- দে । শ
- জুলাই ১৪, ২০২৬
কলকাতায় ‘চালকহীন’ মেট্রো ! নিরাপত্তা পরীক্ষায় পাশ, চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় কলকাতার ‘ইস্ট-ওয়েস্ট করিডর’
কলকাতা মেট্রোর ইতিহাসে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। দেশের প্রথম ‘মেট্রো শহর’ এবার পা বাড়াতে চলেছে চালকবিহীন বা ‘ড্রাইভারলেস’ পরিষেবার পথে। দীর্ঘ দিনের প্রস্তুতি, একাধিক পরীক্ষামূলক চালনা এবং উন্নত সিগন্যালিং ব্যবস্থার সফল প্রয়োগের পর ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোর হাওড়া ময়দান থেকে সেক্টর ফাইভ পর্যন্ত ১৬.৬ কিলোমিটার করিডরে চালকবিহীন ট্রেন চালুর পথে বড়ো পদক্ষেপ কর্তৃপক্ষের।
সম্প্রতি, ‘কমিশনার অব রেলওয়ে সেফটি’ (সিআরএস), উত্তর-পূর্ব সীমান্ত সার্কেলের কমিশনার সুমিত সিংহল গোটা করিডর জুড়ে বিস্তৃত নিরাপত্তা পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের মূল লক্ষ্য ছিল, চালকবিহীন পরিষেবা চালু হলে, বিশেষত গঙ্গার তলার সুড়ঙ্গে কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে তার মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে কি না! হাওড়া ময়দান টার্মিনাল স্টেশন থেকে শুরু হয় ‘সিআরএস’-এর বিশেষ পরিদর্শন। ভারতের প্রথম নদীগর্ভস্থ মেট্রো সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে মেট্রোরেলে চেপে সুমিত সিংহল পৌঁছন সল্টলেক সেক্টর ফাইভ। প্রায় ৫২০ মিটার দীর্ঘ এ সুড়ঙ্গ কলকাতা ও হাওড়াকে যুক্ত করেছে গঙ্গার তলা দিয়ে। মাত্র ৪৫ সেকেন্ডে এ অংশ অতিক্রম করে ট্রেন।
মেট্রো সূত্রে জানা গিয়েছে, ‘ড্রাইভারলেস মোড’-এ ট্রেন চলাকালীন কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে যাত্রীদের নিরাপদে উদ্ধার ও পরিষেবা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সে বিষয়েই বিশেষ নজর দেন কমিশনার। সে কারণে একাধিক বার স্টেশনগুলির মাঝপথে ট্রেন থামিয়ে জরুরি পরিস্থিতির অনুকরণে বিভিন্ন পরীক্ষা চালানো হয়। পরিদর্শনের শুরুতে সিআরএসকে অটোমেটিক ট্রেন অপারেশন বা ‘এটো’ ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে অবহিত করেন মেট্রো কর্তারা। পরে তিনি হাওড়া ময়দান স্টেশনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ পরিদর্শন করেন। সেখান থেকে ট্রেনে করে পৌঁছন সেন্ট্রাল পার্ক ডিপোয় অবস্থিত অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টারে (ওসিসি)। এই ওসিসিকেই ড্রাইভারলেস পরিষেবার ‘মস্তিষ্ক’ বলা হচ্ছে। কারণ, ‘কমিউনিকেশন বেসড ট্রেন কন্ট্রোল’ প্রযুক্তির মাধ্যমে এখান থেকেই দূরবর্তীভাবে ট্রেনের যাবতীয় চলাচল নিয়ন্ত্রিত হবে।
মেট্রো কর্তৃপক্ষের দাবি, ‘ড্রাইভারলেস’ মানে ট্রেনে কোনো কর্মী থাকবেন না, এমনটা নয়। যাত্রী নিরাপত্তা ও পরিষেবার উপর নজরদারির জন্য প্রশিক্ষিত কর্মীরা উপস্থিত থাকবেন। তবে ট্রেন চালানো, গতি নিয়ন্ত্রণ, স্টেশনে থামানো ও পুনরায় যাত্রা শুরু করার মতো সমস্ত কাজই করবে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। এই প্রযুক্তি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক মেট্রো সিগন্যালিং ব্যবস্থাগুলির অন্যতম। ট্রেনে বসানো সেন্সর, অনবোর্ড কম্পিউটার, তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ট্রেনের অবস্থান, গতি ও দূরত্ব নিরন্তর পর্যবেক্ষণ করা হয়। এর ফলে মানবিক ত্রুটির সম্ভাবনা কমে, ট্রেন চলাচলের সংখ্যাও বাড়ানো সম্ভব হয়। একই সঙ্গে শক্তি সাশ্রয় ও পরিচালন ব্যয়ও দীর্ঘমেয়াদে কমে আসে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। কলকাতার ‘ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো’য় ব্যবহৃত ‘এটো’ ব্যবস্থা আসলে এ প্রযুক্তিরই তৃতীয় স্তর। গত বছরের আগস্ট মাস থেকেই হাওড়া ময়দান-শিয়ালদহ অংশে এই প্রযুক্তির নিবিড় পরীক্ষামূলক প্রয়োগ চলছে। সেসব পরীক্ষায় ইতিবাচক ফল মেলার পরই পূর্ণাঙ্গ ‘ড্রাইভারলেস পরিষেবা’র দিকে এগোচ্ছে কলকাতা মেট্রো কর্তৃপক্ষ।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে দিল্লি, মুম্বই ও বেঙ্গালুরুর কিছু মেট্রো করিডরে ‘ড্রাইভারলেস’ প্রযুক্তি চালু রয়েছে। এবার সে তালিকায় শীঘ্রই নাম যুক্ত হতে চলেছে কলকাতার। ওয়াকিবহালদের একাংশের মতে, দেশের প্রথম মেট্রো শহরের জন্য এটি কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতিই নয়, বরং নগর পরিবহণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এখন অপেক্ষা ‘সিআরএস’-এর চূড়ান্ত অনুমোদনের। সে ছাড়পত্র মিললেই গঙ্গার তলার সুড়ঙ্গ পেরিয়ে কলকাতার যাত্রীরা প্রথম বার চড়তে পারবেন এমন এক মেট্রোয়, যার চালকের আসন থাকবে ফাঁকা, প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণে হু হু ছুটবে প্রতিটি মুহূর্ত।
❤ Support Us







