- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ২, ২০২৬
মণিপুরে ফের দাউদাউ অশান্তি, নাগা-কুকি সংঘাতে বাড়ছে উদ্বেগ। ‘বিভাজনের রাজনীতিরই ফল’- মোদি সরকারকে নিশানা রাহুলের
মণিপুরের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা যেন শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ২০২৩ সালের জাতিগত সংঘর্ষের পর, কেন্দ্র সরকারের তরফে বহুবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে দাবি করা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বরং সাম্প্রতিক ঘটনাবলী স্পষ্ট করে দিচ্ছে, রাজ্যের সংকট নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এতদিন যে সংঘাতকে মূলত মেইতেই ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে মনে করা হচ্ছিল, এখন তার সঙ্গে জুড়েছে নাগা-কুকি দ্বন্দ্ব। পাহাড়ি জেলার পর পাহাড়ি জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে অশান্তির আগুন। একের পর এক গ্রামে অগ্নিসংযোগ, অপহরণ, হত্যাকাণ্ড, পাল্টা হামলা, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং বাস্তুচ্যুতির ঘটনায় কার্যত নতুন নিরাপত্তা-সংকটের মুখে পড়েছে উত্তর-পূর্বের রাজ্য।
নতুন করে হিংসার আগুন ছড়িয়ে পড়তেই নরেন্দ্র মোদির সরকারকে তীব্র আক্রমণ শানালেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর অভিযোগ, রাজ্যে ফের যে অশান্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তা বিজেপি সরকারের ‘বিভাজনমূলক আদর্শের’ই প্রত্যক্ষ ফল। ধর্ম, ভাষা, জাতি ও পরিচয়ের ভিত্তিতে সমাজকে বিভক্ত করার রাজনীতিই মণিপুরকে দীর্ঘস্থায়ী সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে দাবি করেছেন কংগ্রেস নেতা। কেন্দ্র সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ। সে কারণেই, রাষ্ট্রপতি শাসন জারি থাকা সত্ত্বেও রাজ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনা যায়নি বলেও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, অসংখ্য পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়েছে, অথচ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ বা সহানুভূতির বার্তা—কোনোটিই মানুষ পাননি মণিপুরবাসীরা। তাঁরা সুরক্ষিত,উন্নত ভবিষ্যতের দাবীদার, ভারতের ঐক্যই এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ বলেও মন্তব্য করেন রাহুল।
রাহুলের এহেন রাজনৈতিক আক্রমণের পটভূমিতে রয়েছে গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ। বুধবার কামজং জেলার ভারত-মায়ানমার সীমান্তবর্তী কুকি গ্রামে সশস্ত্র দুষ্কৃতীদের হামলার অভিযোগ ওঠে। দুপুর নাগাদ গ্রামটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয়দের বক্তব্য, নিরাপত্তার আশঙ্কায় গ্রামবাসীরা আগেই পাশের গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ফলে প্রাণহানি এড়ানো গেলেও একাধিক বাড়ি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়। কুকি ইনপি মণিপুর অভিযোগ করেছে, সীমান্তের ওপার থেকে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিই এই হামলার সঙ্গে জড়িত। এ ঘটনার অল্প সময়ের মধ্যেই তাংখুল নাগা অধ্যুষিত কংকান থানার এলাকায় পাল্টা হামলার অভিযোগ সামনে আসে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, অন্তত বারোটি নাগা পরিবারের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির তাৎপর্য এখানেই যে মণিপুরের সংঘাত আর আগের কাঠামোয় সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৩ সালের ৩ মে শুরু হওয়া মেইতেই-কুকি জাতিগত সংঘর্ষের ফলে রাজ্য কার্যত উপত্যকা ও পাহাড়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। উপত্যকায় মেইতেই ও পাহাড়ে কুকিদের আধিপত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শত শত মানুষ নিহত হন, হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া হন। সে সময় নাগা সম্প্রদায় মূল সংঘর্ষের বাইরে ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরু থেকে ধীরে ধীরে অবস্থান বদলাতে থাকে। উখরুল জেলার লিটান সারেইখং গ্রামে ফেব্রুয়ারির ছোটখাটো বিবাদই পরে বড়ো অবিশ্বাসের সূচনা করে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, মদ্যপ অবস্থায় দু–সম্প্রদায়ের কয়েক জনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা পরে দুই সমাজের সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। প্রবীণ নেতারা, নাগরিক সমাজ পরিস্থিতি সামাল দিলেও পারস্পরিক সন্দেহ আর দূর হয়নি। এরপর একের পর এক বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, মুখোমুখি অবস্থান আর প্রাণহানির ঘটনা সামনে আসতে থাকে।
পরিস্থিতির সবচেয়ে ঘাতক মোড় আসে ১৩ মে। চুরাচাঁদপুর থেকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান সেরে ফেরার পথে থাডৌ সম্প্রদায়ের তিন ধর্মীয় নেতা এবং তাঁদের গাড়িচালককে অতর্কিতে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ড কুকি সমাজে প্রবল ক্ষোভের জন্ম দেয়। বিভিন্ন কুকি সংগঠন নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে। নাগা সংগঠনগুলি অবশ্য সে অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানায়। এখনো পর্যন্ত ওই হত্যার প্রকৃত দায় কার, তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু ঘটনার পর থেকেই দুই সম্প্রদায়ের সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যেতে থাকে। এর পর শুরু হয় প্রতিশোধের রাজনীতি। সেনাপতি ও সংলগ্ন এলাকা থেকে একাধিক কুকিকে অপহরণের অভিযোগ ওঠে। পাল্টা কাঙপোকপি অঞ্চলে নাগাদেরও তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। আলোচনার মাধ্যমে প্রথম দফায় কিছু বন্দির মুক্তি সম্ভব হলেও বহু মানুষ দীর্ঘদিন নিখোঁজ ছিলেন। কয়েক সপ্তাহ পর কুকি বন্দিদের জীবিত উদ্ধার করা গেলেও ছয় জন নিখোঁজ নাগার মৃতদেহ উদ্ধার হয়। নিহতদের পরিবারের দাবি, মৃতদেহ এমনভাবে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল যে পোশাক দেখে পরিচয় নিশ্চিত করতে হয়। এ ঘটনায় নাগা সমাজে প্রবল ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। যদিও কুকি সংগঠনগুলিও হত্যার নিন্দা জানিয়ে জানায়, এ ঘটনার সঙ্গে তাদের কোনো যোগ নেই।
সংঘর্ষের প্রভাব শুধু প্রাণহানিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। দুই সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরের অধ্যুষিত এলাকা ছেড়ে নিজেদের নিরাপদ অঞ্চলে চলে যেতে শুরু করেন। একাধিক ত্রাণশিবির গড়ে ওঠে। বহু পরিবার রাতারাতি বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করা বহু গ্রাম কার্যত জনশূন্য হয়ে যায়। এরই মধ্যে ‘ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল’ জাতীয় সড়ক–২ অবরোধের ডাক দেয়। অবরোধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় কাঙপোকপি জেলা কার্যত দেশের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এ সড়কই ছিল জেলার খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধ-সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের প্রধান পথ। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি শুরু হয়। চাল, রান্নার গ্যাস, পেট্রল— সব কিছুর দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বহু পরিবার দিনে একবেলার খাবার জোগাড় করতেও হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে বাস্তুচ্যুত মানুষ, বিধবা, শিশু এবং দিনমজুরদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ।
অন্যদিকে, অপহরণ থেকে ফিরে আসা বহু কুকি এখনো প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাইছেন না। দীর্ঘ বন্দিদশার স্মৃতি তাঁদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে রেখেছে। কী পরিস্থিতিতে তাঁদের আটকে রাখা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলতে তাঁরা অনীহা প্রকাশ করছেন। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এ নীরবতাই বোঝায় যে সংঘর্ষের মানসিক ক্ষত কত গভীর। নিহত নাগা পরিবারগুলির অবস্থাও সমান মর্মান্তিক। এক বিধবা জানিয়েছেন, অপহরণের পর স্বামীকে শেষবার দেখেছিলেন জীবিত অবস্থায়। পরে মৃতদেহ শনাক্ত করতে হয়েছে তাঁর পরনের শার্ট দেখে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারীকে হারিয়ে এখন তাঁর সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
সংঘাত যত গভীর হয়েছে, ততই পাল্টাপাল্টি অভিযোগও বেড়েছে। নাগা সংগঠনগুলির দাবি, তিন কুকি ধর্মীয় নেতার হত্যার সঙ্গে তাদের কোনো যোগ নেই। অন্যদিকে কুকি সংগঠনগুলির অভিযোগ, নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিই কুকি গ্রামে হামলা চালাচ্ছে। নাগা সংগঠনগুলি আবার সেই অভিযোগও অস্বীকার করেছে। একই সঙ্গে ‘এসওও’ চুক্তিভুক্ত কুকি সংগঠনগুলিকে ঘিরেও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের এ আবর্তে প্রকৃত সত্য এখনো অধরাই। মেইতেই সংগঠনগুলিও পরিস্থিতিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখছে। তাদের বক্তব্য, অবৈধ অনুপ্রবেশ, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন, পৃথক প্রশাসনের দাবি এবং দীর্ঘদিনের বিদ্রোহ— সব মিলিয়েই বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে কুকি সংগঠনগুলির দাবি, কেন্দ্রের সঙ্গে চলা শান্তি-আলোচনাকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যেই তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার নোনে জেলায় নতুন করে হিংসার খবর পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। লেইকোট কুকি গ্রামে ভারী অস্ত্র নিয়ে হামলার অভিযোগ উঠেছে। গ্রামবাসীদের দাবি, স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র এবং মর্টার ব্যবহার করা হয়েছে। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা সীমিত অস্ত্র নিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত গ্রাম ছেড়ে সরে যেতে বাধ্য হন। পরে গ্রামটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এই ঘটনায় ‘কুকি ইনপি’ কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত, অতিরিক্ত নিরাপত্তা ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
মণিপুরের বর্তমান সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, সংঘর্ষের ভৌগোলিক পরিসর যেমন বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে সামাজিক বিভাজনের গভীরতাও। উপত্যকা ও পাহাড়ের বিভাজন এখন পাহাড়ের অভ্যন্তরেও নতুন নতুন জাতিগত সংঘর্ষের জন্ম দিচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য এটি যেমন বড়ো চ্যালেঞ্জ, তেমনই রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছেও এটি কঠিন পরীক্ষা। কারণ, এখন শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করলেই হবে না; বহু বছরের অবিশ্বাস, পরস্পরবিরোধী দাবি, বাস্তুচ্যুতি, অর্থনৈতিক সংকট, মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেও নতুন করে আস্থার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। এ মুহূর্তে মণিপুরের সামনে তাই প্রশ্ন একটাই—অবরোধ, পাল্টা হিংসা এবং জাতিগত মেরুকরণের নতুন অধ্যায় কি আরও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে নিয়ে যাবে, নাকি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নিরপেক্ষ তদন্ত আর আন্তঃসম্প্রদায়িক সংলাপের মাধ্যমে এখনো পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে? উত্তর এখনও অজানা। তবে নিশ্চিত, এই সংকটের সবচেয়ে কঠিন মূল্য চোকাচ্ছেন সাধারণ মানুষই।
❤ Support Us






