার ও তৃণমূলের রহিমা মণ্ডল-সহ অন্যরা দ্রুত তাঁকে বিধানসভার মেডিকেল ইউনিটে নিয়ে যান। প্রবীণ এই বিধায়ক উচ্চ রক্তচাপ ও ব্লাড সুগার জনিত অসুস্থতার কারণেই ফলেই জ্ঞান হারিয়েছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে চিকিৎসকেরা জানান। ঘটনার সময় বিধানসভায় উপস্থিত ছিলেন চিকিৎসক ও বিজেপি বিধায়ক ডা. অজয় পোদ্দার, যিনি প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। তাঁর পাশাপাশি তৃণমূল বিধায়ক রহিমা মণ্ডলও সাহায্যে এগিয়ে আসেন। ৭০ বছরের বেশি বয়সি এই বিধায়ক শুধু শরীরেই নয়, বক্তব্যেও বারবার রাজ্যের রাজনৈতিক মঞ্চে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন। কখনো নিজের দলের নেত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে, কখনো বা বিদ্রোহী মন্তব্য করে দলকে বিব্রত করেছেন।
একাধিক ঘটনার জেরে সোমবারের বিধানসভা অধিবেশনের আবহাওয়া উত্তপ্ত ও বিশৃঙ্খল। রাজ্য রাজনীতিতে আজকের ঘটনাগুলি বিধানসভায় বিরোধীদের ভূমিকা ও তাঁদের অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছে, তীব্র আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। একদিকে বিজেপি দাবি করেছে, মমতা ব্যানার্জির সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে তাঁরা লড়াই চালিয়ে যাবে, অন্যদিকে তৃণমূল শিবিরের দাবি, ‘সংসদীয় শিষ্টাচার বজায় রাখতে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হয়েছে।’
❤ Support Us






