- দে । শ
- জুন ১৯, ২০২৬
সংখ্যার অঙ্কে এগিয়েও আসন হাতছাড়া কংগ্রেসের, ঝাড়খণ্ডে রাজ্যসভার ফল ঘিরে ‘ইন্ডিয়া’ জোটে ভাঙনের সুর। কর্নাটকে উল্টো ছবি
বিধানসভায় সংখ্যার অঙ্কে এগিয়ে থেকেও ঝাড়খণ্ডে রাজ্যসভার আসন হাতছাড়া । অন্য দিকে, একই দিনে কর্নাটকে নিজেদের শক্তির চেয়ে ১৬টি বেশি ভোট পেয়ে বিধান পরিষদ নির্বাচনে দাপুটে জয় । দু-রাজ্যের দুই বিপরীত ফলাফলে ফের প্রশ্নের মুখে কংগ্রেসের জোট-পরিচালনার দক্ষতা আর নির্বাচনী কৌশল ।
ঝাড়খণ্ডে শাসক জোট ‘ইন্ডিয়া’ শিবিরের অন্দরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ ও মতপার্থক্য যে ক্রমশ গভীর হচ্ছে, বৃহস্পতিবারের রাজ্যসভা নির্বাচনের ফলাফল তা প্রকাশ্যে এনে দিল। সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেস প্রার্থী প্রণব ঝার পরাজয়ের পর জোটসঙ্গী রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) এবং সিপিআই(এমএল)-এর বিরুদ্ধে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তুলেছে কংগ্রেস । ঝাড়খণ্ড কংগ্রেসের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা কে রাজুর দাবি, কংগ্রেসের ১৬ জন বিধায়কের পাশাপাশি ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা (জেএমএম)-এর অতিরিক্ত ৪টি ভোটও পেয়েছিলেন তাঁদের প্রার্থী । ফলে মোট ২০টি ভোট নিশ্চিত ছিল। তাঁর অভিযোগ, ‘জেএমএম আমাদের পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে । কিন্তু আরজেডি এবং সিপিআই(এমএল)-এর বিশ্বাসঘাতকতার ফলেই এ পরাজয় ।’
কে রাজুর এই মন্তব্য ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে জোটের শরিক দলগুলির মধ্যে। আরজেডি অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে কংগ্রেসের মন্তব্যকে ‘নিকৃষ্ট মানসিকতার প্রতিফলন’ বলে কটাক্ষ করেছে । আরজেডি বিধায়ক ও মন্ত্রী সঞ্জয় প্রসাদ যাদব বলেছেন, ‘আরজেডি কংগ্রেসের মতো বিশ্বাসঘাতক নয় । আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান রয়েছে । কে রাজু কার নির্দেশে এমন অভিযোগ করছেন, তা আমরা জানি । তিনি এটাও জানেন, কংগ্রেসের কত জন বিধায়ক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দরজায় কড়া নেড়ে পরে তাঁদের দলে যোগ দিয়েছেন ।’ সঞ্জয়ের আরও দাবি, আরজেডির ৪ বিধায়কের ৪টি ভোটই কংগ্রেস প্রার্থীর পক্ষেই পড়েছে । উল্টে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, নিজের দলের বিধায়কদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেও কংগ্রেস নেতৃত্ব দলের অন্দরের পরিস্থিতি বুঝতে ব্যর্থ হলো কেন ?
আরজেডির সাধারণ সম্পাদক ভোলা যাদবও কংগ্রেসকে আত্মসমালোচনার পরামর্শ দিয়েছেন । তাঁর বক্তব্য, ‘অন্যকে দোষারোপ করার আগে কংগ্রেসের নিজেদের ভিতরের সমস্যা খতিয়ে দেখা উচিত ।’ কংগ্রেসের অভিযোগ খারিজ করেছে সিপিআই (এমএল)-ও । দলের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে জানিয়েছেন, পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁদের দুই বিধায়কই কংগ্রেস প্রার্থীর পক্ষেই ভোট দিয়েছেন । দীপঙ্করের বক্তব্য, ‘সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের দুই বিধায়ক পরিকল্পনা অনুযায়ী কংগ্রেস প্রার্থীকেই ভোট দিয়েছেন । দলের শীর্ষ নেতৃত্ব সে ভোট যাচাইও করেছেন ।’ সিপিআই(এমএল) বিধায়ক অরূপ চট্টোপাধ্যায়ও কংগ্রেসকে একহাত নিয়ে বলেছেন, ‘বড়ো দলগুলি অনেক সময় নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে ছোটো দলগুলির উপর দায় চাপানোর চেষ্টা করে । বাস্তব হলো, আমাদের দুই বিধায়কই ইন্ডিয়া জোটের প্রার্থীকেই ভোট দিয়েছেন ।’
‘ইন্ডিয়া’ শরীকদের কোন্দলের মাঝে, শেষ পর্যন্ত বিজেপি-সমর্থিত নির্দল প্রার্থী পরিমল নাথওয়ানি ফের ঝাড়খণ্ড থেকে রাজ্যসভায় নির্বাচিত হয়েছেন । জেএমএম প্রার্থী বৈদ্যনাথ রাম ৩০টি ভোট পেয়ে সহজেই জয়ী হলেও কংগ্রেসের প্রণব ঝার পরাজয় রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে । মোট ৮১টি ভোটের মধ্যে তিনটি ভোট বাতিল হয়েছে । ফলে শাসক জোটের অন্দরে ক্রস-ভোটিং হয়েছে কি না, তা নিয়েই এখন জোর জল্পনা। কংগ্রেসের একাংশের দাবি, বিহারের সাম্প্রতিক রাজ্যসভা নির্বাচনে আরজেডি প্রার্থী এ ডি সিংহের পরাজয়ের নেপথ্যে কংগ্রেস বিধায়কদের অনুপস্থিতি নিয়ে আরজেডির ক্ষোভ ছিল । সে ক্ষোভেরই প্রতিফলন ঘটেছে ঝাড়খণ্ডে ।
দলের অন্য অংশ আবার মনে করছে, ভোটের আগে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের সঙ্গে পরিমল নাথওয়ানির বৈঠক ভুল বার্তা দিয়েছিল। অনেক বিধায়ক সে বৈঠককে নাথওয়ানির প্রতি পরোক্ষ সমর্থন হিসেবেই দেখেছিলেন। ঝাড়খণ্ডে দলের বিপর্যয়ের নেপথ্যে কংগ্রেসের সাংগঠনিক দুর্বলতাকেও দায়ী করছেন দলের নেতারা। প্রণব ঝার নির্বাচনী দায়িত্বে ছিলেন প্রাক্তন ছত্তিশগড়ের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেল এবং কংগ্রেস নেতা অজয় শর্মা। কিন্তু সূত্রের দাবি, ভূপেশ ৬ থেকে ৮ জুন পর্যন্ত রাঁচিতে থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আর ফেরেননি। ‘অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি’র সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) কে সি বেণুগোপালের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে ।
ঝাড়খণ্ডের রাজ্যসভার ফলাফলের রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও বেড়েছে মধ্যপ্রদেশের ঘটনায় । সেখানেও অস্বস্তির মুখে পড়তে হয়েছে কংগ্রেসকে। মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেস নেত্রী মীনাক্ষী নটরাজনের রাজ্যসভা প্রার্থিতা ভোটগ্রহণের আগেই বাতিল হয়েছে । ৯ জুন রিটার্নিং অফিসার তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল করে দেন । কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, মীনাক্ষীর হলফনামায় প্রয়োজনীয় তথ্য ঠিকঠাকভাবে ছিল না । দলের অন্দরে মীনাক্ষীকে রাহুল গান্ধীর ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয়। ফলে এ ঘটনায় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের অবস্থান ঘিরেও প্রশ্ন উঠছে । যদিও, হাত শিবিরের একাংশের মতে, রাজনৈতিকভাবে প্রতিকূল রাজ্যে লড়াই করতে নেমে মীনাক্ষীর আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল । তিন বার লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এমন একজন নেত্রীর মনোনয়ন প্রযুক্তিগত কারণে বাতিল হওয়া বিস্ময়কর । তবে দলের অন্য অংশের সন্দেহ, এর নেপথ্যে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষও কাজ করে থাকতে পারে ।
ঝাড়খণ্ড এবং মধ্যপ্রদেশে যখন কংগ্রেস ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে ব্যস্ত, তখন কর্নাটকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি । সেখানে বিধানসভায় কংগ্রেসের সদস্যসংখ্যা ১৩৫ হলেও বিধান পরিষদ নির্বাচনে তাদের প্রার্থীরা পেয়েছেন ১৫১টি ভোট । ফলে স্পষ্ট হয়েছে, বিজেপি এবং জেডি(এস)-এর শিবিরে উল্লেখযোগ্য ‘ক্রস-ভোটিং’ হয়েছে । কংগ্রেসের ৫ প্রার্থী — থিপ্পান্নাপ্পা কামকনুর, পি ভি মোহন, বি কে হরিপ্রসাদ, শিবান্না বি এস এবং বিনয় কার্তিক প্রকাশ জয়ী হয়েছেন । বিজেপির লিঙ্গরাজ পাটিল এবং রঘু আর বাকি ২টি আসনে জিতেছেন । জেডি(এস) প্রার্থী গোবিন্দরাজু পরাজিত হয়েছেন । কর্নাটক বিজেপি সভাপতি বি ওয়াই বিজয়েন্দ্র দাবি করেছেন, বিজেপির ৫ থেকে ৬ জন এবং জেডি(এস)-এর ৬-৭ জন বিধায়ক দলবিরোধী ভোট দিয়েছেন । তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘যাঁরা ক্রস-ভোট করেছেন, তাঁদের কাউকেই ক্ষমা করা হবে না। প্রয়োজনীয় সব তথ্য আমাদের হাতে রয়েছে । শীঘ্রই কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।’
তবে জেডি(এস) নেতা তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এইচ ডি কুমারস্বামীর দাবি, তাঁদের দলে ৪ জন বিধায়ক ক্রস-ভোট করেছেন । তিনি বলেন, ‘কে দল ছাড়তে চাইছেন, তা আমি জানি । যাঁরা যেতে চান, যেতে পারেন। এই ফল আমাদের শিক্ষা দিয়েছে, অতি বিশ্বাস সব সময় ভাল নয় ।’ কংগ্রেসের নেতারা অবশ্য বলছেন, কর্নাটকের এ ফল নতুন মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার এবং প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি বি কে হরিপ্রসাদের রাজনৈতিক সাফল্য । তাঁরা শুধু নিজেদের বিধায়কদের একজোট রাখতেই সফল হননি, বিরোধী শিবিরের অসন্তোষকেও কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত ভোট টানতে পেরেছেন ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশ এবং কর্নাটকের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল কংগ্রেসের সামনে কঠিন সাংগঠনিক বাস্তবতা তুলে ধরেছে । বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধী শিবির ভাঙানোর অভিযোগ তুললেও, জাতীয় স্তরে বিকল্প রাজনৈতিক মেরুকরণের নেতৃত্ব দিতে গেলে কংগ্রেসকে আগে নিজেদের জোট, প্রার্থী নির্বাচন এবং বিধায়ক-পরিচালনার দক্ষতা আরও মজবুত করতে হবে । ২৯-এর লোকসভা লড়াইয়ের আগে এ বার্তাই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ।
❤ Support Us




