Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • জুন ১৮, ২০২৬

আকাশে ঘাতক ড্রোনের ঝাঁক, জ্বলছে তেল শোধনাগার। পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর মস্কোয় ইউক্রেনের সবচেয়ে বড়ো হামলা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
আকাশে ঘাতক ড্রোনের ঝাঁক, জ্বলছে তেল শোধনাগার। পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর মস্কোয় ইউক্রেনের সবচেয়ে বড়ো হামলা

ভোরের আলো ফোটার আগেই আকাশ জুড়ে ভনভন শব্দ। তার পর একের পর এক বিস্ফোরণ। মুহূর্তের মধ্যে কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেল রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর একাংশ। রাশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগার তখন ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় দাউদাউ জ্বলছে। রাশিয়ার দাবিপূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর এটাই ইউক্রেনের সবচেয়ে ঘাতক ড্রোন আক্রমণ। রুশ রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা টাস জানিয়েছেরাজধানীর কাপোতন্যা প্রশাসনিক জেলায় অবস্থিত ওই তেল শোধনাগারে অন্তত টি ড্রোন আঘাত হানে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় বৃহৎ জ্বালানি ট্যাঙ্কের ঢাকনা কয়েক মিটার উঁচুতে ছিটকে পড়ে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা গিয়েছেশোধনাগারের ভিতর থেকে আগুনের গোলা আকাশে ছিটকে উঠছে, আর তার সঙ্গে ঘন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী ভেসে যাচ্ছে রাজধানীর আকাশে।

মস্কো তেল শোধনাগারটি রাশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিকাঠামো। বছরে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ টন তেল পরিশোধনের ক্ষমতা রয়েছে ই কেন্দ্রের। ইউক্রেনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম কিয়েভ পোস্ট’-এর দাবিমস্কো  সংলগ্ন অঞ্চলে ব্যবহৃত মোট পেট্রলের প্রায় ৭০ শতাংশের জোগান আসে এই শোধনাগার থেকে। গত এক মাসে এটি তৃতীয় বার, চলতি সপ্তাহে দ্বিতীয় বার ইউক্রেনীয় হামলার নিশানা হলো এটি। মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানিয়েছেনবৃহস্পতিবার রাতভর রাজধানীমুখী অন্তত ১৯৪টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তবে হামলার পরিধি শুধু মস্কোয় সীমাবদ্ধ ছিল না। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দাবিগত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোট ৫৫৫টি ইউক্রেনীয় ড্রোন, টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। আজভ সাগরের উপর দিয়েও একাধিক ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। ইউক্রেনীয় সূত্রের দাবিগোটা অভিযানে প্রায় ১,০০০ ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল। অন্য দিকেইউক্রেনীয় বিমানবাহিনীর দাবিপাল্টা হামলায় রাশিয়া টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২৩৯টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। কিয়েভ এবং পোলতাভা অঞ্চলের একাধিক জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তবে এত বড়ো আক্রমণ সত্ত্বেও মস্কোতে কোনো বিমান হামলা সতর্কীকরণ সাইরেন বাজানো হয়নি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছেভোরে বিস্ফোরণের শব্দে ঘুম ভাঙার পর বহু বাসিন্দা বিভ্রান্ত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। জানালার বাইরে দেখা যায়আকাশে উড়ছে ড্রোনদূরে জ্বলছে আগুনআর চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে পোড়া তীব্র গন্ধ। শুধু তেল শোধনাগার নয়ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বহুতল আবাসন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শপিং কমপ্লেক্স এবং একাধিক বাড়ি। বেশ কয়েকটি আবাসিক বহুতল ভবন দ্রুত খালি করে দেওয়া হয়। মস্কো অঞ্চলের গভর্নর আন্দ্রেই ভোরোবিয়ভ জানিয়েছেনহামলায় অন্তত ১৭ জন আহত হয়েছেন। ড্রোন হামলা আর তার পরবর্তী অগ্নিকাণ্ডে কার্যত থমকে যায় মস্কোর জনজীবন। শোধনাগারের কাছাকাছি রাজধানীর রিং রোডে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। রুশ সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বিমান চলাচলেও ব্যাপক প্রভাব পড়ে। ডোমোদেদোভোভনুকোভোশেরেমেতিয়েভো এবং ঝুকভস্কি— মস্কোর টি প্রধান বিমানবন্দরে পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়।  শতাধিক উড়ান বাতিল বা বিলম্বিত হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, নিরাপত্তাজনিত কারণে বিমানবন্দরগুলির সমস্ত উড়ান পরিষেবা স্থগিত রাখা হয়েছিল।

অন্যদিকে, ব্রাসেলসে ন্যাটো নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দিতে গিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বৃহস্পতিবারের হামলাকে রাশিয়ার হামলার সম্পূর্ণ ন্যায্য জবাব’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা যুদ্ধ চাই না, কখনো চাইনি। কিন্তু যদি ইউক্রেন আগুনে জ্বলেতা হলে মস্কোও জ্বলবে। আগ্রাসন বন্ধ করার, যুদ্ধ শেষ করার সময় এসেছে।’ গত সপ্তাহে কিয়েভের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ইউনেস্কো স্বীকৃত একটি ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনায় রুশ হামলার জবাব হিসেবেই এ ড্রোন অভিযান চালানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। কাজান শহরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নেতাদের নিয়ে আয়োজিত এক সম্মেলনে ব্যস্ত রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এখনো পর্যন্ত  হামলা নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।

উল্লেখ্য, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বাজেটের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ আয় আসে তেল খাত থেকে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন  আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার জেরে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই রুশ তেলের ক্রেতা কমেছে। যদিও সাম্প্রতিক পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে কিছুটা সুবিধা পেয়েছে মস্কো। কিন্তু, ২০২৪ সাল থেকে রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলিতে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। কিয়েভের লক্ষ্যমস্কোর যুদ্ধ অর্থনীতির মেরুদণ্ডে আঘাত হানা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমীক্ষা বলছেপূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার ৩৩টি প্রধান তেল শোধনাগারের মধ্যে অন্তত ২৪টিতে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। ২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ ধরনের হামলার সংখ্যা পৌঁছেছে ১৫৮-তে।

এই ধারাবাহিক হামলার ফলে কিরিশিরিয়াজানসামারা এবং পার্ম-সহ একাধিক শোধনাগারে বারবার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। তীব্র হামলার সময় রাশিয়ার মোট পরিশোধন ক্ষমতার ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অচল হয়ে পড়েছিল বলে বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে এসেছে। একাধিক সময়ে রাশিয়ার তেল পরিশোধনের পরিমাণ দৈনিক ৫০ লক্ষ ব্যারেলেরও নিচে নেমে গিয়েছে। তার ফলে দেশে পেট্রল ও ডিজেলের ঘাটতি দেখা দিয়েছেসাময়িক রফতানি নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজারেজ্বালানির দাম বেড়েছে। ফলে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদক রাশিয়া,  জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় চলতি মাসেই সমুদ্রপথে জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা করছে। 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!