Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • আগস্ট ২, ২০২৬

বুদ্ধিজীবীদের ভ্রান্তিবিলাস

রূপান্তর কোনো নতুন জ্ঞানালোক বা উপলব্ধির তাড়নায় নয়; ক্ষমতার অলিন্দে ভিড় জমানো এবং ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা আদায়ের হীন লালসা থেকে উৎসারিত । নীতিবোধের এই চরম পতনকে রূপক অর্থে বলা চলে ‘বুদ্ধিজীবীদের বিলাস ভ্রমণ’— যেখানে আদর্শের শক্ত পাটাতন ভেঙে তৈরি হয় ক্ষমতা তোষণের সুসজ্জিত প্রাসাদ

হিলাল উদ্দিন লস্কর
বুদ্ধিজীবীদের ভ্রান্তিবিলাস

সমাজ পরিবর্তনের অগ্রদূত, চিন্তার আলোকবর্তিকা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রদীপ্ত উচ্চারণ — এভাবেই বুদ্ধিজীবীরা সাধারণ মানুষের মনে চিরকাল সমাদৃত হয়ে এসেছেন । ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার থেকে শুরু করে আন্তোনিও গ্রামসি কিংবা আমাদের এ অঞ্চলের মুক্তচিন্তার প্রবক্তারা বুদ্ধিজীবীকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এমন এক স্বাধীনসত্তা হিসেবে, যিনি সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে শাসক বা ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে কখনো দ্বিধা করেন না ।

সমকালীন বাস্তবতায় রূপটি অনেকটাই ম্লান, যা অস্বীকার করার উপায় নেই । এখনকার উচ্চশিক্ষিত সমাজ, লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের একটি বড়ো অংশ রাতারাতি নিজেদের আদর্শিক অবস্থান বদলে ফেলছেন । এ রূপান্তর কোনো নতুন জ্ঞানালোক বা উপলব্ধির তাড়নায় নয়; ক্ষমতার অলিন্দে ভিড় জমানো এবং ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা আদায়ের হীন লালসা থেকে উৎসারিত । নীতিবোধের এই চরম পতনকে রূপক অর্থে বলা চলে ‘বুদ্ধিজীবীদের বিলাস ভ্রমণ’— যেখানে আদর্শের শক্ত পাটাতন ভেঙে তৈরি হয় ক্ষমতা তোষণের সুসজ্জিত প্রাসাদ ।

বুদ্ধিজীবী কেবল উপাধিধারী, ডিগ্রিধারী বা নিছক পাণ্ডিত্যের অধিকারী ব্যক্তি নন; চিন্তা ও কর্মের এক অবিচ্ছেদ্য মেলবন্ধনে গড়ে ওঠে তাঁর প্রকৃত পরিচয় । ফরাসি চিন্তাবিদ জুলিয়েন বেন্দা তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ট্রেসন অফ দ্য ইন্টেলেকচুয়ালস’-এ অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছেন যে, বুদ্ধিজীবীদের মূল কাজ শাশ্বত সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অনড়ভাবে দাঁড়ানো । ক্ষমতা, অর্থ বা মোহের কাছে নিজেদের মেধা ও সত্তাকে বিকিয়ে দেওয়া মানেই সমাজের সঙ্গে বুদ্ধিজীবীদের সবচেয়ে বড়ো বিশ্বাসঘাতকতা । প্রকৃতপক্ষে, বুদ্ধিজীবী হলেন সেই বিবেক, যিনি শাসকের স্তাবকতা করেন না, বরং শাসকের অন্যায়কে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। নৈতিক ভিত্তি ও সাহসের বর্ম ছাড়া কোনো ব্যক্তি বুদ্ধিজীবী পদবাচ্যের অধিকারী হতে পারেন না । আপসহীন সততা এবং চিন্তার ধারাবাহিকতাই একজন প্রকৃত বুদ্ধিজীবীর অপরিহার্য ও অলঙ্ঘনীয় বৈশিষ্ট্য ।

সরকারের অন্যায় সমালোচনা করা মানে দেশদ্রোহিতা নয়; নাগরিক হিসেবে দেশের মানুষের এবং বিশ্বমানবতার কল্যাণার্থে সরকারের ভুল শুধরে দেওয়াটাই সর্বশ্রেষ্ঠ দেশপ্রেম। গণতন্ত্রের মূল প্রাণশক্তি কেবল নির্বাচন বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসন নয়বরং তা নিহিত রয়েছে সরকারের জবাবদিহিতা এবং নাগরিক সমাজের স্বাধীন ও সাহসী কণ্ঠস্বরের ওপর।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এখনকার সমাজবাস্তবতায় যখন অধ্যাপক, গবেষক বা বুদ্ধিজীবী ক্ষমতার সামান্য পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাতারাতি নিজেদের লেখালিখি, সুর ও বয়ান বদলে ফেলেন, তখন তা কেবল এক ব্যক্তির ব্যক্তিগত নীতিচ্যুতি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা সমগ্র বুদ্ধিজীবী সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে ধূলিসাৎ করে দেয় এবং সাধারণ মানুষের মনে চিন্তার জগৎ আর সত্যের ধারণা সম্পর্কে গভীর আস্থার সংকট তৈরি করে । বুদ্ধিবৃত্তির এই পতন সমাজকে প্রগতির পরিবর্তে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয় ।

বিজ্ঞানের ভাষায় অথবা সমাজতত্ত্বে চিন্তার পরিবর্তন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া । মানুষের জীবন ও জগতের অভিজ্ঞতা বাড়লে তার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসতেই পারে।যেমন ফরাসি দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্র কিংবা কার্ল পপারও তাঁদের জীবদ্দশায় নতুন উপলব্ধির নিরিখে চিন্তার পুনর্মূল্যায়ন করেছেন । সে পরিবর্তন যদি হয় সত্যের অনুসন্ধান, তবে তা মহৎ। পক্ষান্তরে, আজকের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ যে রূপান্তরের সম্মুখীন, তা নতুন কোনো উপলব্ধির ফল নয়; তা হচ্ছে ক্ষমতার লোভ । এটি এক ধরনের মানসিক ও আদর্শিক ‘বিলাস ভ্রমণ’— যেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ, সরকারি অনুদান, পদ-পদবি এবং ক্ষমতার নৈকট্য পাওয়ার লোভে তাঁরা নিজেদের মেরুদণ্ড বিসর্জন দিচ্ছেন । যাঁরা একসময় রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের কড়া সমালোচনা করতেন, ক্ষমতার ছায়ায় যাওয়ার পর তাঁরাই সে একই নীতির অন্ধ সমর্থক হয়ে ওঠেন । সত্যকে আড়াল করে শাসকশ্রেণির স্বার্থে নতুন নতুন তত্ত্ব ও ব্যাখ্যা দাঁড় করানো তাঁদের মূল পেশা হয়ে ওঠে । আমরা বিষপানে সক্রেটিসের মৃত্যুর ঘটনাটি সবাই জানি; মূলত সেখান থেকেই একজন প্রকৃত বুদ্ধিজীবীর গৌরবময় ইতিহাসের সূচনা । গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের ভাষায় —‘অন্বেষণহীন জীবন যেমন যাপনের অযোগ্য, তেমনি মেরুদণ্ডহীন ও সুবিধাবাদী চিন্তা সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয় ।’

বলতে লজ্জা হয়, এই সময়ে অনেক বুদ্ধিজীবী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্ষমতার পদলেহন করতে গিয়ে আত্মমর্যাদাবোধ চিরতরে বিসর্জন দিচ্ছেন । তাঁরা জনগণের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ অথবা জেনেশুনেই তা এড়িয়ে যান । ক্ষমতার মনঃপুত হওয়ার জন্য তাঁরা ইতিহাসকে বিকৃত করেন, ক্ষমতাকে তুষ্ট করতে চলমান সংকটকে ধামাচাপা দেন এবং এক ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিবৃত্তিক বয়ান তৈরি করেন । এ ব্যাপারে নোম চমস্কির একটি বিখ্যাত মন্তব্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক: ‘ক্ষমতার সাথে বুদ্ধিজীবীদের আপস করার প্রবণতা নতুন নয়, তবে যখন তাঁরা ক্ষমতার অন্যায়কে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রলেপ দিয়ে বৈধতা দিতে শুরু করেন, তখন তা গণতন্ত্র ও মুক্তচিন্তার সবচেয়ে বড়ো শত্রু হয়ে দাঁড়ায় ।’ যে অধ্যাপক বা বুদ্ধিজীবী সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে কলম ধরার কথা, তিনি যখন সরকারি পুরস্কার বা অনুগ্রহ পাওয়ার আশায় স্তাবকতায় লিপ্ত হন, তখন তা বুদ্ধিজীবী সমাজের জন্য চরম লজ্জার আকার নেয় ।

সততা এবং অদম্য সাহসিকতাই বুদ্ধিজীবীর প্রকৃত অলংকার। বুদ্ধিজীবীর কাজ, সমাজের দর্পণ হওয়া। কিন্তু সে দর্পণ যদি ক্ষমতার চাটুকারিতায় অন্ধ হয়ে যায়তবে সমাজ দিকভ্রান্ত হতে বাধ্য। চিন্তার ধারাবাহিকতা না থাকলে কোনো তত্ত্বের বা মতবাদের দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তি থাকে না। আজ বাতাসে যার পক্ষে হাওয়া বয়কাল ঠিক তার পক্ষেই কলম ধরেন সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীরা

বার্ট্রান্ড রাসেল বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা, ক্ষমতার অন্ধ তোষণ এবং চিন্তার স্বাধীনতা নিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ও জোরালো মতামত ব্যক্ত করেছেন । তিনি মনে করতেন, প্রকৃত বুদ্ধিজীবীর প্রধান কাজ হলো প্রচলিত ক্ষমতার সামনে মাথা নত না করে সাহসের সঙ্গে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো । পদলেহী তথাকথিত বুদ্ধিজীবী এবং চিন্তার স্বাধীনতা নিয়ে রাসেলের প্রধান কিছু বক্তব্য ও দৃষ্টিভঙ্গি এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । রাসেল স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, যখন বুদ্ধিজীবীরা শাসকশ্রেণির মন জোগাতে বা ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের জন্য নিজেদের বিবেক ও সত্যের সঙ্গে আপস করেন, তখন তা সমাজ ও সভ্যতার জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। তাঁর মতে, মেধা যখন ক্ষমতার দাসত্ব স্বীকার করে, তখন তা আর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা থাকে না, বরং তা নিছক স্তাবকতায় পরিণত হয় । রাসেল বলেছেন, ‘ক্ষমতার প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং সত্যের চেয়ে সুবিধাকে বড়ো করে দেখা বুদ্ধিজীবী সমাজের সবচেয়ে বড়ো পতন । বুদ্ধিজীবীর কাজ ক্ষমতার গুণকীর্তন নয়, বরং ক্ষমতা যাতে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতে না পারে, তার ওপর কড়া নজর রাখা ।’ রাসেল তাঁর বিভিন্ন লেখা ও ভাষণে উল্লেখ করেছেন যে, অনেক সময় বুদ্ধিজীবীরা সামাজিক চাপ, রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন কিংবা প্রলোভনের মুখে নিজেদের মেরুদণ্ড বিকিয়ে দেন । ভয় বা লোভের বশে যারা মত পাল্টান, তাঁরা মানবতার মূল আদর্শ থেকে দূরে সরে যান । রাসেল মুক্তচিন্তার ওপর চরম আস্থাশীল ছিলেন এবং মনে করতেন যে, বাহ্যিক চাপের কাছে বুদ্ধিজীবীর আপস করা মানে নিজের আত্মাকে হত্যা করা । ভয় মানুষকে বোকা বানায় এবং ক্ষমতা মানুষকে অন্ধ করে । এই দুইয়ের মিলনে যে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ তৈরি হয়, তা সমাজকে আলোর পরিবর্তে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায় ।

রাসেল সবসময় প্রচলিত ক্ষমতার অন্যায় নির্দেশ বা মতবাদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার প্রবক্তা ছিলেন । তাঁর মতে, যারা ক্ষমতার ছায়াতলে থেকে ভীরুতার কারণে সত্যকে লুকিয়ে রাখেন, তাঁরা বুদ্ধিজীবী নামের যোগ্য নন। প্রকৃত বুদ্ধিজীবী বা দার্শনিক তিনিই, যিনি জনপ্রিয়তার মোহে অন্ধ না হয়ে যুক্তির আলোয় সমাজকে পথ দেখান, হোক সে পথ কণ্টকাকীর্ণ । বুদ্ধিজীবীদের এই তথাকথিত ‘বিলাস ভ্রমণ’ বা সুবিধাবাদী অবস্থান মূলত সততার সাথে প্রতারণা । মেধার অপব্যবহার করে ক্ষমতার পদলেহন করাকে রাসেল মানবতা ও বুদ্ধিবৃত্তির পরিপন্থী বলে মনে করতেন । তাঁর মতে, সততা এবং অদম্য সাহসিকতাই বুদ্ধিজীবীর প্রকৃত অলংকার । বুদ্ধিজীবীর কাজ, সমাজের দর্পণ হওয়া । কিন্তু সে দর্পণ যদি ক্ষমতার চাটুকারিতায় অন্ধ হয়ে যায়, তবে সমাজ দিকভ্রান্ত হতে বাধ্য । চিন্তার ধারাবাহিকতা না থাকলে কোনো তত্ত্বের বা মতবাদের দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তি থাকে না । আজ বাতাসে যার পক্ষে হাওয়া বয়, কাল ঠিক তার পক্ষেই কলম ধরেন সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীরা । বাতাসের গতির সঙ্গে দিক বদলানো তাঁদের এক চতুর কৌশল । একইভাবে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে মানুষের আত্মশক্তির কথা এবং মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর কথা বলেছেন । পরমুখাপেক্ষী এবং নীতিহীন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে কখনোই সম্মান জানাননি তিনি । নৈতিক দৃঢ়তা না থাকলে উচ্চশিক্ষা এবং মেধা সমাজের উপকারে আসে না, বরং তা অনেক সময় আরও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় ।

বুদ্ধিজীবীদের তথাকথিত ‘বিলাস ভ্রমণ’ সাময়িকভাবে কিছু ব্যক্তির ব্যক্তিগত প্রাপ্তি বা পদ-পদবি এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা পুরো জাতিকে মেধাশূন্য ও নৈতিকভাবে পঙ্গু করে তোলে । সমাজের প্রকৃত মুক্তি আসে তখন, যখন চিন্তাবিদরা ক্ষমতার তোষণ ছেড়ে সাধারণ মানুষের পক্ষে, সততার পক্ষে এবং শাশ্বত ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ়ভাবে অবস্থান গ্রহণ করেন । যে সমাজে বুদ্ধিজীবীরা মেরুদণ্ড বিক্রি করে দেন, সে সমাজ অন্ধের মতো খাদের দিকে এগিয়ে যায় । এ কারণেই ক্ষমতার পদলেহী এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের মুখোশ উন্মোচন করা এবং সততা ও চিন্তার ধারাবাহিকতাভিত্তিক নতুন নৈতিক সমাজ গড়ে তোলা আজ সবচেয়ে বড়ো ও অনিবার্য প্রয়োজন ।

নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান এবং সততা বজায় রাখতে গিয়ে আমৃত্যু হুমকি, হয়রানি, নির্বাসন বা চরম নিপীড়নের শিকার হয়েছেন— অথচ ক্ষমতার কাছে কখনো মাথা নত করেননি, এমন কয়েকজন প্রাতঃস্মরণীয় মনীষীর অবদান মানবসভ্যতার ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে । তালিকার শীর্ষে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস । সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করার অপরাধে তাঁকে রাষ্ট্রীয় আদালতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কারাবন্দী অবস্থায় বন্ধুদের সহায়তায় পলায়নের সুযোগ থাকলেও তিনি তা করেননি । নিজের নীতি ও আদর্শ বিসর্জন না দিয়ে সানন্দে বিষপান করে জীবন বিসর্জন দেন । ইতালীয় দার্শনিক, গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী জর্ডানো ব্রুনো রেনেসাঁ যুগে, মহাবিশ্বের অনন্ততা এবং কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মডেল নিয়ে যুগান্তকারী চিন্তাভাবনা প্রকাশ করে তৎকালীন রোমান ক্যাথলিক চার্চের গোঁড়ামি ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করলেন । চার্চের মতাদর্শের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে তাঁকে ‘ইনকুইজিশন’ বা ধর্মীয় আদালতের রায়ে দীর্ঘ আট বছর বন্দি রাখা হয় । বারবার নিজের মতবাদ প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হলেও ব্রুনো তা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেন । ১৬০০ সালে তাঁকে প্রকাশ্যে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয় । সপ্তাদশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ডাচ দার্শনিক স্পিনোজার স্বাধীন চিন্তা, বস্তুবাদী দর্শন এবং প্রচলিত ধর্মীয় কট্টরতার বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক লেখা তাঁকে চরম নির্যাতনের মুখে ফেলে দেয় । তাঁর প্রথাবিরোধী চিন্তার কারণে আমস্টারডামের ইহুদি সম্প্রদায় থেকে তাঁকে চিরতরে হেরেম বা বয়কট করা হয় এবং তাঁর ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালানো হয়। চরম সামাজিক বয়কট, একাকীত্ব ও মানসিক হয়রানির মধ্যেও তিনি তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও চিন্তার ধারাবাহিকতা থেকে একচুলও সরে দাঁড়াননি । ফরাসি আলোকায়নের অন্যতম প্রধান পুরোধা ভলতেয়ার আজীবন বাকস্বাধীনতা, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং বিচারবহির্ভূত নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। চার্চ এবং ফরাসি রাজতন্ত্রের তীব্র সমালোচনার জন্য তাঁকে একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হতে হয় । তাঁকে কুখ্যাত বাস্তিল দুর্গে কারাবরণ করতে হয় এবং দীর্ঘ সময় দেশছাড়া (নির্বাসিত) থাকতে হয় । শত হুমকি ও হয়রানির মুখেও তিনি অন্যায় ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান । আধুনিক বিজ্ঞান ও পর্যবেক্ষণের আরেক জনক গ্যালিলিও কোপারনিকাসের মতবাদকে সমর্থন করে প্রমাণ করেন যে, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, যা তৎকালীন বাইবেলের আক্ষরিক ব্যাখ্যার সাথে সাংঘর্ষিক ছিল । চার্চের পক্ষ থেকে তাঁকে কঠোর হুমকি দেওয়া হয় এবং আমৃত্যু গৃহবন্দি করে রাখা হয় । বার্ধক্য ও অন্ধত্বের শিকার হওয়ার পরও তাঁকে রোমান ‘ইনকুইজিশন’-এর নির্যাতনমূলক বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল । এ সমস্ত মনীষীর জীবন প্রমাণ করে যে, বাহ্যিক শক্তি বা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন মানুষের চিন্তার স্বাধীনতাকে সাময়িকভাবে রুদ্ধ করতে পারলেও সত্যের অন্বেষণ ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততাকে চিরতরে মুছে ফেলতে পারে না ।

সক্রেটিসের মৃত্যুর ঘটনাটি সবাই জানি;  মূলত সেখান থেকেই একজন প্রকৃত বুদ্ধিজীবীর গৌরবময় ইতিহাসের সূচনা। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের ভাষায়— ‘অন্বেষণহীন  জীবন যেমন যাপনের অযোগ্যতেমনি মেরুদণ্ডহীন ও সুবিধাবাদী চিন্তা সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়

গভীর চিন্তা এবং স্বচ্ছ পাণ্ডিত্য ব্যক্তিপ্রতিভাকে আত্মবিশ্বাসী ও সুদৃঢ় করে তোলে। সক্রেটিস, স্পিনোজা বা ব্রুনোর মতো মনীষীদের জীবনে আমরা দেখেছি, তাঁদের অন্তরের জ্ঞান ও নৈতিক স্পষ্টতা তাঁদের অনড় মেরুদণ্ডের ভিত্তি । প্রকৃত জ্ঞান বা প্রজ্ঞা কেবল তথ্য বা তত্ত্বের মুখস্থ বিদ্যা নয়, সত্যের সঙ্গে আত্মার এ এক গভীর সংযোগ । জ্ঞানীর আত্মপ্রত্যয় বাহ্যিক কোনো পুরস্কার বা ক্ষমতার স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করে না । এটি আসে নিজের বিবেকের সঙ্গে আপসহীন বোঝাপড়া থেকে । ব্রুনো বা স্পিনোজার ওপর যতই নির্যাতন বা সামাজিক বয়কট আসুক না কেন, গভীর চিন্তা তাঁদের ভেতর এমন এক নৈতিক শক্তি জুগিয়েছিল যা তাঁদের টলাতে পারেনি । তাঁদের কাছে জ্ঞানই ছিল দুর্ভেদ্য দুর্গ । কিন্তু সামাজিক বাস্তবতা সবসময় একরকম থাকে না। চার্লস পেগুই বা জুলিয়েন বেন্ডার মতো চিন্তাবিদরা বারবার সতর্ক করেছেন যে, সমাজের তথাকথিত ‘পণ্ডিত’ বা ‘বুদ্ধিজীবী’ মাত্রেই প্রকৃত জ্ঞানী নন । পাণ্ডিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা যখন আদর্শের পথ থেকে সরে গিয়ে বাজারদর, ক্ষমতা বা সুযোগ-সুবিধার মাপকাঠিতে পরিচালিত হয়, তখন পণ্ডিত নিছক ‘বুদ্ধি বিক্রেতা’ বা স্তাবকে পরিণত হন । এ দ্বান্দ্বিকতার আলোকেই প্রাজ্ঞতার আত্মপ্রত্যয় এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াপনার চরিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে । এই অবক্ষয় ও রূপান্তরের পেছনে বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ গভীরভাবে সক্রিয় থাকে :

১. ক্ষমতার মোহ ও নৈকট্য লাভের আকাঙ্ক্ষা : বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করেন । ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় থাকলে সামাজিক প্রতিপত্তি ও প্রভাব বিস্তার করা সহজ হয় । এই মোহে পড়ে তাঁরা সত্য বলার সাহস হারিয়ে ফেলেন এবং শাসক বা ক্ষমতাবানদের মন জুগিয়ে কথা বলাকেই নিজেদের পাণ্ডিত্য প্রমাণের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন ।

২. বৈষয়িক ও আর্থিক প্রলোভন : পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় মেধা ও চিন্তাকে যখন পণ্যে পরিণত করা হয়, তখন অনেকেই বুদ্ধিবৃত্তিকে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে দেখতে শুরু করেন। সত্য বা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর চেয়ে কোন কথাটি বেশি লাভজনক হবে, সে হিসাব-নিকাশ তাদের আদর্শকে গ্রাস করে ফেলে।

৩. সামাজিক ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার মনস্তত্ত্ব : স্পিনোজা বা গ্যালিলিওর মতো সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে গেলে সমাজ থেকে বিতাড়িত হওয়ার বা রাষ্ট্রীয় রোষানলে পড়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে। এই একাকীত্ব, সামাজিক বয়কট বা শাস্তির ভয়ে অনেক পণ্ডিত আপসের পথ বেছে নেন। তাঁরা স্রোতের বিপরীতে হাঁটার চেয়ে স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়াকে নিরাপদ মনে করেন ।

৪. আত্ম-প্রবঞ্চনা ও আদর্শিক শূন্যতা : প্রকৃত দার্শনিকদের মতো আত্ম-অনুসন্ধানের অভাব থাকলে জ্ঞান কেবলই কিছু বাহ্যিক তথ্যের সমষ্টিতে পরিণত হয় । যখন কোনো ব্যক্তির নিজের ভেতরে নৈতিক মানদণ্ড বা আদর্শিক ভিত্তি দুর্বল থাকে, তখন তার পক্ষে খুব সহজেই যেকোনো সুবিধাবাদী মতাদর্শের কাছে নিজেকে বিক্রি করে দেওয়া সম্ভব হয় ।

৫. সস্তা জনপ্রিয়তার মোহ : জনগণ যা শুনতে চায়, তা-ই বলে হাততালি কুড়ানোর মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা অনেকর মধ্যে সক্রিয় । সত্য সব সময় রূঢ় এবং অপ্রিয় । সেই অপ্রিয় সত্যটি বলে জনতার রোষানলে পড়ার চেয়ে, চটকদার কথার মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন করাকেই তাঁরা সাফল্য বলে মেনে নেন ।

প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী ও নির্ভীক করে তোলে, আর সুবিধাবাদী পাণ্ডিত্য মানুষের চিন্তায় দাসত্বের জন্ম দেয়। প্রকৃত জ্ঞানী যেখানে সত্যের বেদিমূলে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে সর্বদা প্রস্তুত, সেখানে ‘বুদ্ধি বিক্রেতা’ সামান্য স্বার্থের বিনিময়ে সত্যকে বিকৃত করতে একটুও দ্বিধা করেন না। বাজারের একজন বিক্রেতার মূল লক্ষ্য যেমন ক্রেতার মনঃপুত পণ্য সরবরাহ করা, বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে ‘ক্রেতা’-র ভূমিকায় তেমনি রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক ক্ষমতা। ফলে ক্ষমতার পটপরিবর্তন ঘটলে এই শ্রেণি নিজেদের মতাদর্শকেও পণ্যের মতো অনায়াসে বদলে ফেলতে পারেন। জঁ-পল সার্ত্র কিংবা নোম চমস্কির মতো মনীষীরা দেখিয়েছেন যে, ক্ষমতার ছায়াতলে আশ্রিত পণ্ডিতেরা মূলত আত্মিক দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল। বাহ্যিকভাবে তাঁদের গভীর চিন্তা বা মেধা থাকলেও তার পেছনে কোনো দৃঢ় নৈতিক ভিত্তি থাকে না। যাঁর আত্মপ্রত্যয় কেবল সুবিধাবাদ ও মোহের ওপর প্রতিষ্ঠিত, ক্ষমতার সামান্য চাপ বা প্রলোভনেই তা মুহূর্তে ভেঙে পড়ে। আর এ কারণেই ক্ষমতার পদলেহন করতে গিয়ে তাঁদের মধ্যে আত্মিক দৃঢ়তা বা মেরুদণ্ডের চরম অভাব স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়।

ইতিহাসে এই বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্বাসঘাতকতার স্বরূপ বহুবার উন্মোচিত হয়েছে। ফরাসি চিন্তাবিদ জুলিয়েন বেন্ডা তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ট্রেসন অফ দ্য ইন্টেলেকচুয়ালস’-এ দেখিয়েছেন যে, যখন বুদ্ধিজীবীরা চিরন্তন সত্য বা ন্যায়ের পথ ছেড়ে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক লাভের উদ্দেশ্যে নিজেদের মেধা বিক্রি করতে শুরু করেন, তখন সমাজ তার নৈতিক কম্পাস হারিয়ে ফেলে। মার্ক্সবাদী দর্শনেও বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশকে অনেক সময় ‘বুর্জোয়া মতাদর্শের উৎপাদক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা নিজেদের স্বার্থ বা টিকে থাকার তাগিদে শাসকশ্রেণির স্বার্থে তত্ত্ব বা বয়ান তৈরি করেন। এঁদের পক্ষে নৈতিক দৃঢ়তা রক্ষা করা অসম্ভব, কারণ তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তির ভিত্তি সত্যের ওপর নয়, বরং সুবিধাবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। গভীর চিন্তা ও পাণ্ডিত্য যদি নৈতিকতার আলোয় দীপ্ত না হয়, তবে তা মানুষের চরিত্রকে সুদৃঢ় করার পরিবর্তে তাকে আরও বেশি সুবিধাবাদী করে তোলে। যাঁরা জ্ঞানকে সত্যের সাধনা হিসেবে না দেখে ক্ষমতার বাজারে বিক্রির পণ্য হিসেবে ব্যবহার করেন — যাঁদের আমরা যথার্থ অর্থেই ‘বুদ্ধি বিক্রেতা’ বলতে পারি — তাঁদের পক্ষে সংকটের মুহূর্তে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব । আত্মপ্রত্যয় ও নৈতিক মুক্তি কেবল জ্ঞান এবং সততার মেলবন্ধন থেকেই আসে, যা ক্ষণস্থায়ী বাজারের প্রলোভনে বিকিয়ে যায় না ।

মানবতার মুক্তি ও মুক্তবুদ্ধির চর্চায় বার্ট্রান্ড রাসেল এবং নোয়াম চমস্কি ইতিহাসের এমন দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র, যাঁরা ক্ষমতার অন্ধ সমর্থক না হয়ে সবসময় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে নিজেদের অবস্থান অটুট রেখেছেন । নিজ নিজ দেশের যুদ্ধংদেহী নীতি ও সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাঁদের সাহসী কণ্ঠস্বর বিশ্বজুড়ে স্বাধীন চিন্তার অনন্য নজির স্থাপন করেছে । রাসেল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪–১৯১৮) সময় সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ ও কূটনীতির অন্ধ বলিদান হিসেবে পরিচালিত যুদ্ধের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন । শান্তিবাদী অবস্থানের কারণে ব্রিটিশ সরকারের হঠকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে তাঁকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা থেকেই বরখাস্ত করা হয়নি, যুদ্ধবিরোধী লিফলেট বিতরণের দায়ে কারাদণ্ডও ভোগ করতে হয়েছিল । পরবর্তীকালে স্নায়ুযুদ্ধের সময় পারমাণবিক অস্ত্রের জিগির হোক কিংবা ভিয়েতনাম যুদ্ধ — সবক্ষেত্রেই তাঁর লক্ষ্য ছিল মানবজাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা এবং নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে সরকারের হঠকারী সামরিক সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা। আমেরিকার ভাষাবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক নোয়াম চমস্কি মার্কিন বৈদেশিক নীতির ( যেমন — ভিয়েতনাম যুদ্ধ, লাতিন আমেরিকায় হস্তক্ষেপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে আগ্রাসন ) অন্যতম কঠোর সমালোচক । তিনি কখনো নিজ রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার পক্ষে কথা বলেননি; বরং মার্কিন সংবিধান, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের মূল আদর্শগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে দেখিয়েছেন যে, সরকার নিজেই নিজেদের ঘোষিত আদর্শ লঙ্ঘন করে অন্য দেশের ওপর দমনপীড়ন চালাচ্ছে । গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের প্রতিটি অন্যায় কাজের হিসাব চাওয়া এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা নাগরিকের মৌলিক দায়িত্ব — এটাই চমস্কির রাজনৈতিক দর্শনের মূল কথা । তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন যে, রাষ্ট্র বা সরকারের অন্ধ আনুগত্য আর দেশের প্রতি প্রকৃত দেশপ্রেম এক জিনিস নয়। সার্বিকভাবে, বার্ট্রেন্ড রাসেল বা নোয়াম চমস্কি — কেউই তাঁদের নিজ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, শত্রুভাবাপন্ন কোনো শক্তির পক্ষে দাঁড়াননি। তাঁরা মূলত আঘাত করেছেন রাষ্ট্রের অন্যায় নীতি ও সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের ওপর । তাঁদের গভীর বিশ্বাস, সরকারের অন্যায় সমালোচনা করা মানে দেশদ্রোহিতা নয়; নাগরিক হিসেবে দেশের মানুষের এবং বিশ্বমানবতার কল্যাণার্থে সরকারের ভুল শুধরে দেওয়াটাই সর্বশ্রেষ্ঠ দেশপ্রেম ।

গণতন্ত্রের মূল প্রাণশক্তি কেবল নির্বাচন বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসন নয়; বরং তা নিহিত রয়েছে সরকারের জবাবদিহিতা এবং নাগরিক সমাজের স্বাধীন ও সাহসী কণ্ঠস্বরের ওপর। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে অন্ধ তোষামোদে লিপ্ত হওয়া সাময়িক সুবিধা এনে দিলেও তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র এবং জনসমাজকে পঙ্গু করে দেয় । এই বাস্তবতাকে স্মরণে রেখেই উপমহাদেশের প্রখ্যাত আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ নানি এ. পাল্কিওয়ালা বুদ্ধিজীবী সমাজের সুবিধাবাদী চরিত্রকে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরে বলেছিলেন: ‘প্রকৃত বুদ্ধিজীবী তিনিই, যিনি জানেন রুটি সেকা হচ্ছে কোথায় ।’ এই একটিমাত্র বাক্যের গভীর ইঙ্গিতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর পরিবর্তে যাঁরা ক্ষমতার সান্নিধ্য ও ব্যক্তিগত প্রাপ্তির লোভে আদর্শ বিসর্জন দেন, তাঁরা বুদ্ধিজীবী নন। রাষ্ট্র ও জনগণের প্রকৃত মঙ্গল সাধিত হয় তখনই, যখন বুদ্ধিজীবীরা তোষামোদের বৃত্ত ভেঙে ক্ষমতার অন্যায় নীতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার নৈতিক সাহস বজায় রাখেন। কারণ, সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই সুস্থ, সচল ও অর্থবহ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠা সম্ভব ।

♦–♦•♦–♦♦  ♦•♦–♦♦  ♦•♦–♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!