- দে । শ
- জুন ৫, ২০২৬
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙালি অধ্যাপিকাকে নৃশংস হত্যা ! ফ্ল্যাটের ভিতরে উদ্ধার রক্তাক্ত দেহ
পূর্ব দিল্লির এক বহুতলে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করতেন তিনি। নিয়মিত কলেজে যেতেন, গবেষণা ও পাঠদানের কাজে ব্যস্ত থাকতেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার দুপুরে সে জীবন শেষ হল এক বিভীষিকাময় পরিণতিতে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবাজি কলেজের সহকারী অধ্যাপক দেবস্মিতা পালের (৪৯) রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার হলো তাঁর নিজের ফ্ল্যাট থেকে। আরও বিস্ময়কর, যে ফ্ল্যাটের ভিতরে তাঁর দেহ পাওয়া গিয়েছে, সেটি সকাল থেকে বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। ফলে এই রহস্য মৃত্যু ঘিরে তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন ও জল্পনা। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ একে খুন বলেই মনে করছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, পূর্ব দিল্লির বসুন্ধরা এনক্লেভের সত্যম অ্যাপার্টমেন্টে একাই থাকতেন দেবস্মিতা। তাঁর স্বামী কর্মসূত্রে বেঙ্গালুরুতে থাকেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বার বার ফোন করেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না মৃতার বোন দেবরতি পাল। প্রথমে বিষয়টিকে স্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাওয়ার পরেও ফোনের কোনও উত্তর না মেলায় উদ্বেগ বাড়তে থাকে। দুপুরের দিকে দেবরতি সরাসরি দিদির ফ্ল্যাটে পৌঁছন। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, ফ্ল্যাটের মূল দরজায় বাইরে থেকে তালা ঝুলছে। বিষয়টি আরও সন্দেহজনক মনে হয় তাঁর। আশঙ্কা বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত তিনি তালা ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করেন। আর তারপরই সামনে আসে ভয়াবহ দৃশ্য। ঘরের ভিতরে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছেন দেবস্মিতা। ঘটনাস্থল থেকেই তিনি পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করেন।
দুপুর প্রায় ২টা ৩৫ মিনিট নাগাদ নিউ অশোক নগর থানায় খবর পৌঁছয়। খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ, ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের দল এবং ক্রাইম ব্রাঞ্চের আধিকারিকেরা। গোটা ফ্ল্যাট ঘিরে শুরু হয় তদন্ত। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, দেবস্মিতার মাথায় ভারী কোনো বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল। তাঁর মাথায় গভীর ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গিয়েছে। পাশাপাশি কব্জির শিরাও কাটা অবস্থায় ছিল বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা। তবে খুনের সঠিক পদ্ধতি ও মৃত্যুর নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ।
তদন্তকারীদের কাছে সবচেয়ে বড়ো ধাঁধা হয়ে উঠেছে ফ্ল্যাটের বাইরে থেকে তালাবদ্ধ থাকার বিষয়টি। যদি খুন হয়ে থাকে, তবে অভিযুক্ত বা অভিযুক্তেরা কীভাবে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে বাইরে থেকে তালা লাগাল? খুনের পর কি কোনোভাবে ঘটনাস্থল সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছিল? না কি এর পিছনে রয়েছে আরও জটিল কোনো পরিকল্পনা? প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী দল। ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা ফ্ল্যাটের বিভিন্ন অংশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন। ঘরের ভিতরে ধস্তাধস্তির কোনও চিহ্ন ছিল কি না, দরজা বা জানালার মাধ্যমে কেউ জোর করে ঢুকেছিল কি না, সেসব দিকও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্তে সাহায্যের জন্য আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে। ফ্ল্যাট থেকে কোনো মূল্যবান জিনিসপত্র খোয়া যায়নি। গয়না, নগদ অর্থ ও অন্যান্য দামী সামগ্রী অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। ফলে লুটপাটের উদ্দেশ্যে এ খুন হয়েছে বলে আপাতত মনে করছেন না তদন্তকারীরা। বরং ব্যক্তিগত শত্রুতা, পরিচিত কারও জড়িত থাকা কিংবা অন্য কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেই সম্ভাবনাগুলিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিউ অশোক নগর থানায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৩(১) ধারায় খুনের মামলা রুজু করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের বয়ানেও উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। তাঁদের দাবি, মৃত্যুর কিছু ক্ষণ আগেও দেবস্মিতা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিলেন। এমনকি মায়ের কাছে ওষুধ পাঠানোর ব্যবস্থাও করেছিলেন। ফলে তাঁর আচরণে কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল বলে মনে করছেন না পরিবারের সদস্যেরা।
পূর্ব দিল্লির ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশ রাজীব কুমার জানিয়েছেন, ঘটনার প্রতিটি দিক অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দেবস্মিতার সাম্প্রতিক গতিবিধি, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, ডিজিটাল যোগাযোগ, ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্পর্ক এবং আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে। তদন্তে ইতিমধ্যেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মিলেছে বলেও দাবি করেছে পুলিশ। অভিযুক্তদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদী তদন্তকারীরা। শিক্ষাজগতে দেবস্মিতার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সহকর্মী ও পরিচিত মহলের অনেকেই এ ঘটনায় স্তম্ভিত। রাজধানীর বুকে এক শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত নারী অধ্যাপিকার এই নৃশংস পরিণতি ফের নারী নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ দিন ধরে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন দেবস্মিতা। প্রায় এক দশক আগে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের পরে ২০২৩ সালে পশ্চিম দিল্লির রাজা গার্ডেনে অবস্থিত শিবাজী কলেজে স্থায়ী পদে যোগ দেন। তার আগে বহু বছর ধরে তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার অধীনে ‘অ্যাড-হক’ অধ্যাপক হিসেবে পাঠদান করেছেন।
❤ Support Us






