- বি। দে । শ
- জুন ১৮, ২০২৬
বঙ্গোপসাগরে নজর পাকিস্তানের ? চিনা ‘হ্যাঙ্গর’ সাবমেরিন ঘিরে বাড়ছে দিল্লির সতর্কতা
করাচি থেকে বিশাখাপত্তনম— দূরত্ব প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার। এবার এই ভৌগোলিক ব্যবধানই সঙ্কুচিত করতে চাইছে ইসলামাবাদ। চিন-নির্মিত নতুন ‘হ্যাঙ্গর’ শ্রেণির সাবমেরিন হাতে পেয়েই বঙ্গোপসাগরে দীর্ঘমেয়াদি নৌ-উপস্থিতির ইঙ্গিত দিয়েছে পাকিস্তান। আর তাতেই দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণে নতুন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
সম্প্রতি করাচিতে পৌঁছেছে পাক-নৌবাহিনীর নতুন সাবমেরিন ‘পিএনএস হ্যাঙ্গর’। চিনে কমিশনপ্রাপ্ত এই সাবমেরিন পাকিস্তানের বৃহত্তম নৌ-আধুনিকীকরণ কর্মসূচির প্রথম ধাপ। পড়শি দেশের পরিকল্পনা, আগামী কয়েক বছরে এ ধরনের মোট আটটি সাবমেরিন নৌবহরে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
তবে শুধু নতুন যুদ্ধসামগ্রী হাতে পাওয়াই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের আবেগ আর কৌশলগত বার্তা। ‘হ্যাঙ্গর’ নামটি ফিরিয়ে এনে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের স্মৃতিকে উস্কে দিয়েছে পাকিস্তান। সে বছর পাকিস্তানি সাবমেরিন ‘পিএনএস হ্যাঙ্গর’-এর টর্পেডো হামলায় ডুবে গিয়েছিল ভারতীয় নৌবাহিনীর ‘আইএনএস খুকরি’। স্বাধীনতার পর যুদ্ধে ভারতীয় নৌবাহিনীর কোনো যুদ্ধজাহাজ ডোবার সেটিই ছিল প্রথম ঘটনা। যদিও পাকিস্তানের ওই সাফল্য যুদ্ধের সামগ্রিক ফল বদলাতে পারেনি। স্থল, আকাশ আর সমুদ্রে ভারতের সম্মিলিত আক্রমণে চূড়ান্ত পরাজয় হয় পাকিস্তানের। জন্ম হয় বাংলাদেশের।
পরাজয়ের পর গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পাকিস্তানের নৌ-সক্রিয়তা মূলত আরব সাগরেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাতে চাইছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তান নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্তারা প্রকাশ্যে জানাচ্ছেন, নতুন ‘হ্যাঙ্গর’ শ্রেণির সাবমেরিন তাদের বঙ্গোপসাগরে নিয়মিত উপস্থিতি বজায় রাখার সক্ষমতা দিতে পারে। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কায় এক অনুষ্ঠানে পাকিস্তান নৌবাহিনীর কমোডর ওমর ফারুক এই সাবমেরিনকে ‘গেম চেঞ্জার’ বলে বর্ণনা করেন। তাঁর দাবি, এই সাবমেরিন পাকিস্তানকে আরব সাগরের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কার্যকর উপস্থিতি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, বঙ্গোপসাগর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, এই জলভাগেই রয়েছে ভারতের পূর্ব নৌ-কমান্ডের সদর দফতর বিশাখাপত্তনমে। কাছেই আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য এবং জ্বালানি পরিবহণের অন্যতম প্রধান রুটও এই অঞ্চল। পাশাপাশি ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসায় বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কাকে ঘিরে থাকা এই জলভাগে ক্রমশ বাড়ছে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, পাকিস্তানের নয়া পরিকল্পনা শুধুমাত্র সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নয়, বরং ভারত মহাসাগরে নিজেদের বৃহত্তর ভূ-কৌশলগত উপস্থিতি জানান দেওয়ার প্রচেষ্টাও বটে।
নতুন ‘হ্যাঙ্গর’ সাবমেরিনগুলির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ‘এয়ার-ইন্ডিপেনডেন্ট প্রপালশন’ বা ‘এআইপি’ প্রযুক্তি। প্রচলিত ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিনকে ব্যাটারি চার্জের জন্য নির্দিষ্ট সময় অন্তর ভেসে উঠতে হয় বা ‘স্নরকেল’ ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু ‘এআইপি’ প্রযুক্তির সাহায্যে দীর্ঘ সময় জলের নীচে থাকা সম্ভব। ফলে এ ধরনের সাবমেরিনকে শনাক্ত করা তুলনামূলক ভাবে কঠিন। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই প্ল্যাটফর্ম পাকিস্তানের সমুদ্রভিত্তিক পরমাণু সক্ষমতার অংশও হতে পারে। যদিও ইসলামাবাদ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
পাকিস্তানের নতুন নৌ-উদ্যোগের সময়কালও তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামরিক যোগাযোগ উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর ফের চালু হয়েছে ঢাকা-করাচি সরাসরি বিমান পরিষেবা। বেড়েছে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য। সাংস্কৃতিক বিনিময়ও নতুন মাত্রা পেয়েছে। সামরিক ক্ষেত্রেও দু–দেশের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে। বাংলাদেশ ‘জেএফ-১৭’ যুদ্ধবিমান কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে। দুই দেশের নৌবাহিনী যৌথ সামুদ্রিক মহড়াতেও অংশ নিয়েছে।
গত বছরের নভেম্বরে পাকিস্তান নৌবাহিনীর ‘ফ্রিগেট পিএনএস সইফ’ চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছিল। ১৯৭১ সালের পর প্রথমবার কোনো পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ বাংলাদেশে ঢোকে। দু–দেশের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা চলছে বলেও বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। যদিও বাংলাদেশে পাকিস্তানি সামরিক সম্পদ মোতায়েন বা স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তোলার বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি। তবে পরিবর্তিত সমীকরণ কৌশলগত মহলে নতুন প্রশ্ন তুলছে। বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের উপস্থিতি সীমিত হলেও, তা ভারতের কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। কারণ, নয়াদিল্লি দীর্ঘ দিন ধরেই এই অঞ্চলকে নিজেদের কৌশলগত প্রভাব বলয়ের অংশ হিসেবে দেখে এসেছে।
অবশ্য বর্তমান বাস্তবতা ১৯৭১ সালের থেকে অনেকটাই আলাদা। গত পাঁচ দশকে ভারতীয় নৌবাহিনী ব্যাপক ভাবে শক্তিশালী হয়েছে। পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন, বিমানবাহী রণতরী এবং দীর্ঘ-পাল্লার সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থার সাহায্যে আরব সাগর এবং বঙ্গোপসাগর— দুই ক্ষেত্রেই ভারতের উপস্থিতি এখন অনেক বেশি সুসংহত। ফলে পাকিস্তানের নতুন সাবমেরিন হয়তো অবিলম্বে বঙ্গোপসাগরের শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারবে না। কিন্তু ইসলামাবাদের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা যে দক্ষিণ এশিয়ার নৌ-কৌশলগত মানচিত্রে নতুন কৌশল মাত্রা যোগ করছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
❤ Support Us







