- দে । শ
- জুন ১৯, ২০২৬
ভারতে কীভাবে এল স্মার্ট মিটারের ধারণা ! বিদ্যুৎ বিলের স্বচ্ছ হিসাব, না কি বাড়বে খরচ ?
বাংলায় তৃণমূল জমানার শেষের দিক, পালাবদল এবং বিজেপির সরকার গঠনের সময়কাল জুড়ে, রাজনৈতিক বাদ-বিবাদের মাঝে আমজনতার মনে ধারাবাহিকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রশ্ন লাগাতার আলোচনার মধ্যে থেকেছে, কেন্দ্রে স্মার্ট মিটার। গতবছর রাজ্যজুড়ে আধুনিক প্রযুক্তির মিটার বসানোর কথা থাকলেও, বিক্ষোভ-আন্দোলনে সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে মমতা ব্যানার্জির সরকার। তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও প্রত্যন্ত এলাকায় স্মার্ট মিটার বসানোর ক্ষেত্রে প্রবল বিরোধিতা করেছিলেন।
এখন সময় পাল্টেছে, মসনদ রাজার নীতির বহু কিছুই বদলে দেয়। ক্ষমতায় এসেই বিজেপি সরকার এখন রাজ্যে স্মার্ট মিটার বসানোয় প্রবল উদ্যোগ নিয়েছে। প্রাথমিক ভাবে সরকারি কর্মচারিদের ক্ষেত্রে এটি বসানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যদিও, এর আগে মুখ্যমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছিলেন, কাউকে জোর করা হবে না। ফলে, সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র জল্পনা ধীরে ধীরে সব ঘরেই স্মার্ট মিটার বসাতে বাধ্য করবে নতুন সরকার।
বিদ্যুতের মিটার বলতে চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাড়ির দেওয়ালে লাগানো ছোট্ট বাক্স। মাসের শেষে মিটার রিডার এসে করেন ইউনিটের হিসাব, তার উপর ভিত্তি করেই তৈরি হয় বিল। কিন্তু ডিজিটাল ভারতের পথে এগোতে গিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাতেও শুরু হয়েছে প্রযুক্তির নতুন অধ্যায়। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে দ্রুত গতিতে বসানো হচ্ছে স্মার্ট মিটার। সরকারের দাবি, এর ফলে কমবে বিদ্যুৎ চুরি, নির্ভুল হবে বিলিং এবং আর্থিক সঙ্কটে জর্জরিত বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাগুলির হাল ফিরবে। তবে নাগরিকদের একাংশের প্রশ্ন, স্মার্ট মিটার কি সত্যিই ‘স্মার্ট’, নাকি এর আড়ালে রয়েছে বাড়তি খরচ, বিভ্রান্তি ও নজরদারির আশঙ্কা ?
স্মার্ট মিটার ধারণার জন্ম ভারতে নয়। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় বিদ্যুৎ গ্রিডকে আধুনিক করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। লক্ষ্য ছিল বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহকে ‘রিয়েল-টাইম’ তথ্যের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা। নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে তৈরি হয় ‘স্মার্ট গ্রিড’। ভারতে এ ভাবনার প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হয় ২০১০ সালে, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ-২ সরকারের আমলে। কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ মন্ত্রকের উদ্যোগে গঠিত হয় ‘ইন্ডিয়া স্মার্ট গ্রিড ফোরাম’। এরপর ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয় ‘জাতীয় স্মার্ট গ্রিড রোডম্যাপ’।
২০১২ সালে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে একাধিক স্মার্ট গ্রিড পাইলট প্রকল্প অনুমোদন করে কেন্দ্র। অসম, পাঞ্জাব, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ-সহ বিভিন্ন রাজ্যে পরীক্ষামূলক ভাবে স্মার্ট মিটার ও উন্নত মিটারিং পরিকাঠামো চালু করা হয়। তবে ইউপিএ সরকারের শেষ পর্বে প্রকল্পগুলি মূলত পরীক্ষামূলক স্তরেই সীমাবদ্ধ ছিল। বৃহৎ পরিসরে স্মার্ট মিটার বসানোর জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক মডেল, ডিজিটাল পরিকাঠামো কিংবা বণ্টন সংস্থাগুলির সক্ষমতা তখনো গড়ে ওঠেনি।
২০১৪ সালে কেন্দ্র ক্ষমতার পালাবদলের পর, স্মার্ট মিটার প্রকল্পে গতি আসে। ২০১৫ সালে এনডিএ সরকার চালু করে ‘জাতীয় স্মার্ট গ্রিড মিশন’, যার লক্ষ্য ছিল বিদ্যুৎ বণ্টন ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলা। মিটারিং, যোগাযোগ ব্যবস্থা, লোড ম্যানেজমেন্ট এবং তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয়ে বিদ্যুৎ বণ্টন ব্যবস্থাকে আধুনিক করার পরিকল্পনা। ২০১৭ সালে ‘এনার্জি এফিশিয়েন্সি সার্ভিসেস লিমিটেড’-এর মাধ্যমে শুরু হয় ‘স্মার্ট মিটার ন্যাশনাল প্রোগ্রাম’। ২০২১ সালে চালু হওয়া ‘রিভ্যাম্পড ডিস্ট্রিবিউশন সেক্টর স্কিম’ (আরডিএসএস)-এর মাধ্যমে স্মার্ট মিটার বসানোর কাজ আরও গতি পায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত দেশে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় ৫.২৮ কোটিরও বেশি স্মার্ট মিটার বসানো হয়েছে। লক্ষ্য, দেশের প্রায় ২৫ কোটি গ্রাহকের কাছে স্মার্ট মিটার পৌঁছে দেওয়া। বর্তমানে, ‘আরডিএসএস’ প্রকল্পের অধীনে অনুমোদিত হয়েছে প্রায় ১৯.৭৯ কোটি গ্রাহকের জন্য স্মার্ট মিটার।
বর্তমানে মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ, অসম, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, পাঞ্জাব-সহ বিভিন্ন রাজ্যে দ্রুত গতিতে স্মার্ট মিটার বসানো হচ্ছে। গুজরাটে ইতিমধ্যেই প্রায় ২৯ লক্ষ, অসমে সাড়ে ৪০ লক্ষের বেশি এবং মহারাষ্ট্রে কয়েক কোটি স্মার্ট মিটার স্থাপনের কাজ এগিয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে বিতর্কও। গোয়া, মহারাষ্ট্র-সহ বিভিন্ন রাজ্যে গ্রাহকদের একাংশের অভিযোগ, স্মার্ট মিটার বসানোর পর বিদ্যুতের বিল অনেকখানি বেড়েছে। বেড়েছে বিল মেটানো, হঠাৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হবার উদ্বেগও।
বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাগুলির দাবি অবশ্য ভিন্ন। তাদের মতে, স্মার্ট মিটার আরও নির্ভুল ভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার মাপ করছে, ছোটো ছোটো লোডের ব্যবহারও ধরছে, যা পুরনো মিটারে অনেক সময় ধরা পড়ত না। পাশাপাশি, মিটার রিডিংয়ে ভুল, বিদ্যুৎ চুরির সম্ভাবনাও আর নেই। কারণ, স্মার্ট মিটার প্রচলিত মিটারের মতো শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব রাখে না। পুরনো মিটারের সঙ্গে এর মূল পার্থক্য হল যোগাযোগ ব্যবস্থা। স্মার্ট মিটারের ভিতরে থাকা যোগাযোগ ব্যবস্থা নির্দিষ্ট সময় অন্তর তথ্য সরাসরি বণ্টন সংস্থার সার্ভারে পাঠায়। ফলে মিটার রিডারের প্রয়োজন হয় না। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘অ্যাডভান্সড মিটারিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ বা এএমআই। এতে বিদ্যুৎ চুরি বা কারচুপি সহজেই চিহ্নিত করা যায়।
বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোর দাবি, অদূর ভবিষ্যতে সময়ভিত্তিক বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ বা ‘টাইম-অব-ডে ট্যারিফ’-ও চালু করা সম্ভব হবে। গ্রাহক মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিজের বিদ্যুৎ ব্যবহারের খুঁটিনাটি তথ্য দেখতে পারবেন। তবে, সংস্থা বলুক না কেন, গোপনীয়তা, তথ্য সুরক্ষা এবং ‘প্রিপেড’ ব্যবস্থার কারণে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলির উপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। তাঁদের মতে, প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে, তাদের আস্থা অর্জন না করতে পারলে এ প্রকল্প কখনো পূর্ণ সাফল্য পাবে না।
ইতিহাস বলছে, ভারতে বিদ্যুৎ বণ্টন ব্যবস্থার দুর্বলতা নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার পর থেকে উৎপাদন বাড়লেও বিদ্যুৎ চুরি, বিল সংগ্রহে অনিয়ম, অবকাঠামোগত ক্ষতি এবং বণ্টন সংস্থাগুলির বিপুল আর্থিক লোকসান ক্রমশ গভীর হয়েছে। বিদ্যুৎ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বহু রাজ্যে ‘অ্যাগ্রিগেট টেকনিক্যাল অ্যান্ড কমার্শিয়াল’ বা ‘এটিঅ্যান্ডসি’ ক্ষতির হার দীর্ঘদিন ধরেই ২০ শতাংশের উপরে ছিল। বিপুল এই ক্ষতি কমানোর জন্য প্রয়োজন ছিল এমন এক ব্যবস্থা, যা ‘রিয়েল-টাইম’ বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে এবং বণ্টন সংস্থাকে তাৎক্ষণিক নজরদারির সুযোগ দেবে। এ প্রয়োজন থেকেই স্মার্ট মিটার ধারণা উঠে আসে।
চমকপ্রদভাবে এ বৃহত্তর প্রযুক্তিনির্ভর শক্তি-নীতির ভাবনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, ড. এ পি জে আব্দুল কালামের নামও। স্মার্ট মিটারের পরিকল্পনার নেপথ্যে তাঁর সরাসরি কোনো প্রশাসনিক ভূমিকা না থাকলেও, ভারতের শক্তি-স্বনির্ভরতা নিয়ে তাঁর ভাবনা আজকের স্মার্ট গ্রিড নীতির সঙ্গে আশ্চর্যভাবে মিলে যায়। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়া ২০২০: আ ভিশন ফর দ্য নিউ মিলেনিয়াম’ বইয়ে ড. কালাম প্রযুক্তিনির্ভর, জ্ঞানভিত্তিক এবং শক্তি-স্বনির্ভর ভারতের কথা বলেছিলেন। তিনি মনে করতেন, উন্নত ভারত গড়তে হলে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, ডিজিটাল পরিকাঠামো, শক্তির স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
রাষ্ট্রপতি পদ থেকে বিদায়ের আগে ২০০৭ সালে সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণেও তিনি ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের ‘এনার্জি ইন্ডিপেন্ডেন্স’-এর লক্ষ্য নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তি, প্রযুক্তিনির্ভর গ্রিড এবং তথ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার উপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, স্মার্ট মিটার আসলে কালামের সেই বৃহত্তর ‘স্মার্ট এনার্জি ইকোসিস্টেম’-এরই একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কারণ, সৌরশক্তি বা বায়ুশক্তির মতো অনিয়মিত নবায়নযোগ্য উৎসকে কার্যকর ভাবে গ্রিডে যুক্ত করতে হলে রিয়েল-টাইম তথ্য সংগ্রহ এবং চাহিদা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা অপরিহার্য।
❤ Support Us




