- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
নির্বাচন কমিশনে মতপার্থক্য ঘিরে তুঙ্গে বিতর্ক ! বিরোধীদের নিশানায় জ্ঞানেশ কুমার, ‘সব সিদ্ধান্তই সর্বসম্মত’— বিবৃতি কমিশনের
নির্বাচন কমিশনের অন্দরমহলে কি বড়োসড়ো মতবিরোধ তৈরি হয়েছে? ভোটার তালিকা সংশোধন থেকে শুরু করে নতুন ভোটারের নাম নথিভুক্ত করা, নাম বাদ দেওয়া, বাদ পড়া নাম পুনর্বহাল, ভোটার-তথ্যের নিয়ন্ত্রণ এবং ভোটার নিবন্ধনের আবেদনপত্রে পরিবর্তন — একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তির খবর প্রকাশ্যে আসতেই বুধবার তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তুমুল বিতর্কের মধ্যেই সরাসরি পাল্টা বিবৃতি দিয়ে যাবতীয় জল্পনা খারিজ করার চেষ্টা করেছে নির্বাচন কমিশন। তাদের বক্তব্য, বহু-সদস্য বিশিষ্ট একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে মতপার্থক্য, প্রশ্ন বা ভিন্ন মতামত উঠে আসা অস্বাভাবিক নয়। বরং সেটিই গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক ও গঠনমূলক প্রক্রিয়া। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-সহ কমিশনের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমেই নেওয়া হয়েছে বলে দাবি নির্বাচন কমিশনের।
বুধবার, একটি জাতীয় ইংরেজি সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক তদন্তমূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য সুখবীর সিংহ সান্ধু এবং বিবেক জোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশের বিরুদ্ধে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তাঁদের অজ্ঞাতসারেই নেওয়া হয়েছে। এমনকি একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত ও নির্দেশিকা নিয়ে একই দিনে চার বার আপত্তি নথিভুক্ত করা হয়েছিল বলেও ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আপত্তির বিষয়গুলি নিছক প্রশাসনিক কাজকর্মে সীমাবদ্ধ নয়। ভোটার তালিকায় নতুন নাম অন্তর্ভুক্ত করা, কোনো ভোটারের নাম বাদ দেওয়া, বাদ পড়া নাম পুনরায় তালিকায় যুক্ত করা, নতুন ভোটারের জন্য ব্যবহৃত ফর্মে পরিবর্তন, ভোটার-তথ্যের নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচনী তালিকা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল—এমন একাধিক মৌলিক বিষয় নিয়ে দুই কমিশনার প্রশ্ন তুলেছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। কোনো কোনো পদক্ষেপকে তাঁরা ‘অননুমোদিত’ এবং ‘বেআইনি’ বলেও লিখিত ভাবে চিহ্নিত করেছিলেন বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এ খবর সামনে আসতেই দেশজুড়ে বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির আক্রমণ আরও তীব্র হয়েছে। কংগ্রেস, তৃণমূল, সমাজবাদী পার্টি, আম আদমি পার্টি, সিপিএম-সহ একাধিক দলের নেতারা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। তাঁর অপসারণ, নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম নিয়ে তদন্ত এবং ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া বাতিলের দাবি উঠেছে। কয়েক জন নেতা সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন, তাঁরা পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। তবে প্রবল রাজনৈতিক চাপের মুখে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। দিল্লির নির্বাচন সদন থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কমিশন একটি বহু-সদস্য বিশিষ্ট সাংবিধানিক সংস্থা। ফলে কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার আগে কমিশনার বা সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের মধ্যে প্রশ্ন, মতামত, পর্যবেক্ষণ কিংবা আপত্তি থাকা স্বাভাবিক। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে এই ধরনের মতবিনিময়কে কমিশনের স্বাভাবিক কাজের অংশ হিসাবেই দেখতে হবে।
কমিশনের দাবি, অভ্যন্তরীণ ‘নোট’ বা কোনো আধিকারিকের প্রাথমিক পর্যায়ের মন্তব্যকে আলাদা করে তুলে ধরে গোটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি করা হচ্ছে। গত ১০ মাসে কমিশনের দেওয়া কোটি কোটি নির্দেশ ও গৃহীত অসংখ্য সিদ্ধান্তের মধ্যে কয়েকটি নির্দিষ্ট মন্তব্যকে সামনে আনলে সামগ্রিক চিত্রটি ধরা পড়ে না। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি মেনেই তারা সমস্ত সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক নির্দেশ জারি করেছে। কমিশনের বক্তব্য, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কমিশনের সদস্যেরা নিজেদের মতামত জানাতে পারেন, প্রয়োজনীয় প্রশ্ন তুলতে পারেন কিংবা যে কোনো বিষয়ে আপত্তি জানাতে পারেন। অন্যান্য আধিকারিকও প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শ দিতে পারেন। এ প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্যই হলো আইনি বিধান মেনে চলা, ভোটারদের অধিকার সুরক্ষিত রাখা ও নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা।
তবে, সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’ নিয়ে। কমিশনের তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, ‘এসআইআর’-সহ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তিন কমিশনারের সম্মতিতেই নেওয়া হয়েছে। কমিশনের দাবি, গত এক বছরে প্রায় ৪০টি নতুন উদ্যোগ ও নির্বাচনী সংস্কার বাস্তবায়িত হয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধন এবং এসআইআর তার মধ্যে অন্যতম। এই সময়ে কেরালা, তামিলনাড়ু, পুদুচেরি, অসম, বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের মতো একাধিক রাজ্যে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রেও বিপুল প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, এত বড়ো পরিসরের কাজ শুধুমাত্র একজন কমিশনারের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয়নি। পূর্ণ কমিশনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই এগুলি বাস্তবায়িত হয়েছে। কমিশন আরও জানিয়েছে, তাদের জারি করা সমস্ত সরকারি নির্দেশ, সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক নির্দেশের আইনি ভিত্তি রয়েছে এবং সেগুলি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ, চাকরির শর্ত ও মেয়াদ সংক্রান্ত ২০২৩ সালের আইনের বিধান অনুসরণ করেই জারি করা হয়।
এদিকে, তদন্তমূলক প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তির অন্যতম বিষয় ছিল ভোটার তালিকা পরিচালনার পদ্ধতি। আগে নির্বাচনী কেন্দ্রের ভোটার তালিকা সংক্রান্ত কাজের জন্য ‘ইআরওনেট’ নামের ব্যবস্থার ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে ‘ইসিআইনেট’ ব্যবস্থার মাধ্যমে ভোটার-তথ্য পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোটার তালিকায় নাম যোগ করা বা বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিকদের ক্ষমতা কমে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন সান্ধু এবং জোশী। তাঁদের আপত্তির কেন্দ্রে ছিল তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে ভোটার তালিকা সংশোধনের নিয়ন্ত্রণ কতটা কেন্দ্রীয় হয়ে পড়ছে, সে প্রশ্নও। আগস্টে সান্ধু না কি মন্তব্য করেছিলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচনী আধিকারিকদের ‘ইআরওনেট’ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের মহাপরিচালক সীমা খান্নার ভূমিকা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য ছিল, আইন অনুযায়ী ওই পোর্টালের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তাঁর থাকার কথা নয়।
এ প্রসঙ্গটি নিয়ে তৃণমূলও নতুন করে সরব হয়েছে। দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় গত ডিসেম্বরেই সীমা খান্নার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বলে দলের দাবি। ২৭ ডিসেম্বরের একটি সাংবাদিক বৈঠকে অভিষেক দাবি করেছিলেন, তাঁর কাছে এমন কিছু ছবি রয়েছে, যাতে সীমা খান্নার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। দিল্লিতে কার নির্দেশে তিনি কাজ করছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন অভিষেক। এখন দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তির কথা প্রকাশ্যে আসায় তৃণমূলের দাবি, তাদের পুরনো অভিযোগই কার্যত প্রতিষ্ঠা পেল। তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রও কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে ভোটার তালিকা পরিবর্তনের অভিযোগ তুলেছেন। তবে এ সমস্ত অভিযোগের কোনোটিই নির্বাচন কমিশনের তরফে স্বীকার করা হয়নি। কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বিধিবদ্ধ ক্ষমতা এখনও নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক এবং জেলা নির্বাচনী আধিকারিকদের কাছেই রয়েছে। ডিজিটাল ব্যবস্থাগুলি সেই আইনসিদ্ধ প্রক্রিয়াকে কার্যকর করার জন্যই ব্যবহৃত হয়।
বিতর্কের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করার আবেদনপত্র ‘ফর্ম ৬’। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মে মাসে নির্বাচন কর্মকর্তা বিবেক জোশী জানিয়েছিলেন, ‘এসআইআর’ সংক্রান্ত নির্দেশের মাধ্যমে বিধিবদ্ধ ফর্ম ৬ পরিবর্তন করা যায় না। তাঁর মতে, আইনসঙ্গত ভাবে পরিবর্তন করতে হলে সংশ্লিষ্ট বিধি সংশোধনের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো প্রয়োজন। সান্ধুও সেই মতের সঙ্গে সহমত জানিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অনলাইনে ফর্ম ৬-এ নতুন ভোটারের আবেদনের সঙ্গে এসআইআর-সংক্রান্ত একটি ঘোষণাপত্র যুক্ত করা হয়। আগস্টে সান্ধু সেই পরিবর্তনকে ‘অননুমোদিত এবং বেআইনি’ বলে তা সরিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুতর বলে মনে করেছেন প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও পি রাওয়াত। ২০১৮ সালে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করা রাওয়াতের বক্তব্য, বিধিবদ্ধ নিয়ম পরিবর্তন না করে কোনো নির্দেশের মাধ্যমে ফর্ম ৬ বদলানো হয়ে থাকলে তা আইনগত ভাবে প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাঁর মতে, কমিশনের ভিতরে এমন ধরনের মতপার্থক্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। তবে রাওয়াত একই সঙ্গে দুই কমিশনারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর প্রশ্ন, তাঁরা যদি ১০ মাস ধরে বিষয়গুলিকে অনুচিত বা বেআইনি বলে মনে করে থাকেন, তা হলে এত দিন প্রকাশ্যে বা আরও আগে আপত্তি জানানো হয়নি কেন?
ভোটার তালিকার তথ্য কে নিয়ন্ত্রণ করছেন, সে প্রশ্নও এখন বিতর্কের কেন্দ্রে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দুই কমিশনার মনে করেছিলেন, ভোটার তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া আগের তুলনায় অনেক বেশি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের অধীনে চলে গিয়েছে। প্রতিটি নির্বাচনী কেন্দ্রের ভোটার তালিকা তৈরি এবং সংরক্ষণের দায়িত্ব আইন অনুযায়ী নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিকদের। কিন্তু সফ্টওয়্যার ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো পরিবর্তন করা সম্ভব না হলে মাঠপর্যায়ের আধিকারিকরা কার্যত ক্ষমতাহীন হয়ে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার রাওয়াতও এ প্রশ্নটি তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, কোনো সফ্টওয়্যার এমন ভাবে তৈরি করা যায় না যাতে আইনসিদ্ধ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ের আধিকারিকরা নিজেদের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে না পারেন। সফ্টওয়্যার কোনো ভাবেই আইন বা বিধিবদ্ধ ক্ষমতার বিকল্প হতে পারে না বলেই তাঁর বক্তব্য।
এদিকে, জাতীয় নির্বাচন কমিশনের অন্দরের কলহ প্রকাশ্যে আসার পরেই জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শুরু করেছে কংগ্রেস। দলের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি চলতি বছরের ২৪ এপ্রিল রাজ্যসভায় বিরোধী সাংসদদের জমা দেওয়া অপসারণের নোটিসের কথাও উল্লেখ করেছেন। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল বলেন, একজন ব্যক্তির হাতে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ভোটাধিকার নাগরিকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক অধিকার এবং তা থেকে কাউকে বঞ্চিত করতে হলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও ‘ভোট চুরি’ নিয়ে ফের সরব হয়েছেন। সমাজমাধ্যমে তিনি অভিযোগ করেন, ভোট চুরি ভারতীয় জনগণের বিরুদ্ধে অপরাধ এবং সংবিধানের উপর সরাসরি আক্রমণ। রাহুলের দাবি, ভোটার তালিকা সংক্রান্ত অনিয়মের জন্য নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের জবাবদিহি করতে হবে। তিনি এর আগে কমিশনের আধিকারিকদেরও সতর্ক করেছিলেন বলে জানান। রাহুলের এই বক্তব্যের সঙ্গে অবশ্য নির্বাচন কমিশনের অবস্থানের তীব্র ফারাক রয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, এসআইআরের লক্ষ্য ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা এবং অযোগ্য বা একাধিক বার থাকা নাম বাদ দেওয়া। প্রকৃত ভোটারদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ কমিশন স্বীকার করেনি।
শুধু কংগ্রেস নয়, অনান্য বিরোধী দলগুলিও এ বিষয়ে সমান সরব। সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবও নির্বাচন কমিশনের অন্দরের মতপার্থক্যের খবরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং তার নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করার কথা। সেই প্রতিষ্ঠানের ভিতরেই যদি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তা হলে কমিশনের কার্যপ্রণালী নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন তৈরি হবে। অখিলেশের প্রশ্ন, ‘কার হয়ে’ নির্বাচন কমিশন কাজ করছে। তাঁর অভিযোগ, ভোটার তালিকা নিয়ে সিদ্ধান্তের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাস আরও কঠোর ভাষায় জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের জন্য সংসদীয় প্রক্রিয়া শুরু করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, দুই কমিশনারের লিখিত আপত্তি যদি সত্যিই থেকে থাকে, তা হলে তা হালকা ভাবে দেখার সুযোগ নেই। আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরীওয়াল দাবি করেছেন, জ্ঞানেশ কুমার একক ভাবে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত পরিচালনা করছেন। তাঁর অভিযোগ, কমিশনের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া নির্দেশ জারি করা হয়ে থাকলে গোটা এসআইআর প্রক্রিয়াই প্রশ্নের মুখে পড়ে। কেজরীওয়াল ‘এসআইআর’ বাতিল, তার অধীনে করা সমস্ত পরিবর্তন প্রত্যাহার এবং তিন বছর আগের ভোটার তালিকা পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের দাবিও তুলেছেন।
তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ এবং আদালতের তত্ত্বাবধানে তদন্তের দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, কোনো রাজনৈতিক দলকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হলে তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তির উপর আঘাত। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন শেষ হওয়ার পর বিরোধী জোটের দলগুলি দেশের প্রধান বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের কাছে অভিযোগ জানিয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সেই অভিযোগগুলি যথাযথ ভাবে খতিয়ে দেখা হয়নি বলে তাঁর দাবি। শেষ পর্যন্ত আদালত এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ করবে কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন অভিষেক। তৃণমূলের রাজ্যসভার নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েনও জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের জন্য রাজ্যসভায় আগে জমা দেওয়া প্রস্তাব ফের আলোচনায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে) নেতা সঞ্জয় রাউতও জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন। তাঁর দাবি, দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি উপেক্ষা করেই একের পর এক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি কুমারের অপসারণ এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। রাউত আরও অভিযোগ করেছেন, কমিশনের সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন নির্বাচনে। যদিও তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের সঙ্গে সময়কালগত অসঙ্গতিও রয়েছে। কারণ, ২০২৪ সালের নভেম্বরে মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচন যখন হয়েছিল, তখন জ্ঞানেশ কুমার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ছিলেন না। জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতিও এই বিতর্কে সরব হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনী তালিকায় এমন পরিবর্তন চলতে থাকলে, যা কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে সুবিধা দিতে পারে বলে বিরোধীরা মনে করছেন, তা হলে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন উঠবে। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তির বিষয়টি সামনে আসাকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, ক্ষমতাসীনদের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস দেখানো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
এসবত অভিযোগের মধ্যেও নির্বাচন কমিশনের মূল বক্তব্য অপরিবর্তিত। তাদের দাবি, কমিশনের অভ্যন্তরীণ নোট, প্রাথমিক পর্যায়ের আপত্তি বা কোনো আধিকারিকের পর্যবেক্ষণকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যায় না। কোনো বিষয়ে মতামত আলাদা হতে পারে, প্রশ্ন উঠতে পারে, এমনকি কোনও পদক্ষেপ নিয়ে আপত্তিও জানানো যেতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কমিশন যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সেটিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। কমিশনের মতে, এই মতবিনিময় আসলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করে। আইনগত ত্রুটি, প্রশাসনিক সমস্যা বা ভোটারদের অধিকার সংক্রান্ত কোনও প্রশ্ন থাকলে তা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে আলোচনায় আসাই স্বাভাবিক। নির্বাচন কমিশন আরও জানিয়েছে, গত এক বছরে প্রায় ৪০টি উদ্যোগ এবং নির্বাচনী সংস্কার কার্যকর করা হয়েছে। একাধিক রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনও পরিচালিত হয়েছে। এত বড়ো পরিসরের কাজ তিন সদস্যের পূর্ণ কমিশনের সম্মতি ছাড়া পরিচালিত হয়েছে—এমন ধারণা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর বলেই কমিশনের বক্তব্য।
‘মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ, চাকরির শর্ত ও মেয়াদ) আইন, ২০২৩’-এর ১৮ নম্বর ধারায় কমিশনের কাজকর্ম যতটা সম্ভব সর্বসম্মতির ভিত্তিতে পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। অর্থাৎ, কমিশনের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য থাকা এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত হওয়া — দুটি বিষয় একই সঙ্গে সম্ভব। বিতর্কের আসল প্রশ্ন তাই শুধু মতপার্থক্য হয়েছিল কি না, তা নয়। বরং কোন বিষয়ে কী আপত্তি উঠেছিল, সে আপত্তির পরে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের আইনি ভিত্তি কী এবং সেই সিদ্ধান্তে তিন কমিশনারের চূড়ান্ত সম্মতি ছিল কি না! ফলে ‘এসআইআর’, ফর্ম ৬, ভোটার তালিকা পরিচালনার সফ্টওয়্যার এবং কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক আপাতত থামার লক্ষণ নেই।
❤ Support Us





