- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- জুন ২১, ২০২৬
মাতৃসূত্রের আড়ালে কৃষির সঙ্কট, উত্তর-পূর্ব ভারতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর ভূমিকা
অলোকচিত্র : সংগৃহীত
গত কয়েক দশকে বিশ্ব অর্থনীতি, কর্ম-অংশগ্রহণের হার এবং কর্মসংস্থানের ধরণে আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। বিশ্বায়ন ও অর্থনৈতিক উদারীকরণ এই পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। একাধিক উপাদানকে অন্তর্ভুক্ত করে সে এক বিস্তৃত কাঠামো নির্মাণ করেছে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিও পরিবর্তন ও রূপান্তরের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকেনি। ফলে, বদলেছে ভারতের কৃষিনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতিও।
উত্তর-পূর্ব ভারতে, যেখানে এখনো প্রাথমিক অর্থনৈতিক খাতকে কেন্দ্র করেই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবিকা নির্ধারণ করে, সেখানে পরিবর্তনের অভিঘাত পড়েছে বহুমাত্রিক ভাবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমির ক্রমবর্ধমান অ-কৃষি ব্যবহার, আন্তঃআঞ্চলিক জনচলাচল, বহুজাতিক জনবিন্যাস এবং বাইরের বিনিয়োগকারীদের প্রবেশ— সব মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির চরিত্র। পরিবর্তনের হাওয়ায় ভাসছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— কৃষিক্ষেত্রে নারীর অবস্থান কি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে ? বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কৃষিক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো উল্লেখযোগ্য হলেও, জমির উপরে তাঁদের অধিকার, বনজ সম্পদ, কৃষিকাজ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। নিম্নমুখী এ প্রবণতা সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চল জুড়েই লক্ষ্য করা গেলেও, কিছু রাজ্য ও আঞ্চলিক ক্ষেত্রে তা আরও স্পষ্ট।
সাম্প্রতিক গবেষণা ও সমীক্ষা ইঙ্গিত দিচ্ছে, জমির মালিকানা নথিতে নারীর উপস্থিতি যতটা দৃশ্যমান, কৃষির বাস্তব পরিসরে তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ততটাই ক্ষয়িষ্ণু। ফসলের ধরন নির্ধারণ, জমির ব্যবহার ও কৃষিপণ্যের উপর অধিকার প্রয়োগের মতো ক্ষেত্রে নারীদের স্বায়ত্তশাসন ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৯০-এর দশকের অর্থনৈতিক সংস্কারের পর থেকে কৃষিক্ষেত্র তথা প্রাথমিক অর্থনৈতিক খাত থেকে নারীদের ধীরে ধীরে অপসারণের প্রবণতা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান
উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম অঙ্গরাজ্য মেঘালয়কে দীর্ঘ দিন ধরেই নারীর ক্ষমতায়নের এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। খাসি, জয়ন্তিয়া ও গারো সমাজের মাতৃসূত্রভিত্তিক পারিবারিক কাঠামোয় সম্পত্তির উত্তরাধিকার সাধারণত নারীদের হাতেই থাকে। দেশের অধিকাংশ অঞ্চলের পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর বিপরীতে এ ব্যবস্থা বহু গবেষকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে এতদিন। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা ও সমীক্ষা ইঙ্গিত দিচ্ছে, জমির মালিকানা নথিতে নারীর উপস্থিতি যতটা দৃশ্যমান, কৃষির বাস্তব পরিসরে তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ততটাই ক্ষয়িষ্ণু। ফসলের ধরন নির্ধারণ, জমির ব্যবহার ও কৃষিপণ্যের উপর অধিকার প্রয়োগের মতো ক্ষেত্রে নারীদের স্বায়ত্তশাসন ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৯০-এর দশকের অর্থনৈতিক সংস্কারের পর থেকে কৃষিক্ষেত্র তথা প্রাথমিক অর্থনৈতিক খাত থেকে নারীদের ধীরে ধীরে অপসারণের প্রবণতা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। এ প্রবণতা কি নারীদের প্রাথমিক খাত থেকে অন্য খাতে স্থানান্তরের নির্দেশক, না কি এটি রাজ্যের উপজাতীয় সমাজগুলির অন্তর্নিহিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ—তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
যে কোনো দেশের অর্থনীতি, বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থান মূলত কর্ম-অংশগ্রহণের ধরণ এবং নির্দিষ্ট সময়ে কর্মরত ও বেকার মানুষের অনুপাতের সমীক্ষায় বোঝা যায়। ভারতীয় অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, গ্রামীণ কৃষি খাত এখনো বেশিরভাগ নাগরিকের পেশা ও কর্মসংস্থানের প্রধান ক্ষেত্র। সর্বশেষ জনগণনার তথ্যেও এটি প্রতিফলিত হয়েছে। বিশ্বায়ন-পরবর্তী সময়ে ভারত দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ঘটলেও, দেশের বহু প্রান্তিক অঞ্চলের অর্থনীতির বিকাশ আশাব্যঞ্জক নয়। এর ফলে সামাজিক ও আঞ্চলিক বৈষম্য আরও গভীর হচ্ছে, দেশের সমন্বিত উন্নয়নের পথে যা অন্যতম প্রতিবন্ধকতা বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
ভারতীয় কৃষি অর্থনীতিতে নারীদের অবস্থান বুঝতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নিবিড় তথ্য বিশ্লেষণ করলে জানা যায়, সাধারণভাবে নারী শ্রমিকরা, বিশেষত তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত নারীরা, ধীরে ধীরে জমির উপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন। তাদের শ্রম ও অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। যদিও কেন্দ্র সরকার ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ (এসডিজি), বিশেষত অর্থনৈতিক কাঠামোয় লিঙ্গসমতা বিষয়ক ‘এসডিজি-৫’ অর্জনের জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তবুও কয়েকটি রাজ্য বাদ দিলে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর নারীদের জমির মালিকানা ও কৃষিকাজে তাদের স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কিত তথ্য অপ্রতুল, যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য নয়। জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা (এনএফএইচএস)-এর রাজ্য ভিত্তিক সমীক্ষার সাম্প্রতিক তথ্যও এই বৈপরীত্যকে সামনে এনেছে। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, কৃষিজমির মালিক গৃহপ্রধানদের উত্তর এবং জমির মালিক নারীদের উত্তরের মধ্যে বিভিন্ন রাজ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
উত্তর-পূর্ব ভারতের কৃষির বৈশিষ্ট্য জটিল। অপেক্ষাকৃত বিচ্ছিন্ন ভৌগোলিক অবস্থান, দুর্গম ভূপ্রকৃতি, প্রচুর বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘস্থায়ী বন্যা ও জলাবদ্ধতার সমস্যা কৃষি কার্যক্রম আর তার উন্নয়নের হারকে ব্যাপক হারে প্রভাবিত করে। আবার এ অঞ্চলে কৃষির উন্নয়ন তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকার কারণ শুধু প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশও নয়, অপর্যাপ্ত পরিকাঠামো, সীমিত বাজারব্যবস্থা এবং বহু ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের যথাযথ ও সময়োপযোগী সহায়তার অভাবও এর জন্য দায়ী। এর পাশাপাশি উচ্চ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, অঞ্চলভিত্তিক জনচলাচল, বহু-জাতিগত জনসংখ্যার গঠন, কৃষিজমির অ-কৃষি কাজে রূপান্তর এবং বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী উদ্যোক্তাদের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে।
জুমচাষ হোক বা স্থায়ী ধানচাষ, নারীরা কৃষির বিভিন্ন স্তরে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষির প্রকৃতি বদলেছে। উদ্যানপালন, বাণিজ্যিক কৃষি, রেশমচাষ, বনায়ন ও বাজারমুখী কৃষির প্রসার ঘটেছে। নতুন কৃষি পদ্ধতিগুলিতে আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ দক্ষতা আর অধিক মূলধনের প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে কৃষির নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে পুরুষ ও বাইরের বিনিয়োগকারীদের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। একই সঙ্গে সম্প্রদায়ভিত্তিক জমির পুনর্বণ্টন ও ব্যবস্থাপনার ক্ষমতাও ক্রমশ পুরুষদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে
দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব এবং পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এ অঞ্চল বহু প্রজাতির ফসল ও উদ্ভিদের আবাসস্থল, বিপুল বৈচিত্র্য, জনসংখ্যাগত বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে মিলিত হয়ে, মানুষ ও প্রকৃতির পারস্পরিক সম্পর্কের এক সমৃদ্ধ ইতিহাস তৈরি করে, যা উদ্ভিদ ও প্রাণীর গৃহপালন মধ্যেও প্রতিফলিত হয়। ভূপ্রকৃতি ও স্থানীক জলবায়ুর পারস্পরিক প্রভাবে অল্প দূরত্বের মধ্যেই ভিন্নধর্মী পরিবেশ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ অঞ্চলে প্রধানত তিন ধরনের কৃষি ব্যবস্থা প্রচলিত— এক, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা, বরাক উপত্যকা, ইম্ফল উপত্যকা, ত্রিপুরার সমভূমি ও অরুণাচল প্রদেশ ও মেঘালয়ের সমতল অঞ্চলে স্থায়ী জলধান চাষের প্রাধান্য দেখা যায়। দুই, আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ের ঢালু পাহাড়ি এলাকায় বাগানভিত্তিক কৃষি। তিন, অপেক্ষাকৃত দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর দ্বারা পরিচালিত স্থানান্তরিত কৃষি বা জুম চাষ।
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সাপ্তাহিকী (ইপিডব্লিউ) সহ বিভিন্ন সংস্থার সমীক্ষায় দেখা গেছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কৃষিক্ষেত্রে নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সাধারণত সম্পদ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান, দক্ষতা ও সচেতনতার অভাব ও সামাজিক সুরক্ষার ঘাটতি সীমাবদ্ধতার প্রধান কারণ। তবে কিছু সমাজ ও সংস্কৃতিতে ব্যতিক্রমও দেখা যায়। জুম চাষের এলাকাগুলিতে নারী কৃষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং কৃষি-সম্পর্কিত মতামত প্রকাশের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। তবুও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীদের কৃষিকাজ পরিবার বা গোত্রের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়, ফলে তারা যথাযথ স্বীকৃতি ও সামাজিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হন। কৃষিক্ষেত্রে লিঙ্গভূমিকার বাস্তব চিত্র বোঝার জন্য এ বিষয়টির গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
ভারতের মূল ভূখণ্ডের মতো উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর পুরুষদের ক্রমবর্ধমান হারে পরিষেবা খাতে স্থানান্তর এবং গ্রাম থেকে বহির্গমনের ফলে কৃষিক্ষেত্রে নারীকরণ বা ‘ফেমিনাইজেশন’-এর প্রবণতা দেখা গেছে। তবে এই নারীকরণ নারীদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির প্রতিফলন নয়। স্বল্প সাক্ষরতা, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্পর্কে তথ্য ও জ্ঞানের অভাব, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরিষেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার নারীদের তুলনামূলকভাবে কম উৎপাদনশীল, অধিক শ্রমনির্ভর কৃষিকাজে আবদ্ধ রেখেছে। উদাহরণস্বরূপ, আসামের বিস্তীর্ণ চা-বাগানে বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমিক পাতা তোলা ও প্রক্রিয়াকরণের কাজে যুক্ত থাকলেও মজুরি ও পরিষেবা চুক্তির ক্ষেত্রে তারা বৈষম্যের শিকার হন।
মেঘালয়ে মাতৃসূত্রভিত্তিক সামাজিক কাঠামো জমির উপর নারীদের প্রথাগত অধিকার দিলেও, তা গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতিতে কার্যকরভাবে রূপান্তরিত হয়নি। তাদের অবদান মূলত জমি পরিষ্কার, বীজ বপন, আগাছা পরিষ্কার আর জুমক্ষেত থেকে ফসল সংগ্রহের মতো শ্রমনির্ভর কাজেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। ফলে কৃষিক্ষেত্রে নারীদের উচ্চ অংশগ্রহণের হার বিভ্রান্তিকর এক ছবি উপস্থাপন করে, যা ক্রমবর্ধমান সংখ্যক নারী কৃষিশ্রমিকের উপস্থিতির মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়। কৃষি গবেষণা সংস্থাগুলির মতে, এই নারীকরণের প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে ভূমি ও ভূমিসম্পদ উন্নয়নের নতুন ও বিশেষায়িত পদ্ধতির প্রবর্তন হয়েছে, যা নারীদের উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকে আরও সীমিত করেছে। এ প্রসঙ্গে বেঙ্গালুরুর গবেষক সুমি কৃষ্ণ তাঁর গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছেন যে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রায় সব রাজ্যের কৃষিশ্রমের মূল ভার বহন করেন বয়স্ক নারীরা, যাদের উপর খাদ্য উৎপাদন ও পরিবারের পুষ্টির দায়িত্ব বর্তায়। ফলে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাদের কাছে এ ধরনের আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য পর্যাপ্ত সময় থাকে না, এমনকি যেসব সমাজে নারীদের মতামত প্রদানের সুযোগ রয়েছে— যেমন অঞ্চলের মাতৃসূত্রভিত্তিক বা মাতৃতান্ত্রিক সম্প্রদায়গুলিতে সেখানেও অবস্থা একই।
মেঘালয়ের কৃষি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এ রাজ্যে কৃষিকাজের, বিশেষত ধান ও সবজি চাষেরদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। অতীতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আগত জনগোষ্ঠীগুলি ধানচাষের কৌশল নিয়ে খাসি-জয়ন্তিয়া অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। কৃষির প্রসার ঘটায়। রাজ্যে অন্য প্রধান উপজাতীয় গোষ্ঠী গারো জনগোষ্ঠী, তিব্বত-বর্মী নৃতাত্ত্বিক ধারার অন্তর্ভুক্ত। তারা প্রথমে ব্যক্তিগত জীবিকা নির্বাহের জন্য কৃষিকাজ শুরু করলেও পরবর্তীতে সে জ্ঞান সম্প্রদায়ের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী সমতল এলাকায় তারা স্থায়ী কৃষি পদ্ধতির চর্চাও গড়ে তোলে। উত্তর-পূর্ব ভারতের এই পাহাড়ি রাজ্যে নারী ও পুরুষ উভয় কৃষকই পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত কৃষি-জ্ঞান ও দক্ষতার পরিচয় বহন করে চলেছেন। ফলে, রাজ্যের দক্ষিণের ‘ওয়ার’ অঞ্চল এবং উত্তর-পশ্চিমের ভাঙাচোরা ভূপ্রকৃতির অংশ বাদ দিলে প্রায় সর্বত্র কৃষিকাজ বিস্তৃত।
মেঘালয়ের মাতৃসূত্রভিত্তিক সামাজিক ব্যবস্থা নারীদের কৃষি অর্থনীতিতে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করবে, এমন প্রত্যাশা থাকাই স্বাভাবিক। ধারণা করা হয় যে, নারী কৃষকেরা ফসল নির্বাচন, সেচব্যবস্থা, ফসল সংগ্রহ ও বিপণন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে গ্রহণ করতে সক্ষম হবেন। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলিতে গ্রামান্তরে কৃষকদের চলাচল বৃদ্ধি, সম্প্রদায়ভিত্তিক জমির পুনর্বণ্টনের ক্ষমতা পুরুষদের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া এবং নারীদের জমির মালিক থেকে কেবল উত্তরাধিকারী ও অভিভাবকে পরিণত করার প্রবণতা নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে। রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃসূত্রবাদ এবং কৃষিকাজের মধ্যে কোনও মৌলিক দ্বন্দ্ব ছিল না। জুমচাষ হোক বা স্থায়ী ধানচাষ, নারীরা কৃষির বিভিন্ন স্তরে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষির প্রকৃতি বদলেছে। উদ্যানপালন, বাণিজ্যিক কৃষি, রেশমচাষ, বনায়ন ও বাজারমুখী কৃষির প্রসার ঘটেছে। নতুন কৃষি পদ্ধতিগুলিতে আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ দক্ষতা আর অধিক মূলধনের প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে কৃষির নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে পুরুষ ও বাইরের বিনিয়োগকারীদের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। একই সঙ্গে সম্প্রদায়ভিত্তিক জমির পুনর্বণ্টন ও ব্যবস্থাপনার ক্ষমতাও ক্রমশ পুরুষদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। ফলে নারীরা জমির মালিক থেকে অনেক ক্ষেত্রেই কেবল উত্তরাধিকারী বা রক্ষণাবেক্ষণকারীর ভূমিকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছেন। যেখানে একসময় তাদের শক্তিশালী অবস্থান ছিল, নারীদের সেই অর্থনৈতিক খাতে স্বায়ত্তশাসন চর্চাকে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মেঘালয়ের অভিজ্ঞতা একটি আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলছে, কেবল জমির উত্তরাধিকার কি নারীর ক্ষমতায়নের নিশ্চয়তা দিতে পারে ? গবেষকদের একাংশের মতে, উত্তরটি নেতিবাচক। কারণ, জমির মালিকানা এবং জমির উপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ— এ দুইয়ের মধ্যে ফারাক ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। আর সে ফারাকই মাতৃসূত্রভিত্তিক সমাজব্যবস্থার অন্তর্নিহিত সীমাবদ্ধতাকে নতুন করে সামনে আনছে
জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা (এনএফএইচএস)-এর তথ্যের উপর ভিত্তি করে, ২০১৯ সালে বিনা আগরওয়াল ও সহ-গবেষকদের পরিচালিত বিশেষ গবেষণায়, মেঘালয়ে নারীদের কৃষিতে ভূমিকা, জমির উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সব প্রশ্ন উত্থাপিত করা হয়েছে। ওই সমীক্ষায় ১৫–৪৯ বছর বয়সী জমির মালিক নারী ও পুরুষদের কাছ থেকে পৃথক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। যেখানে অধিকাংশ রাজ্যে নারী কৃষকদের উত্তর অনুযায়ী জমির মালিকানার হার গৃহপ্রধানদের উত্তরের তুলনায় বেশি ছিল। মেঘালয়ে দেখা গিয়েছে উল্টো চিত্র। গৃহপ্রধানদের উত্তর অনুযায়ী যেখানে নারীদের জমির মালিকানার হার ৮৬.৭ শতাংশ, সেখানে নারীদের নিজস্ব উত্তরে সেই হার নেমে এসেছে ৪২.৭ শতাংশে। বিপুল এ ব্যবধান গবেষকদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ভুল উত্তর, নমুনার সীমাবদ্ধতা, তথ্য গোপন করা বা অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করার মতো বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তবুও, একটা বিষয় স্পষ্ট যে, যেখানে পিতৃতান্ত্রিক সমাজগুলিতে নারীদের জমির মালিকানা সম্পর্কিত তথ্য অতিরঞ্জিত বলে মনে হয়, সেখানে মাতৃসূত্রভিত্তিক মেঘালয়ে প্রাপ্ত তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলেই মনে হয়।
এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র কৃষি, যা মূলত নারীদের হাতেই পরিচালিত হয়, পরিকাঠামোগত ঘাটতির কারণে ক্রমশ সংকটে পড়ছে। সংরক্ষণাগারের অভাব, দুর্বল পরিবহণ ব্যবস্থা এবং বিপণনের সীমাবদ্ধতা কৃষিকে অলাভজনক করে তুলছে। যার ফলে কৃষিকাজে নিযুক্ত নারী শ্রমের চাহিদাও হ্রাস পাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নারীদের কর্মসংস্থানের উপর। যদিও স্বনির্ভর গোষ্ঠী (এসএইচজি), নারী অধিকার সংগঠনগুলি ক্রমশ সক্রিয় হচ্ছে, বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্যোগগুলি পর্যাপ্ত নয়। নারীদের জন্য প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরিষেবার সম্প্রসারণ, কৃষিঋণে সহজ প্রবেশাধিকার এবং কৃষিজমির উপর তাঁদের প্রকৃত সিদ্ধান্তগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন কঠিন।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পাহাড়ি এই রাজ্যের অর্থনৈতিক কাঠামোর দ্রুত পরিবর্তন। গ্রামীণ অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নিয়ে এসেছে কয়লাখনির বিস্তার ও পরিষেবা খাতের সম্প্রসারণ। বিশেষত পূর্ব জয়ন্তিয়া পাহাড় জেলায় কয়লাখনিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো। বাইরের বিনিয়োগের প্রবেশে ঐতিহ্যগত ভূমি–সম্পর্ককে দুর্বল করছে। বহু কৃষিজমি খনির আওতায় চলে যাচ্ছে। কৃষিকাজ আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে খাদ্য ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত নারীরা তাঁদের দীর্ঘদিনের জীবিকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। অনেকে কর্মহীন হয়ে পড়ছেন, অনেক ক্ষেত্রে কৃষিক্ষেত্র থেকে সরে এসে তাঁরা খনিশিল্পে নিম্নস্তরের কাজে যুক্ত হচ্ছেন। গবেষকদের মতে, এ প্রক্রিয়া মেঘালয়ের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীদের এক ধরনের নীরব স্থানচ্যুতি তৈরি করছে।
সবশেষে, এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, মেঘালয়ের প্রান্তিক মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় কৃষি ও নারীর ক্ষমতায়ন পরস্পর পরিপূরক। বিশ্বায়ন, অর্থনৈতিক উদারীকরণ অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য, জিডিপি বৃদ্ধি, বাণিজ্যের উন্নয়নে নিঃসন্দেহে রাজ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু, উন্নয়ন ও কল্যাণ সূচকে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা মেঘালয়ের মতো ছোটো রাজ্যের পক্ষে অর্থনৈতিক সংস্কারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সহজ নয়। ক্রমশ একথাও স্পষ্ট হচ্ছে, যে ব্যবস্থা একসময় রাজ্যের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে ছাতার ভূমিকা পালন করত, অর্থনীতি সম্পর্কে পরিবর্তিত ধারণা পাহাড়ের সেই ঐতিহ্যবাহী মাতৃসূত্রভিত্তিক ব্যবস্থাকে প্রান্তিক করে তুলছে। পাশাপাশি, মেঘালয়ের অভিজ্ঞতা একটি আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলছে, কেবল জমির উত্তরাধিকার কি নারীর ক্ষমতায়নের নিশ্চয়তা দিতে পারে ? গবেষকদের একাংশের মতে, উত্তরটি নেতিবাচক। কারণ, জমির মালিকানা এবং জমির উপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ— এ দুইয়ের মধ্যে ফারাক ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। আর সে ফারাকই মাতৃসূত্রভিত্তিক সমাজব্যবস্থার অন্তর্নিহিত সীমাবদ্ধতাকে নতুন করে সামনে আনছে। অর্থনীতির নয়া বাস্তবতা, ঐতিহ্যগত সামাজিক কাঠামোর টানাপোড়েনের কেন্দ্রে রয়েছেন মেঘালয়ের প্রান্তিক নারীরা— যাঁদের শ্রম এখনো রাজ্যের কৃষির মেরুদণ্ড, তাদের কণ্ঠস্বর ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে।
♦•♦–♦•♦
❤ Support Us






