- দে । শ
- আগস্ট ৭, ২০২৬
হাসপাতালের ভর্তি অনশনরত ছাত্রনেতা, ঝাড়খণ্ডে তীব্রতর চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন ! মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি আলোচনার দাবিতে বিধানসভা অভিযান
সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবিতে ঝাড়খণ্ডের চাকরিপ্রার্থী ও পড়ুয়াদের আন্দোলন ক্রমশ নতুন মাত্রা পাচ্ছে। টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলা অবস্থান-বিক্ষোভ, অনশন, রাজ্যজুড়ে সমর্থনের আবহের মধ্যে শুক্রবার আন্দোলন ১৪তম দিনে পৌঁছতেই রাজধানী রাঁচির পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সকাল থেকেই হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী জড়ো হন জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়ামে। সেখান থেকে শুরু হয় বহু প্রতীক্ষিত ‘বিধানসভা মার্চ’। একই দিনে অনশনরত এক ছাত্রনেতার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হওয়ায় আন্দোলন ঘিরে উদ্বেগও বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক মহলের উপরেও চাপ ক্রমশ বাড়ছে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে ‘জেপিএসসি’ ও ‘জেএসএসসি’-র অধীনস্ত একাধিক নিয়োগ পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম, প্রশ্নফাঁস ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি ভবিষ্যতের সমস্ত নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করার দাবিতেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ছাত্র সংগঠনগুলির দাবি, এ আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনের নয়; ঝাড়খণ্ডের বেকার যুবসমাজের সম্মিলিত প্রতিবাদ। আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে রাজ্যের বাইরে থেকেও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে। এদিকে, চলমান এ আন্দোলনের অন্যতম মুখ রাহুল ক্রান্তি গত ছয় দিন ধরে অনশন করছিলেন। শুক্রবার সকালে তাঁর শারীরিক অবস্থার হঠাৎ অবনতি হলে আন্দোলনস্থল থেকেই তাঁকে রাঁচির সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে দেবেন্দ্র নাথ-সহ মোট ছয় জন ছাত্র অনশনে রয়েছেন। হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে রাহুল অভিযোগ করেন, চিকিৎসকদের পরামর্শে প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হলেও সরকারি মেডিক্যাল টিম তা সরবরাহ করেনি। তাঁর দাবি, চিকিৎসকেরা ওষুধের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিলেও রাত কেটে গেলেও তা হাতে পৌঁছয়নি।
ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার আলোচনার উদ্যোগ নিলেও প্রথম দফাতেই জট তৈরি হয় প্রতিনিধি দলকে কেন্দ্র করে। সরকারের পক্ষ থেকে পাঁচ থেকে সাত জন প্রতিনিধিকে আলোচনায় পাঠানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আন্দোলনকারীরা প্রথমে ১১ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ঘোষণা করেন। সেখানে ছাত্রদের পাশাপাশি এক জন আইনজীবী, দুই জন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, দুই সাংবাদিক এবং এক প্রাক্তন অ্যাডভোকেট জেনারেলের নামও রাখা হয়। সরকারি প্রতিনিধিরা জানান, আলোচনায় কেবল ছাত্র প্রতিনিধিরাই অংশ নিতে পারবেন। মতপার্থক্যের জেরে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও বৈঠক এগোয়নি। প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে আলোচনা চললেও কোনো সমাধান বের হয়নি। পরে ছাত্ররা নতুন করে আট সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গঠন করে আলোচনায় সম্মত হলেও অচলাবস্থা এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
এরইমধ্যে, শুক্রবার সকাল ১১টা নাগাদ আন্দোলনকারীরা বিধানসভার উদ্দেশে মিছিল শুরু করেন। আগে থেকেই এই কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল। আন্দোলনকারীরা জানান, তাঁদের দাবি শুধু একটি পরীক্ষা বাতিল করা নয়; গোটা নিয়োগ ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ করে তোলাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। তাঁদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে পরীক্ষার নামে যে অনিয়মের অভিযোগ জমা হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না হলে ভবিষ্যতেও একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হবে। সরকারের সঙ্গে কোনো গোপন বৈঠকে তাঁরা রাজি নন বলে স্পষ্ট করেছেন বিক্ষোভকারীরা। তাঁদের একটাই দাবি— মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন নিজে আন্দোলনস্থলে এসে প্রকাশ্যে তাঁদের সঙ্গে কথা বলুন। রাহুল ক্রান্তির বক্তব্য, তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে কোনো রাজনৈতিক নেতার মতো নয়, রাজ্যের নাগরিক ও সন্তান হিসেবেই ন্যায়বিচার চাইছেন। তাঁর দাবি, হেমন্ত সোরেন সরকারের প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদে অনুষ্ঠিত সমস্ত নিয়োগ পরীক্ষার তদন্ত কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীকেই প্রকাশ্যে করতে হবে। সিবিআই তদন্ত সম্ভব না হলে রাজ্যের বাইরের অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্ট বিচারপতিদের নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের দাবিও তুলেছেন তাঁরা। আন্দোলনকারীদের মূল দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে ‘১৪তম জেপিএসসি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা’-র ফল বাতিল করা, গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বাধীন তদন্ত এবং ‘জেপিএসসি’ ও ‘জেএসএসসি’-র প্রশাসনিক কাঠামোয় মৌলিক সংস্কার।
ঝাড়খণ্ড সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন ইতিমধ্যেই মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের নিয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করেছেন। রাঁচির মহকুমাশাসক কুমার রজত জানান, নিয়োগ সংক্রান্ত অভিযোগগুলির তদন্ত দ্রুতগতিতে চলছে। সরকারের উদ্দেশ্য আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান করা। তবে ছাত্রদের অবস্থান স্পষ্ট— সমস্ত আলোচনা সংবাদমাধ্যম ও ক্যামেরার সামনে প্রকাশ্যে হতে হবে। এদিকে তদন্তে নতুন অগ্রগতির কথাও জানিয়েছে ঝাড়খণ্ড সিআইডি। ‘জেপিএসসি’ নিয়োগে কথিত দুর্নীতির মামলায় এ পর্যন্ত ২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সম্প্রতি, ‘টিডিপিএল’ সংস্থার হিসাবরক্ষক রক্ষক সিংকে লখনউ থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ওই সংস্থাই সংশ্লিষ্ট নিয়োগ পরীক্ষার দায়িত্বে ছিল। তদন্তকারীদের দাবি, ডিজিটাল তথ্য, আবেদনপত্রের নথি এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গোটা তদন্তের দায়িত্বে রয়েছে বিশেষ তদন্তকারী দল।
চাকরীপ্রার্থীদের এ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তরজাও তীব্র হয়েছে। এদিন, বিধানসভার বাইরে পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে বিক্ষোভ দেখান বিজেপি বিধায়কেরা। বিরোধী দলনেতা বাবুলাল মারান্ডি বলেন, আন্দোলনরত পড়ুয়াদের দাবি এড়িয়ে না গিয়ে সরকারের উচিত অবিলম্বে তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় বসা। একই সঙ্গে বিজেপি কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। বিজেপির দাবি, ঝাড়খণ্ডে কংগ্রেস জোট সরকার ক্ষমতায় থাকায় বিরোধী দলনেতা এই বিষয়ে মুখ খুলছেন না। অন্যদিকে কংগ্রেস নেতা ইরফান আনসারি জানিয়েছেন, সরকার আলোচনার পথ খুলে দিয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি যুক্তিসঙ্গত হলে তা অবশ্যই বিবেচনা করা হবে।
অন্যদিকে, আন্দোলনের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যুবসমাজের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, এ আন্দোলন সেই ক্ষোভেরই প্রতিফলন। তাঁর দাবি, চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন শুধু নিয়োগে স্বচ্ছতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির দাবিতেও পরিণত হয়েছে। সে কারণেই তাঁর দলের সদস্যেরা ঝাড়খণ্ডে গিয়ে আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়াবেন। ফলে, ১৪ দিনের এ আন্দোলন এখন শুধু নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তা ক্রমশ যুবসমাজের ক্ষোভ, সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে এক বৃহত্তর গণআন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করেছে।
❤ Support Us






