Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • আগস্ট ৩০, ২০২৬

প্রেমের বিস্তার, হিংসায় শৃঙ্খল

হিলাল উদ্দিন লস্কর
প্রেমের বিস্তার, হিংসায় শৃঙ্খল

মানব হৃদয়ের গভীরে ছড়িয়ে থাকে চিরপ্রবহমান প্রেম আর হিংসা — এই দুই বিপরীত মেরুর আবেগই সভ্যতার গতিস্রোত নির্ধারণের প্রধান চালিকাশক্তি । চিরন্তন অনুভূতির মিথস্ক্রিয়া, মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ও সমাজজীবনে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব গভীর অনুসন্ধানের বিষয় । প্রেম হিংসার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে, তাই এর পরিচিত নাম ‘অহিংসা’। নিজের অহংকার বিসর্জন দিয়ে অন্যকে নিজের সত্তায় ধারণ করার উচ্চতর প্রক্রিয়ায় প্রেম বা অহিংসার স্নায়বিক ও হরমোনগত স্তরে এটি মানুষের সহানুভূতি, বিশ্বাস এবং দৃঢ় সামাজিক বন্ধন তৈরি করে । প্রেম কখনো ধ্বংস চায় না; প্রেমের বিশ্বাস মিলনে আর নির্মাণে। মানবকল্যাণ, বিজ্ঞান, শিল্প কিংবা সংস্কৃতির প্রতিটি যুগান্তকারী অগ্রগতি, এ পর্যন্ত সম্ভব হয়েছে কেবল পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা এবং ভালোবাসার হাত ধরে ।

পক্ষান্তরে, হিংসার জন্ম হয় মানুষের অতৃপ্তি, নিরাপত্তাহীনতা এবং গভীর ভয় থেকে । এই স্খলিত, বিবেচনাহীন অন্ধতা মস্তিষ্কের আদিম অংশকে সক্রিয় করে তোলে, যা মানুষকে যুক্তিহীন, বিবেকহীন ধ্বংসাত্মক আচরণের দিকে ঠেলে দেয় । হিংসা কেবল বাইরের জগতকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, ব্যক্তির নিজস্ব মানসিক শান্তি ও আত্মিক বিকাশকেও দমিয়ে রাখে । দীর্ঘ ঐতিহাসিক পরিক্রমায় হিংসা ও যুদ্ধ মানবজাতিকে বারবার পিছিয়ে দিয়েছে, সৃষ্টি করেছে অনাবশ্যক রক্তপাত ও সভ্যতার সংকট। হিংসা কেবল অন্ধকার ও ধ্বংস ডেকে আনে, আর প্রেম আমাদের হৃদয়ে প্রজ্বলিত করে তোলে চিরন্তন আলো ।

একবিংশ শতাব্দীতে যখন দেখি, বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নয়ন ও বিশ্বায়নের জোয়ার আসছে এবং পাশাপাশি অসহিষ্ণুতা, উগ্র জাতীয়তাবাদ, সামাজিক মেরুকরণ এবং স্বার্থান্বেষী হিংসা বিপজ্জনক চেহারা নিয়ে বিস্তৃত হচ্ছে, তখন আমরা হতাশ হই। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগে দাঁড়িয়েও ভেতরের আদিম হিংস্র প্রবৃত্তি যখন সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখন তা কেবল আঞ্চলিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, সমগ্র সভ্যতার অস্তিত্বকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এই বৈশ্বিক সংকট উত্তরণে, ক্ষমতার ব্যবহার স্থায়ী সমাধান আনতে পারে না; স্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহনশীলতা এবং অবলুপ্তপ্রায় মানবিক মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবন। আধুনিক বিশ্বে যোগাযোগব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। পৃথিবী আমাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে শুরু করে মহাকাশ গবেষণা— সবক্ষেত্রেই মানবমেধা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। পরিতাপের বিষয়, এইসব প্রযুক্তি অনেক সময় হিরন্ময় শান্তির পরিবর্তে ক্ষুদ্রতার মেরুকরণ, ঘৃণা আর বিভাজনের শক্তিকে উসকে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মানুষের তথ্যগত সমৃদ্ধি ঘটলেও নৈতিক ও আত্মিক বিকাশ পিছিয়ে পড়েছে। যান্ত্রিক উৎকর্ষের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে ভেতরের অন্তর্দৃষ্টি ও সহমর্মিতা।


ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবী গড়তে হলে অন্তরের সব অন্ধকার ও ঘৃণার বিষবাষ্প দূর করতে হবে। বিদ্বেষের বীজ বপন না করে মননে, কথনে ও আচরণে সহমর্মিতার আলো ছড়িয়ে দেওয়াটাই এই মুহূর্তে মানবজাতির সবচেয়ে বড়ো দায়িত্ব। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে হলে হিংসার বিনাশ ঘটিয়ে, মানুষের মনে প্রেমের চিরন্তন দীপশিখা জ্বালিয়ে রাখাটাই হয়ে উঠুক আমাদের একমাত্র ব্রত


জার্মান দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ার বলেছিলেন, ‘অন্ধ ইচ্ছা’-ই হচ্ছে জগতের মূল চালিকাশক্তি। এ ইচ্ছার প্রকাশ ঘটে আত্মরক্ষার তাগিদে অন্যকে গ্রাস করার প্রবণতায়। এরকম ক্ষেত্রে হিংসা ‘অন্ধ ইচ্ছার’-ই বহিঃপ্রকাশ, যেখানে অন্যকে দমন করে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার বা প্রাধান্য দেওয়ার আদিম প্রবৃত্তি কাজ করে। ব্যক্তিগত কিংবা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এ পর্যন্ত যত সংঘাত তৈরি হয়েছে, তার মূলে রয়েছে আধিপত্য বিস্তারের লোভ, সংকীর্ণ স্বার্থপরতা এবং অন্যের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার মানসিকতা। হিংসা কেবল বাহ্যিক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় না, বরং এটি মানুষের মনস্তত্ত্বকে বিষাক্ত করে তোলে। যখন কোনো সমাজে পারস্পরিক আস্থার সংকট তৈরি হয় এবং হিংসা সামাজিক ভিত পেয়ে যায়, তখন সে সমাজ ধীরে ধীরে আত্মবিনাশের দিকে পা বাড়ায়। মানুষের স্বাধীন চিন্তা, সৃজনশীলতা আর ভালোবাসার শক্তিকে পরাস্ত করে নৈরাজ্যের ঘরবাড়ি সৃষ্টি করে। ব্যক্তিগত অস্তিত্বের সুরক্ষা, মানসিক শান্তি, সামাজিক ঐক্য আর স্থায়ী উন্নয়নের স্বার্থে হিংসার সংস্কৃতি চিরতরে পরিহার করা, এই সময়ের সবচেয়ে বড়ো দাবি। ‘প্রেম’ কেবল সাধারণ আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি সুদূরপ্রসারী দার্শনিক ধারণা— যা পরমতসহিষ্ণুতা, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, ক্ষমা এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান জানানোর স্থায়ী প্রক্রিয়া। বিশ্বের যেকোনো সংকট মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা আর ভালোবাসার সার্বজনীন আবেদন মানুষের সঙ্গে মানুষের মজবুত সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে। সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবী গড়তে হলে অন্তরের সব অন্ধকার ও ঘৃণার বিষবাষ্প দূর করতে হবে। বিদ্বেষের বীজ বপন না করে মননে, কথনে ও আচরণে সহমর্মিতার আলো ছড়িয়ে দেওয়াটাই এই মুহূর্তে মানবজাতির সবচেয়ে বড়ো দায়িত্ব। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে হলে হিংসার বিনাশ ঘটিয়ে, মানুষের মনে প্রেমের চিরন্তন দীপশিখা জ্বালিয়ে রাখাটাই হয়ে উঠুক আমাদের একমাত্র ব্রত।

প্রাচীন গ্রিক দর্শন প্রেমকে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করেছে। প্লেটোর ধারণা, প্রেম মানুষের ভেতরে থাকা এক দিব্য আকাঙ্ক্ষা, যা মানুষকে নশ্বর থেকে অবিনশ্বর সত্য, সৌন্দর্য এবং মঙ্গলের দিকে চালিত করে। সে আমাদের বিচ্ছিন্নতা দূর করে সামগ্রিকতার সঙ্গে যুক্ত হতে শেখায়। আধুনিক ও নৈতিক দর্শনে নিঃস্বার্থ পরার্থপরতা সর্বজনীন ঐক্যের ভিত্তি স্থাপন করে। ফ্রেডরিখ নিটশে প্রেম এবং হিংসা উভয়কেই মানুষের ‘ক্ষমতার ইচ্ছা’-র সঙ্গে জড়িয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। হিংসা বা ক্ষোভ অনেক সময় আত্মরক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার শক্তি জোগায়, অন্যদিকে উচ্চতর জীবনের সৃষ্টিশীলতার পেছনেও কোনো না কোনো রূপে সে আবেগ কাজ করে। অস্তিত্ববাদী দর্শনে অন্য মানুষের উপস্থিতি আমাদের কাছে হুমকি বা স্বাতন্ত্র্য হরণের কারণ হতে পারে। জঁ-পল সার্ত্রের বিখ্যাত উক্তি ‘অন্য মানুষের আরেক নাম নরক’— এরকম ধারণা থেকেই অন্যের দৃষ্টিতে আমরা বস্তুতে পরিণত হই। নিরাপত্তাহীনতা ও অহংবোধ থেকেই মূলত হিংসা এবং পারস্পরিক সংঘাতের জন্ম হয়।


মানুষের আচরণের অন্তর্নিহিত জটিলতাকে অনুধাবন করতে হলে হিংসার জৈবিক ও মনস্তাত্ত্বিক উৎসগুলোর গভীরতা অন্বেষণ করা অপরিহার্য। তাত্ত্বিক ও বিবর্তনীয় দৃষ্টিভঙ্গির আলোয় বিচার করলে দেখা যাবে, হিংসা কোনো আকস্মিক বিকৃতি নয়; এটি মানব মনের গভীর আর আদিম প্রবৃত্তি। বিবর্তনবাদ, মনোসমীক্ষণ এবং সমাজতাত্ত্বিক কাঠামোর নিরিখে এসব প্রবৃত্তির স্বরূপ নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব


মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় প্রেম এবং হিংসা মনের গভীরে প্রোথিত দুটি আদিম শক্তির দ্বান্দ্বিক প্রকাশ। এই দুই শক্তির অন্তহীন সংঘাত এবং মিথস্ক্রিয়াই মানবসভ্যতার গতিপ্রকৃতি ও সাংস্কৃতিক বিকাশকে নির্ধারণ করছে। সিগমন্ড ফ্রয়েড বলেছিলেন, মানুষের মন মূলত দুটি বিপরীতমুখী প্রবৃত্তির দ্বন্দ্বে পরিচালিত— সৃজনশীল শক্তি ‘ইরোস’ এবং ধ্বংসাত্মক মৃত্যু প্রবৃত্তি ‘থানাতোস’। অবচেতনে সুপ্ত, এই মৃত্যুমুখী শক্তি সুযোগ পেলেই আগ্রাসী রূপ ধারণ করে। মনোবিজ্ঞানী এরিখ ফ্রম দেখিয়েছেন, সমাজ বা প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে মানুষ যখন বিচ্ছিন্নতায় ভোগে, তখন সে দুটি পথ বেছে নেয়— হয় প্রেম ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে ঐক্য স্থাপন, নতুবা হিংসা ও ধ্বংসের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। হিংসাকে তিনি মূলত দুর্বলতা ও সৃজনশীলতার ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ বলতে দ্বিধা করেননি। কার্ল ইয়ুং-এর মনস্তত্ত্বে ব্যক্তিত্বের অবদমিত ক্ষোভ, ঈর্ষা ও অন্ধকার দিকটি ‘ছায়া’ হিসেবে চিহ্নিত। মানুষ নিজের ভেতরের অন্ধকার অংশকে চিনতে বা স্বীকার করতে ব্যর্থ হলে তা হিংসার রূপ নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভালোবাসার প্রকৃত বিকল্প হিংসা নয়, একধরনের গভীর উদাসীনতা বা নির্বিকারত্ব; কারণ প্রেম ও ঘৃণা উভয় ক্ষেত্রে চরম মানসিক শক্তি ও মনোযোগ জরুরি। বহু ক্ষেত্রে চরম হিংসার ভিত্তি অপূর্ণ প্রেম, অধিকারবোধ কিংবা হারানোর ভয়।

হিংসা বিচ্ছিন্নতার বেদনা ও ধ্বংসের উন্মাদনা, প্রেম সেখানে এমন এক নিরাময়কারী শক্তি যা আমাদের সংকীর্ণ গণ্ডি ছাড়িয়ে সর্বজনীন মেলবন্ধন তৈরি করতে শেখায়। যেখানে হিংসার অন্ধ প্রবৃত্তিকে চিনে সেগুলোকে প্রেমের সৃজনশীল ও মানবিক চেতনায় রূপান্তরিত করার নিরন্তর সংগ্রামের মধ্যেই সভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি নিহিত। মানুষের আচরণের অন্তর্নিহিত জটিলতাকে অনুধাবন করতে হলে হিংসার জৈবিক ও মনস্তাত্ত্বিক উৎসগুলোর গভীরতা অন্বেষণ করা অপরিহার্য। তাত্ত্বিক ও বিবর্তনীয় দৃষ্টিভঙ্গির আলোয় বিচার করলে দেখা যাবে, হিংসা কোনো আকস্মিক বিকৃতি নয়; এটি মানব মনের গভীর আর আদিম প্রবৃত্তি। বিবর্তনবাদ, মনোসমীক্ষণ এবং সমাজতাত্ত্বিক কাঠামোর নিরিখে এসব প্রবৃত্তির স্বরূপ নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব। চার্লস ডারউইন প্রাকৃতিক নির্বাচনবাদ ও বিবর্তনের তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে বোঝাতে চেয়েছেন, আদিম সমাজে সীমিত সম্পদ, খাদ্য, ভূখণ্ড ও প্রজননগত সঙ্গীর অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল। প্রতিকূল পরিবেশে প্রজাতিগত অস্তিত্ব রক্ষা এবং বংশের আধিপত্য সুনিশ্চিত করার একটি জৈবিক ও কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে আগ্রাসন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মনোভাব কাজ করত। আদিম মানবসত্তার কাছে হিংসা বা আক্রমণাত্মক প্রবৃত্তি ছিল আত্মরক্ষার প্রবৃত্তিজাত রক্ষাছাতা। প্রযুক্তির বিকাশ এবং মানবসভ্যতার ক্রমউত্তরণের পাশাপাশি আদিম হিংসার শারীরিক ও পাশবিক বহিঃপ্রকাশের ধরণ পরিবর্তিত হয়েছে। ক্রমাগত প্রত্যক্ষ শারীরিক সংঘাতের স্থান দখল করেছে কাঠামোগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক আর মানসিক হিংসা— যার বহিঃপ্রকাশে ঈর্ষা, আধিপত্য বিস্তার এবং প্রান্তিকীকরণের নানা সূক্ষ্ম কৌশল রূপান্তরিত হতে থাকে। এরই অন্তর্নিহিত চালিকাশক্তি আদিম আত্মরক্ষা এবং তুলনামূলক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের অবচেতন তাড়না থেকেই উৎসারিত হয়।

♦–♦•♦–♦  ♦–♦•♦–♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!