- এই মুহূর্তে দে । শ
- মে ২১, ২০২৬
ইবোলা উদ্বেগ, স্থগিত দিল্লির ভারত-আফ্রিকা সম্মেলন
আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ফের মাথাচাড়া দিচ্ছে ইবোলা। সংক্রমণ ছড়াতে পারে অন্য দেশেও। এ পরিস্থিতিতে, সতর্ক কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নিল দিল্লি। আগামী ২৮ থেকে ৩১ মে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল চতুর্থ ‘ইন্ডিয়া-আফ্রিকা ফোরাম সামিট’। কিন্তু ইবোলা সংক্রমণ ঘিরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত এই শীর্ষ বৈঠক স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত সরকার ও আফ্রিকান ইউনিয়ন। বৃহস্পতিবার, ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রকের তরফে আনুষ্ঠানিক ভাবে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। যদিও সরকারি বিবৃতিতে সরাসরি ‘ইবোলা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি, তবে কূটনৈতিক সূত্রে স্পষ্ট, আফ্রিকার একাধিক দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক সতর্কতাই এমন সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে।
দিল্লির এই সম্মেলনকে ঘিরে ইতিমধ্যেই কূটনৈতিক তৎপরতা তুঙ্গে উঠেছিল। আফ্রিকার একাধিক রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী আর বনিক প্রতিনিধিদের ভারতে আসার কথা ছিল। বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর যৌথ কৌশল— সব মিলিয়ে এ সম্মেলনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সব পরিকল্পনায় ছেদ পড়ল। বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্মেলন ও তার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বৈঠক করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ, আফ্রিকান ইউনিয়নের চেয়ারপার্সন এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশনের মধ্যে একাধিক দফায় আলোচনা হয়। বিস্তৃত আলোচনার পরই সম্মেলন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন দিনক্ষণ পরে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে ঠিক হবে বলেও জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে ভারত এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন দু–পক্ষই আফ্রিকার বর্তমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য পরিকাঠামো শক্তিশালী করা, মহামারি মোকাবিলায় প্রস্তুতি বাড়ানো এবং ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য সঙ্কটের বিরুদ্ধে সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন’ বা সিডিসি-র ভূমিকার কথা। ভারত জানিয়েছে, আফ্রিকার দেশগুলিকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে তারা প্রস্তুত। পাশাপাশি সিডিসি-র নেতৃত্বে গৃহীত উদ্যোগগুলোকে সমর্থন করবে নরেন্দ্র মোদির সরকার। বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্যে ভারত-আফ্রিকা সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও উঠে এসেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পারস্পরিক সম্মান, সংহতি, দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা, উন্নয়ন ও শান্তির অভিন্ন অঙ্গীকারের উপর ভিত্তি করেই দীর্ঘদিনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এ সম্পর্ক ভবিষ্যতেও অটুট থাকবে বলেই ইঙ্গিত দিয়েছে দিল্লি।
এদিকে, ইবোলা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশই বাড়ছে আন্তর্জাতিক মহলে। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (কঙ্গো এবং উগান্ডায় ছড়িয়ে পড়া ইবোলা ‘আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই ঘোষণাই কার্যত গোটা বিশ্বকে নতুন করে সতর্ক করে দিয়েছে। বর্তমানে যে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, তা ইবোলা ভাইরাসের ‘বুন্ডিবুগিও’ স্ট্রেনের কারণে। এই স্ট্রেন তুলনামূলক ভাবে কম পরিচিত হলেও সংক্রমণ ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর আগে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার ভয়াবহ মহামারির জন্য দায়ী ছিল ‘জায়ের’ স্ট্রেন। সে সময় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
ভারতও ইতিমধ্যেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার করেছে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের নির্দেশে ইবোলা-আক্রান্ত বা উচ্চ-ঝুঁকির দেশগুলি থেকে ভারতে আসা এবং ট্রানজিট যাত্রীদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যবিধি চালু করা হয়েছে। ডিরেক্টরেট জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেস–এর জারি করা নির্দেশিকায় কঙ্গো, উগান্ডা এবং দক্ষিণ সুদানকে ‘হাই রিস্ক’ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দিল্লি বিমানবন্দরে ‘এয়ারপোর্ট হেলথ অর্গানাইজেশন’-এর তরফে ইতিমধ্যেই সতর্কবার্তা জারি হয়েছে। যাত্রীদের জ্বর, প্রবল দুর্বলতা, মাথাব্যথা, পেশিতে যন্ত্রণা, বমি, ডায়রিয়া, গলা ব্যথা কিংবা অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। যাঁদের আক্রান্ত রোগীর রক্ত বা শরীরের তরলের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা রয়েছে, তাঁদের অবিলম্বে বিমানবন্দরের স্বাস্থ্য আধিকারিকদের জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক সূত্রে খবর, ভারতে এখনো পর্যন্ত ইবোলার কোনো সংক্রমণ ধরা পড়েনি। তবে পরিস্থিতিকে হালকা ভাবে নিতে নারাজ কেন্দ্র। বুধবার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসচিব পুন্য সলিলা শ্রীবাস্তব দেশের বিভিন্ন রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের স্বাস্থ্যসচিবদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন। সেখানে নজরদারি, কোয়ারেন্টাইন, স্ক্রিনিং, পরীক্ষাগার প্রস্তুতি এবং জরুরি চিকিৎসা পরিকাঠামো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। রাজ্যগুলিকে ইতিমধ্যেই বিস্তারিত ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিয়র’ পাঠানো হয়েছে। বিমানবন্দর, বন্দর ও আন্তর্জাতিক সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রকের এক আধিকারিকের জানিয়েছেন, ‘এখনো দেশে কোনো সংক্রমণ নেই ঠিকই, কিন্তু বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না।’
❤ Support Us





