- মা | ঠে-ম | য় | দা | নে
- জুন ১৮, ২০২৬
বিশ্বকাপ জ্বরে ঘুম উধাও, বাড়ছে হৃদস্পন্দনের গতি ? ফুটবলপ্রেমীদের স্বাস্থ্যে নজর গবেষকদের
ফুটবল বিশ্বকাপের মরশুমে একটি গোল, একটি ‘সেভ’ বদলে দিতে পারে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মেজাজ। শেষ মুহূর্তের সমতা ফেরানো গোল, পেনাল্টি, টাইব্রেকারের টানটান উত্তেজনা, লাল কার্ডের নাটকীয়তা কিংবা অঘটনের শঙ্কা — এসব কিছুর মধ্যেই কোটি কোটি সমর্থকের শরীরে ঘটে যায় অদৃশ্য নানা পরিবর্তন। হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, মানসিক চাপ বাড়ে, ঘুমের ছন্দ বিঘ্নিত হয়। এসব পরিবর্তন কি বৈজ্ঞানিক ভাবে মাপা সম্ভব ? জার্মানির বিলেফেল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের দাবি, আধুনিক স্মার্টওয়াচই দিতে পারে সে উত্তর।
২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ‘ফুটবল ফিভার স্টাডি’ নামে এক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকল্প শুরু করেছে বিলেফেল্ড বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষণার লক্ষ্য, ফুটবল ম্যাচ চলাকালীন এবং তার আগে-পরে সমর্থকদের শরীরে ঠিক কী ধরনের শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটে, তা বিশদে বোঝা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ফুটবলপ্রেমীদের স্মার্টওয়াচ এবং ফিটনেস ট্র্যাকার থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হবে, মাঠের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সঙ্গে দর্শকদের শারীরিক প্রতিক্রিয়ার কতটা সম্পর্ক রয়েছে।
গবেষকরা জানাচ্ছেন, ফুটবল কেবল বিনোদন নয়, এ এক গভীর আবেগঘন অভিজ্ঞতা। স্টেডিয়ামে হাজার হাজার মানুষের গর্জনের অংশ হওয়া কিংবা টিভির সামনে বসে উদ্বেগ, প্রত্যাশা আর উচ্ছ্বাস শরীরে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা এর আগে বড়ো পরিসরে আগে কখনো বিশ্লেষণ করা হয়নি। সে কারণেই বিশ্বের সব দেশের সমর্থকদের গবেষণায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণার ধরন এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে অংশগ্রহণের সুযোগ যত বেশি সম্ভব মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। বর্তমানে ১৩টি জনপ্রিয় স্মার্টওয়াচ ও ফিটনেস প্ল্যাটফর্মের ব্যবহারকারীরা এতে যোগ দিতে পারবেন। গবেষণাটি পরিচালিত হচ্ছে বিলেফেল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফোকাস এরিয়া কোয়ামু’ বা ‘কোয়ান্টিফিকেশন অব আনসার্টেনটি’ গবেষণা উদ্যোগের অধীনে। এ প্রকল্পের সহযোগী সংস্থা বিলেফেল্ডের ‘ভিসেনসভের্কস্টাড্ট’ বা ‘নলেজ হাব’।
গবেষকরা জানিয়েছেন, অংশগ্রহণকারীদের স্মার্টওয়াচ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হৃদস্পন্দন, মানসিক চাপের মাত্রা, শারীরিক নড়াচড়া ও ঘুমের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। সমস্ত তথ্য বেনামে সংরক্ষণ করা হবে। তথ্য সুরক্ষার নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলা হবে বলেও তাঁরা আশ্বাস দিয়েছেন। গবেষণায় যুক্ত হওয়ার অন্যতম আকর্ষণ হলো, পুরো বিশ্বকাপ জুড়ে যুক্ত থাকার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। উদ্বোধনী ম্যাচের আগে নাম নথিভুক্ত করাও জরুরি নয়। কেউ যদি কেবল একটি ম্যাচ বা কয়েকটি ম্যাচ দেখেন, তবুও তাঁর তথ্য গবেষণার কাজে ব্যবহার করা হবে। গবেষকদের মতে, একটি মাত্র ম্যাচ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া সম্ভব।
বিলেফেল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান ও ক্রীড়াবিজ্ঞান অনুষদের সহ-প্রকল্প প্রধান অধ্যাপক ক্রিশ্চিয়ান ডয়চার জানিয়েছেন, তাঁরা এমন একটি বৈচিত্র্যময় তথ্যভান্ডার তৈরি করতে চান, যেখানে সব দেশের সমর্থকদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। তিনি বলেছেন, ‘আমরা চাই, যে দেশের সমর্থকই হোন না কেন, যে স্মার্টওয়াচই ব্যবহার করুন না কেন, সবাই এ গবেষণায় অংশ নিন। অংশগ্রহণকারী যত বেশি হবে, গবেষণার ফল তত বেশি নির্ভরযোগ্য হবে।’ তিনি আরও জানিয়েছেন, বর্তমানে পূর্ব ইউরোপ, দক্ষিণ ইউরোপ ও তুরস্কের সমর্থকদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। তাই ওই অঞ্চলগুলির ফুটবলপ্রেমীদের বিশেষ ভাবে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
এ গবেষণার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, একই ম্যাচের একটি ঘটনাকে বিভিন্ন দেশের সমর্থকেরা কী ভাবে অনুভব করেন, তা বোঝার চেষ্টা। গবেষকদের প্রশ্ন, একটি গোল কি জার্মান সমর্থকদের হৃদস্পন্দন যতটা বাড়ায়, ততটাই কি প্রভাব ফেলে ব্রাজিল বা তুরস্কের সমর্থকদের উপর? একই রকম পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশের সমর্থকদের মানসিক প্রতিক্রিয়া কতটা আলাদা, তা বোঝার জন্য বিশ্বকাপকে আদর্শ ক্ষেত্র বলে মনে করছেন তাঁরা। অংশগ্রহণকারীদের লিঙ্গ, জাতীয়তা, বর্তমানে বসবাসের দেশ, প্রিয় দল এবং সে দলের প্রতি তাঁদের আবেগগত সংযুক্তির মাত্রা সম্পর্কেও তথ্য দিতে হবে। পাশাপাশি তাঁরা ম্যাচটি কী ভাবে দেখছেন— স্টেডিয়ামে উপস্থিত থেকে, টেলিভিশনে লাইভ মাধ্যমে নাকি কোনো ‘পাবলিক ভিউয়িং’ অনুষ্ঠানে— সে তথ্যও জানাতে হবে।
গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য হল, ফুটবলের আবেগ কি কেবল ম্যাচের ৯০ মিনিটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, না কি তার প্রভাব আরও দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে থেকে যায়, তা বোঝা। কোনো টানটান রাতের ম্যাচের পরে ঘুমের গুণমান কমে যায় কি না, কিংবা ম্যাচের আগে থেকেই মানসিক চাপ বাড়তে শুরু করে কি না, তা-ও বিশ্লেষণ করা হবে। শারীরিক নড়াচড়ার তথ্যও এ গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। কারণ, স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখা সমর্থক এবং বাড়িতে বসে টেলিভিশনের সামনে খেলা দেখা দর্শকদের শারীরিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে বহুল পার্থক্য থাকতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ডিএফবি কাপ ফাইনালে ডিএসসি আর্মিনিয়া বিলেফেল্ডের ২২৯ জন সমর্থকের উপর একই ধরনের একটি সমীক্ষা চালানো হয়েছিল। সেখানে দেখা গিয়েছিল, স্টেডিয়ামে উপস্থিত সমর্থকদের গড় হৃদস্পন্দন ছিল মিনিটে ৯৪ বার। অন্যদিকে, বাড়িতে বসে টেলিভিশনে খেলা দেখা দর্শকদের গড় হৃদস্পন্দন ছিল মিনিটে ৭৯ বার। বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। স্টেডিয়ামে থাকা সমর্থকদের হৃদস্পন্দন টেলিভিশনে খেলা দেখা দর্শকদের তুলনায় সর্বাধিক ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, গবেষণায় দেখা যায়, ম্যাচ শুরু হওয়ার প্রায় ১৪ ঘণ্টা আগেই সমর্থকদের মানসিক চাপ বাড়তে শুরু করেছিল।
গবেষকদের মতে, বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে এ পার্থক্য আরও প্রকট হতে পারে। বিশ্বকাপে জাতীয় আবেগ, প্রত্যাশা আর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা থাকে চরমে। প্রিয় দলের সমর্থকদের চাপ যেমন এক ধরনের, তেমনই অঘটনের অপেক্ষায় থাকা দলের সমর্থকদের মানসিক অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। টাইব্রেকার, লাল কার্ড, অতিরিক্ত সময়ে গোল কিংবা শেষ মুহূর্তের জয়ের মতো ঘটনাগুলি শরীরে ভিন্ন ভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। গবেষকরা জানিয়েছেন, বিশ্বকাপ চলাকালীন বিশেষ করে জার্মান জাতীয় দলের ম্যাচগুলির পরে প্রাথমিক ফলাফল তাঁদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। অর্থাৎ, টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করেই সমর্থকেরা জানতে পারবেন, মাঠের নাটকীয় মুহূর্তগুলি তাঁদের শরীরে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে।
❤ Support Us








