- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ২, ২০২৬
টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গ, ভূমিধসে বন্ধ শিলিগুড়ি-সিকিমের ‘লাইফলাইন’ এনএইচ-১০ । দুর্ভোগে পর্যটক ও স্থানীয়রা
উত্তরবঙ্গে চলছে বর্ষার দাপট। টানা বৃষ্টির জেরে ফের বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে শিলিগুড়ি-সিকিমের অন্যতম প্রধান সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। একাধিক জায়গায় ভূমিধস, পাহাড়ের ঢাল থেকে আলগা পাথর গড়িয়ে পড়া এবং রাস্তার অংশ বিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ১০ নম্বর জাতীয় সড়কে (এনএইচ-১০) সাময়িকভাবে যান চলাচল বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। ফলে, স্থানীয়দের পাশাপাশি সিকিম ও কালিম্পংমুখী হাজার হাজার যাত্রী, পর্যটক এবং পণ্যবাহী যানবাহনের চলাচল স্তব্ধ।
জাতীয় সড়কের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ‘ন্যাশনাল হাইওয়েজ অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড’ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ভোর ৫টা থেকে সকাল ১১টা পর্যন্ত জাতীয় সড়কের নির্দিষ্ট অংশে সব ধরনের সাধারণ যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ধস সরানো, পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা বিপজ্জনক পাথর অপসারণ, রাস্তার ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত-সহ প্রয়োজনীয় নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে। নিরাপত্তার স্বার্থেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে। সবচেয়ে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সেভক কালীবাড়ি ও বাঘপুল সংলগ্ন এলাকায়। প্রবল বৃষ্টির জেরে পাহাড়ের ঢাল নরম হয়ে যাওয়ায় যে কোনো মুহূর্তে নতুন করে ধস নামতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই মুহূর্তে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে মাটি সরানোর কাজের প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা আলগা পাথরও অপসারণ করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে যান চলাচলের সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা কমানো যায়।
এনএইচ-১০ শুধুমাত্র একটি জাতীয় সড়ক নয়, পশ্চিমবঙ্গের সমতল এলাকার সঙ্গে সিকিমের প্রধান স্থল যোগাযোগের পথ। এ সড়ক দিয়েই প্রতিদিন পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, প্রয়োজনীয় পণ্যবাহী ট্রাকের যাতায়াত হয়। ফলে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব মুহূর্তের মধ্যে বিস্তৃত এলাকায় পড়ে। পরিবহণ ব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন শিল্প ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহেও তার প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। বর্ষার মরসুমে সিকিম ও উত্তরবঙ্গে বেড়াতে গিয়ে এখনো বহু পর্যটক পাহাড়ে রয়েছেন। তাঁদের অনেকেই নির্ধারিত সময়ে সমতলে ফিরতে পারছেন না। পরিস্থিতির উন্নতির অপেক্ষায় হোটেল ও পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা। অনেকের ট্রেন কিংবা বিমানের টিকিট থাকলেও রাস্তা বন্ধ থাকায় সময়মতো শিলিগুড়ি পৌঁছনো নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিকল্প রুট ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আপাতত গজলডোবা–ওদলাবাড়ি–গরুবাথান রুট ব্যবহার করতে বলা হয়েছে ছোটো-বড়ো সমস্ত যানবাহনকে। এছাড়াও পরিস্থিতি অনুযায়ী লাভা, গরুবাথান, সিংতাম ও পাকইয়ং হয়ে যাতায়াতের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে, বিকল্প পথগুলিতে যাত্রার সময় স্বাভাবিকের তুলনায় অন্তত তিন থেকে চার ঘণ্টা বেশি লাগে। পাহাড়ি সরু রাস্তায় অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের কারণে যানজটের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ভারী ট্রাক ও বাসের ক্ষেত্রে গরুবাথান রুটকেই আপাতত সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যদিও সে পথেও সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের তরফে চালকদের পাহাড়ি এলাকায় গতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, আবহাওয়ার সর্বশেষ পরিস্থিতি জেনে তবেই যাত্রা শুরু করা, প্রয়োজন ছাড়া রাতের বেলা পাহাড়ি রাস্তায় যাতায়াত না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত কয়েক দিনের অবিরাম বৃষ্টিতে উত্তরবঙ্গের একাধিক জেলায় নদী-নালা ফুলেফেঁপে উঠেছে। পাহাড়ি ঝরনাগুলির জলস্তরও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর জেরে বহু এলাকায় রাস্তার নীচের মাটি আলগা হয়ে গিয়ে ধসের প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ে মাটি অতিরিক্ত জল শোষণ করলে তার ধারণক্ষমতা কমে যায়, ফলে অল্প চাপেই বড়ো আকারের ভূমিধস নেমে আসতে পারে। ‘এনএইচআইডিসিএল’-এর বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, রাস্তা সম্পূর্ণ নিরাপদ বলে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ যান চলাচল স্বাভাবিক করা হবে না। প্রয়োজন হলে পরিস্থিতি বিবেচনা করে আরও কিছু সময় যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হতে পারে। আবহাওয়া ও রাস্তার অবস্থা প্রতি মুহূর্তে পর্যবেক্ষণ করছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও জেলা প্রশাসন।
এদিকে, উত্তরবঙ্গে আগামী কয়েক দিনও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দফতর। ফলে, আগামীতে পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসন পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনীয় যাত্রা এড়িয়ে চলার আবেদন জানিয়েছে। পাশাপাশি যাঁদের পাহাড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, তাঁদের যাত্রার আগে রাস্তার পরিস্থিতি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং প্রশাসনের সর্বশেষ নির্দেশ অবশ্যই জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আশা, আবহাওয়ার কিছুটা উন্নতি হলে, চলমান মেরামতের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা গেলে ধাপে ধাপে এনএইচ-১০-এ যান চলাচল পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে। তবে নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে।
❤ Support Us






