Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • জুন ১৪, ২০২৬

বলাগড় বন্দর : পরিবেশগত সংশয় – গঙ্গা, সবুজ দ্বীপ ও জীববৈচিত্র্য

অয়ন মুখোপাধ্যায়
বলাগড় বন্দর : পরিবেশগত সংশয় – গঙ্গা, সবুজ দ্বীপ ও জীববৈচিত্র্য

বিগত পর্বগুলিতে আমি বলাগড়ের বন্দর প্রকল্পের অর্থনৈতিক উজ্জ্বল দিক, শিল্পের সম্ভাবনা এবং কর্মসংস্থানের বিপুল সুযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি । আধুনিক একবিংশ শতাব্দীতে যে কোনো বৃহৎ পরিকাঠামো উন্নয়নের সমান্তরালে যে প্রশ্নটি সবচাইতে বড় এবং অনস্বীকার্য হয়ে দেখা দেয়, তা হলো প্রকৃতির ওপর কত চড়া মূল্য চুকিয়ে এই উন্নয়ন আমাদের ঘরে আসছে । বলাগড় টার্মিনাল নির্মাণের ক্ষেত্রেও এই পরিবেশগত প্রশ্নটিই সবচেয়ে সংবেদনশীল, স্পর্শকাতর এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে জটিল ।

তাই এই তৃতীয় পর্বে আমার অনুসন্ধানের মূল বিষয় হলো গঙ্গা নদী, তার বুক জুড়ে থাকা বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র ও প্রাকৃতিক ফুসফুস সবুজ দ্বীপ এবং এই সমগ্র অঞ্চলের বিপন্ন জলজ ও স্থলজ জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রস্তাবিত বন্দরের সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী আঘাত ।

শান্ত, কোলাহলমুক্ত দ্বীপে ও তার আশেপাশে যখন দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা ভারী পণ্যবাহী জাহাজের প্রপেলার অনবরত ঘুরবে, কয়লা, ফ্লাই অ্যাশ বা অন্যান্য খনিজ সামগ্রী ওঠানো-নামানোর স্বয়ংক্রিয় যান্ত্রিক ক্রেন চলবে এবং শত শত ট্রাকের কালো ধোঁয়া ও তীব্র হর্ন বাজবে, তখন এই দ্বীপের চিরন্তন নিস্তব্ধতা এবং নির্মল বাতাস চিরতরে হারিয়ে যাবে। শীতকালে সবুজ দ্বীপে এবং সংলগ্ন চরে বিভিন্ন স্থান থেকে বা অন্যান্য ঠান্ডা দেশ থেকে যে সমস্ত পরিযায়ী পাখি আসে, বন্দরের এই তীব্র কোলাহল ও দূষণে তাদের সেই চেনা আশ্রয় নষ্ট হবে এবং এই অঞ্চলের বন্যপ্রাণীদের জীবনচক্র মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে।

বলাগড়ের প্রধান প্রাকৃতিক আকর্ষণ এবং এই অঞ্চলের জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষার প্রধান উৎস হলো হুগলি নদীর বুকে জেগে ওঠা সবুজ দ্বীপ। এটি কেবল পর্যটকদের জন্য একটি চেনা পিকনিক স্পট নয়, এটি নদী-বাস্তুতন্ত্র ও বন্যপ্রাণের এক অনন্য প্রাকৃতিক বাসস্থান। এই শান্ত, কোলাহলমুক্ত দ্বীপে ও তার আশেপাশে যখন দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা ভারী পণ্যবাহী জাহাজের প্রপেলার অনবরত ঘুরবে, কয়লা, ফ্লাই অ্যাশ বা অন্যান্য খনিজ সামগ্রী ওঠানো-নামানোর স্বয়ংক্রিয় যান্ত্রিক ক্রেন চলবে এবং শত শত ট্রাকের কালো ধোঁয়া ও তীব্র হর্ন বাজবে, তখন এই দ্বীপের চিরন্তন নিস্তব্ধতা এবং নির্মল বাতাস চিরতরে হারিয়ে যাবে। শীতকালে সবুজ দ্বীপে এবং সংলগ্ন চরে বিভিন্ন স্থান থেকে বা অন্যান্য ঠান্ডা দেশ থেকে যে সমস্ত পরিযায়ী পাখি আসে, বন্দরের এই তীব্র কোলাহল ও দূষণে তাদের সেই চেনা আশ্রয় নষ্ট হবে এবং এই অঞ্চলের বন্যপ্রাণীদের জীবনচক্র মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। সর্বোপরি বন্দরকে কেন্দ্র করে এখনই শুরু হয়ে গেছে মিলনগড় জিরাট বলাগড় প্রভৃতি এলাকার বিশাল বিশাল বাগান বিক্রি গাছ কাটা ।এর ফলে এলাকার বাস্তুতন্ত্র ক্ষতি শুরু হয়ে গেছে ।

সবুজ দ্বীপের স্থলজ পরিবেশের চেয়েও বড় বিপদের মেঘ ঘনিয়ে আসছে নদীর জলের নিচে। যে গঙ্গা নদীর ওপর এই টার্মিনাল গড়া হচ্ছে, তার নির্দিষ্ট অংশ এইটি আমাদের জাতীয় জলজ প্রাণী তথা গাঙ্গেয় শুশুকের অন্যতম প্রধান ও নিরাপদ বাসস্থান। শুশুক অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বুদ্ধিমান প্রাণী, যারা চোখের দৃষ্টির চেয়ে শব্দের প্রতিধ্বনি বা ইকোলোকেশন পদ্ধতি ব্যবহার করে জলের নিচে চলাচল, যোগাযোগ ও শিকার করে। বন্দরে বড় বার্জ বা জাহাজের তীব্র ইঞ্জিনের আওয়াজ জলের নিচে এক ধরনের ভয়াবহ শব্দ দূষণ তৈরি করে। এর ফলে শুশুকদের দিকভ্রান্ত হওয়া, তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং দ্রুতগামী জাহাজের প্রপেলারের ধাক্কায় মারা যাওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। তাছাড়া বন্দর সচল হলে জাহাজ বা বার্জ থেকে তেল, মোবিল, লুব্রিকেন্ট বা রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে মেশার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, যা নদীর মাছের প্রজনন ক্ষমতা ও সামগ্রিক জলজ খাদ্যশৃঙ্খল কে চিরতরে ধ্বংস করে দিতে পারে।

কলকাতা বন্দরের মতো বলাগড়কেও সারা বছর সচল রাখতে হলে নদীগর্ভে নিয়মিত কৃত্রিম উপায়ে ড্রেজিং বা পলি খনন কাজের মধ্য দিয়ে, যাতে ভারী জাহাজ চলাচলের মতো ন্যূনতম গভীরতা বজায় থাকে। এই কৃত্রিম ড্রেজিংয়ের গভীরে পরিবেশগত কুফল রয়েছে। নদীগর্ভ থেকে ক্রমাগত পলি ও বালি তুললে নদীর তলদেশের প্রাকৃতিক গঠন ও স্রোতের গতিপ্রকৃতি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। সেখানে থাকা জলজ উদ্ভিদ, শ্যাওলা এবং ছোট ছোট অমেরুদণ্ডী প্রাণী, যা গঙ্গার মাছের প্রধান খাদ্য, তা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। এর চেয়েও বড় আশঙ্কা হলো, ড্রেজিংয়ের ফলে নদীর তলদেশ হঠাৎ অত্যন্ত গভীর হয়ে গেলে পাড়ের মাটির ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং বলাগড়ে তো এমনিতেই নদী ভাঙনপ্রবণ এলাকার মধ্যে পড়ে ফলে এখানে পাড় ধসে যাওয়ার প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।

পরিবেশবিদদের এই সমস্ত গুরুতর আশঙ্কার জবাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ সাধারণত পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বা ইআইএ রিপোর্টের দোহাই দেন এবং গ্রীন পোর্ট বা পরিবেশ-বান্ধব বন্দরের আধুনিক ধারণার কথা বলেন। বলা হয়, উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে দূষণ ন্যূনতম রাখা হবে। কিন্তু ভারতের নদী বন্দরগুলোর বাস্তব অভিজ্ঞতা ও নজরদারির অভাব আমাদের বলে যে, খাতা-কলমের সোনালি নিয়ম অনেক সময়ই বাস্তবে খাটানো যায় না। এই পরিবেশ রক্ষা আর দেশের উন্নয়ন, দুটির কোনোটিকেই আমরা পুরোপুরি বাদ দিতে পারি না । এই ভারসাম্যের সমীকরণে আমাদের মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাহিদাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে যুক্ত করতে হবে। একদিকে যখন সবুজ দ্বীপ বা শুশুক বাঁচানোর জন্য পরিবেশবিদেরা লড়াই করবেন, অন্যদিকে তখন মাথায় রাখতে হবে পরিবেশ রক্ষার নামে উন্নয়ন যেন মানুষের পেটে লাথি না মারে। বন্দর সংলগ্ন এলাকায় যে নতুন পরিবেশ-বান্ধব হোটেল, রেস্তোরাঁ বা ট্যুরিস্টদের থাকার আধুনিক পরিকাঠামো গড়ে উঠবে, সেখানে কঠোর গ্রীন ট্রাইব্যুনালের নিয়মনীতি মেনে যদি স্থানীয়দের ব্যবসা ও ছোট দোকানপাটের অধিকার দেওয়া যায়, তবেই পরিবেশ রক্ষা এবং মানুষের অন্নসংস্থান, দুই-ই একসঙ্গে মেলানো সম্ভব হবে।

♦•♦•♦•♦•♦•♦•♦•♦

বলাগড় বন্দর : অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়ন

 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!