Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুন ১৯, ২০২৬

কমিউনিস্ট চিনেও ‘জাতিভেদ’ প্রথা ? ভারতীয় নেটিজেনদের দাবিতে বিতর্ক, পাল্টা জবাব বেজিংয়ের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
কমিউনিস্ট চিনেও ‘জাতিভেদ’ প্রথা ? ভারতীয় নেটিজেনদের দাবিতে বিতর্ক, পাল্টা জবাব বেজিংয়ের

মাওবাদের দেশেও রয়েছে ভারতের মতো কাস্ট সিস্টেম’ বা জাতিভেদ প্রথা সমাজমাধ্যমে ভারতীয় নেটিজেনদের একাংশের এমন দাবি ঘিরে গত কয়েক দিন ধরে প্রবল তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়েছে নেট পাড়ায়। প্রাচীন চিনের শি-নং-গং-শাং’ বা চার পেশাভিত্তিক সামাজিক বিন্যাস এবং আধুনিক চিনের হুকৌ’ বা পরিবারভিত্তিক নিবন্ধন ব্যবস্থাকে সামনে এনে অনেকেই দাবি করছেনবিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিতেও জন্মের ভিত্তিতে সুযোগ-সুবিধার বিভাজন রয়েছে। যদিও চিনা শিক্ষাবিদ, প্রশাসনের একাংশ এহেন তুলনাকে ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

জুনের মাঝামাঝি সময়ে বিভিন্ন সমাজমাধ্যমে বিতর্কের সূত্রপাত। মুম্বইয়ের বাসিন্দা বলে পরিচয় দেওয়া এক নেটিজেন একটি তথ্যচিত্র পোস্ট করে লেখেন, ‘আমি জানতামই না, চিনেও জাতিভেদ  প্রথা রয়েছে!’ অন্য এক ভারতীয় ব্যবহারকারীর দাবি, ‘চিনে গ্রাম্য এলাকায় জন্মালেই আপনি কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। উন্নত শিক্ষাস্বাস্থ্য পরিষেবাআবাসন ভর্তুকি, ভালো চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হয়। এ এক ধরনের কাস্ট সিস্টেম’, যা কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্যের ফাঁদে আটকে রাখে।

এ দাবির সূত্র ধরেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রাচীন চিনের শি-নং-গং-শাং’ সামাজিক কাঠামো। সে সময় সম্রাটের নীচে সমাজকে চারটি বৃহৎ পেশাভিত্তিক শ্রেণিতে ভাগ করা হতো— ‘শি’ বা পণ্ডিত ও প্রশাসক, ‘নং’ বা কৃষক, ‘গং’ বা কারিগর এবং শাং’ বা বণিক। এ বিন্যাসের বাইরেও ছিল জিয়ানমিন’ নামে পরিচিত একটি প্রান্তিক গোষ্ঠীযাদের সামাজিক মর্যাদা ছিল সর্বনিম্ন। এঁদের সঙ্গে ভারতীয় ‘দলিত’ সমাজের তুলনা টানছেন অনেকে। নেটিজেনদের একাংশের দাবিএই শ্রেণিবিন্যাসই আসলে চিনের জাতিভেদ প্রথার ভিত্তি।

ঐতিহাসিকদের মতেঝৌ রাজবংশের শেষ পর্ব এবং ওয়ারিং স্টেটস’ যুগে এ শ্রেণিবিন্যাসের সূত্রপাত হয়। পরে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে বুক অব হান’-এ ইতিহাসবিদ বান গু এই সামাজিক কাঠামোর উল্লেখ করেন। কনফুসীয় দর্শনে পণ্ডিতদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হলেও কৃষিকাজকে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে দেখা হতো। অন্যদিকেমুনাফাকেন্দ্রিক মানসিকতার কারণে বণিকদের তুলনামূলক কম মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা কখনোই ভারতীয় জাতিভেদ প্রথার মতো জন্মসূত্রে নির্ধারিত স্থায়ী পরিচয়ে পরিণত হয়নি।

চিনের শিক্ষাবিদদের বক্তব্য, নেটিজেনদের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের চিনা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ঝাং ইওউয়ের দাবি, ‘শি-নং-গং-শাং ছিল পেশাভিত্তিক সামাজিক বিন্যাসকোনো বংশানুক্রমিক জাতিভেদ প্রথা নয়। কৃষকের সন্তান পড়াশোনা করে প্রশাসক হতে পারতবণিকের সন্তান সাম্রাজ্যিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চপদে যেতে পারত। সামাজিক উত্তরণের পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ ছিল না। রাজতন্ত্রের অবসান ও  মাও সেতুং-এর নেতৃত্বে বিপ্লবের পর, এ বিন্যাসও চিরতরে বিলুপ্ত হয়েছে।’

তবে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রাচীন ইতিহাস নয়আধুনিক চিনের হুকৌ’ ব্যবস্থা। ১৯৫০-এর দশকে চালু হওয়া হুকৌ’ লো চিনের পরিবারভিত্তিক নিবন্ধন ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থা নাগরিকদের গ্রামীণ’ এবং শহুরে’— দুই শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। শিক্ষাস্বাস্থ্য পরিষেবাআবাসনসামাজিক সুরক্ষা-সহ বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে এই নিবন্ধনের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। দীর্ঘদিন ধরে গ্রাম থেকে শহরে স্থায়ী ভাবে বসবাসের উপরও এ ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল।

সমালোচকদের দাবি, ‘হুকৌ চিনে দুধরনের নাগরিক তৈরি করেছে। এক দিকে শহুরে বাসিন্দারা উন্নত শিক্ষাস্বাস্থ্য পরিষেবাআবাসন ভর্তুকি-সহ সকল সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা ভোগ করেন। অন্যদিকেগ্রামীণ হুকৌধারীরা বহু ক্ষেত্রেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকেন। ভারতীয় লেখক অরবিন্দন নীলকন্দন তাঁর ‘আ ধার্মিক সোশ্যাল হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া’ বইয়ে দাবি করেছেনমাও সে তুংয়ের আমলে চিনে ‘হুকৌ ব্যবস্থাকে আরও কঠোর করা হয় ১৯৫৯ সালের পর থেকে তা কার্যত বংশানুক্রমিক চরিত্র পায়। লেখকের মতে, ‘চিনে এক জনের জন্মের সময়ই তার সামাজিক অবস্থান, রাষ্ট্রীয় সম্পদে প্রবেশাধিকারের সীমা নির্ধারিত হয়ে যায়।

অরবিন্দনের এই মতের সমর্থনে নৃতত্ত্ববিদ সুলামিথ পটার এবং জ্যাক পটার চিনের গ্রামীণ ও শহুরে বিভাজনকে ‘জাতিভেদ-সদৃশ বাধা’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতেএই ব্যবস্থার ফলে শুধু ভৌগোলিক স্থানান্তর নয়সামাজিক উত্তরণের পথও সীমিত হয়েছে। চাইনিজ ইউনিভার্সিটি অ হংকং’-এর এক গবেষণাপত্রেও হুকৌ ব্যবস্থাকে আরবান কাস্ট সিস্টেম’ বা শহুরে জাতিভেদ’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। গবেষকদের মতেসোভিয়েত ধাঁচের শিল্পায়ন নীতির অংশ হিসেবেই কৃষি থেকে উদ্বৃত্ত সম্পদ শহরমুখী করা হয়েছিল। ফলে শহুরে বাসিন্দারা রাষ্ট্রীয় সুবিধার বড়ো অংশ পেয়েছেনগ্রামীণ মানুষ দীর্ঘদিন থেকেছেন প্রান্তিক অবস্থানে।

মার্কিন প্রকাশনা ডিপ্লোম্যাটিক কুরিয়ার’-এর এক বিশ্লেষণেও দাবি করা হয়েছে, ‘হুকৌ ব্যবস্থা চিনে গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি করেছে। গ্রামীণ হুকৌধারীরা সাধারণত কম মজুরির শ্রমনির্ভর কাজ করেন। শহরে চলে এলেও শিক্ষাস্বাস্থ্য পরিষেবা  কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখে পড়তে হয় তাঁদের। তবে চিনের সরকারি অবস্থান ভিন্ন। বেজিংয়ের দাবি, ‘হুকৌ কোনো জাতিভেদ প্রথা নয়বরং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ব্যবস্থাপনার একটি প্রশাসনিক কাঠামো।

চিনা নেটিজেনদের একাংশের বক্তব্যভারতীয়রা নিজেদের সামাজিক অভিজ্ঞতার আলোতেই চিনা সমাজকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন। এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘মানুষ সাধারণত নিজেদের পরিচিত কাঠামোর মধ্য দিয়েই অন্য সমাজকে বোঝার চেষ্টা করে। ভারতীয়রাও তাইই করছেন।’ আবার বহু আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা, ‘হুকৌ ব্যবস্থাকে মূলত অভ্যন্তরীণ পাসপোর্ট’ ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছে। ২০১৪ সালের পর থেকে গ্রামীণ ও শহুরে বৈষম্য কমাতে এবং ছোটো ছোটো শহরগুলিতে অভিবাসীদের জন্য নিবন্ধন সহজ করতে একাধিক সংস্কার কর্মসূচি নিয়েছে বেজিং।

উল্লেখ্য,  চিনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী২০২৫ সালের শেষে দেশের ভাসমান জনসংখ্যার সংখ্যা প্রায় ৩৫ কোটি ৮০ লক্ষ। অর্থাৎমোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ নিজেদের নিবন্ধিত এলাকার বাইরে বসবাস করছেন। তা হলে কি চিনে সত্যিই ‘জাতিভেদ প্রথা’ রয়েছেবিশেষজ্ঞদের মতেএ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে কাস্ট’ বা ‘জাতি’ শব্দটির সংজ্ঞার মূল্যায়নের উপর। যদি ‘জাতি’ বলতে এমন একটি জন্মভিত্তিক ব্যবস্থা বোঝানো হয়যা মানুষের সুযোগসামাজিক উত্তরণ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদে প্রবেশাধিকারে প্রভাব ফেলেতবে হুকৌ ব্যবস্থার মধ্যে কিছু ‘জাতিভেদ-সদৃশ’ বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু যদি কাস্ট বলতে বংশানুক্রমিক সামাজিক পরিচয়নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাহশুচিতা-অশুচিতার ধারণা, গভীর সাংস্কৃতিক বিভাজনকে বোঝানো হয়তবে অধিকাংশ গবেষকের মতে চিনের হুকৌ ব্যবস্থা সে সংজ্ঞার সঙ্গে মেলে না।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!