- বি। দে । শ
- জুন ১৮, ২০২৬
অবশেষে পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতে ইতি ! সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর আমেরিকা-ইরানের, শীঘ্রই খুলবে হরমুজ
প্রায় চার মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাত, হামলা-পাল্টা হামলা, নৌ অবরোধ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপের পর অবশেষে আলোচনার পথে হাঁটতে সম্মত হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। বহু জল্পনার অবসান ঘটিয়ে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। দুই দেশের দাবি, এ চুক্তির মাধ্যমে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হচ্ছে, খুলে যাচ্ছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তির রূপরেখা তৈরির জন্য আলোচনার নতুন পর্ব শুরু হবে বলেও জানা যাচ্ছে।
ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বুধবার গভীর রাতে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ-কে জানান, দু–দেশের রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের মাধ্যমে সমঝোতা স্মারকের চূড়ান্ত পাঠ অনুমোদিত হয়েছে। জানা গিয়েছে, এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর হয়েছে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। প্রথমে ঠিক হয়েছিল, শুক্রবার সুইৎজারল্যান্ডের জেনেভায় দু–দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিক ভাবে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগেই ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে সই-সাবুদ সম্পন্ন হওয়ায় জেনেভার কর্মসূচি ঘিরে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। যদিও তেহরান জানিয়েছে, আলোচক দলগুলির জেনেভা সফর এখনো নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী হবে। সামনাসামনি বৈঠক হবে কি না, তা নিয়ে আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। ফ্রান্সে ‘জি-৭ সম্মেলন’-পরবর্তী নৈশভোজে যোগ দিতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও চুক্তি স্বাক্ষরের কথা নিশ্চিত করেছেন। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘চুক্তিতে সই হয়েছে। আমি ভার্সাইয়েই সই করেছি। এইমাত্র সই করলাম।’ পরে হোয়াইট হাউসও সেই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করেছিল আমেরিকা ও ইজরায়েল। প্রায় ১১০ দিন ধরে চলা এই সংঘাতে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠেছিল। গত ৮ এপ্রিল ঘোষিত অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির ফলে সংঘর্ষের তীব্রতা কিছুটা কমলেও স্থায়ী সমাধানের কোনো ইঙ্গিত মেলেনি। নতুন এই সমঝোতা সেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়িয়ে দিল। ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকে অবিলম্বে সব ধরনের শত্রুতামূলক কার্যকলাপ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। নথিতে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, লেবানন-সহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ী ভাবে বন্ধ করা হবে। চুক্তির আওতায় শুধু ইরান নয়, গোটা পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত প্রশমনের লক্ষ্যে বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে।
তবে সমঝোতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বে রফতানি হওয়া তেল ও গ্যাসের বড়ো অংশ পরিবহণ করা হয়। ইরানের বাধার কারণে জ্বালানি, সার এবং অন্যান্য পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি ও ঘাটতি ঘটেছিল। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ইরানকে ঘিরে আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। একই সময়ে যুদ্ধ-পূর্ব পরিস্থিতি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে কাজ করবে ওয়াশিংটন।
বিনিময়ে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সমঝোতা স্মারকের একাংশে উল্লেখ করা হয়েছে, আগামী ৬০ দিন কোনো অতিরিক্ত শুল্ক ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবে তেহরান। যদিও পরে বাঘাই জানিয়েছেন, ওমানের সঙ্গে যৌথ ভাবে হরমুজ প্রণালির নতুন প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে এবং সেখানে পরিষেবা বাবদ শুল্ক আরোপের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। এ অবস্থান ইতিমধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে। কারণ, আমেরিকার পক্ষ থেকে আগে দাবি করা হয়েছিল যে হরমুজ প্রণালি স্থায়ী ভাবে শুল্কমুক্ত রাখা হবে।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যা ঘিরেই তীব্র এ সংঘাতের সূত্রপাত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, ইরান যাতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সে লক্ষ্যেই সামরিক অভিযান শুরু হয়েছিল। নতুন চুক্তিতে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে ‘পরমাণু অস্ত্র প্রসার রোধ চুক্তি’র আওতায় পুনরায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। একই সঙ্গে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে আগামী দিনে আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে তেহরান। তবে ভিন্ন সূত্রের খবর, তেহরান ওয়াশিংটনকে জানিয়ে দিয়েছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কোনো অবস্থাতেই আলোচনার বিষয় হবে না। কারণ ক্ষেপণাস্ত্র দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ, তা নিয়ে বহিঃশক্তির সঙ্গে আলোচনা করা যায় না। এমনকি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত বিদেশে পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা নেই তেহরানের। তবে ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধির মাত্রা কমানোর বিষয়টি আলোচনার টেবিলে থাকতে পারে। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ৬০ দিনের আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
সমঝোতা স্মারকে ইরানের তেল ও জ্বালানি খাতের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে শিথিল করার কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের আওতায় ইরানের বিরুদ্ধে জারি থাকা কিছু বিধিনিষেধও পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে মার্কিন প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নির্ভর করবে ইরান চুক্তির শর্ত কতটা মেনে চলছে, তার উপর। পাশাপাশি, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের কথাও উল্লেখ রয়েছে সমঝোতা স্মারকে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, আঞ্চলিক সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয় করে এই তহবিল গড়ে তোলা হবে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের একাংশ জানিয়েছে, আমেরিকার নিজস্ব কোষাগার থেকে এ প্রকল্পে অর্থ ব্যয় করা হবে না। সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো আঞ্চলিক অংশীদারদের বিনিয়োগে ইরানের পরিকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। তবে, চুক্তি অনুযায়ী, ইরানের বাজেয়াপ্ত সম্পদের একাংশ ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়া হবে। বাকি সম্পদ ফেরানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে ভবিষ্যতের দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ভিত্তিতে।
সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলি বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের জন্য আমেরিকা এবং ইরানের যৌথ তত্ত্বাবধানে একটি পর্যবেক্ষক দল গঠনের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। যদিও সে দল কী ভাবে কাজ করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। স্মারকের লিখিত খসড়া ৮০০ শব্দেরও কম। ফলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিংবা সেনা প্রত্যাহারের মতো একাধিক স্পর্শকাতর বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। কূটনৈতিক মহলের ধারণা, আগামী ৬০ দিনের আলোচনায় এই বিষয়গুলিরই বিস্তারিত রূপরেখা তৈরি হবে। চুক্তির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, দুই রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর থেকেই চুক্তির শর্ত কার্যকর হতে শুরু করবে।
প্রসঙ্গত, ইসলামাবাদে একাধিক দফা বৈঠক হলেও প্রথম দিকে আলোচনায় বিশেষ অগ্রগতি হয়নি। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আমেরিকা-ইরান সমঝোতার পথে হাঁটতে রাজি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অন্য দিকে, চুক্তি নিয়ে আমেরিকার অভ্যন্তরেও শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। রিপাবলিকান দলের একাংশের অভিযোগ, ইরানের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয় অবস্থান নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। যদিও হোয়াইট হাউসের দাবি, আপস নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে নেওয়া কৌশলগত সিদ্ধান্ত। জানা যাচ্ছে, চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর ট্রাম্প ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গেও কথা বলেন। ট্রাম্প জানান, নেতানিয়াহুকে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, এই সমঝোতা ইজরায়েলের নিরাপত্তার পক্ষেও কেন গুরুত্বপূর্ণ।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি, ‘আমি চাই না ইজরায়েলে কোনো পরমাণু হামলা হোক। আমি তাঁকে বলেছি, এ চুক্তি ইজ়রায়েলের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেবে।’ তিনি আরও দাবি করেছেন, ইরান যদি পরমাণু অস্ত্র অর্জন করে, তা হলে ইজরায়েলের অস্তিত্বই বিপন্ন হতে পারে। সে কারণেই এই চুক্তি ইজরায়েলের জন্যও জরুরি। ট্রাম্পের দাবি, নেতানিয়াহু তাঁর এই অবস্থানের সঙ্গে একমত হয়েছেন, চুক্তি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশও করেছেন। তবে বাস্তব পরিস্থিতি এতটা সরল নয় বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল। কারণ, সপ্তাহের শুরুতেই নেতানিয়াহু জানিয়েছিলেন, হিজবুল্লার বিরুদ্ধে লেবাননে অভিযান চালিয়ে যাবে ইজরায়েলি সেনা। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘আমি যত দিন প্রধানমন্ত্রী থাকব, এই অভিযান চলবে।’ শুধু তা-ই নয়, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে ইজরায়েলের আপত্তির খবরও সামনে এসেছিল। সে সময় না কি ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়ায় কোনো বাধা সৃষ্টি করা ইজরায়েলের উচিত হবে না।
এনতুন সমঝোতা চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে ইউরোপ-সহ পশ্চিম এশিয়ার একাধিক দেশ। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ প্রশস্ত করবে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে যাওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ইউরোপীয় নেতাদেরও বক্তব্য, এ চুক্তি পশ্চিম এশিয়ায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত করতে পারে। একই সঙ্গে তাঁরা জোর দিয়ে বলেছেন, ইরানকে কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না। হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচলও নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা যতটা সহজ, তাকে স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানে পরিণত করা ততটাই কঠিন। পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, লেবাননের পরিস্থিতি এবং ইজরায়েলের নিরাপত্তা— এ সমস্ত প্রশ্নের উত্তরই আগামী ৬০ দিনের আলোচনায় খুঁজতে হবে। আগামী দুই মাসেই স্পষ্ট হবে, এই সমঝোতা পশ্চিম এশিয়ায় স্থায়ী শান্তির ভিত্তি গড়তে পারে কি না।
❤ Support Us








