- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
৩ দিনের ধর্মঘটের আগে রবিবার খোলা থাকবে ব্যাঙ্ক ! রাষ্ট্রায়ত্ত ও গ্রামীণ ব্যাঙ্কগুলিকে পরিষেবা দেবার নির্দেশ কেন্দ্রের
তিন দিনের দেশব্যাপী ব্যাঙ্ক ধর্মঘটের আগে গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ কেন্দ্রের। ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর, রবিবার, দেশের সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক এবং আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাঙ্ক স্বাভাবিক ভাবে খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওই দিন অন্যান্য কর্মদিবসের মতোই গ্রাহকদের সমস্ত ব্যাঙ্কিং পরিষেবা দেওয়া হবে। কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তের ফলে ধর্মঘট শুরুর আগে ব্যাঙ্কের জরুরি কাজ সেরে নেওয়ার অতিরিক্ত একটি সুযোগ পাবেন গ্রাহকেরা।
২৮ সেপ্টেম্বর, সোমবার থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর, বুধবার পর্যন্ত তিন দিনের দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে ‘ইউনাইটেড ফোরাম অব ব্যাংক ইউনিয়ন’। সংগঠনটির দাবি, তারা দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যাঙ্ককর্মীর প্রতিনিধিত্ব করে। ধর্মঘটের আগে ২৬ সেপ্টেম্বর চতুর্থ শনিবার এবং ২৭ সেপ্টেম্বর রবিবার হওয়ায় এমনিতেই ২ দিন ব্যাঙ্ক বন্ধ থাকার কথা ছিল। এবার টানা ৩ দিন ধর্মঘট। ফলে ২৬ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট পাঁচ দিন ব্যাঙ্কের শাখাভিত্তিক পরিষেবা কার্যত বন্ধ থাকার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সম্ভাব্য ভোগান্তি এড়াতেই রবিবার ব্যাংক খোলা রাখার সিদ্ধান্ত কেন্দ্রের।
বুধবার, কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় ব্যাঙ্কিং পরিষেবা যাতে দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করতেই এ ব্যবস্থা। মন্ত্রকের বক্তব্য, গ্রাহকদের জরুরি ব্যাঙ্কিং প্রয়োজনীয়তা যাতে টানা কয়েক দিন আটকে না থাকে, সে কারণেই ২৭ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রায়ত্ত ও আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাংকগুলিকে স্বাভাবিক ভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুধু সাধারণ ব্যাংক শাখা নয়, ‘আরবিআই’ অনুমোদিত ব্যাঙ্কের অফিস, এটিএম-সংযুক্ত শাখা এবং কারেন্সি চেস্টও চালু থাকবে। অর্থাৎ, ব্যাঙ্কিং পরিষেবার গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোও সচল রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ধর্মঘট শুরুর আগে গ্রাহকদের যাতে যতটা সম্ভব প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নেওয়ার সুযোগ থাকে, সে লক্ষ্যেই এই অতিরিক্ত কর্মদিবস।
তবে, এ সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ধর্মঘট প্রত্যাহারের জন্য ইউনিয়নগুলির সঙ্গে আলোচনাও চালিয়ে যাচ্ছে কেন্দ্র সরকার। মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে ব্যাংককর্মী ও অফিসারদের সংগঠনগুলিকে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন জানানো হয়েছে। ‘ডিপার্টমেন্ট অব ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস’, ‘ইন্ডিয়ান ব্যাংকস অ্যাসোসিয়েশন’ এবং ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের তরফেও একই আবেদন জানানো হয়েছে। যদিও এখনো পর্যন্ত ধর্মঘট প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানায়নি ‘ইউনাইটেড ফোরাম অব ব্যাংক ইউনিয়ন’। ধর্মঘটের আগে মঙ্গলবার‘ ইউনাইটেড ফোরাম অব ব্যাংক ইউনিয়ন’-এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে ডেপুটি চিফ লেবার কমিশনারের উপস্থিতিতে একটি সমঝোতা বৈঠকও হয়। কিন্তু সে বৈঠক থেকে কোনো চূড়ান্ত সমাধানসূত্র বেরোয়নি। বৈঠকের পরে ‘ইউনাইটেড ফোরাম অব ব্যাংক ইউনিয়ন’-এর তরফে জানানো হয়, পাঁচ দিনের ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা চালুর দাবির বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ও ইতিবাচক অগ্রগতি হলে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা পুনরায় বিবেচনা করতে পারে।
কী নিয়ে এতদিন ধরে টানাপড়েন? ব্যাঙ্ককর্মী ও অফিসারদের সংগঠনগুলির যৌথ মঞ্চ ‘ইউনাইটেড ফোরাম অব ব্যাংক ইউনিয়ন’-এর অন্যতম প্রধান দাবি, সপ্তাহে পাঁচ দিন ব্যাঙ্কিং পরিষেবা চালু করতে হবে। বর্তমানে দ্বিতীয় ও চতুর্থ শনিবার ব্যাঙ্ক বন্ধ থাকে। সে ব্যবস্থার পরিবর্তে সপ্তাহে পাঁচ দিন ব্যাঙ্ক খোলা রাখার দাবি দীর্ঘদিন ধরেই জানিয়ে আসছে ইউনিয়নগুলি। পাঁচ দিনের কর্মদিবসের পাশাপাশি পেনশন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও সংস্কারের দাবিও রয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংককর্মীদের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেনশন বৃদ্ধির দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সমস্ত অবসরপ্রাপ্ত কর্মী ও পেনশনভোগীর জন্য অভিন্ন মহার্ঘ ভাতা নির্ধারণের পদ্ধতি চালুর দাবিও রয়েছে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো ন্যাশনাল পেনশন সিস্টেম বা ‘এনপিএস’-এর আওতাধীন কর্মীদের পুরনো পেনশন স্কিম বা ‘ওপিএস’ বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া। এই দাবিগুলি নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্র ও ব্যাঙ্ক ইউনিয়নগুলির মধ্যে আলোচনা চলছে। ‘ইউএফবিইউ’- এর বক্তব্য, দাবিগুলি নিয়ে কেন্দ্রের মনোভাব এখনো যথেষ্ট ইতিবাচক নয়। সেই কারণেই তিন দিনের ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ বার ধর্মঘট ঘিরে কেন্দ্রের তৎপরতার পিছনে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। গত ১১ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার, ‘ইউনাইটেড ফোরাম অব ব্যাংক ইউনিয়ন’-এর ডাকে দেশ জুড়ে ব্যাঙ্ক ধর্মঘট হয়েছিল। তার পরের দু-দিন ছিল মাসের দ্বিতীয় শনিবার এবং রবিবার। ফলে ধর্মঘটের সঙ্গে পরপর দু-দিনের নির্ধারিত ছুটি যুক্ত হওয়ায় গ্রাহকদের ব্যাঙ্কিং পরিষেবা পেতে সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। এ বারও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে চলেছে। ২৬ সেপ্টেম্বর চতুর্থ শনিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর রবিবার এবং তার পর ২৮ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর ধর্মঘট। ফলে শনিবার থেকে বুধবার পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের একটি দীর্ঘ পরিষেবা-বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এটিএম পরিষেবাও ধর্মঘটের প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকবে কি না, তা নিয়েও গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। সে অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি এড়াতেই রবিবারকে অতিরিক্ত কর্মদিবস করার সিদ্ধান্ত বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে অন্তত ধর্মঘট শুরুর আগে একটি দিন শাখাভিত্তিক ব্যাঙ্কিং পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
ধর্মঘটের তিন দিনে শাখাভিত্তিক পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ইতিমধ্যেই গ্রাহকদের ডিজিটাল পরিষেবা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, এটিএম, ইউপিআই এবং বিজনেস করেসপন্ডেন্ট-এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় লেনদেন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে নগদ লেনদেন, নথিপত্র-সংক্রান্ত কাজ, চেক-সংক্রান্ত কিছু পরিষেবা বা শাখায় সরাসরি উপস্থিত হয়ে করতে হয় এমন কাজের ক্ষেত্রে ধর্মঘটের প্রভাব পড়তে পারে। সে কারণেই জরুরি কাজ থাকলে ২৭ সেপ্টেম্বর রবিবারের অতিরিক্ত কর্মদিবসটি কাজে লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
ধর্মঘটের শেষ দিন ৩০ সেপ্টেম্বর হওয়ায় পরিস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ওই দিন ব্যাঙ্কগুলির অর্ধবার্ষিক হিসাব বন্ধের সময়সীমা। হিসাবের পুনর্মিলন, প্রভিশনিং, ট্রেজারি এবং বিভিন্ন বাজার-সংক্রান্ত কাজের ক্ষেত্রে সেপ্টেম্বরের শেষ দিনটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ফলে, একদিকে তিন দিনের ধর্মঘট, অন্যদিকে অর্ধবার্ষিক হিসাব বন্ধ — দুই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একই সময়ে পড়ায় ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ইউনিয়নগুলির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ধর্মঘট এড়ানোর চেষ্টা করছে সরকার, আবার পরিষেবা যাতে দীর্ঘ সময়ের জন্য পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে যায়, তার জন্য বিকল্প ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক জানিয়েছে, সরকারের কাছে গ্রাহকদের কল্যাণ ও সুবিধাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। যদিও ইউনিয়নগুলিও নিজেদের দাবিতে এখনো অনড়। ফলে আগামী রবিবার ব্যাঙ্ক খোলা থাকলেও ২৮ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের ধর্মঘট শেষ পর্যন্ত হচ্ছে কি না, সে দিকে নজর থাকবে গ্রাহক থেকে শুরু করে গোটা ব্যাঙ্কিং মহলের। আপাতত কেন্দ্রের পদক্ষেপে ধর্মঘটের আগে অন্তত একটি অতিরিক্ত কর্মদিবস হাতে পেলেন গ্রাহকেরা।
❤ Support Us





