- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুন ২০, ২০২৬
‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’-এ শ্যামাপ্রসাদের বন্দনা, দেশভাগের ইতিহাস স্মরণে প্রধানমন্ত্রী
রাজনৈতিক পালাবদলের পর এই প্রথমবার সরকারিভাবে পালিত হলো ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’। আর সেই অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই দেশভাগ-পূর্ব বাংলার রক্তাক্ত ইতিহাস, পশ্চিমবঙ্গের ভারতভুক্তির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে ধরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শনিবার হুগলির তারকেশ্বরে আয়োজিত পশ্চিমবঙ্গ দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেন, ‘এক সময় গোটা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছিল। সে পরিস্থিতিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের দৃঢ় নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক লড়াইয়ের ফলেই পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হিসেবে থেকে যেতে পেরেছিল।’
দু–দিনের সফরে শনিবার দুপুরে রাজ্যে পৌঁছন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ বিমানে দমদম বিমানবন্দরে নামার পর সেখান থেকে হেলিকপ্টারে রওনা দেন হুগলির তারকেশ্বরের উদ্দেশে। বিকেল চারটের কিছু পরে তাঁর কপ্টার সভাস্থলে অবতরণ করে। প্রধানমন্ত্রী পৌঁছনোর আগেই অনুষ্ঠানের মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, রাজ্যপাল আর এন রবি। সভামঞ্চে প্রধানমন্ত্রীকে ডোকরার তৈরি দুর্গামূর্তি উপহার দিয়ে স্বাগত জানান মুখ্যমন্ত্রী। উপহারের তালিকায় ছিল বাংলার ঐতিহ্যবাহী রসগোল্লা এবং জলভরা সন্দেশও। প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে সকাল থেকেই তারকেশ্বর কার্যত পরিণত হয়েছিল নিরাপত্তার দুর্গে। সভাস্থল এবং সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছিল বিপুল সংখ্যক পুলিশকর্মী ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান। একাধিক স্তরের নিরাপত্তা বলয়ে ঘিরে ফেলা হয় অনুষ্ঠান চত্বর। দর্শকদের জন্য সভাস্থলের দু–পাশে তৈরি করা হয়েছিল মোট পাঁচটি বিশাল হ্যাঙার।
রাজ্য সরকারের প্রথম পশ্চিমবঙ্গ দিবস উদ্যাপনকে স্মরণীয় করে তুলতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল মঞ্চসজ্জায়। থাইল্যান্ড থেকে আনা হয়েছিল অ্যান্থোরিয়াম ফুল। তামিলনাড়ুর উটি থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল জারবেরা ও লিলি। এ ছাড়াও পাঁচ ধরনের গোলাপ, ব্লু ডেইজি, রজনীগন্ধা আর গাঁদা ফুলে সেজে ওঠে গোটা মঞ্চ। অনুষ্ঠান চত্বরে তুলে ধরা হয় বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ। কলকাতার পরিচিত হলুদ ট্যাক্সি, হাতে টানা রিকশা, দক্ষিণেশ্বর মন্দির, বেলুড় মঠের প্রতিরূপ ও ছবিতে সাজানো হয় গোটা এলাকা। বক্তৃতার শুরুতে পরিবর্তিত বাংলার আবহের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের প্রতিটি প্রান্ত থেকে তিনি নতুন উদ্যমের বাতাস অনুভব করছেন। তাঁর মতে, ‘বাংলা আজ শৃঙ্খলমুক্ত হয়েছে। পরিবর্তনের এ পরিবেশ বাংলার মানুষ অনুভব করছেন। দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি বাংলার অগ্রগতিকে থামিয়ে রেখেছিল। সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে এখন ডবল ইঞ্জিন সরকার দ্বিগুণ গতিতে উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’
প্রধানমন্ত্রী আরও দাবি করেন, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার পাশাপাশি কৃষি, মৎস্যচাষ, পরিকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক নির্মাণে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে তাঁর বক্তব্যের মূল সুর জুড়ে ছিল দেশভাগের ইতিহাস এবং পশ্চিমবঙ্গের ভারতভুক্তির প্রশ্ন। মোদি বলেন, ১৯৪৬ সালের ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ এবং নোয়াখালির দাঙ্গা বাংলার মানুষের স্মৃতিতে এক ভয়াবহ অধ্যায় হয়ে রয়েছে। সে সময় বাংলার মানুষ নিজেদের মাতৃভূমিকে বিভক্ত হতে দেখেছিলেন। তাঁর দাবি, উত্তাল সে সময় গোটা পশ্চিমবঙ্গকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা হয়েছিল। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সে ষড়যন্ত্র সফল হতে দেননি। তিনি না থাকলে আজকের পশ্চিমবঙ্গের অস্তিত্ব হয়তো থাকত না। কংগ্রেস তখন কার্যত হাল ছেড়ে দিয়েছিল।’
ইতিহাসের একাধিক অধ্যায় ইচ্ছাকৃত ভাবে আড়াল করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, পশ্চিমবঙ্গের ভারতভুক্তির নেপথ্যে যাঁদের ভূমিকা ছিল, তাঁদের অবদান সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে নতুন প্রজন্মকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ দিবসের দিনক্ষণ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আমলে পয়লা বৈশাখকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে পালন করা হতো। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর নতুন প্রশাসন ২০ জুনকেই পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কারণ হিসাবে নতুন সরকার বলেছে, ১৯৪৭ সালের এই দিনেই অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক আইনসভায় ভোটাভুটির মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। ঐতিহাসিক সে সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে বিজেপি নেতৃত্বের দাবি।
প্রসঙ্গত, ১৯৪৭ সালে তারকেশ্বরেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল বলে এ দিনের সভা থেকে উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি দাবি করেন, দেশভাগের সময় বাঙালিরা ভারতভুক্ত পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই নিরাপত্তা খুঁজেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেস, বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল— পূর্ববর্তী সব সরকারই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদানকে আড়াল করার চেষ্টা করেছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, আগামী ৬ জুলাই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী সরকারিভাবে উদ্যাপন করা হবে। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা করেন, হুগলির জিরাটে শ্যামাপ্রসাদের পৈতৃক বাড়ি অধিগ্রহণ করে সেখানে স্মৃতিসৌধ এবং গ্রন্থাগার গড়ে তোলা হবে। কলকাতায় তাঁর ১২৫ ফুট উঁচু মূর্তি স্থাপনের কথাও ঘোষণা করেন তিনি। অনুষ্ঠানে একটি তথ্যচিত্রও প্রদর্শিত হয়, যেখানে দেশভাগ-পূর্ব বাংলার সাম্প্রদায়িক হিংসা এবং পশ্চিমবঙ্গের ভারতভুক্তির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়।
রাজ্যে আসার আগে শনিবার সকালে সমাজমাধ্যমে বাংলার মানুষকে পশ্চিমবঙ্গ দিবসের শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি লেখেন, সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প, আধ্যাত্মিকতা, বিজ্ঞান, বাণিজ্য এবং সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের অবদান ভারতের ইতিহাস ও জাতীয় চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছে। এদিন, তারকেশ্বরে প্রায় আধ ঘণ্টার ভাষণ শেষে প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেন। সন্ধ্যায় তাঁর মিলেনিয়াম পার্কে আয়োজিত যোগ কার্নিভ্যালে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে ড্রোন শো-সহ একাধিক অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন তিনি। কলকাতার লোক ভবনে রাত্রিবাসের পর রবিবার আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উপলক্ষে রেড রোডে আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানে যোগাসন করবেন প্রধানমন্ত্রী।
❤ Support Us








