- দে । শ
- জুন ১৮, ২০২৬
টেলিগ্রামের উপর নিষেধাজ্ঞার দাবি কেন্দ্রের, ১৫ কোটি ব্যবহারকারীর অধিকার খর্ব কীভাবে? প্রশ্ন হাই কোর্টের
প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে সাইবার প্রতারণা, শিশু যৌন নির্যাতন-সংক্রান্ত সামগ্রী ছড়ানো থেকে সন্ত্রাসবাদী প্রচার— জনপ্রিয় মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম টেলিগ্রামের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে দিল্লি হাই কোর্টে হলফনামা পেশ করল কেন্দ্র। সরকারের দাবি, টেলিগ্রাম কার্যত ‘নয়া ডার্ক ওয়েব’-এ পরিণত হয়েছে, যেখানে অপরাধীচক্র, সাইবার জালিয়াত, উগ্রপন্থী সংগঠন এবং বিশৃঙ্খলাকারী গোষ্ঠী নির্বিঘ্নে যোগাযোগ রক্ষা করছে।
কেন্দ্রের এ অবস্থানকে ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলেছে দিল্লি হাই কোর্ট। ‘নিট-ইউজি’ পুনঃপরীক্ষার আগে টেলিগ্রামের উপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও, এদিন বিচারপতি তেজস কারিয়ার বেঞ্চ জানতে চেয়েছে, মাত্র একাংশ পরীক্ষার্থীর স্বার্থরক্ষার জন্য দেশের প্রায় ১৫ কোটি ব্যবহারকারীর অধিকার কীভাবে সীমিত করা যায়। কেন্দ্রের দাবি, টেলিগ্রামের গোপনীয়তা-ভিত্তিক প্রযুক্তিগত কাঠামোই আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলির কাজকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে। হলফনামায় বলা হয়েছে, ব্যবহারকারীরা সহজেই নিজেদের ফোন নম্বর এবং টেলিগ্রাম আইডি গোপন রাখতে পারেন। ফলে অ্যাকাউন্টের নেপথ্যে থাকা প্রকৃত ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
সরকারের বক্তব্য, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অপরাধে টেলিগ্রামের ব্যবহার ক্রমশ বেড়েছে। বিশেষ করে ‘নিট’ প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে আসার পরই প্ল্যাটফর্মটির ভূমিকা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ ছাড়াও মাদক পাচার, আর্থিক জালিয়াতি, সাইবার অপরাধ, শিশু যৌন শোষণ-সংক্রান্ত সামগ্রী আদানপ্রদান এবং সন্ত্রাসবাদী প্রচারের ক্ষেত্রেও টেলিগ্রামকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবি কেন্দ্রের। হলফনামায় কেন্দ্র জানিয়েছে, ‘টেলিগ্রাম নতুন ডার্ক ওয়েবে পরিণত হয়েছে। অপরাধীরা বিভিন্ন চ্যানেলের মাধ্যমে ডিপ ওয়েবের লিঙ্ক ভাগ করে নিচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত ডার্ক ওয়েব ফোরামের সঙ্গে যুক্ত। এর ফলে অপরাধীদের শনাক্ত করা কিংবা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।’
সরকারের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানান, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনস্থ ‘ইন্ডিয়ান সাইবার ক্রাইম কো-অর্ডিনেশন সেন্টার’-এর নিয়মিত রিপোর্টে টেলিগ্রামের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে। মেহতার বক্তব্য, টেলিগ্রামের অন্যতম সমস্যা তার ‘বট’ পরিকাঠামো। একটি অ্যাকাউন্ট থেকে সর্বাধিক ৪০টি বট তৈরি করা সম্ভব। এই বটগুলি আবার স্বয়ংক্রিয় ভাবে তথ্য ছড়াতে ও নতুন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষম। আদালতে মেহতা বলেন, ‘বটগুলি যন্ত্রচালিত। এগুলি নিজেদের আরও বিস্তার ঘটাতে পারে। টেলিগ্রামের এই বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত জটিল নেটওয়ার্ক তৈরির সুযোগ দেয়, যেখানে মানুষের হস্তক্ষেপ ন্যূনতম।’ সরকারের দাবি, কোনো বট বা অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যে নতুন নামে একই ধরনের অ্যাকাউন্ট তৈরি হয়ে যায়। ফলে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার পদক্ষেপ অনেক ক্ষেত্রেই সাময়িক ফল দেয়।
আদালতে কেন্দ্র আরও জানিয়েছে, টেলিগ্রামের ‘ক্লাউড-ভিত্তিক’ কাঠামো তদন্তকে আরও কঠিন করে তোলে। ব্যবহারকারী অ্যাকাউন্ট মুছে ফেললে তার সঙ্গে যুক্ত সমস্ত বার্তা, ছবি, ভিডিও এবং সংরক্ষিত তথ্যও মুছে যায়। ফলে অপরাধমূলক কার্যকলাপের ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহে সমস্যা তৈরি হয়। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও তুলে ধরেছে কেন্দ্র। অভিযোগ, তাদের হাতে থাকা রিপোর্ট অনুযায়ী, সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলির কাছে টেলিগ্রামই বর্তমানে সবচেয়ে পছন্দের যোগাযোগমাধ্যম। বিভিন্ন গোষ্ঠী টেলিগ্রাম চ্যানেল ও গ্রুপ ব্যবহার করে উগ্রপন্থী মতাদর্শ প্রচার করছে, বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে এবং জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার চেষ্টা করছে।
হলফনামায় শিশু যৌন নির্যাতন-সংক্রান্ত সামগ্রী ছড়িয়ে পড়া নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি অভিযোগ, সাইবার অপরাধীরা ভুয়ো পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে আর্থিক প্রতারণা, তথ্য চুরি, ‘ম্যালওয়্যার’ ছড়ানো এবং অর্থপাচারের কাজ চালাচ্ছে। কেন্দ্র জানিয়েছে, ‘ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম রিপোর্টিং পোর্টাল’-এ টেলিগ্রাম-সংক্রান্ত অভিযোগের সংখ্যা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ‘মিউল অ্যাকাউন্ট’ কেনাবেচা, চুরি যাওয়া তথ্যের আদানপ্রদান এবং নাগরিকদের আধার-সহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ক্ষেত্রেও টেলিগ্রাম ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।এ ছাড়া পাইরেটেড সিনেমা, ওয়েব সিরিজ এবং অন্যান্য কপিরাইট-সুরক্ষিত সামগ্রী ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও টেলিগ্রামকে দায়ী করেছে কেন্দ্র।
প্রসঙ্গত, গত ৩ মে আয়োজিত ‘নিট ইউজি’ পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁস-সহ একাধিক অনিয়মের অভিযোগে বাতিল করে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি। আগামী ২১ জুন পুনঃপরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সে পরীক্ষাকে ঘিরেই ২২ জুন পর্যন্ত টেলিগ্রামের উপর সাময়িক বিধিনিষেধ জারি করেছে কেন্দ্র। গোটা ঘটনার তদন্ত করছে সিবিআই। পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে বার্তা দিয়ে ‘এনটিএ’ জানিয়েছে, পুনঃপরীক্ষা ‘নিরাপদ, সুরক্ষিত ও নিরপেক্ষ’ পরিবেশে আয়োজন করা হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক, রাজ্য সরকার এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলির সঙ্গে সমন্বয় করে একাধিক স্তরে নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে তারা। পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে সংস্থার আবেদন, ‘গুজবে কান না দিয়ে শুধুমাত্র সরকারি সূত্রের উপর ভরসা রাখুন। নিজের প্রস্তুতির উপর আস্থা রাখুন। শান্ত থাকুন এবং নির্ধারিত দিন পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছে নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করুন।’ অভিভাবক ও সমাজের বৃহত্তর অংশকে পরীক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমাতে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে এনটিএ।
❤ Support Us







