Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • জুলাই ৫, ২০২৬

আমার কাক্কা

জয়িতা নন্দী মজুমদার
আমার কাক্কা

আমার কাক্কাকে নিয়ে কিছু লেখা, আমার কাছে ধৃষ্টতা, সম্পাদাকের অনুরোধে তাঁকে ঘিরে পারিবারিক পরিসরের কিছু স্মৃতি তুলে ধরার চেষ্টা করব। কাক্কার কাছে আমি একটু বেশিই আদর পেয়েছি, সবাই আমাকে যে ডাকনামটিতে ডাকতেন, সে নামের একটা আহ্লাদীকরণ করে একমাত্র কাক্কাই আমাকে ডাকতেন। ছোটোবেলার স্মৃতি মানেই আমাদের করিমগঞ্জ চিত্তরঞ্জন লেনের সেই বাড়ি, আর সে বাড়িতে থাকা নানা প্রতিভাধর সদস্যরা। সবার মধ্যমণি অবশ্যই কাক্কা, ছোটবেলার সমস্ত দুষ্টুমির প্রশ্রয়দাতা, মিষ্টভাষী আর সুরসিক স্বভাবের জন্য ছোটবেলা থেকে লেপ্টে থাকতাম তাঁর সঙ্গে। বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একদিকে যেমন বিভিন্ন মঞ্চে বা অনুষ্ঠানে সহজবোধ্য ভাষায় বক্তৃতা শোনার মাধ্যমে তাঁর গভীর পাণ্ডিত্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটল, তেমনি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধ ও ‘যুগশক্তি’তে তাঁর সমাজচিন্তা বিষয়ক অসংখ্য বিশ্লেষণধর্মী লেখা পড়তে পড়তে এই বোধ জাগ্রত হলো যে, আমার কাক্কা অন্য অনেক কাকাদের থেকে বেশ অনেকটাই আলাদা।  সৌগত সেন ছদ্মনামে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে সাপ্তাহিক ‘যুগশক্তি’র সে পর্বগুলি যেন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দলিল । সেইসব প্রবন্ধ সংকলিত ‘সময়ের পদাবলী’ শীর্ষক গ্রন্থটি প্রকাশিত হলো ২০০৬ সালে। সংকলনের সবকটি লেখাই আমার প্রিয়, তবে সবচাইতে আকর্ষণীয় ও প্রাসঙ্গিক প্রবন্ধটির শীর্ষনাম ‘হেলিকপ্টার মাহাত্য’। সাধু ভাষায় লেখা ‘গোরু ও আমরা’ প্রবন্ধটির ঝরঝরে, সাবলীল অথচ ক্ষুরধার পরিবেশনার জন্যেই প্রবন্ধগুলো পুনর্পাঠের তাগিদ বা প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি আজও। কাক্কা বাড়িতেই আড্ডা দিতে পছন্দ করতেন বেশি, বিভিন্ন প্রজন্মের অনুগামীদের ভিড় বাড়িতে লেগেই থাকত। কাক্কার ভক্তকুলের মধ্যে বয়সের তারতম্য লক্ষণীয়। কুড়ি বছর বয়সি একজন হয়তো কোনো জরুরি প্রয়োজনে এল, তার খানিক পরেই আরেকজন এলেন, তার বয়স ৬০ কিংবা ৬৫। কাক্কাকে দেখতাম দুজনকেই সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন, আবার দুজনের সঙ্গেই সমান স্বচ্ছন্দ। ভাইবোনদের মধ্যে আমার বাবা, বিজিৎ চৌধুরী, ছিলেন সবার বড়ো। আর কাক্কা, সুজিৎ চৌধুরী, ছিলেন মেজো, আমার মায়ের অতি প্রিয় দেওর। মায়ের চেয়ে বয়সে খানিকটা বড়ো হলেও কাক্কার প্রতি মায়ের ছিল পরম স্নেহ আর অগাধ আস্থা। ভোজনরসিক কাক্কা প্রিয় বৌদির হাতের রান্নার বড়ো ভক্ত। যেসব বাড়িতে খাবার টেবিলে সবাই মিলে আড্ডা হয় না, সেসব বাড়ির অন্দরমহলের রুচি সম্বন্ধে বেশ সন্দেহ প্রকাশ করতে দেখেছি তাঁকে।

একবার না কি একটা ম্যাচে কাক্কা ছত্রিশ রান করলেন আবার দুই উইকেট নিয়ে জিতে গিয়েও বাড়ি ফিরে বাবার কাছে জুটেছিল ব্যাটের‌ চপেটাঘাত। দুজনেই যখন ষাটোর্ধ তখন ঘরোয়া আড্ডায় কাক্কা ওই ক্রিকেট ম‍্যাচের গল্পটা যখন আবার বললেন, সিগারেটে টান দিতে দিতে বাবা বিড়বিড় করে বললেন, মারব না মানে ! আউটই হয় না। ওর জন‍্যই ম‍্যাচটা আমরা হারলাম। ওই বয়সে এসেও বাবার সেদিনের রাগ যাচ্ছিল না। প্রতিক্রিয়া দেখে কাক্কা হাসতে হাসতে বললেন, দাদার রাগ এখনো যাচ্ছে না

কাক্কা খুব ভালো ক্রিকেট খেলতেন। এই ক্রিকেট খেলা নিয়ে একটা মজার ঘটনার কথা বলি, একবার না কি একটা ম্যাচে কাক্কা ছত্রিশ রান করলেন আবার দুই উইকেট নিয়ে জিতে গিয়েও বাড়ি ফিরে বাবার কাছে জুটেছিল ব্যাটের‌ চপেটাঘাত। দুজনেই যখন ষাটোর্ধ তখন ঘরোয়া আড্ডায় কাক্কা ওই ক্রিকেট ম‍্যাচের গল্পটা যখন আবার বললেন, সিগারেটে টান দিতে দিতে বাবা বিড়বিড় করে বললেন, মারব না মানে ! আউটই হয় না। ওর জন‍্যই ম‍্যাচটা আমরা হারলাম। ওই বয়সে এসেও বাবার সেদিনের রাগ যাচ্ছিল না। প্রতিক্রিয়া দেখে কাক্কা হাসতে হাসতে বললেন, দাদার রাগ এখনো যাচ্ছে না। পারিবারিক পরিসরে ভাইদের মধ্যে এমন সুসম্পর্কের সুদৃঢ় বন্ধন আজকের দিনে বিরল। কাক্কা প্রচুর সিগারেট খেতেন, চেন স্মোকার। ওই প্রজন্মের অনেকেই চেন স্মোকার হতেন। কিন্তু কাক্কা তাদের চেয়েও আলাদা। তিনি সিগারেটের নেশাকে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জন‍্য অপরিহার্য বলে দাবি করতেন। যুক্তি দিতেন, চার্চিল তাঁর মন্ত্রিসভা চলাকালীন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সিগার খাওয়ার জন‍্য বিরতি নিতেন। সিগারে টান দেওয়ার পর তাঁর বুদ্ধির দরজা খুলে যেত এবং ফিরে এসে মোক্ষম সিদ্ধান্তটি নিতেন। কাক্কা ধূমপান নিয়ে এতটাই নিবেদিতপ্রাণ ও সোচ্চার ছিলেন যে, স্টেটসম‍্যান পত্রিকায় ‘ইন ডিফেন্স অফ স্মোকিং’ নামে একটি নিবন্ধ লিখে ঝাল মিটিয়েছেন। ধূমপানের প্রতি দায়বদ্ধতার জেরে ডাক্তারের নিষেধ ও কাকীর কড়া বারণ ভেদ করে কিশোরসুলভ নানা কৌশল করে ধূমপানের সুযোগ বের করে নিতেন।

আজীবন মাতৃভূমির শেকড় আঁকড়ে থাকা মানুষটি লোকসংস্কৃতি আর লোকসাহিত্যের অতল সমুদ্রে ডুব দিয়ে তুলে এনেছিলেন অজস্র মণিমানিক্য , পরবর্তীকালে এসব রতন তাঁর গবেষণার উপাদান হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে।

স্নেহপ্রবণ আর সুকোমল স্বভাবের মানুষটির শক্তিশালী কলম সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে বারবার। বেশিরভাগ লেখাই হয়ে উঠত সমকালীন সময়ের এক একটা প্রতিচ্ছবি। আমার ঠাকুরদা, স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিধুভূষণ চৌধুরীর কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন নতুন যুগের নতুন ধারণাকে গ্রহণ করা ও চর্চা করার অভ্যেস।

আমার কন্যা ডানা তার মেজদাকে বলত চলমান বিশ্বকোষ। ২০১৭ সালে জার্মানির বন ইউনিভার্সিটির অনলাইন লাইব্রেরিতে হঠাৎ ডানার নজরে এল কাক্কার ‘প্রাচীন ভারতে মাতৃপ্রাধান্য’ বইটি হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিতে রয়েছে। ডানার দুচোখ বেয়ে তখন জলের ধারা, কারণ ওর পরমপ্রিয় মেজদা আর ইহজগতে নেই। একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ইতিহাসের একজন ছাত্র হিসেবে ভারতবর্ষের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী শহরগুলোতে তাঁর যেতে ইচ্ছে করে কি না, উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমার তো করিমগঞ্জ শিলচর রাস্তার দুধারের সৌন্দর্যের ঘোর আজও কাটেনি, তাই অন্য কোনো প্রদেশে যাওয়ার ইচ্ছেটাই হলো না’। ভারতবর্ষ তথা সমগ্র উত্তর পূর্বাঞ্চল জুড়ে ধর্মের নামে রাজনীতি, সাম্প্রদায়িকতার আধিপত্য, জাতপাতের লড়াইয়ের হিংসাত্মক ঘটনার বিবরণ চোখে পড়লেই বাবা, কাক্কা আর কাকামণির সংবেদনশীল অথচ সাহসী সাংবাদিকতার অভাববোধ বাড়তে থাকে। প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ও মগ্ন প্রকৃতিপ্রেমিক এই মানুষটির শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত আত্মকথা ‘হারানো দিন হারানো মানুষ’-এর পরতে পরতে যেন মিশে আছে ওইসব দিনে ফিরে যাওয়ার অনিঃশেষ আকূতি। বইটির গল্প, বর্ণনা আর বিশ্লেষণে শৈশব থেকে কৈশোরের পথে যেমন করে সেরপুরকে পেছনে ফেলে বাসটি সিলেটের দিকে এগিয়ে গিয়ে মিলিয়ে গেল, ঠিক তেমনি করে আমার বাবা, কাক্কা, কাকামণিরাও সবাই স্মৃতির মিছিলে মিশে আছেন।


  • Tags:
❤ Support Us
এক অর্ধ-গবেষকের বিদ্যাদাতা পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
বহুমাত্রিক সুজিত চৌধুরী পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
error: Content is protected !!