Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • জুন ২৮, ২০২৬

ঐতিহ্যের উৎস সন্ধানে: নূহ-মনু ও আব্রাহাম-ব্রহ্মা

হিলাল উদ্দিন লস্কর
ঐতিহ্যের উৎস সন্ধানে: নূহ-মনু ও আব্রাহাম-ব্রহ্মা

পর্ব- ২

নুহ-মনুর মতো আব্রাহাম (Abraham)এবং ব্রহ্মার (Brahma) সংযোগটি সরাসরি কোনো পৌরাণিক কাহিনীর দ্বারা প্রমাণিত নয় । তবে ভাষাতাত্ত্বিক ও ধ্বনিগত সাদৃশ্য এবং ঐতিহাসিক পটভূমি বিচারে এই দুই সত্তার মধ্যকার মিল গবেষকদের দীর্ঘকাল ধরে বিস্মিত করেছে । সেমেটিক ঐতিহ্যের (ইহুদি, খ্রিষ্টান ও ইসলাম) আদি পিতা হযরত ইব্রাহিম বা আব্রাহাম এবং সনাতন ধর্মের সৃষ্টিকর্তা দেবতা ব্রহ্মা — উভয়ের নাম, দর্শন এবং তাঁদের জীবনসঙ্গিনীদের চরিত্রের মধ্যে এক অদ্ভুত সমান্তরাল রেখা বিদ্যমান । এই সংযোগের প্রধান ভিত্তি হলো নামের মূল ব্যঞ্জনধ্বনি । আব্রাহাম শব্দটির প্রাচীন হিব্রু ও আরামাইক উচ্চারণ বিশ্লেষণ করলে ‘ আ-ব্রাহাম’ এবং ‘ব্রহ্ম’ শব্দের এক অনবদ্য সাদৃশ্য পাওয়া যায় । তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের অনেক গবেষকের মতে, মূল ব্যঞ্জনবর্ণের কাঠামোগত ভিত্তি (B-R-H-M)থেকে বিচার করলে এই দুটি শব্দ একই আদি উৎস থেকে উৎসারিত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না ।

সংস্কৃতের ‘সরস্বতী’ এবং হিব্রু ‘সারাহ’— উভয়ই নিজ নিজ সৃষ্টিতত্ত্বে মাতৃশক্তির অনন্য ও উচ্চতর প্রতীক। এই ভাষাতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক যোগসূত্র ইঙ্গিত দেয় যে, হাজার হাজার বছর আগে বিভিন্ন ভূখণ্ডের মানুষের মধ্যে নিবিড় সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ঘটেছিল অথবা কোনো এক আদি উৎস থেকে এই ভাবনার বিস্তার ঘটেছিল, যা কালক্রমে বিভিন্ন সভ্যতায় ভিন্ন ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করেছে

আব্রাহাম এবং ব্রহ্মাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পৌরাণিক আখ্যানের অন্যতম কৌতূহলোদ্দীপক সংযোগটি নিহিত রয়েছে তাঁদের জীবনসঙ্গিনীদের নামের মধ্যে। হিব্রু ঐতিহ্যে আব্রাহামের স্ত্রী ‘সারাহ’ (Sarah)বা ‘সরাই’ আদি মাতৃরূপ হিসেবে পূজনীয়। অন্যদিকে, ভারতীয় দর্শনে ব্রহ্মার শক্তি ও জীবনসঙ্গিনী হলেন সরস্বতী — যিনি জ্ঞান, বাণী ও বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী । তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের একটি প্রতিষ্ঠিত নিয়ম হলো, প্রাচীন ইন্দো-ইরানীয় ভাষাগোষ্ঠীর ‘স’ (S)ধ্বনিটি অনেক ক্ষেত্রে প্রাচীন পারস্য ও হিব্রু প্রভাববলয়ে ‘হ’ (H) ধ্বনিতে রূপান্তরিত হয় (যেমন: ‘সিন্ধু’ থেকে ‘হিন্দু’ বা ‘সপ্ত’ থেকে ‘হপ্ত’)। এই ভাষাতাত্ত্বিক বিবর্তনের সূত্র ধরে গডফ্রে হিগিন্স বা স্যার উইলিয়াম জোন্সের মতো প্রাচ্যবিদরা ‘সরস্বতী’ ও ‘সারাহ’-র নামগত সাদৃশ্যকে দুই প্রাচীন সভ্যতার গভীর সম্পর্কের নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সাংস্কৃতিক ও রূপক অর্থেও এই দুই
মাতৃ-আর্কেটাইপ (Archetype) অদ্ভূতভাবে মিলে যায়। ‘সারাহ’ শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ হলো রাজকুমারী বা মহিমান্বিত জননী, যিনি হিব্রু ঐতিহ্যে এক নতুন বিশ্বাসের ধারক ও জাতির জন্মদাত্রী । অন্যদিকে, ‘সরস্বতী’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি ‘সরস্’ (জল বা প্রবাহ) ও ‘বতী’ (ধারিণী)-এর সমন্বয়ে গঠিত। ঋগ্বেদের আদি যুগে সরস্বতী ছিলেন একটি বাস্তব, পুণ্যতোয়া নদী এবং উর্বরতার প্রতীক । কালক্রমে বৈদিক যুগের অবসানে তিনি স্থূল নদী থেকে সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিকতায় রূপান্তরিত হন — জ্ঞানের প্রবহমান নদী তথা বাণী ও বিদ্যার দেবী হিসেবে তিনি ভারতীয় সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক চেতনায় পবিত্র আসন লাভ করেন। সংস্কৃতের ‘সরস্বতী’ এবং হিব্রু ‘সারাহ’— উভয়ই নিজ নিজ সৃষ্টিতত্ত্বে মাতৃশক্তির অনন্য ও উচ্চতর প্রতীক। এই ভাষাতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক যোগসূত্র ইঙ্গিত দেয় যে, হাজার হাজার বছর আগে বিভিন্ন ভূখণ্ডের মানুষের মধ্যে নিবিড় সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ঘটেছিল অথবা কোনো এক আদি উৎস থেকে এই ভাবনার বিস্তার ঘটেছিল, যা কালক্রমে বিভিন্ন সভ্যতায় ভিন্ন ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করেছে।

মানব সভ্যতার ইতিহাস কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়, বরং তা এক আদি উৎস থেকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়া বিশাল স্রোতস্বিনী । প্রাচীন সংস্কৃতির সেতু হিসেবে ‘নূহ ও মনু’ এবং ‘আব্রাহাম ও ব্রহ্মা’-র ধারণাগত তুলনামূলক বিশ্লেষণটি কেবল কোনো কাল্পনিক অনুমান নয়; বরং তা আধুনিক বিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব এবং ভাষাতত্ত্বের এক অনন্য যুগলবন্দী

হিব্রু বাইবেল অনুযায়ী, আব্রাহামের আদি নিবাস ছিল মেসোপটেমিয়ার অত্যন্ত উন্নত ও প্রাচীন নগরী ‘ঊর’ (Ur)-এ । প্রত্নতাত্ত্বিক সিলমোহর ও আধুনিক জিনতত্ত্ব আজ অকাট্যভাবে প্রমাণ করেছে যে, এই মেসোপটেমীয় সভ্যতার সাথে প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার নিবিড় বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ ছিল । অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকের বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ, যেমন, রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা স্যার উইলিয়াম জোন্স, ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার এবং গডফ্রে হিগিন্স তাঁর বিখ্যাত আকর গ্রন্থ “Anacalypsis”-এ এই তত্ত্বটি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, প্রাচীনকালে পারস্য বা মধ্য এশিয়ার মিলনমেলায় আর্য ও সেমেটিক সংস্কৃতির গভীর ভাব বিনিময় ঘটেছিল, যার ফলে এক অঞ্চলের ‘আদি পিতা’ অন্য অঞ্চলে ‘আদিস্রষ্টা দেবতা’র রূপ পরিগ্রহ করেন। তবে মূলধারার আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানীরা এই নামগত মিলকে অনেক সময় “Folk Etymology” বা লোক-ব্যুৎপত্তি হিসেবে বিবেচনা করেন। কারণ হিব্রু ও সংস্কৃত সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ভাষা বংশের (যথাক্রমে আফ্রো-এশিয়াটিক/সেমেটিক এবং ইন্দো-ইউরোপীয়) অন্তর্ভুক্ত। ফলে একে ঐতিহাসিক ধ্রুব সত্যের চেয়ে মানুষের আধ্যাত্মিক ভাবনার সমান্তরাল বিবর্তন হিসেবে দেখাই বেশি যুক্তিযুক্ত।

মানব সভ্যতার ইতিহাস কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়, বরং তা এক আদি উৎস থেকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়া বিশাল স্রোতস্বিনী । প্রাচীন সংস্কৃতির সেতু হিসেবে ‘নূহ ও মনু’ এবং ‘আব্রাহাম ও ব্রহ্মা’-র ধারণাগত তুলনামূলক বিশ্লেষণটি কেবল কোনো কাল্পনিক অনুমান নয়; বরং তা আধুনিক বিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব এবং ভাষাতত্ত্বের এক অনন্য যুগলবন্দী। এই প্রবন্ধের সপক্ষে যে গভীর বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে, তা মূলত নিচে উল্লিখিত আকর গ্রন্থসমূহ এবং পণ্ডিতদের গবেষণার আলোকেই প্রতিষ্ঠিত:

ক· হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত জিনতত্ত্ববিদ ডেভিড রাইখের Who We Are and How We Got Here গ্রন্থটি আধুনিক জেনেটিক্স ও মানব অভিবাসনের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য দলিল। প্রাচীন ডিএনএ (DNA)বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া এবং ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের মধ্যে যে ব্যাপক পরিভ্রমণ, স্থানান্তর ও সংমিশ্রণ ঘটেছে, তার অকাট্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এই বইটিতে রয়েছে । এই আলোচনার ক্ষেত্রে সেটিই প্রধান ভিত্তি । অন্যদিকে, টনি জোসেফের Early Indians গ্রন্থটি ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের জিনগত গঠন এবং তাদের প্রাচীন পরিভ্রমণ নিয়ে লেখা একটি চমৎকার আকর গ্রন্থ । অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় লেখা এই বইটিতে প্রমাণিত হয়েছে যে, এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠী জিনগতভাবে একে অপরের সাথে কতটা নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত । প্রাচীন সভ্যতার সংযোগের ক্ষেত্রে গ্রেগরি পসেল-এর The Indus Civilization: A Contemporary Perspective একটি মহামূল্যবান কাজ । সিন্ধু সভ্যতার সাথে সুমেরীয় সভ্যতার (আক্কাদীয় লিপিতে যা ‘মেলুহা’ নামে পরিচিত ছিল) নিবিড় বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এই গ্রন্থে বিশদভাবে উঠে এসেছে, যা প্রাচীন দুই সভ্যতার সংযোগের তত্ত্বকে আরও সুদৃঢ় করে ।

খ· জোসেফ ক্যাম্পবেলের The Hero with a Thousand Faces-এর তত্ত্বানুযায়ী, মানব চেতনার বিবর্তন বিশ্বজুড়ে সমান্তরাল ধারায় প্রবাহিত । খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দ ছিল মানব ইতিহাসের এক ‘অক্ষীয় সময়’, যখন মানুষ বহুঈশ্বরবাদের আদিম আচ্ছন্নতা কাটিয়ে এক ‘পরম সত্য’ বা একক সত্তার সন্ধানে ব্রতী হয়েছিল । আব্রাহামীয় ঐতিহ্য ও ভারতীয় দর্শন — উভয় ক্ষেত্রেই এই সময়কাল এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সাক্ষী । মেসোপটেমিয়ার ব্যাবিলনে আব্রাহাম তৎকালীন বহু দেবদেবীর পূজা অস্বীকার করে এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বরের ধারণা প্রবর্তন করেন । ঠিক একই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে, ভারতের বৈদিক ঋষিরা ঋগ্বেদের শেষভাগে (নাসদীয় সূক্তে) এবং পরবর্তী উপনিষদগুলোতে বহু দেবতার ঊর্ধ্বে উঠে এক ও অদ্বিতীয় ‘ব্রহ্ম’-এর ধারণা প্রতিষ্ঠিত করেন, যার ঘোষণা হলো—‘একমেবাদ্বিতীয়ম্’ (তিনি এক এবং অদ্বিতীয়) ।

গ· গডফ্রে হিগিন্সসহ অনেক গবেষকের মতে, এই সমকালীনতা কাকতালীয় নয় । ব্রোঞ্জ যুগের বাণিজ্য ও মানব পরিভ্রমণের (ডেভিড রাইখের জিনতাত্ত্বিক গবেষণা অনুযায়ী) ফলে পারস্য ও মধ্য এশিয়ার মিলনস্থলে এই দুই ধারার বীজ একই সময়ে রোপিত হয়েছিল । একটি ধারা পশ্চিমে গিয়ে ‘আব্রাহাম’ নামক পয়গম্বরের ঐতিহাসিক রূপ নিয়েছে, আর অন্য ধারাটি পূর্বে এসে ‘ব্রহ্মা’ নামক মহাজাগতিক দর্শনে বিকশিত হয়েছে । এখানে ভারতীয় দর্শনের গভীরতা উপলব্ধির জন্য ‘ব্রহ্ম’ ও ‘ব্রহ্মা’-র সূক্ষ্ম পার্থক্যটি অনুধাবন করা জরুরি । ব্রহ্মের স্বরূপ হলো — তিনি নির্গুণ, নিরাকার ও পরম সত্তা। ব্রহ্মা হচ্ছেন সগুণ, সাকার ও সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বর। ব্রহ্মের দার্শনিক ভিত্তি হলো উপনিষদ বা বেদান্ত এবং ব্রহ্মার বিবরণ পৌরাণিক সৃষ্টিতত্ত্বে; তিনি ত্রিদেবের একজন ।

আব্রাহামীয় ও ভারতীয় দর্শনের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান । আব্রাহামীয় ধর্মে ঈশ্বর বিশ্বজগতের ‘বাইরে’ থেকে জগৎ সৃষ্টি করেন, যা স্রষ্টার অনন্য ও উচ্চতর অবস্থানকে নির্দেশ করে । অন্যদিকে, ভারতীয় দর্শনে নিরাকার ‘ব্রহ্ম’ যখন দৃশ্যমান মহাবিশ্ব সৃষ্টির জন্য রূপ পরিগ্রহ করেন, তখন তিনি নিজেই জগৎ হিসেবে প্রকাশিত হন । অর্থাৎ, এখানে স্রষ্টা ও সৃষ্টি মূলত এক ও অভিন্ন । আব্রাহামীয় একেশ্বরবাদ এবং ভারতীয় অদ্বৈতবাদের মূল অভিলক্ষ্য অভিন্ন — বহু ঈশ্বরের অসারতা ভেঙে এক আদি সত্যের সন্ধান । এই দুই সংস্কৃতির বিবর্তনে আমরা ‘মানবায়ন’ ও ‘দেবত্বারোপের’ এক দ্বিমুখী যাত্রা লক্ষ্য করি। বলা যায়, ভাষাতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক প্রমাণ নির্বিশেষে, আব্রাহাম এবং ব্রহ্মা-ব্রহ্ম — উভয়ই মানব চেতনার একই বিবর্তনের বহিঃপ্রকাশ। একটি ধারা সৃষ্টির একত্বকে স্রষ্টা ও তাঁর প্রতিনিধির (পয়গম্বর) সম্পর্কের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করেছে; অন্যটি সেই একত্বকে মহাবিশ্বের অন্তলীন চেতনা (ব্রহ্ম) এবং সৃষ্টির আদি কারিগর (ব্রহ্মা) হিসেবে আরাধনা করেছে । ভারতবর্ষে মহামানবের ওপর দেবত্ব আরোপের যে প্রবণতা, তা মূলত মানুষের অন্তরের সেই পরম ‘ব্রহ্ম’-কে খুঁজে পাওয়ার এক চিরায়ত আত্মিক আকুতি ।

ভারতীয় বেদান্ত দর্শনের অদ্বৈত চেতনা এবং সেমেটিক ধর্মের একেশ্বরবাদের মধ্যকার আধ্যাত্মিক সংযোগ ও তুলনামূলক আলোচনার জন্য এই ধরনের তাত্ত্বিক গ্রন্থসমূহ পথপ্রদর্শকের কাজ করে । আব্রাহাম ও ব্রহ্মা নামের ভাষাতাত্ত্বিক ও ধ্বনিগত সমতা এই সত্যের শক্তিশালী এক তথ্য। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও পুরাণ, বিশেষ করে গডফ্রে হিগিন্স রচিত তাঁর বিখ্যাত আকর গ্রন্থ “Anacalypsis” — এ দাবি করা হয়েছে যে, প্রাচীন বিশ্বের ধর্মগুলোর মূল উৎস এক

পৌরাণিক কাহিনীর বিশ্বজনীন রূপক বা ‘আর্কেটাইপ’ অনুধাবনের ক্ষেত্রে জোসেফ ক্যাম্পবেলের The Hero with a Thousand Faces গ্রন্থটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ । বিভিন্ন আদিম সংস্কৃতিতে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনের ফলে কীভাবে একই আখ্যান বারবার ভিন্ন ভিন্ন নামে ফিরে আসে, তিনি তা মনস্তাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন । অন্যদিকে, ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট ও শৌখিন ইতিহাসবিদ গডফ্রে হিগিন্স (১৭৭২–১৮৩৩)-এর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত কাজ হলো ১৮৩৬ সালে প্রকাশিত দুই খণ্ডের বিশাল গ্রন্থ Anacalypsis । অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকের এই প্রাচ্যবিদ তাঁর এই গ্রন্থে প্রাচীন বিশ্বের ধর্মগুলোর মধ্যকার অন্তর্নিহিত মিল এবং বিশেষ করে আব্রাহাম ও ব্রহ্মার সংযোগ নিয়ে দীর্ঘ তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন । ভাষাতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে, বরেণ্য ভাষাবিদ ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং ড. সুকুমার সেনের গবেষণামূলক প্রবন্ধসমূহ থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, ইন্দো-ইরানীয় ও সেমেটিক ভাষাগোষ্ঠীর প্রাচীন সভ্যতাগুলোর মধ্যে কেবল বাণিজ্যিক সম্পর্কই ছিল না, বরং তাদের ভাষার গভীরে এক নিবিড় সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানও বিদ্যমান ছিল। পাশাপাশি, রাহুল সাংকৃত্যায়নের ভোলগা থেকে গঙ্গা গ্রন্থটি এক্ষেত্রে একটি অনন্য সংযোজন । ইন্দো-ইউরোপীয় ও আর্যদের সুদীর্ঘ পরিভ্রমণ, তাদের সামাজিক বিবর্তন এবং মধ্য এশিয়া থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে বিশ্বাসের বিস্তার বুঝতে এই কালজয়ী আখ্যানটি গবেষক ও পাঠকদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক ।

ভারতীয় বেদান্ত দর্শনের অদ্বৈত চেতনা এবং সেমেটিক ধর্মের একেশ্বরবাদের মধ্যকার আধ্যাত্মিক সংযোগ ও তুলনামূলক আলোচনার জন্য এই ধরনের তাত্ত্বিক গ্রন্থসমূহ পথপ্রদর্শকের কাজ করে । আব্রাহাম ও ব্রহ্মা নামের ভাষাতাত্ত্বিক ও ধ্বনিগত সমতা এই সত্যের শক্তিশালী এক তথ্য । তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও পুরাণ, বিশেষ করে গডফ্রে হিগিন্স রচিত তাঁর বিখ্যাত আকর গ্রন্থ “Anacalypsis” — এ দাবি করা হয়েছে যে, প্রাচীন বিশ্বের ধর্মগুলোর মূল উৎস এক । এর মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ মিলটি পাওয়া যায় সেমেটিক ঐতিহ্যের ‘আব্রাহাম’ (Abraham) এবং ভারতীয় ঐতিহ্যের ‘ব্রহ্মা’ (Brahma) ধারণার মধ্যে । এই মিল কেবল নামের ধ্বনিগত সমতাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাঁদের জীবনসঙ্গী এবং দার্শনিক অবস্থানের গভীরেও প্রোথিত । সেমেটিক ভাষায় ‘আব্রাহাম’ শব্দের অর্থ “বহুজনের পিতা” বা “জাতির পিতা”। অন্যদিকে, সংস্কৃত ‘ব্রহ্মা’ হলেন মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা এবং সমস্ত জীবের পিতা বা ‘প্রজাপতি’ । মূল ব্যঞ্জনবর্ণের কাঠামোগত দিক থেকে
(B-R-H-M) এই দুটি শব্দ একই আদি উৎস থেকে উৎসারিত হতে পারে ।

প্রাচীন ভারত, পারস্য ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে যে নিবিড় আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ঘটেছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ । পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু তাঁর The Discovery of India গ্রন্থে এই অঞ্চলগুলোর মধ্যকার সেতুবন্ধন ও সাংস্কৃতিক বিনিময় অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন । এছাড়া, রাহুল সাংকৃত্যায়নের ভোলগা থেকে গঙ্গা গ্রন্থে ইন্দো-ইউরোপীয় গোষ্ঠী ও আর্যদের সুদীর্ঘ পরিভ্রমণের যে চিত্র অঙ্কিত হয়েছে, তা থেকে এটি স্পষ্ট যে — প্রাচীন পারস্য ও মেসোপটেমিয়া ছিল আর্য ও সেমেটিক সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ মিলনভূমি । পরিশেষে, সারাহ ও সরস্বতীর এই নামতাত্ত্বিক ও পৌরাণিক সমান্তরাল অবস্থান মানব সভ্যতার সেই আদিযুগের ইঙ্গিত দেয়, যখন বিভিন্ন জনপদ ও সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পরিক জ্ঞান ও বিশ্বাসের এক নিরন্তর প্রবাহ বিদ্যমান ছিল ।

পারস্যের ঐতিহ্যে আব্রাহামকে অনেক সময় ‘জরথুষ্ট্র’ বা এক ঈশ্বরবাদের প্রবক্তা হিসেবে দেখা হয় । ব্রহ্মা যেমন বৈদিক ঐতিহ্যের বহুঈশ্বরবাদের ঊর্ধ্বে উঠে ‘ব্রহ্ম’ বা পরম সত্তার সাকার রূপ, আব্রাহামও তেমনি বহুঈশ্বরবাদী সমাজ থেকে বেরিয়ে এসে একনিষ্ঠ একঈশ্বরবাদের ভিত্তি স্থাপন করেন । উভয় চরিত্রই নিজ নিজ সংস্কৃতিতে এক নতুন ধর্মীয় ও সামাজিক যুগের সূচনা করেন । পুরো আলোচনাকে মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড় করানো যেতে পারে:

১. ভৌগোলিক ও বৈজ্ঞানিক সত্যতা: ডেভিড রাইখ এবং টনি জোসেফের জিনতাত্ত্বিক সূত্র ধরে বলা যায়, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন মানুষেরা বিচ্ছিন্ন ছিল না । গ্রেগরি পোসেলের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা অনুযায়ী সিন্ধু-সুমেরীয় বাণিজ্য (মেলুহা) এই মেলবন্ধনের এক অকাট্য ঐতিহাসিক প্রমাণ ।

২. ভাষাতাত্ত্বিক রূপান্তর: সুকুমার সেন ও সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের তত্ত্ব অনুযায়ী, ‘ব্রহ্মা’ এবং ‘আব্রাহাম’ শব্দদ্বয় প্রাচীন আর্য ও সেমেটিক ভাষার সংযোগস্থলে একে অপরকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে, যা পারস্য বা মধ্য এশিয়ার প্রাচীন মিলনমেলায় ঘটা অসম্ভব নয় ।

৩. দার্শনিক একাত্মতা: “বেদান্ত ও সেমেটিক ধর্ম” ভাবধারার আলোকে দেখানো যায় যে, বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানে পার্থক্য থাকলেও মানব সভ্যতার মৌলিক সত্য — যেমন সৃষ্টি (ব্রহ্মা/আব্রাহাম) এবং প্রলয় ও সংরক্ষণ (মনু/নূহ)—সব সংস্কৃতির মানুষের কাছে একই অন্তলীন দর্শনে ধরা দিয়েছিল ।

আব্রাহাম-ব্রহ্মা কিংবা নূহ-মনু কেবল ধর্মীয় চরিত্র নন; তাঁরা প্রাচীন বিশ্ব সংস্কৃতির অভিন্নতার প্রতীক । আধুনিক বিজ্ঞান জেনেটিক্স এবং প্রাচীন পুরাণ আজ একই বিন্দুতে এসে মিলছে । এই সংশ্লেষ প্রমাণ করে যে — ভৌগোলিক দূরত্ব, রাজনৈতিক সীমানা বা ধর্মের বাহ্যিক ভিন্নতা সত্ত্বেও প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই আদিম মানবজাতি রক্তের ও চেতনার এক অবিভাজ্য সূত্রে গাঁথা ছিল । আব্রাহাম-ব্রহ্মা এবং নূহ-মনুর ধারণাগত সাদৃশ্য ও এদের “এক আদি উৎস” নিয়ে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব এবং প্রাচ্যবিদ্যায় শতাব্দীকাল ধরে গভীর, রোমাঞ্চকর এবং বিতর্কিত আলোচনা চলছে । এই গভীর অনুসন্ধানটিকে তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের আলোকে অনুধাবন করা সম্ভব। আঠারো ও উনিশ শতকের প্রাচ্যবিদ ও গবেষকরা আব্রাহাম এবং ব্রহ্মার মধ্যকার সাদৃশ্য নিয়ে ব্যাপক ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ করেছেন । বিভিন্ন গবেষকের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংযোগের রূপরেখা নিচে তুলে ধরা হলো :

গডফ্রে হিগিন্স তাঁর বিখ্যাত আকর গ্রন্থ Anacalypsis–এ জোরালোভাবে দাবি করেন যে, সনাতন ও সেমেটিক ধর্মের মূল উৎস অভিন্ন । তিনি মনে করতেন, প্রাগৈতিহাসিক যুগের একটি অতি প্রাচীন ও উচ্চতর আধ্যাত্মিক ধারা (যাকে তিনি ‘আদি জ্ঞানপন্থী’ ধারা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ) থেকেই এই দুই সংস্কৃতির উৎপত্তি ঘটেছে । তাঁর মতে, পারস্য বা মধ্য এশিয়ার কোনো এক আদি কেন্দ্র থেকে একদল মানুষ পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ‘আব্রাহামিক’ ধারার জন্ম দেয়; অন্যদিকে অপর দলটি পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে ‘বেদান্ত’ ও ব্রহ্মার ধারণার বিস্তার ঘটায় । হিগিন্স আরও দেখান যে, আব্রাহাম ক্যালডিয়ানদের যে ‘ঊর’ (Ur) শহর থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন, প্রাচীন পারস্য ও ভারতের সীমান্ত-সংলগ্ন একটি অঞ্চলের নামও ঠিক অনুরূপ ছিল । মেসোপটেমিয়ার এই ‘ঊর’ শহর থেকেই তিনি কানান (বর্তমান ফিলিস্তিন/ইসরায়েল) অঞ্চলে অভিবাসন করেছিলেন । রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা স্যার উইলিয়াম জোন্স যখন প্রাচীন সংস্কৃত এবং ল্যাটিন ভাষার মধ্যে অভিন্ন উৎসের সন্ধান পান, তখন হিগিন্সের এই তত্ত্ব আরও জোরালোভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে । ভাষাতাত্ত্বিক এই আবিষ্কার দুই ভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐক্যের ধারণাকে একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রদান করে ।

আদিম মানুষ বিশ্বাস করত যে, তাদের নৈতিক স্খলনের কারণে প্রকৃতি তাকে মহাপ্রলয় বা প্লাবনের মাধ্যমে শাস্তি দেবে । কিন্তু ধ্বংসের সেই ক্রান্তিলগ্নে কোনো দেবদূত বা অবতার এসে সৎ ও পুণ্যবান মানুষকে আগামী পৃথিবীর ‘বীজ’ হিসেবে রক্ষা করবেন । এটি মূলত মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক পুনর্জন্মেরই এক বিশ্বজনীন রূপক

ফরাসি গবেষক লুই জ্যাকোলিওট তাঁর গ্রন্থ The Bible in India: Hindoo Origin of Hebrew and Christian Revelation– অনুসারে হিব্রু বাইবেলের বহু আখ্যানের আদি উৎস নিহিত রয়েছে ভারতের প্রাচীন বৈদিক চিন্তাধারায়। তিনি দেখান, প্রাচীন পারস্যের ধর্মগ্রন্থ ‘জেঁদ আবেস্তা’ (Zend-Avesta) হলো এই দুই সংস্কৃতির মেলবন্ধনের একটি ঐতিহাসিক সেতু । তাঁর মতে, আর্যরা যখন পারস্যের মধ্য দিয়ে পরিভ্রমণ করছিল, মূলত তখনই ব্রহ্মার ধারণা সেমেটিক সংস্কৃতিতে রূপান্তরিত হয়ে ‘আ-ব্রাহাম’ বা ‘আব্রাম’ (Abram) রূপ ধারণ করে ।
বিখ্যাত মিথোলজিস্ট জোসেফ ক্যাম্পবেল বিষয়টিকে ভৌগোলিক বা ঐতিহাসিক উৎসের পরিবর্তে “মনস্তাত্ত্বিক আদি উৎস”-এর দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন । তাঁর মতে, মানুষের মস্তিষ্কের গঠন এবং সামষ্টিক অবচেতন মন সব সংস্কৃতিতেই অভিন্ন । ব্রহ্মা বা আব্রাহাম হলেন মানব মনের সেই আদি আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, যা মহাবিশ্বের বিশৃঙ্খলা (Chaos)থেকে এক সুশৃঙ্খল বিন্যাস (Order) তৈরি করতে চায় এবং সৃষ্টির আদি পিতাকে অন্বেষণ করে ।

প্লাবন ও পুনর্জন্মের রূপক অনুসারে নূহ বা মনু হলেন মানবজাতির চিরন্তন ভয়ের প্রতীক । আদিম মানুষ বিশ্বাস করত যে, তাদের নৈতিক স্খলনের কারণে প্রকৃতি তাকে মহাপ্রলয় বা প্লাবনের মাধ্যমে শাস্তি দেবে । কিন্তু ধ্বংসের সেই ক্রান্তিলগ্নে কোনো দেবদূত বা অবতার এসে সৎ ও পুণ্যবান মানুষকে আগামী পৃথিবীর ‘বীজ’ হিসেবে রক্ষা করবেন । এটি মূলত মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক পুনর্জন্মেরই এক বিশ্বজনীন রূপক । মানবসভ্যতার আদি উৎস এবং বিভিন্ন জনপদ ও সংস্কৃতির মধ্যকার সংযোগ নিয়ে যে প্রাগৈতিহাসিক অন্বেষণ, তাকে তিনটি সুনির্দিষ্ট তাত্ত্বিক মডেলে বিন্যস্ত করা যেতে পারে:

১. ঐতিহাসিক ও ভাষাতাত্ত্বিক মডেলটি রাহুল সাংকৃত্যায়ন, জওহরলাল নেহরু এবং ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণার আলোকে নির্মিত । তাঁদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মধ্য এশিয়া ও পারস্য ছিল প্রাচীন বিশ্বের সাংস্কৃতিক মিলনমেলা । ইন্দো-ইউরোপীয় এবং আফ্রো-এশিয়াটিক ভাষার শব্দার্থের বিবর্তন, রূপান্তর এবং আর্য-সেমেটিক সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানই ‘ব্রহ্মা’ ও ‘আব্রাহাম’-এর মতো ধারণাগত কাঠামোকে পরস্পর কাছাকাছি নিয়ে এসেছে । ভাষাগত এই যোগসূত্রই প্রমাণ করে যে, এই দুই সংস্কৃতি বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়, বরং একই মূলধারার শাখা-প্রশাখা ।

২. নৃতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক মডেলের নির্মাতা গ্রেগরি পোসেল এবং অ্যালান ডান্ডেস, এই দুই নৃতাত্ত্বিকদের মতে, সিন্ধু সভ্যতা ও মেসোপটেমিয়ার মধ্যকার সুপ্রাচীন বাণিজ্যিক পথগুলো কেবল পণ্য বিনিময়ের মাধ্যম ছিল না, বরং তা ছিল আখ্যান ও বিশ্বাসের বাহক । ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে আদি উপাখ্যানগুলো এই বাণিজ্যিক রুটের মাধ্যমেই ছড়িয়ে পড়েছিল বিভিন্ন ভূখণ্ডে । এই প্রত্নতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট প্রমাণ করে যে, ভৌগোলিক ব্যবধান থাকলেও চিন্তার আদান-প্রদান ছিল নিরবচ্ছিন্ন ।

৩. আধুনিক জিনতাত্ত্বিক ও সমন্বিত মডেল হিসেবে ডেভিড রাইখের মতো গবেষকদের আধুনিক জিনতাত্ত্বিক গবেষণা এবং সমসাময়িক তুলনামূলক পুরাণতত্ত্ব আজ একই পরম সত্যকে উন্মোচিত করছে। এই মডেল অনুযায়ী — ধর্ম, আচার-অনুষ্ঠান কিংবা ভূগোলের দেয়ালগুলো মূলত মানুষের তৈরি বিভাজন । বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক তথ্যের নিরিখে এটি স্পষ্ট যে, প্রাগৈতিহাসিক প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে সমগ্র মানবজাতি আসলে একই নৃতাত্ত্বিক উত্তরাধিকার এবং একই অভিন্ন চেতনার সূত্রে গাঁথা । এই তিনটি মডেলের সমন্বিত পাঠ আমাদের শেখায় যে, সভ্যতার ইতিহাস কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমাহার নয়, বরং এক সুবিশাল ও আন্তঃসংযুক্ত আখ্যান। ‘ব্রহ্মা’ ও ‘আব্রাহাম’— যিনিই হোন, তাঁদের মধ্যকার এই সাযুজ্য মূলত মানবজাতির সেই আদি ঐক্যকেই নির্দেশ করে, যা আজ আধুনিক বিজ্ঞানের আলোয় নতুন করে দৃশ্যমান হচ্ছে ।

এই গভীর অনুসন্ধানগুলো প্রমাণ করে যে, উপর্যুপরি ধর্ম বা সংস্কৃতিগুলোকে আলাদা মনে হলেও, একটু গভীরে প্রবেশ করলেই বোঝা যায় মানুষের আদিম চিন্তা, ভয় এবং দর্শন একই উৎস থেকে পুষ্টি লাভ করেছিল। ডি. ডি. কোসাম্বীর মতো প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও নৃবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, কীভাবে ভারতের লোকায়ত সংস্কৃতির লৌকিকবীর, সমাজসংস্কারক বা গোষ্ঠীপতিরা কালক্রমে বৈদিক ও পৌরাণিক ধারার সাথে যুক্ত হয়ে ঈশ্বরের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন । পাশ্চাত্যের সেমেটিক সংস্কৃতিতে ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে একটি অলঙ্ঘনীয় দূরত্ব বা ‘ট্রান্সেন্ডেন্স’ বজায় রাখা হয় । সেখানে মানুষ ঈশ্বরের দাস, প্রতিনিধি বা পয়গম্বর; কিন্তু মানুষ কখনো ঈশ্বর হতে পারে না। অন্যদিকে, ভারতীয় দর্শনে — বিশেষ করে বেদান্ত ও ভক্তি আন্দোলনে — মানুষের ভেতরেই পরমেশ্বরের অবস্থান বা ‘ইমানেন্স’ কল্পনা করা হয়েছে ।

সেমেটিক ঐতিহ্যে নূহ যেমন আব্রাহামের পূর্বসূরি, ভারতীয় পুরাণে মনু তেমনি ব্রহ্মার মানসপুত্র বা উত্তরসূরি। হিব্রু বাইবেল এবং ইসলামি ঐতিহ্য অনুসারে, নূহ হলেন মানবজাতির দ্বিতীয় আদি পিতা । মহাপ্লাবনের পর নূহের তিন পুত্র —শাম , হাম এবং ইয়াফিস -এর মাধ্যমেই পৃথিবীতে নতুন করে মানববংশের বিস্তার ঘটে । নূহের জ্যেষ্ঠ পুত্র শামের বংশধারাকেই বলা হয় ‘সেমেটিক’ ধারা । এই সেমেটিক ধারায় নূহের কয়েক প্রজন্ম পরেই জন্ম নেন আব্রাহাম । অতএব, বংশগত, কালানুক্রমিক এবং ঐতিহাসিক—সব দিক থেকেই নূহ হলেন আব্রাহামের আদি পূর্বপুরুষ

উপনিষদের অন্তলীন দর্শন হচ্ছে “অহং ব্রহ্মাস্মি” (আমিই ব্রহ্ম) কিংবা “তত্ত্বমসি” (তুমিই সেই) — এই অদ্বৈত চেতনার কারণে ভারতীয় উপমহাদেশে কোনো মানুষের মধ্যে অতিপ্রাকৃতিক গুণ, প্রজ্ঞা বা অসামান্য নেতৃত্ব দেখলেই সাধারণ মানুষ তাঁকে ঈশ্বরের ‘অবতার’ বা স্বয়ং ঈশ্বর বলে মনে করেছে। জোসেফ ক্যাম্পবেলের ভাষায়, এটিই হলো বীর বা মহামানবের রূপকধর্মী রূপান্তর বা ইতিহাসের পুরাণে রূপান্তর। ঐতিহাসিক কোনো সত্য যখন কালক্রমে মানুষের যৌথ স্মৃতিতে কিংবদন্তি হয়ে ওঠে, তখন তার মানবিক ত্রুটিগুলো মুছে গিয়ে কেবল তার অলৌকিক ও কল্যাণকর রূপটিই টিকে থাকে । যদি ‘ব্রহ্ম’ বা ‘ব্রহ্মা’ কোনো এক আদি সমাজ-নিয়ন্তা বা মেধার প্রতীক মহামানব হয়ে থাকেন, তবে তাঁর দেবত্বে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি সমাজবিবর্তনের চমৎকার উদাহরণ । প্রাচীন সমাজগুলোতে যিনি বা যাঁরা প্রথম মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব, জ্ঞান (বেদ) এবং সমাজ পরিচালনার নিয়ম আবিষ্কার করেছিলেন, তিনি হয়তো ছিলেন একজন রক্তমাংসের পরম জ্ঞানী মানুষ — একজন আদি ঋষি বা সমাজপতি। ভাষাতাত্ত্বিক বিবর্তনে ‘ব্রহ্ম’ (পরমাত্মা) শব্দ থেকে ‘ব্রাহ্মণ’ (জ্ঞানী সমাজ) এবং ‘ব্রহ্মা’ (ব্যক্তিত্ববান ঈশ্বর) ধারণার সৃষ্টি। ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে, যিনি আদি সমাজে প্রথম যজ্ঞ বা আধ্যাত্মিক দর্শনের প্রবর্তন করেছিলেন (যাঁকে আদি পুরোহিত বা ‘ব্রহ্মা’ বলা হতো), কালক্রমে পৌরাণিক রূপকের মাধ্যমে তিনি সমগ্র সৃষ্টিরই ‘আদিস্রষ্টা’ বা প্রজাপতিতে রূপান্তরিত হন। সেমেটিক তথ্যের সূত্র ধরে যদি আব্রাহাম ও ব্রহ্মাকে এক ধরা হয়, তবে আব্রাহাম যেমন হিব্রু জাতির একজন ঐতিহাসিক আদি পিতা, ভারতীয় সংস্কৃতিতে ঠিক তেমনি সংস্কৃতির আদি পিতাকে পৌরাণিক রূপ দিয়ে ত্রিদেবের অন্যতম ‘ব্রহ্মা’ বা সৃষ্টির দেবতায় উন্নীত করা হয়েছে ।

সেমেটিক ঐতিহ্যে নূহ যেমন আব্রাহামের পূর্বসূরি, ভারতীয় পুরাণে মনু তেমনি ব্রহ্মার মানসপুত্র বা উত্তরসূরি। হিব্রু বাইবেল এবং ইসলামি ঐতিহ্য অনুসারে, নূহ হলেন মানবজাতির দ্বিতীয় আদি পিতা । মহাপ্লাবনের পর নূহের তিন পুত্র —শাম (Shem), হাম (Ham) এবং ইয়াফিস (Japheth)-এর মাধ্যমেই পৃথিবীতে নতুন করে মানববংশের বিস্তার ঘটে । নূহের জ্যেষ্ঠ পুত্র শামের বংশধারাকেই বলা হয় ‘সেমেটিক’ (Semitic) ধারা । এই সেমেটিক ধারায় নূহের কয়েক প্রজন্ম পরেই জন্ম নেন আব্রাহাম । অতএব, বংশগত, কালানুক্রমিক এবং ঐতিহাসিক—সব দিক থেকেই নূহ হলেন আব্রাহামের আদি পূর্বপুরুষ । ঠিক যেভাবে ভারতীয় পুরাণে ‘মহাপ্লাবনের রক্ষক’ মনু হলেন সৃষ্টির আদি দেবতা ব্রহ্মার উত্তরসূরি বা মানসপুত্র, সেমেটিক ধারাতেও তেমনি ‘মহাপ্লাবনের পরিত্রাতা’ নূহ হলেন সৃষ্টির আদি একত্ববাদের প্রবক্তা আব্রাহামের পূর্বসূরি । দুই সংস্কৃতির এই বংশলতিকাগত সমান্তরাল কাঠামোটি অত্যন্ত বিস্ময়কর । উভয় সংস্কৃতিতেই ‘মহাপ্লাবন ও পুনর্গঠনকারী’ চরিত্রটি (নূহ/মনু) সৃষ্টির আদি ধারণার ঠিক পরেই যুক্ত হয়েছে । তবে এদের মূল্যায়নের ছাঁচে মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান । জলপ্লাবনের মতো প্রলয়ঙ্করী প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় যে দূরদর্শী নেতা নৌকা তৈরি করে জীবজগৎ ও মানবজাতিকে রক্ষা করেছিলেন, তিনি ছিলেন এক অসামান্য মহামানব । কিন্তু সেমেটিক সংস্কৃতিতে নূহ অতিমানবীয় কীর্তি স্থাপন করা সত্ত্বেও পরম করুণাময়ের একনিষ্ঠ অনুগত ‘দাস’, ‘নবী’ বা ‘রাসূল’ হিসেবেই মূল্যায়িত হয়েছেন; তিনি মানুষই থেকে গেছেন। অন্যদিকে, ভারতীয় সংস্কৃতিতে প্রাগৈতিহাসিক সেই আদি চরিত্রগুলোকে তাঁদের অসামান্য কীর্তির জন্য উপাস্য বা ঈশ্বরের সমকক্ষ অবতারের আসনে অধিষ্ঠিত করার একটি বিশেষ প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় । এরই ধারাবাহিকতায় ‘মনু’ কালক্রমে দেবত্ব লাভ করে ‘বৈবস্বত মনু’ হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছেন, যিনি একই সাথে মৎস্য অবতারের কৃপাধন্য এবং মানব সভ্যতার রক্ষাকর্তা । ভারতীয় সনাতন ঐতিহ্যে ‘মনু’ সংক্রান্ত ধারণাটি অত্যন্ত বহুমাত্রিক ও সুগভীর । নূহ এবং মনু ঐতিহাসিক ধারায় সমকালীন ছিলেন কি না — তা নিরূপণের বিষয়টি বিজ্ঞান, ইতিহাস ও পুরাণের এক রোমাঞ্চকর সন্ধিক্ষণ । এই তুলনামূলক ঐতিহাসিক, ভূতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হয়তো চূড়ান্ত বা অকাট্য প্রমাণের দাবি রাখে না, তবে এটি আমাদের এই বিষয়ে আরও গভীর অনুসন্ধানের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দেয় ।

নূহ ও মনুর ক্ষেত্রে মহাপ্লাবনের মতো কোনো প্রত্যক্ষ ভূ-তাত্ত্বিক ঘটনা আব্রাহাম ও ব্রহ্মার ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য না হলেও বিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব এবং ভাষাতত্ত্বের আধুনিক গবেষণার ভিত্তিতে প্রমাণ করা সম্ভব যে, তাঁরা একই ঐতিহাসিক কালখণ্ডের এবং একই ধারার চিন্তাগত বিবর্তনের ফসল । ঐতিহাসিক গবেষণায় আব্রাহামের সময়কাল এবং ভারতে উপনিষদীয় চিন্তার উন্মেষের সময়কালকে একটি সমান্তরাল রেখায় আনা সম্ভব । আধুনিক বাইবেলীয় প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, আব্রাহাম যদি একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হয়ে থাকেন, তবে তাঁর সময়কাল ছিল আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৮০০ অব্দ (ব্রোঞ্জ যুগের শেষভাগ)। ঠিক একই সময়ে (খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০-১৫০০ অব্দ) ভারতীয় উপমহাদেশে সিন্ধু সভ্যতার রূপান্তর ঘটছে এবং বৈদিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটছে। মার্কিন প্রত্নতাত্ত্বিক গ্রেগরি পোসেলের গবেষণা অনুযায়ী, এই সময়েই মেলুহা (সিন্ধু অঞ্চল) এবং মেসোপটেমিয়ার মধ্যে গভীর বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ছিল ।

আজকের বিজ্ঞান যেখানে জিনেটিক্স বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রমাণ করছে যে পৃথিবীর সমস্ত মানুষের আদি উৎস এক, প্রাচীন পৃথিবীর মিথ বা পুরাণগুলোও তেমনি ভিন্ন ভিন্ন ভাষায়, ভিন্ন ভৌগোলিক রূপকে মূলত একই মানুষের যৌথ স্মৃতি, যৌথ ভয় এবং আদিম দর্শনের জয়গান গেয়েছে। মেসোপটেমিয়ার প্লাবন আর সিন্ধু অববাহিকার জলচ্ছ্বাস, কিংবা হিব্রু ভূখণ্ডের একশ্বরবাদী পয়গম্বর আর আর্যাবর্তের অদ্বৈত ব্রহ্ম — আপাতদৃষ্টিতে আলাদা মনে হলেও এরা সবাই একই মানব চেতনার অভিন্ন নদী থেকে জলপান করে পুষ্ট হয়েছিল

গডফ্রে হিগিন্সের মতে এই দুই সংস্কৃতির প্রাচীন মিলনভূমি ছিল পারস্য (ইরান) এবং আফগানিস্তান অঞ্চল । আর্যদের একটি শাখা (ইন্দো-ইরানীয়) যখন ভারতে প্রবেশ করছে, প্রায় কাছাকাছি সময়ে সেমেটিক সংস্কৃতির আদি পুরুষেরা মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে সক্রিয় ছিলেন । ফলে, ব্রোঞ্জ যুগের এই সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের যুগে একই ধরনের আধ্যাত্মিক চিন্তার জন্ম হওয়া ঐতিহাসিক দিক থেকে অত্যন্ত স্বাভাবিক । ভাষাতত্ত্ববিদ সুকুমার সেন বা সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ভাষাতাত্ত্বিক তত্ত্বের আলোকেই এই দুই ধারণার সমকালীন বিকাশ ও সংযোগটি ব্যাখ্যা করা সম্ভব । ‘আ-ব্রাহাম’ শব্দের ব্যবচ্ছেদ করলে প্রাচীন হিব্রু ভাষায় আব্রাহামের আদি নাম ছিল ‘আব্রাম’ (Abram), পরবর্তীতে যা ‘আব্রাহাম’ (Abraham) হয় । অনেক প্রাচ্যবিদ মনে করেন, সংস্কৃত ‘অ-ব্রাহ্মণ’ বা ‘আ-ব্রহ্ম’ শব্দের সাথে এর গভীর ধ্বনিগত ও ব্যুৎপত্তিগত সংযোগ রয়েছে ।

এই তুলনামূলক গবেষণার শেষ প্রান্তে এসে আমাদের বৈজ্ঞানিক সত্য (জিনতত্ত্ব বা প্রত্নতত্ত্ব) এবং রূপক সত্যের (ধর্মীয় পুরাণ) মধ্যে একটি সুক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে । প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানব পরিভ্রমণ ও অভিবাসনের কারণে যদি এই আখ্যানগুলো এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে গিয়ে থাকে, তবে তা মানব ইতিহাসের এক অদ্ভুত এবং সুন্দর একাত্মতাকেই প্রকাশ করে । আজকের বিজ্ঞান যেখানে জিনেটিক্স বা ডিএনএ (DNA) বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রমাণ করছে যে পৃথিবীর সমস্ত মানুষের আদি উৎস এক, প্রাচীন পৃথিবীর মিথ বা পুরাণগুলোও তেমনি ভিন্ন ভিন্ন ভাষায়, ভিন্ন ভৌগোলিক রূপকে মূলত একই মানুষের যৌথ স্মৃতি, যৌথ ভয় এবং আদিম দর্শনের জয়গান গেয়েছে । মেসোপটেমিয়ার প্লাবন আর সিন্ধু অববাহিকার জলচ্ছ্বাস, কিংবা হিব্রু ভূখণ্ডের একশ্বরবাদী পয়গম্বর আর আর্যাবর্তের অদ্বৈত ব্রহ্ম — আপাতদৃষ্টিতে আলাদা মনে হলেও এরা সবাই একই মানব চেতনার অভিন্ন নদী থেকে জলপান করে পুষ্ট হয়েছিল ।

নূহ-মনু ও আব্রাহাম-ব্রহ্মার এই গভীর তুলনামূলক আলোচনাটি প্রমাণ করে যে, মানব সভ্যতার বাহ্যিক আচার, ভূগোল কিংবা ধর্মের দেয়ালগুলো যতই বৈচিত্র্যময় হোক না কেন, মানুষের আদিম চিন্তা, ভয়, দর্শন এবং ইতিহাসের মূল স্রোতটি একই অনবদ্য উৎস থেকে পুষ্ট হয়েছিল । আধুনিক পপুলেশন জেনেটিক্স যেমন আজ মানুষের রক্তের একত্বের কথা বলছে, এই তুলনামূলক পুরাণতত্ত্বও ঠিক তেমনি প্রমাণ করছে যে — প্রাচীন বিশ্ব জুড়েই মানুষের আত্মিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন ছিল অত্যন্ত সুদৃঢ় ও অবিভাজ্য ।

♦–•♦–•♦

পূর্ববর্তী পর্ব পড়ুন :

ঐতিহ্যের উৎস সন্ধানে: নূহ-মনু ও আব্রাহাম-ব্রহ্ম


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!