- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- জুলাই ২, ২০২৬
যুদ্ধের হাজার দিন ! যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় প্রাণহানি অব্যাহত, খাদ্য-পানীয়ের সংকট। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে ২০ লক্ষ ফিলিস্তিনি
এক হাজার দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত, অসংখ্য প্রাণহানি, ধ্বংসস্তূপে পরিণত শহর, অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটানো ২০ লক্ষেরও বেশি মানুষের জীবন। যুদ্ধের ১ হাজার তম দিনে দাঁড়িয়ে গাজা উপত্যকার ভবিষ্যৎ প্রবলভাবে অনিশ্চিত। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও হামলা থামেনি। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ইজরায়েলি বিমান বা ড্রোন হামলায় প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ ফিলিস্তিনিরা। অন্যদিকে, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, যুদ্ধোত্তর প্রশাসন গঠন, গাজার পুনর্গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলিও কার্যত অচলাবস্থায় আটকে রয়েছে। ফলে পশ্চিম এশিয়ার এ সংঘাত যে আপাতত শেষ হওয়ার নয়, তা আরও একবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস-নেতৃত্বাধীন জঙ্গি হামলার মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল এ পর্যায়ের যুদ্ধ। দক্ষিণ ইজরায়েলে ওই হামলায় প্রায় ১,২০০ জন নিহত হন, ২৫১ জনকে পণবন্দি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। ওই ঘটনার পরই গাজায় নজিরবিহীন সামরিক অভিযান শুরু করে ইজরায়েল। এক হাজার দিনের মাথায় এসে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রকের দাবি, ইজরায়েলি অভিযানে নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩,০৬৬। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশ নারী ও শিশু। যদিও ইজরায়েলের দাবি, তাদের অভিযান হামাস-সহ সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছে, সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে নয়। একই সঙ্গে তাদের অভিযোগ, হামাস সাধারণ মানুষকে ‘মানবঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে বলে আন্তর্জাতিক মহলের আশা ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই আশার প্রতিফলন ঘটেনি। গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও প্রায় প্রতিদিনই ফিলিস্তিনের নানান অংশে ইজরায়েলি হামলা চলছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রকের দাবি, যুদ্ধবিরতির পর থেকেই এখনো পর্যন্ত ১,০৫৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৫০ জনেরও বেশি নারী ও শিশু। আহতের সংখ্যা সাড়ে তিন হাজার ছাড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ক্ষোভে ফুঁসছেন সাধারণ মানুষ। সাম্প্রতিক একটি হামলার পর গাজার বাসিন্দারা প্রশ্ন তুলছেন, সবাই যে যুদ্ধবিরতির কথা বলছে, সেটা কোথায়? আমাদের দিকে তাকানোর সময়ও কারও নেই। গোটা আরব বিশ্ব বিশ্বকাপ নিয়ে ব্যস্ত, আর আমরা প্রতিদিন মরছি।
রাষ্ট্রপুঞ্জও পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, গাজায় ইজরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত হওয়ায় বহু এলাকায় নিরাপদ অঞ্চল বলে কিছু আর অবশিষ্ট নেই। কোথায় যুদ্ধক্ষেত্র, কোথায় সাধারণ মানুষের বসতি— তার স্পষ্ট সীমারেখা না থাকায় সাধারণ মানুষের মৃত্যুঝুঁকি আরও বেড়েছে। এক হাজার দিনের যুদ্ধের পরে গাজার সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন পুনর্গঠন। কিন্তু সে প্রক্রিয়াও কার্যত থমকে রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, তার পরবর্তী ধাপগুলির অন্যতম শর্ত হামাসের নিরস্ত্রীকরণ। সে প্রশ্নেই আলোচনার অগ্রগতি বন্ধ হয়ে রয়েছে। যুদ্ধবিরতি তদারকির দায়িত্বে থাকা আন্তর্জাতিক কূটনীতিক নিকোলাই ম্লাদেনভ সম্প্রতি স্পষ্ট জানিয়েছেন, হামাসের অস্ত্র সমর্পণ না হওয়া পর্যন্ত গাজার প্রশাসনিক পুনর্গঠন কিংবা আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের মতো পদক্ষেপ এগোনো সম্ভব নয়।
প্রসঙ্গত, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে চলতি বছরের শুরুতে গঠিত হয়েছিল ‘বোর্ড অব পিস’। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজাকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মহল থেকে বিপুল অর্থসাহায্যের প্রতিশ্রুতিও মিলেছিল। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই সেই বোর্ড কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। প্রকাশ্যে তাদের কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বা কর্মপরিকল্পনার কথাও শোনা যাচ্ছে না। এ দিকে গাজায় বসবাসকারী ২০ লক্ষেরও বেশি মানুষের জীবন প্রতিদিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। অধিকাংশ মানুষ এখনো ত্রিপলের তাঁবুতে অথবা বোমায় বিধ্বস্ত বাড়ির ধ্বংসস্তূপে আশ্রয় নিয়ে রয়েছেন। খাদ্য, পানীয় জল, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য পরিষেবা— সবই চরম সংকটে। যুদ্ধবিরতির পর পর্যাপ্ত খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানি পৌঁছনোর কথা থাকলেও আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলির অভিযোগ, সীমান্তে কড়া নিয়ন্ত্রণ এবং জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়ার কারণে প্রয়োজনীয় ত্রাণ এখনো পর্যাপ্ত পরিমাণে গাজায় পৌঁছতে পারছে না।
রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবিক সহায়তা বিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচারের অভিযোগ, ইজরায়েলের দীর্ঘ প্রশাসনিক অনুমোদন প্রক্রিয়ার কারণে অত্যাবশ্যক চিকিৎসা-সরঞ্জামও আটকে যাচ্ছে। এমনকি কৃত্রিম অঙ্গও অনেক ক্ষেত্রে গাজায় ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। কারণ, সেগুলি অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার হতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করছে ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষ। যদিও গাজায় বেসামরিক বিষয়গুলির সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ইজরায়েলি সংস্থা ‘কোগাট’-এর দাবি ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, বর্তমানে গাজায় যে পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী প্রবেশ করছে, তা সেখানকার মানুষের পুষ্টিগত চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলি সে দাবির সঙ্গে একমত নয়। তাদের বক্তব্য, খাদ্য পৌঁছলেও তা যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকার সর্বত্র সমান ভাবে বণ্টন করা যাচ্ছে না।
তবে, দীর্ঘ সংঘাতের মারণ ছায়া শুধু গাজার উপরেই পড়েনি, তার অভিঘাত অনুভূত হচ্ছে ইজরায়েলেও। ৭ অক্টোবরের হামলার ক্ষত এখনো টাটকা। বৃহস্পতিবার সে হামলার এক হাজার দিন পূর্তি উপলক্ষে দেশজুড়ে একাধিক স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। নোভা সঙ্গীত উৎসবের মাঠে নিহতদের স্মরণে জড়ো হন স্বজনেরা, যেখানে হামাসের হামলায় অন্তত ৩৬৪ জন নিহত হয়েছিলেন। একই সঙ্গে নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ বাড়ছে। ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার তদন্তে এখনও স্বাধীন কমিশন গঠন না হওয়া, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং সেনাবাহিনীতে নিয়োগ সংক্রান্ত বিতর্ক— সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা কমেছে। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ৬০ শতাংশেরও বেশি ইজরায়েলির মত, নেতানিয়াহুর আর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা উচিত নয়।
ফলে, এক হাজার দিনের যুদ্ধ শেষ হলেও ভূমধ্যসাগরের তীরে শান্তি এখনো বহু দূরের স্বপ্ন। গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা আজ ধ্বংসস্তূপ। লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া। পুনর্গঠন থমকে। যুদ্ধবিরতি ভঙ্গুর। প্রতিদিনই নতুন করে প্রাণহানির খবর আসছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতি এখনো সমাধানের পথ খুঁজছে। গাজার সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে প্রশ্নটি একই রয়ে গিয়েছে— যুদ্ধ কবে সত্যিই শেষ হবে, আর কবে তারা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন ?
❤ Support Us






