- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ
- জুলাই ১৪, ২০২৬
শ্যামাপ্রসাদের অসমাপ্তি, পুনর্বাসন দরকার
১
অনিবার্য আর ঐতিহাসিক কারণেই বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল, এর দায়ভাগ এককভাবে কোন ব্যক্তিবিশেষের উপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। দেশভাগের পর একসময় শ্যামাপ্রসাদ বলেছিলেন, ” জিন্নাহ ভারত ভাগ করেছেন, আমি বাংলা ভাগ করেছি”, সেটা তাঁর মনের কথা ছিল না; এক বিশাল জনসমষ্টির আবেগকে তুলে ধরার জন্যই তাঁকে হয়ত তাৎক্ষণিকভাবে ওইরকম বলতে হয়েছিল। কারণ তাঁর সারাজীবনের কার্যকলাপের সঙ্গে একথার মিল নেই। বাংলাকে অখন্ড রাখারজন্যই তিনি একসময় প্রোগ্রেসিভ পার্টির নেতা এ.কে. ফাজলুল হকের হাত ধরেছিলেন এবং বৃহত্তর সমাজকে এক সুতোয় বাঁধার’ আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। কাজেই তাঁর পক্ষে সাম্প্রদায়িকভাবে বাংলভাগ করার প্রশ্নই ওঠে না। বাংলা ভাষা ও বাঙালিত্বের প্রতি তাঁর নিটোল ভালোবাসার টান যেকোনো মননশীল বাঙালির থেকে অনেক, অনেক বেশি ছিল।
শ্যামাপ্রসাদের পরিবারে ‘সাম্প্রদায়িকতা ও গোঁড়ামির স্থান’ ছিল না। বিধবা বিবাহের কট্টর বিরোধী বঙ্কিমচন্দ্রের দৌহিত্রের সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদের পিতা স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় নিজের জ্যেষ্ঠ কন্যা রানুর বিবাহ দিয়েছিলেন। বিবাহের অল্পদিন পরে কন্যা বিধবা হয়ে ফিরে এলে তিনি কন্যার দ্বিতীয় বিবাহও দিয়েছিলেন । এ ব্যাপারে বঙ্কিম-কন্যার অর্থাৎ রানুর শাশুড়িমার হাজার ওজর-আপত্তি, কোর্ট-কাছারি এবং গোঁড়া সমাজের বাধাদানের চেষ্টা কিছুই তাঁকে পিছু হটাতে পারেনি। প্রায় মুছে দেওয়া আরেকটি ইতিহাস, অসুস্থ কাজী নজরুল ইসলামের চিকিৎসাভার শ্যামাপ্রসাদ শুধু নিজের কাঁধে তুলে নেননি, তাঁকে সস্ত্রীক নিজেদের দেওঘরের বাড়িতে স্থান দিয়েছিলেন । তাঁদের বাড়ির সাহিত্য-আড্ডায় জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিক ও কলাকুশলীদের অবাধ প্রবেশাধিকার ছিল। সেখানেও শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।
দেশভাগের আগে এ-বঙ্গের রাজনীতিতে ধর্মীয় মেরুকরণজনিত যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল, তারজন্য উভয় সম্প্রদায়ের কিছু ক্ষমতালোভী নেতা সমানভাবে দায়ী ছিলেন। শ্যামপ্রসাদ প্রাথমিকভাবে এ মেরুকরণ রাজনীতির তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি ‘বাংলা বলতে অখণ্ড বাংলা’ এবং ‘ভারত বলতে অখণ্ড ভারত’- বুঝতেন। এ.কে. ফজলুল হকের মন্ত্রিসভায় নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করে তিনি বলতে চেয়েছিলেন, বাংলা তার রাজনৈতিক ঐতিহ বজায় রাখবে। এই মন্ত্রীসভা ছিল দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বপ্নের বাংলা তথা ভারত তৈরির এক পরীক্ষাগার। কিন্তু মেরুকরণজাত রাজনীতির চাপে অখণ্ড বাঙালার হক-শ্যমাপন্থী ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি ক্রমশঃ কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভার সদস্য হলেও, স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজের উদার হিন্দুত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। তাই তাঁর পক্ষে প্রগতিপন্থী নেতা ফজলুল হকের ডাকে তাঁর মন্ত্রিসভায় নির্দ্বিধায় যোগদান করা সম্ভব হয়েছিল। ঘটনাচক্রে জিন্নার নেতৃত্বাধীন বাঙালি-বিদ্বেষী মুসলিম লিগের কূটকৌশলে ফজলুল হকের ক্ষমতা হ্রাসের সম্ভাবনা দেখা দিলে, শ্যামাপ্রসাদ হতাশ হয়ে হক সাহেবের মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন।
তিনি বুঝেছিলেন, ব্রিটিশ গভর্নর তাঁদের ক্ষমতাচ্যুত করে ‘সাম্প্রদায়িক অবাঙালি মুসলিম লীগ নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন’কে গদিনসিন করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। তারপর ঘটনাপ্রবাহ যেভাবে গড়ায়, তাতে, শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক শক্তিরই জয় অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। ভারত ভাগের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাও ভাগ হয়ে যায় এবং কলকাতার কর্তৃতাধীন বঙ্গের সীমানা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। নিরুপায় হয়ে শ্যামাপ্রসাদকে এবঙ্গের গরিষ্ঠসংখ্যক মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতি সহ্য করতে হয়েছিল।
২
১৯৪৭ সালে দেশভাগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এক নতুন সমস্যা দেখা দেয়। বাঙালি-অধ্যুষিত কোচবিহারে সামন্তবাদশাসিত ব্রিটিশ করদ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে থাকবে কিনা সে প্রশ্ন দেখা দেয়। যখন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন প্রবল থেকে প্রবলতর আকার ধারণ করে, তখন কোচবিহরের মাটিতে ‘হিতসাধনী সভা’ নামে একটি দল গড়ে ওঠে । এ দলের নেতৃত্বে ছিলেন সতীশচন্দ্র সিংহরায়, খান চৌধুরী আমানতউল্লাহ আহমেদ খান, জলধর সাহা, কামিনীকুমার বর্মণ, গজেন্দ্রকুমার বসুনিয়া, কুমার ধীরেন্দ্রনারায়ণ এর মতো প্রভৃতি রাজানুকূল্যভোগী বেশ কিছু ক্ষমতাধর বিশিষ্ট অমাত্য ও আমলা।
কোচবিহারে ব্যবসা বাণিজ্য ও অন্যান্য কর্মসূত্রে কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে আসা বংশপরম্পরায় বসবাসকারী বাঙালি, যাঁরা অধিকাংশই ছিলেন কংগ্রেস ও অন্যান্য জাতীয় দলের প্রতি আস্থাশীল, তাঁদের কার্যকলাপ দেখে বিস্মিতও হতাশ হয়ে পড়েন। তাঁরা উপলব্ধি করেন, রাজার এই দল ব্রিটিশের অনুগত, সামন্ততান্ত্রিক মনোভাবসম্পন্ন, গণতন্ত্রবিরোধী ও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে ক্ষতিকারক একটি দল। বাংলা ভাগ হলে এবং এঁদের রাজার শাসন-ক্ষমতা শিথিল হলে প্রয়োজনে এরা পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যোগ দিতে পারে, কিন্তু কিছুতেই পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে নয় । ফলে দেশভাগের আগে থেকে কোচবিহারে একটি রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়।
জাতীয় আন্দোলনের মূলস্রোতের বিরুদ্ধে এই স্থানীয় আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু রাজনীতিসচেতন মানুষ ভালো মনে নিতে পারেননি। কোচবিহারের বাইরের জেলাগুলো থেকে যে সব বাঙালির আগমণ ঘটে, তাদের সঙ্গে স্থানীয় দলের বিরোধ উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে। এই বিরোধের আবহাওয়া আরও তপ্ত হয়ে উঠে যখন তিস্তা-তীরে অবস্থিত মেখলিগঞ্জের একটি সভায় কোচবিহারের মহারাজ জগোদ্দীপেন্দুনারায়ণ রায়ের শিক্ষামন্ত্রী সতীশচন্দ্র সিংহ তাঁর বক্তৃতায় প্রকাশ্যে ‘ভাটিয়া’দের কোচবিহার থেকে তাড়ানোর হুমকি দেন।
কোচবিহারের বাইরে থেকে যেসব বাঙালি, বিশেষ করে কলকাতা ও অন্যান্য জেলা থেকে যাঁরা ব্যবসা-বাণিজ্য বা কর্মসূত্রে বাস করতেন, তাঁরা সবাই স্থানীয় দলের চোখে ছিল ‘ভাটিয়া’ বা ‘বহিরাগত’ বলে গণ্য হতেন।
সাধারণ কোচবিহারবাসীদের তুলনায় তাঁরা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সচেতনতার দিক থেকে অনেক বেশি এগিয়ে ছিলেন । তাঁরা উপলব্ধি করেন, ইংরেজ তোষণকারী ‘হিতসাধনী সভা’ নামে রাজার দল আসলে ভারতীয় জাতীয় রাজনীতি ও স্বাধীনতার পরিপন্থী একটি রক্ষণশীল দল। সারা ভারতবর্ষের মানুষ যখন ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনিতে স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ল, তখন এরা ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে আলাদা রাজ্যের পরিকল্পনা করে যাচ্ছে । কবিগুরুর ‘জনগণমন অধিনায়ক গান যখন স্বাধীন ভারতের জাতীয় সংগীত হিসেবে জনমানসে উথালপাথাল ঢেউয়ের সৃষ্টি করেছে, তখন এঁরা আলাদা গান রচনা করে আলাদা আন্দোলন শুরু করে দিলেন । এদের গানটি ছিল “সুজল সুফল শস্যশ্যামল / বাংলাদেশের কণ্ঠহার । ধন্য মোদের জন্মভূমি স্বর্ণভূমি কোচবিহার । তোর্সা ধল্লা গঙ্গাধর রায়ডাক আর কালজানি, পঞ্চনদীর পুণ্যধারায় সিক্ত শ্যামল । বুকখানি। / শষ্যে-জলে-পুষ্পে-ফলে হাস্যময়ী মা। আমার ।”
কোচবিহারকে বৃহৎ বঙ্গসংস্কৃতির অঙ্গভূমি বলে যাঁরা মনে করতেন, তাঁরা নিশ্চিত হয়ে যান যে, স্বাধীনতার পর কলকাতার সঙ্গে যুক্ত না থাকার সম্ভাবনাময় বিভিন্ন পথ খোলা রাখার জন্য ‘হিতসাধনী সভা’র আন্দোলনকে যেভাবেই হোক রুখে দিতে হবে। কলকাতার শিল্পী-সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী মহলও পাল্টা আন্দোলনের মাধ্যমে কোচবিহারের আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার উপর জোর দেন। ১৯৪৭ সালের ৫ মে, কোচবিহার শহরের লাইন মাঠে বিশাল জনসমাবেশের আয়োজন করা হয় এবং সেখানে সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে কোচবিহারী স্বদেশ প্রেমের বন্যা বইয়ে দেন সতীশচন্দ্র সিংহরায় সরকার, ধরণীশঙ্কর ভট্টাচার্য প্রমুখ ‘হিতসাধনী সভা’র নেতারা। সেদিনের বক্তৃতা-মঞ্চে লোকগীতি সম্রাট আব্বাসউদ্দিনের একটি গান ছিল উল্লেখযোগ্য । সেখানে আঞ্চলিক কথায় ও সুরে ওই গান সাময়িকভাবে হলেও শ্রোতাদের মোহমুগ্ধ করে রেখেছিল বেশ কিছুদিন । গানটি হল —
“ও ভাই মোর কুচবিহারী রে…
চতুর্দিকে দেখং সুরজ বাতি.
তোমরা এলা কেনে আন্ধার রাতি?ও ভাই মোর কুচবিহারী রে…
নিজের টোপলা নিজে নেও
হাসিমুখে তোমরা পরকে দেও, পরদেশী কি আপন হয় রে…!”
এ গানের মধ্যে কোচবিহারকে স্বতন্ত্র রাখার একটি পরিস্কার আভাস পাওয়া যায়। ‘পরদেশী’ যে ইংরেজ বা অন্য কেউ নয়, বরং তাদের কথিত সেই ‘ভাটিয়া’রা তা দিনের আলোর মত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
৩
স্বাভাবিকভাবেই হিতসাধনী সভার কার্যকলাপের উপর একটা সন্দেহের অবকাশ তৈরি হয় । তৎকালীন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেলের ২৮ ডিসেম্বর, ১৯৪৮ সালের একটি চিঠিতে তার উল্লেখ মেলে। তিনি
বলেছিলেন, “There is the local Hitosadhoni Sova which is a partly Muslim with the sympathies definitely with neighbouring area of East Pakistan and partly consisting of some members of hill-tribes who are looking to Sikim, Nepal and Bhutan for formation of Uttarakhand Prodesh.”
ক্রমশ উত্তরবঙ্গের কোচবিহারের ভারতভুক্তি এবং একইসঙ্গে বঙ্গভুক্তির ব্যাপারে দারুণ ধোঁয়াশা তৈরি হয়।
এরকম অবস্থায় ২৯ জুন, ১৯৪৮ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিরূপে আসামের তৎকালীন গভর্নর আকবর কে হায়দারিকে দায়িত্ব দেওয়া হয় সরজমিনে কোচবিহার পরিদর্শন করে স্থানীয় মানুষদের মতামত নিয়ে কেন্দ্রকে রিপোর্ট পাঠাতে হবে। জনমতের তোয়াক্কা না করেই হায়দারি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী প্যাটেলের কাছে কোচবিহারকে আসামের সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য সুপারিশ করেন। এটা ছিল পশ্চিমবঙ্গের জনমতকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করার এক বিরল দৃষ্টান্ত। হায়দারি সাহেব বঙ্গভাষী ও বঙ্গভূমির প্রতি কখনোই সুপ্রসন্ন ছিলেন না। কাজেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তাঁর ওই ধরনের রিপোর্ট পাঠানোর ব্যাপারটি ছিল খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কারণ কোচবিহারে বাঙালিরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সমস্ত বাঙালিরা একজোট হয়েছিল কোচবিহারকে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য। অথচ আসামের গভর্নর হায়দরী সাহেব তথ্য গোপন করে দিল্লিকে রিপোর্টে জানালেন, কোচবিহার রাজ্যের সাত লক্ষ জনগণের মধ্যে মাত্র ত্রিশ হাজার বাঙালি । বাকি সব অধিবাসীই রাজবংশি আর মুসলমান। পশ্চিমবঙ্গের সব স্তরের রাজনৈতিক নেতা, লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। যেন রাজবংশী কিংবা মুসলমান হলে বাঙালি হওয়া যায় না ! হায়দরি, এই যুক্তিহীন যুক্তির জন্য কোচবিহারের বাঙালি সমাজ বিভিন্ন স্থানে মিটিং-মিছিল, সভা-সমিতির আয়োজন করতে থাকে।
আসামে সেই সময় বাঙালি-বিদ্বেষ তীব্র থেকে তীব্রতর রূপ ধারণ করে । বাংলা ও বাঙালির এই অস্তিত্বসংকটের মোকাবিলায় শ্যামাপ্রসাদ স্বয়ং এগিয়ে এলেন ত্রাতার ভূমিকায় । পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়কে সঙ্গে নিয়ে ৭ জুলাই, ১৯৪৮ শিলং সফরে যেতে মনস্থ করলেন। আসাম প্রদেশ কংগ্রেসও তখন বাঙালি-অধ্যুষিত কোচবিহারকে গ্রাস করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল।
অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে জলপাইগুড়ি থেকে প্রকাশিত ‘জনমত’ পত্রিকায়, ১৯৪৮ এর ৭ সেপ্টেম্বর (২১ শে ভাদ্র, ১৩৫৫) সম্পাদকীয়-তে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে লেখা হয়েছিল, “পশ্চিমবাংলা কংগ্রেস ও পশ্চিমবাংলা সরকারের কুম্ভকর্ণের নিন্দ্রাভঙ্গ হউক। হায়দ্রাবাদের অভিনয় কোচবিহার রাজ্যে যাহাতে ঘটিতে না পারে সে বিষয়ে এখন হইতেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন । ..আমরা কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রীবল্লভভাই প্যাটেল মহাশয়কে অনুরোধ করি, কোচবিহারের কার্যকলাপ সম্বন্ধে বিশেষ অনুসন্ধান করিতে এবং আবশ্যকমত বিধিব্যবস্থা গ্রহণ করিতে।”
৪
শ্যামাপ্রদাদ গোটা পরিস্থিতির উপর নজর রেখেছিলেন । তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্যাটেলের সঙ্গে বাঙালির আশঙ্কার ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। সর্দার প্যাটেলও গোপন তথ্য মারফৎ কোচবিহারের পরিস্থিতি সম্পর্কে অনেক আগে থেকেই ওয়াকিবহাল ছিলেন। গভর্নর হায়দরির বাঙালি-বিদ্বেষী রিপোর্টের উপর তিনি ভরসা রাখার প্রয়োজন মনে করেননি। নেহরু মন্ত্রিসভা বিভিন্ন কারণে ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত কোচবিহারের পশ্চিমবঙ্গভূক্তির ব্যাপারটি স্থগিত রাখে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্যাটেল তাঁর মন্ত্রিসভার সহকর্মী ও রাজনৈতিক মতাদর্শের সমমতালম্বী বঙ্গসন্তান ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলোচনার পর স্পষ্ট বুঝে গিয়েছিলেন যে, কোচবিহারকে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত না করলে ক্ষুব্ধ বাঙালিকে শান্ত করা যাবে না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জহরলাল নেহেরু বঙ্গভঙ্গের পর কলকাতার বাঙালিদের মনোভাব সম্পর্কে তখনও পর্যন্ত আলাদাভাবে কিছু ভাবার প্রয়োজন মনে করেননি। বল্লভভাই প্যাটেলেরও বাঙালি সম্পর্কে আলাদা করে ভাবার কোন কারণ ছিল না। বরং এ বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার কারণ খুঁজে পাননি।
পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর আস্থাভাজন ছিলেন, বাঙালির ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের মনোভাব যে খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়, তা তিনি স্পষ্ট করে বুঝতে পেরেছিলেন।তাঁর ভরসা ছিল একমাত্র শ্যামাপ্রসাদের উপর। তিনি এও জানতেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হলেও শ্যামাপ্রসাদ কোনমতেই বাংলার প্রতি নেহেরু ও তাঁর মন্ত্রিসভার উপেক্ষা মেনে নিতে পারবেন না।
তাঁর ধারণ যে সঠিক ছিল অচিরেই তার প্রমাণও পাওয়া যায়। প্রয়োজনে বাংলা ও বাঙালির স্বার্থে তিনি (শ্যামাপ্রসাদ) যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা থেকে বেরিয়ে আসতে এক মুহূর্ত দেরি করবেন না তাঁর পরবর্তী কার্যক্রমে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সর্দার প্যাটেলকে লেখা একটি চিঠিতে শ্যামাপ্রসাদ পশ্চিমবঙ্গের অখণ্ডতা বজায় রাখার ব্যাপারে তাঁর সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন। সে চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, “কোচবিহারের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের কোনও সংযোগব্যবস্থা নেই একথা বলা ঠিক হবে না। কেননা কোচবিহার পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার সংলগ্ন। আর ভৌগোলিক দিক থেকে কোচবিহারের অবস্থানের প্রতি অবিচার করতে গেলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলাও বাদ পড়ে যায়। ..রাডক্লিফ সাহেব অত্যন্ত অযৌক্তিকভাবে সীমানা নির্ধারণ করেছিলেন । এবং ইচ্ছা করেই ভারতবর্ষকে এমন সব এলাকা থেকে বঞ্চিত করেছিলেন, সেগুলি নিতান্ত পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত ছিল। কাজেই রাডক্লিফ রোয়েদাদ ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গকে আরও বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল থেকে, যেগুলি স্বাধীনতার পূর্বে অবিভক্ত বঙ্গের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল, সেগুলি থেকে বঞ্চিত করা সঙ্গত হবে না। কোচবিহার এবং ত্রিপুরার মত বৃহৎ বঙ্গভাষী অঞ্চলকে আসাম কংগ্রেসের কর্তৃত্বাধীন করে রাখলে ভবিষ্যতে আরও জটিলতা তৈরি হবে।”
শ্যামাপ্রসাদের কাছ থেকে চিঠি পাওয়ার পর সর্দার প্যাটেল রাজাশাসিত কোচবিহারকে নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা শুরু করলেন। তিনি কংগ্রেস ওয়র্কিং কমিটির বৈঠকে কোচবিহার, ত্রিপুরা এবং কাছাড়ের সমস্যা নিয়ে আলোচনায় বসলেন এবং শ্যামাপ্রসাদকে পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ দেখার বিষয়ে বিষয়ে বিশেষভাবে আশ্বাস দিলেন।
২৬ জুন কলকাতার মহাবধি সোসাইটি হলে শ্যামাপ্রসাদকে মধ্যমণি করে পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু রাজনৈতিক আর বুদ্ধিজীবীদের উদ্যোগে শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্ট নাগরিকদের এক বিশেষ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। “খণ্ডিত বাংলাকে আর কোনমতেই খণ্ডিত করতে দেওয়া হবে না । ” এ বিষয়সূচির বিস্তারিত আলোচনার পর সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং তাতে বলা হয়, “কোচবিহার রাজ্যের যাহারা অধিবাসী তাহাদের মধ্যে নগন্য সংখ্যক লোক ছাড়া সকলেরই মাতৃভাষা বাংলা। সেখানকার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মাধ্যম বাংলা এবং শাসনকার্য সম্পর্কিত ও আদালতের ভাষা বাংলা । পশ্চিমবঙ্গের সহিত কোচবিহার রাজ্যের অন্তর্ভুক্তি স্বাভাবিক ও ন্যায়সঙ্গত যে, মুষ্টিমেয় স্বার্থপ্রণোদিতের পক্ষেই কেবল এর বিরুদ্ধাচারণ করা সম্ভব।”
৫
এইভাবে কোচবিহারকে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের জনমত রাজনৈতিক মতাদর্শগত পার্থক্যকে দূরে সরিয়ে রেখে এককাট্টা হয়েছিল। একদিকে তিনি যেমন ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ প্রমূখ কংগ্রেসের বিশিষ্ট নেতা ও মন্ত্রীদের সমর্থন পেয়েছিলেন, তেমনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতিবিদ শরৎচন্দ্র বসুর মত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বেরও সমর্থন লাভে সমর্থ হয়েছিলেন।
এরপরই কোচবিহারকে দ্রুত পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য পশ্চিমবঙ্গের জনসমর্থন ক্রমশঃ প্রবল আকার ধারণ করতে থাকে। সমসাময়িক প্রধান প্রধান পত্রপত্রিকায় এর সমর্থনে প্রচুর লেখালেখিও শুরু হয়। ১৩৫৬ সালের আশ্বিন সংখ্যায় ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় “বাঙ্গালা দেশকে সকল প্রকারে ছোট করিয়া বাঙ্গালি জাতিকে দাবাইয়া রাখাই এখন কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা বলিয়া মনে হয়। কুচবিহার, ত্রিপুরা ও মণিপুরে বাঙ্গালীই অধিক সংখ্যায় বাস করে — আজ কুচবিহারকে বাঙ্গালা থেকে পৃথক করা হইলে, কাল ত্রিপুরা ও মণিপুর আসামের সঙ্গে সংযুক্ত হইবে। পূর্ব পাকিস্তান পৃথক রাজ্য হওয়ায় আজ বাঙ্গালীর বসবাসের স্থান নাই–তাহার পর বাঙ্গালা আরো ছোট করা হইলে বাঙ্গালী জাতির অস্তিত্ব লোপ পাইবে। বাঙালার সংস্কৃতি একদিন সমগ্র ভারতবর্ষে প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করিয়াছে। আজ তাহা ভারতের সকল প্রদেশের লোকের অসহনীয় হওয়ায় এইভাবে বাঙ্গালার প্রভাব নষ্ট করা হইবে।”
‘ভারতবর্ষ’-এর এই মতামতের সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ সম্পূর্ণ একমত ছিলেন। তিনি তখনও কেন্দ্রে নেহেরু-মন্ত্রিসভার সদস্য, কিন্তু তা সত্বেও তিনি পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারে পূর্ণমাত্রায় সচেতন ছিলেন। তিনি যেটা সত্য ও ন্যায় মনে করতেন তার জন্য সর্বস্ব বাজি রাখতেও পশ্চাদপদ হতেন না। মন্ত্রিত্ব তাঁর নীতির কাছে তুচ্ছ ছিল। তা তিনি প্রমাণও করেছেন নেহেরুর কাশ্মীর নীতিতে অসন্তুষ্ট হয়ে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে। তাই কোচবিহারকে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত রাখার জন্য তিনি তাঁর সাধ্যমত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন।এইসময় কোচবিহারের সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকে অনুকূল জনমতও তৈরি হয়েছিল। ২৬ জুলাই, ১৯৪৯ কোচবিহারের হলদিবাড়ি থেকে হলদিবাড়ি কংগ্রেস কমিটির সম্পাদক মনোরঞ্জন গুহরায়, কৃষক প্রজা পার্টির আসোমদ্দিন ব্যাপারী এবং হলদিবাড়ি জনদধারণের পক্ষে ফজলুল হক পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে কোচবিহারকে যুক্ত করার জন্য তারবার্তা দিল্লিতে পাঠান। ১৪ জুলাই, ১৯৪৯ ভারতের প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহরু কলকাতার এক জনসভায় ঘোষণা করেন, ” The question of merger of Cooch Behar would be decided according to the wishes of the people.”
শ্যামাপ্রসাদ কোচবিহারের জনমতের মধ্যে কলকাতার জনমতের প্রতিফলন দেখে নিশ্চিন্ত হলেন যে, প্রবল জনমত নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের উপর চাপ তৈরি করতে পারবেন এবং যেকোন প্রকারে কোচবিহারকে পশ্চিমবঙ্গের যুক্ত করার জন্য কেন্দ্রকে বাধ্য করবেন। শ্যামাপ্রসাদের এই উদ্যোগকে সফল করার জন্য দেশভাগের পর খন্ডিত বাঙলার আয়তন যাতে আর কোনমতেই হ্রাস করা না হয় সে বিষয়ে দলমতনির্বিশেষে সমস্ত মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। কলকাতায় শরৎচন্দ্র বসু যেমন আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তেমনি উমেশচন্দ্র মন্ডল, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, রমেশচন্দ্র রায়, দূর্গেশ নিয়োগী, নরেশচন্দ্র বোস, প্রবোধচন্দ্র পাল, হারু মুখার্জী, প্রফুল্লচন্দ্র বাগচী প্রমুখ নেতৃবৃন্দও আন্দোলনে শরিক হয়েছিলেন। কলকাতার বুদ্ধিজীবীমহলও এইসময় সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন ছিলেন যথাক্রমে অতুলচন্দ্র গুপ্ত, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কালিদাস নাগ, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সজনীকান্ত দাস, শিশিরকুমার ভাদুরী, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় এবং আরও অনেকে।
ভারতবর্ষ পত্রিকার কার্তিক সংখ্যায় ( সন ১৩৫৬), কোচবিহার এবং ত্রিপুরার ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহন বিলম্বিত হতে দেখে ‘বাঙলার বিপদ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, “পূর্বভারতের তিনটি স্বাধীন রাজ্য সম্প্রতি ভারতের অন্তর্ভুক্ত হইয়াছে — তন্মধ্যে মণিপুর আসাম গবর্ণমেন্টের অধীন করা হইয়াছে এবং ত্রিপুরা ও কোচবিহার কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন করা হইয়াছে। তিনটি রাজ্যেই বঙ্গভাষাভাষী অধিবাসীর সংখ্যা অধিক। .. মণিপুর অবশ্য আসামের এক প্রান্তে, কাজেই তাহার আসামের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আপত্তির কারণ নাই। কিন্তু কুচবিহার ও ত্রিপুরা পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত না করার কারণ বুঝা গেল না। এই দুটি রাজ্যের বঙ্গভাষাভাষীদের হয়ত বাঙ্গালা ভাষা ত্যাগ করিতে হইবে এবং সেখানে বাঙ্গালার যে সংস্কৃতি তাও শেষ হইয়া যাইবে। কেন্দ্রীয় সরকারের এই ব্যবস্থা বাঙ্গালী সমর্থন করিতে পারে না। ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্রী ক্ষিতিশচন্দ্র নিয়োগী কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রীপদে প্রতিষ্টিত আছেন। বিহারের বঙ্গভাষাভাষী অঞ্চলগুলিকে বাঙ্গালাকে ফিরাইয়া দেওয়া হইল না কুচবিহার ও ত্রিপুরা বাঙ্গালা হইতে পৃথক হইয়া গেল — তাঁহারা এই সকল অন্যায়ের প্রতিবাদে যদি অগ্রসর না হন, তবে দেশবাসীর আস্থাভাজন হইয়া থাকিবেন কি প্রকারে তাহাই চিন্তার বিষয়।”
শ্যামাপ্রসাদের সদিচ্ছা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হলেও যাতে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের উপর আশু চাপ সৃষ্টি করতে পারেন, সেকথা ভেবেই ভারতবর্ষ পত্রিকা এরকম লিখেছিল। কারণ পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি তখন শ্যামাপ্রসাদের উপর দারুণ নির্ভরশীল । তারা বুঝতে পেরেছিল এই মহান বঙ্গসন্তান না থাকলে পশ্চিমবঙ্গ আর পশ্চিমবঙ্গে থাকবে না, পূর্ববঙ্গের অধীনস্থ হয়ে পড়বে। তাই যত মান-অভিমান সবই শ্যামাপ্রসাদকে ঘিরে বর্ধিত হতে থাকে।
৬
শ্যামাপ্রসাদ ‘বাংলার মন ও মনন’কে ভেতর থেকে চিনতেন । বাংলার সাহিত্য ও শিল্প-সংস্কৃতি তাঁর কাছে বড় আদরের ও গর্বের বিষয় ছিল । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর থাকাকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনী অনুষ্ঠানে তিনিই প্রথম বাংলাভাষায় ‘উদ্বোধন প্রথা’ চালু করেছিলেন । এ বিষয়ে কবিগুরুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তাঁর প্রধান অনুপ্রেরণা । তাই তিনি উদ্বোধনও করিয়েছিলেন কবিগুরুকে দিয়ে। বাঙালির গর্বের পীঠস্থান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান-তপস্যা। যা দেখে বিস্মিত আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষও তাঁকে ‘বাপকে ব্যাটা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। কোচবিহারকে পশ্চিমবঙ্গের যুক্ত করার জন্য তিনি একদিকে যেমন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে বিরামহীনভাবে দরবার করেছেন, তেমনি পশ্চিমবঙ্গের মাটি থেকে জনমত যাতে সোচ্চার হয়ে উঠে সে ব্যাপারটাও গুরুত্ব সহকারে ভেবেছিলেন । তাঁর ক্রমাগত চাপের কাছে কেন্দ্রীয় সরকারও শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল । নাহলে কেন্দ্রীয় সরকার অনেক আগেই কোচবিহারকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করে দিত । সেটা সম্ভব হয়নি একমাত্র শ্যামাপ্রসাদ ও বাংলার জনগণের জন্য ।
মনে রাখতে হবে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে শুধু কোচবিহার নয়, ত্রিপুরার সংযুক্তির যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে বারবার দরবার করেছেন । তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, রাডক্লিফ রোয়েদাদের ভুল সিদ্ধান্তের জন্য কোচবিহার ও ত্রিপুরায় পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বিছিন্ন হওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিচ্ছিন্নপ্রবন দু’টি রাজ্যকেই তিনি পশ্চিমবঙ্গের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার দাবিকে শেষ পর্যন্ত যুক্তি-প্রমাণা-সহ বোঝাতে সক্ষমও হয়েছিলেন। একারণেই ২৯ নভেম্বর, ১৯৪৯ সালে কেন্দ্রীয় সরকারকে লেখা শ্যামাপ্রসাদের চিঠির উত্তর দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্যাটেল, ১৯৪৯ সালের ২৯ শে নভেম্বর। সরকারিভাবে ওই চিঠিতে তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, “As regards Cooch Bihar, Menon tells me that he has already told you that we have the matter under consideration.” অর্থাৎ শ্যামাপ্রসাদের ইচ্ছাকে মান্যতা দিয়েই যে মেনন রিপোর্ট করেছিলেন তা স্পষ্ট হয়ে উঠে।
জানা যায় মেনন তাঁর গোপন রিপোর্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্যাটেলকে কোচবিহারে তখনকার কিছু ভারতবিরোধী শক্তির উপস্থিতির কথা জানিয়ে বলেছিলেন যে, কোচবিহার নিয়ে সিদ্ধান্তগ্রহন বিলম্বিত হলে অবস্থা আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে পারে। সেজন্য ১৯৫০ সালের ২ জানুয়ারির মধ্যে কোচবিহারকে পশিমবঙ্গের সঙ্গে সংযুক্তির সুপারিশ করেন। ২৮ ডিসেম্বর, ভারত সরকার একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ঘোষণা করে, ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি থেকে কোচবিহার রাজ্যকে পশিমবঙ্গ প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
বহু প্রত্যাশিত এ সংবাদ পশিমবঙ্গের আপামর জনসাধারণ উৎসবের মেজাজে সেদিন বরণ করেছিল। ৩১ ডিসেম্বর, ১৯৪৯ কলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকা আনন্দ-সহকারে সংবাদটি পরিবেশন করে, “…শেষ পর্যন্ত জনমতের জয় হইয়াছে এবং ভারত গভর্নমেন্ট দৃঢ়তার সঙ্গে জনমতের মর্যাদা রক্ষা করিয়াছেন। আসামের কতিপয় কংগ্রেস কর্মীর প্রাদেশিক মনোভাব এবং স্থানীয় মুষ্টিমেয় শক্তির স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রয়াস ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইয়াছে।”
হ্যাঁ, সত্যিই সেদিন ‘জনমতের জয়’ হয়েছিল। আর জয় হয়েছিল সেই জনমত গঠনের নেপথ্য কারিগর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের। তবুও তদানীন্তন কেন্দ্রীয় সরকারের এ সিদ্ধান্তে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেননি স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজের ভাবশিষ্য বীর বাঙালি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। কারণ ত্রিপুরা যেমন পাওয়া যায়নি, তেমনি মণিপুরের বঙ্গভাষীদেরও ঠেলে দেওয়া হয়েছিল চরম অনিশ্চয়তার পথে।
‘বাঙালি জাতিসত্বা’র এই ক্রম-অবক্ষয় শ্যামাপ্রসাদ কখনও মেনে নিতে পারেননি।
ভাঙ্গা বাংলার শক্তি বৃদ্ধির জন্য পূর্ববঙ্গকে বাদ দিয়ে ভারতের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পূর্বতন বাংলার এলাকাধীন কোচবিহার ছাড়াও ত্রিপুরা, কাছাড় ও মণিপুর তাঁর ‘স্বপ্নের নতুন বাংলা’ গঠনের সহায়ক হবে বলে তিনি ভেবেছিলেন। রাজনীতির দাবার চালে এবং তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের অনীহার ফলে শেষ-পর্যন্ত কোচবিহার ছাড়া আর কিছুই ফিরত পাওয়া যায়নি। শ্যামাপ্রাসাদের ষোলো-আনা সদিচ্ছা থাকলেও নেহেরু-প্যাটেলের অনড় মনোভাবের জন্য সেটা সম্ভব হয়নি। ফলে পশ্চিমবঙ্গের সীমানা বাড়ানোর স্বপ্ন অধরাই হয়ে থাকল ।
মনে রাখতে হবে, দেশভাগের প্রাক্মুহূর্ত থেকেই বাঙালি ও বাংলার প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যসূচক আচরণের সূত্রপাত। সময় পরিবর্তনশীল। সময়ের সঙ্গে সাজুর্য্য রেখে শাসক বদলায়, শাসকের চরিত্র ও মনোভাবও বদলায়। কেন্দ্রের বর্তমান শক্তিশালী সরকারের প্রধানমন্ত্রী মাননীয় নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাননীয় অমিত শাহের পরিবর্তনের ডাকে সাড়া দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। এ সরকার ‘বাংলার গৌরব’ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আদর্শে বিশ্বাস। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে তাঁর প্রাপ্য আর যোগ্য সম্মান ফিরিয়ে দিতে এই সরকার বদ্ধপরিকর। প্রত্যাশা করা যেতেই পারে, শ্যামাপ্রসাদের স্বপ্নের বাংলার সীমানা হ্রাসের আশঙ্কায় আর বাঙালিকে ভুগতে হবে না আর। শ্যামাপ্রসাদের ভাবনা আর কর্মের সাধনা আর আত্মত্যাগের, বীরত্ব আর দাঢ্য চরিত্রের যৌক্তিক, ইতিহাস সম্মত মূল্যায়নও সম্ভবত শুরু হবে, অচিরে । শ্যামাপ্রসাদকে আমরা বুঝতে পারিনি, তাঁকে ভুল চোখে দেখা হয়েছে, তাঁরে স্বশাসিত, স্বাধীন দৃষ্টিতে দেখবার চারপাশে তৈরি হয়েছে অদ্ভূত ধোঁয়াশা, মুক্ত চিন্তা, মুক্ত মনন ছেড়ে কেন এক অনন্য প্রতিভাকে এতদিন দেখা হল না, অবিলম্বে এই বিস্মৃতি আর বাস্তবতার উজ্জ্বল উদ্ধার জরুরি । ইতিহাস নিরপেক্ষ, নির্মোহ । ক্ষুদ্রতা কিংবা সংগঠিত তথ্যবিলুপ্তিকে ইতিহাস ক্ষমা করে না, করতে পারে না, যা সত্য, অর্ধসত্য, অবহেলিত কিংবা মিথ্যারোপিত – তার উন্মোচনই ইতিহাসের কর্মের ধর্ম । শ্যামাপ্রসাদকে এই পথেই তুলে ধরবে, জনসমক্ষে খুলে দেবে তার নির্মেদ ইতিকথা । পূর্ণ হবে অবদমিত ইচ্ছার নির্মাণ ও বিনির্মাণ ।
♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦
লেখক : বিশিষ্ট অনুবাদক, অবসরপ্রাপ্ত আমলা । সালার-এর বাসিন্দা ।
❤ Support Us






