- দে । শ
- মে ২১, ২০২৬
মে মাসে জোজিলায় তুষারপাত ! যখন দাবদাহে পুড়ছে দেশ, কাশ্মীর-লাদাখে ফের শীতের প্রত্যাবর্তন
দেশের বহু প্রান্তে এই মুহূর্তে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা। বেলা বাড়লেই রাস্তা-ঘাট শুনশান। গরমে হাঁসফাঁস করছে প্রতিটি প্রাণী। অন্য দিকে, ঠিক সে সময়েই জোজিলা পাসে ঝরছে বরফ ! মে মাসের শেষভাগে এমন দৃশ্য দেখে বিস্মিত পর্যটক থেকে আবহাওয়াবিদ সকলেই। বৃহস্পতিবার ভোরে নতুন করে তুষারপাতে সাদা চাদরে ঢেকে গেছে মিনামার্গ, দ্রাস এবং জোজিলা সংলগ্ন বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকা। গ্রীষ্মের মুখে হঠাৎ শীতের এই প্রত্যাবর্তনে সাময়িক ভাবে বন্ধ করে দিতে হয় কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শ্রীনগর-লাদাখ জাতীয় সড়ক।
যে সময়ে সাধারণত জোজিলার বরফ গলতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয় লাদাখগামী যোগাযোগ ব্যবস্থা, ঠিক সে সময়ে এমন অকাল তুষারপাতকে ‘অস্বাভাবিক’ বলেই ব্যাখ্যা করছেন আবহাওয়া দফতরের আধিকারিকেরা। তাঁদের মতে, নতুন একটি পশ্চিমী ঝঞ্ঝার জেরেই জম্মু-কাশ্মীরের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে ফের সক্রিয় হয়েছে শীতকালীন আবহাওয়া। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই জোজিলা ও দ্রাস এলাকায় প্রবল ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করে। রাতভর বৃষ্টি ও তাপমাত্রা পতনের পর ভোরের দিকে শুরু হয় তুষারপাত। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাহাড়ের ঢাল, রাস্তার ধারের সেনা শিবির, এমনকি আবাসিক এলাকাগুলিও বরফে ঢেকে যায়। মিনামার্গের দৃশ্য যেন হঠাৎ করেই ফিরে যায় জানুয়ারির কাশ্মীরে।
তুষারপাতের জেরে সাময়িক ভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে শ্রীনগর-লেহ জাতীয় সড়ক। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার উচ্চতায় অবস্থিত জোজিলা পাসই কাশ্মীর উপত্যকা এবং লাদাখের মধ্যে একমাত্র প্রধান সড়ক যোগাযোগ। ফলে রাস্তা বন্ধ হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন পর্যটক, পণ্যবাহী গাড়ির চালক এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রশাসনের তরফে বরফ সরানোর কাজ শুরু হয়েছে, তবে আবহাওয়া অনুকূল না হলে রাস্তা পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগতে পারে বলেই আশঙ্কা। তবে শুধু তুষারপাতই নয়, উপত্যকার একাধিক জেলায় প্রবল বৃষ্টি ও বজ্রবিদ্যুৎ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
শ্রীনগর, বান্দিপোরা, গন্দরবল, বারামুলা এবং কুপওয়ারায় ভারী বৃষ্টিতে জলমগ্ন হয়ে পড়ে একাধিক নিচু এলাকা। শহরের বেশ কিছু রাস্তা ও বাজারে হাঁটু জল জমে রয়েছে। কোথাও কোথাও ঝোড়ো হাওয়ার জেরে বিদ্যুৎ পরিষেবাও ব্যাহত হয়েছে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি উত্তর কাশ্মীরের বান্দিপোরা জেলায়। শ্রীনগর-বান্দিপোরা সড়কের দারুল উলুম রহিমিয়া সংলগ্ন এলাকায় আচমকা বৃষ্টির জেরে বন্যাসদৃশ্য পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জল–কাদা ঢুকে পড়েছে একাধিক বাড়িতে। প্রশাসন জানিয়েছে, অন্তত দু–টি বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আহত হয়েছেন দু–জন ব্যক্তি।
তবে এই দুর্যোগের মধ্যেও পর্যটকদের একাংশের মুখে হাসি। উত্তর ভারতের তপ্ত সমতল অঞ্চল থেকে বেড়াতে আসা ভ্রমণপিপাসুদের কাছে অকাল তুষারপাত ‘বোনাস অভিজ্ঞতা’। দিল্লি, পাঞ্জাব, হরিয়ানা থেকে আসা পর্যটকদের অনেকেই বলছেন, ৪৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা থেকে সরাসরি বরফ দেখার অভিজ্ঞতা অবিশ্বাস্য। কেউ মোবাইলে ছবি তুলছেন, কেউ আবার রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে উপভোগ করছেন ঠান্ডা হাওয়া। আবহাওয়া দফতর আগামী দু থেকে তিন দিন জম্মু-কাশ্মীরের বিভিন্ন এলাকায় বজ্রঝড়, দমকা হাওয়া ও বিচ্ছিন্ন শিলাবৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকায় যাতায়াতকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে এবং আবহাওয়া স্বাভাবিক হলেই বন্ধ রাস্তা খুলে দেওয়ার চেষ্টা হবে।
আবহবিদদের মতে, এই অস্বাভাবিক আবহাওয়ার পেছনে রয়েছে পশ্চিমী ঝঞ্ঝা এবং দ্রুত বদলে যাওয়া জলবায়ু পরিস্থিতি। পশ্চিম এশিয়া এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা আর্দ্র বায়ু হিমালয়ের ঠান্ডা বায়ুর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েই তুষারপাত ও বজ্রবৃষ্টির পরিস্থিতি তৈরি করেছে। কিন্তু মে মাসের দ্বিতীয়ার্ধে এমন প্রবল প্রভাব তুলনামূলক ভাবে বিরল বলেই মত বিশেষজ্ঞদের। ভারতের সমতল অঞ্চলে যখন দাবদাহ ক্রমশ ভয়াবহ আকার নিচ্ছে, তখন পাহাড়ে তুষারপাত জলবায়ু পরিবর্তনের অশনি সংকেত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, আবহাওয়ার এই চরম অস্থিরতা আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে। কোথাও খরা, কোথাও আকস্মিক বৃষ্টি, আবার কোথাও মরসুমের বাইরে তুষারপাত হতে পারে।
❤ Support Us






