Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • আগস্ট ৯, ২০২৬

অধিবিদ্যা বনাম সাম্প্রতিকের ইতিহাস চর্চা

হিলাল উদ্দিন লস্কর
অধিবিদ্যা বনাম সাম্প্রতিকের ইতিহাস চর্চা

সভ্যতা আর সংস্কৃতির বিবর্তনে ‘সময়’ কেবল পরিমাপযোগ্য একক অথবা ঘড়ির কাঁটার যান্ত্রিক ঘূর্ণন নয়; এটাই ব্যক্তিপ্রতিভার অস্তিত্ব ও চেতনার গভীরতম দার্শনিক ভিত্তি। ইতিহাস কীভাবে রচিত হবে, অতীত কীভাবে এখনকার কাঠামোর মধ্যে অর্থবহ হয়ে উঠবে এবং সমাজ তার যৌথ স্মৃতিকে কীভাবে ধারণ বা বর্জন করবে— তার পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত হয় সমাজের সময়ের অধিবিদ্যা বা মৌলিক ধারণার ওপর। সময়ের এসব উপলব্ধির ওপরই নির্ভর করে যেকোনো জাতির আত্মপরিচয়, তার প্রগতির রূপরেখা এবং অতীতের সঙ্গে তার সম্পর্কের ধরন। সময়ের স্বরূপ উন্মোচন করতে গেলে মূলত দুটি বিপরীত অথচ পরিপূরক ধারার সাক্ষাৎ মেলে। কালচেতনার দুই ভিন্ন ধারা ইতিহাস পাঠের পদ্ধতিকে যেমন বদলে দেয়, তেমনি সভ্যতার অগ্রযাত্রার দৃষ্টিভঙ্গিকেও ভিন্ন পথে চালিত করে। ভারতীয় ঐতিহ্যে সময়ের অধিবিদ্যায়ব অবস্থান কীভাবে তার ইতিহাস চিন্তা আর জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছে, এই আলোচনায় আমরা সে বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব।


ভারতীয় দর্শনে বৃত্তাকার গতিতে ঘূর্ণায়মান মহাজাগতিক প্রবাহ সত্যত্রেতাদ্বাপর ও কলি— এই চার যুগের নিরন্তর আবর্তনে সৃষ্টিস্থিতি ও লয় বারবার ফিরে আসে, যেখানে নির্দিষ্ট ঘটনা বা যুগই চূড়ান্ত বা অনন্য নয় এখানে সবকিছুই পুনরাবৃত্তিমুখী


সময়ের বহুমাত্রিক রূপকে প্রধানত দুটো তত্ত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।  রৈখিক সময় তত্ত্ব : রৈখিক কালচেতনার মূল  কথা হলো, সময় একটি নির্দিষ্ট সূচনাবিন্দু থেকে শুরু হয়ে অনাগত ভবিষ্যতের দিকে অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে চলে। এই দর্শনে সময়ের  প্রতিটি মুহূর্ত সম্পূর্ণ অনন্য, একক ও অদ্বিতীয়। অতিক্রান্ত অতীত চিরকালের জন্য বিলীন হয়ে যায় এবং তা আর কখনোই হুবহু ফিরে আসে না। ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে এই দর্শন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রৈখিক কালচেতনা মূলত ইতিহাসের প্রগতি, কার্যকারণ সম্পর্ক, ধারাবাহিক পরিবর্তন এও বস্তুনিষ্ঠ কালপঞ্জিকে প্রাধান্য দেয়। অতীত থেকে বর্তমান এবং বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের দিকে সমাজের এই নিরবচ্ছিন্ন যাত্রাই আধুনিক, তথ্যভিত্তিক ও বৈজ্ঞানিক ইতিহাস গবেষণার মূল ভিত্তি। রৈখিক সময়ের ধারণার সর্বপ্রধান ধর্মীয় উৎস হচ্ছে ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলামের আব্রাহামীয় ঐতিহ্য । এসব ঐতিহ্যে সৃষ্টিজগতের নির্দিষ্ট সূচনা, ইতিহাসের ক্রমবিকাশ এবং একটি চূড়ান্ত সমাপ্তি বা পরকালের কথা বলা হয়েছে, যা সময়কে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অভিমুখে ধাবিত করে। রৈখিক সময়কে আধুনিক ইউরোপীয় ইতিহাস দর্শনের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করেন সেন্ট অগাস্টিন। ইতিহাসকে ঈশ্বরের ঐশ্বরিক পরিকল্পনার সরলরৈখিক যাত্রা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন তিনি। পরে রেঁনেসা ও জ্ঞানালোকের যুগে এ ধারণাকে বৈজ্ঞানিক ও বস্তুনিষ্ঠ রূপ দেন ইমানুয়েল কান্ট এবং গেয়র্গ ভিলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেল। হেগেলের অনুমান, ইতিহাস হলো মানবচেতনা ও স্বাধীনতার এক ধারাবাহিক সরলরৈখিক বিকাশ। সপ্তদশ শতকে আইজ্যাক নিউটনের গতিবিদ্যা এবং পরবর্তীতে থার্মোডায়নামিক্স বা তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র এই রৈখিক সময়চেতনাকে বৈজ্ঞানিক দিক থেকেও সুপ্রতিষ্ঠিত করে। রৈখিক সময় মানুষকে এই শিক্ষাই দেয় যে, অতীতের প্রতিটি ঘটনা অনন্য এবং মানবজাতি কেবল এক লক্ষ্যমুখী ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসরমান।


প্রাচীন ভারতে নিখাদ রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জি বা কালপঞ্জির অভাব পুরোপুরি সত্য নয়কলহণের ‘রাজতরঙ্গিনী’, শিলালিপি বা তাম্রশাসনের মতো উপাদান তার প্রমাণ। তবে শুষ্ক রাজনৈতিক ইতিহাসের চেয়ে সমাজে পুরাণইতিকথা ও মহাকাব্যের প্রভাব ছিল অনেক বেশি।


বৃত্তাকার সময় তত্ত্ব : বৃত্তাকার কালচেতনার মূল কথা হচ্ছে, সময় সরলরেখায় ধাবিত অসীম পথ নয়; এটি প্রকৃতির ঋতুচক্র বা মহাজাগতিক আবর্তনের মতো নিরবচ্ছিন্ন বৃত্তপথে বারবার ফিরে আসে। এই ধারণায় সময় স্বয়ংসম্পূর্ণ রৈখিক প্রবাহ নয়; এটি সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের এক শাশ্বত ও পুনরাবৃত্তশীল মহাজাগতিক চক্র। ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে এই দর্শন গভীর তাৎপর্যবহ। চক্রাকার সময়চেতনায় অতীত কখনোই চিরতরে হারিয়ে যাওয়া বা মৃত কোনো অধ্যায় নয়; অতীত বর্তমানের ভেতরেই পুনরায় উদ্ভাসিত হয় এবং অনন্ত ভবিষ্যতের মধ্যেও তার জীবন্ত উপস্থিতি বজায় রাখে। এই দর্শন অনুযায়ী, কোনো চূড়ান্ত গন্তব্যের দিকে চলা সরলরেখা নয়; এটি এক শাশ্বত আবর্তন। চক্রাকার সময়ের ধারণার সবচেয়ে সুগভীর প্রকাশ দেখা যায় ভারতীয় আর প্রাচ্য দর্শনে। বৈদিক ও পৌরাণিক ঐতিহ্যে সময়কে মহাজাগতিক যুগের অবিরাম আবর্তনে ভাগ করা হয়েছে, যা সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলিযুগের মহাচক্র হিসেবে পরিচিত। হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন দর্শনে জন্ম, মৃত্যু ও পুনর্জন্মের ধারণা মূলত এই চক্রাকার কালচেতনারই দার্শনিক রূপায়ণ। পাশ্চাত্যের প্রাচীন ঐতিহ্যের মূলে, বিশেষ করে গ্রিক ও মেসোপটেমীয় সভ্যতায় চক্রাকার সময়ের শক্তিশালী উপস্থিতি ছিল। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো ও অ্যারিস্টটল মহাজাগতিক আবর্তন এবং প্রকৃতির পুনরাবৃত্তিমূলক গতিপ্রকৃতির ওপর জোর দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে স্টোয়িক দার্শনিকরা বিশ্বাস করতেন যে, মহাবিশ্বের সমস্ত ঘটনা নির্দিষ্ট মহাজাগতিক চক্র সম্পন্ন হওয়ার পর হুবহু পুনরাবৃত্ত হয়। আধুনিক পশ্চিমি দর্শনে এই চক্রাকার ধারণাকে নতুনভাবে পুনরুজ্জীবিত করেন দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিটশে ও ওসওয়াল্ড স্পেংলার প্রমুখ। নিটশের ‘চিরন্তন পুনরাবৃত্তি’ তত্ত্বে ব্যাখা করা হয়, মহাবিশ্বের সমস্ত শক্তি সীমিত এবং এর পরিবর্তনের বিন্যাস নির্দিষ্ট; এ কারণে অসীম সময়ে প্রতিটি ঘটনা বারবার অবিকলভাবে ফিরে আসে। ইতালীয় সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসদ্রষ্টা জিয়ামবাতিস্তা ভিকো তাঁর ‘নিউ সায়েন্স’ গ্রন্থে সমাজ ও সভ্যতার উত্থান, বিকাশ ও পতনের চক্রাকার ঐতিহাসিক গতির রূপরেখা এঁকেছেন। সময়চক্র মানুষকে এই শিক্ষাই দেয় যে, মহাবিশ্বে কিছুই পুরোপুরি হারিয়ে যায় না; অতীত বারবার নতুন রূপে ফিরে আসে।

ভারতীয় চিন্তাভাবনাকেও বস্তুনিষ্ঠ ও কালানুক্রমিক ইতিহাস চর্চার প্রকৃতি গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ভারতীয় দর্শনে বৃত্তাকার গতিতে ঘূর্ণায়মান মহাজাগতিক প্রবাহ সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি— এই চার যুগের নিরন্তর আবর্তনে সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় বারবার ফিরে আসে, যেখানে নির্দিষ্ট ঘটনা বা যুগই চূড়ান্ত বা অনন্য নয়। এখানে সবকিছুই  পুনরাবৃত্তিমুখী। এই চক্রাকার কালচেতনার বশবর্তী হয়ে, প্রাচীন ভারতীয় সমাজ জাগতিক ঘটনাপ্রবাহের পুঙ্খানুপুঙ্খ কালপঞ্জি বা দিনপঞ্জি সংরক্ষণের বিশেষ কোনো তাগিদ অনুভব করেনি। এর পেছনে কার্যকর ছিলো, আরও একটি আধ্যাত্মিক  মনস্তত্ত্ব, যেখানে জাগতিক ঘটনাপ্রবাহকে ‘মায়া’, ‘লীলা’ বা ক্ষণস্থায়ী বলে জ্ঞান করা হতো। জাগতিক উত্থান-পতন, রাজনৈতিক সংঘাত কিংবা রাজবংশের পরিবর্তনকে পরমার্থিক সত্যের বিচারে নিছক জগতের ‘লীলা’ বা রূপান্তর হিসেবে দেখা হয়েছে। গ্রিক ঐতিহ্যে, থুসিডাইডস বা হেরোডোটাসের লেখায় মানবীয় কর্ম, যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক সংঘাতের সুনির্দিষ্ট বিবরণই ইতিহাস রচনার মুখ্য বিষয় হয়ে উঠলেও ভারতীয় মনন সেখানে অবগাহন করেছে  অপরিবর্তনীয়, অবিনশ্বর ও পরম সত্যের সন্ধানে— যাকে পরিবর্তনশীল জগতের সীমানায় আবদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। যা আজ আছে এবং কাল মহাকালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে, এই ক্ষণস্থায়ী রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জির তথ্যভিত্তিক পুঙ্খানুপুঙ্খ ইতিহাস রচনাকে ভারতীয় আধ্যাত্মিক চিন্তায় অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করা হয়েছিল।

অধিবিদ্যায়িক স্তরে বৃত্তাকার সময়ের ধারণার সঙ্গে ঐতিহাসিক উপাদানের মিল খুঁজতে গেলে বৈপরীত্যের পাশাপাশি তাত্ত্বিক সমন্বয়ের চিত্রও ফুটে ওঠে। প্রাচীন ভারতে নিখাদ রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জি বা কালপঞ্জির অভাব পুরোপুরি সত্য নয়; কলহণের ‘রাজতরঙ্গিনী’, শিলালিপি বা তাম্রশাসনের মতো উপাদান তার প্রমাণ। তবে শুষ্ক রাজনৈতিক ইতিহাসের চেয়ে সমাজে পুরাণ, ইতিকথা ও মহাকাব্যের প্রভাব ছিল অনেক বেশি। পুরাণে কালানুক্রমিক তথ্যের চেয়ে মানবস্বভাবের শাশ্বত দ্বন্দ্ব এবং মহাজাগতিক বিশ্বতত্ত্বের রূপক ব্যক্ত হয়েছে। বৃত্তাকার সময়ের কাঠামোয় রাম বা কৃষ্ণের মতো চরিত্রগুলো নির্দিষ্ট শতাব্দীর গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে নৈতিক সংকটের শাশ্বত প্রতীকে পরিণত হতে দেখি।  ভারতীয় মননে বাহ্যিক তথ্যের চেয়ে নৈতিক প্রজ্ঞা ও ভাবসত্যের প্রাধান্য বেশি। এ প্রসঙ্গে দার্শনিক সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ তাঁর ‘অ্যান আইডিয়ালিস্ট ভিউ অব লাইফ’ গ্রন্থে বলেছেন যে, পাশ্চাত্য অর্থে ভারতীয় মনন প্রথাগত ঐতিহাসিক চেতনাসম্পন্ন নয়, কারণ তাদের কাছে ইতিহাসের চেয়ে আত্মার কালহীন সত্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে, ইতিহাসবিদ আর্থার বেসিল কিথও মনে করতেন যে, ভারত বাহ্যিক ঘটনার কালপঞ্জির চেয়ে অন্তঃসারপূর্ণ ভাবের প্রকাশকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, যেখানে পুরাণ কেবল অতীত ঘটনার বিবরণ নয়, মানব অস্তিত্বের শাশ্বত রূপকও বটে।


রাষ্ট্রীয় আদেশে নাম পরিবর্তন বা ইতিহাস পুনর্লিখনের প্রচেষ্টা কেবল অতীতকে অস্বীকার করা নয়মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা যৌথ অভ্যাসের ওপর কধরনের জবরদস্তি। সহনশীল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে সব সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং অতীতের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন জরুরি


পাশ্চাত্যের আধুনিক বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চা মূলত রৈখিক সময়, কার্যকারণ সম্পর্ক এবং তথ্যভিত্তিক প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ঔপনিবেশিক আমলে এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ভারতীয়দের পরিচয় ঘটে এবং এদেশীয় পন্ডিতেরা আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক ইতিহাস চর্চায় মনোনিবেশ করেন। মধ্যযুগেও রৈখিক ধারায় ইতিহাস চর্চার গৌরবময় ঐতিহ্য ছিল। ঔপনিবেশিক শাসনকাল থেকেই ভারতীয় ইতিহাস চর্চায় গভীর সংকট ও দ্বান্দ্বিকতার সৃষ্টি হয়। পাশ্চাত্য ঐতিহাসিক ও দার্শনিকরা প্রাচীন ভারতের চক্রাকার সময়চেতনাকে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়ে কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রচার করতে শুরু করেন যে, ভারতীয়দের মধ্যে ‘ইতিহাসবোধের অভাব’ রয়েছে। এই অভিযোগের পেছনে মূলত রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের মনোবৃত্তি কাজ করেছিল, যার মাধ্যমে তারা ঔপনিবেশিক শাসনের নৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে চেয়েছিল। তাদের যুক্তি ছিল— ভারতীয়রা নিজেদের অতীত ও কালপঞ্জি সংরক্ষণ করতে জানে না, তাই  শাসন করার অধিকার কেবল উন্নত পশ্চিমাদেরই রয়েছে। জার্মান দার্শনিক গেয়র্গ ভিলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেল ভারত ও প্রাচ্য সভ্যতাকে ইতিহাসের মূল পরিধির বাইরে রেখে দেন। তিনি বলেছেন, ভারতের সমাজ স্থবির এবং সময় এখানে চক্রাকারে আবর্তিত হয় বলেই এখানে প্রকৃত ঐতিহাসিক চেতনার অস্তিত্ব নেই। একইভাবে, ব্রিটিশ ঐতিহাসিক জেমস মিল তাঁর ‘হিস্ট্রি অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে ভারতীয় সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে অবৈজ্ঞানিক ও বিশৃঙ্খল বলে চরম অবমূল্যায়ন করেন। মূলত সময়ের ধারণাগত মৌলিক সংঘাতের কারণেই পাশ্চাত্যের ইতিহাসবিদরা মহাজাগতিক ও চক্রাকারে ঘূর্ণনরত সময়কে রৈখিক প্রগতির মাপকাঠিতে বিচার করতে গিয়ে ভারতীয় ইতিহাস চেতনাকে ভুল বুঝেছিলেন।

আধুনিক অর্থে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যভিত্তিক ইতিহাস চর্চার অনুপস্থিতি প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যে স্পষ্ট। শুষ্ক কালপঞ্জি বা রাজনৈতিক ইতিহাসের বদলে ভারতীয় মনন সবসময় শাশ্বত পুরাণ এবং রূপকধর্মী আখ্যানের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে। আজও এই মানসিকতার উত্তরাধিকার বিদ্যমান। একারণে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস ও পৌরাণিক কল্পকাহিনীর সীমারেখা অনেক সময় অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর মূলে রয়েছে ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের মধ্যকার এক অবিচ্ছেদ্য মেলবন্ধন, যা মূলত দুটি প্রধান লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত:

ক. ভারতীয় দর্শনে চক্রাকারমুখী সময়তত্ত্ব অতীতকে বর্তমান থেকে বিচ্ছিন্ন অধ্যায় হিসেবে দেখে না। বরং এটি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে অবিচ্ছিন্ন সুতোয় বেঁধে রাখে, যেখানে প্রতিটি যুগ ও ঘটনাপ্রবাহ পুনরাবৃত্তিমূলক এবং শাশ্বত।

খ. মানসিক সান্ত্বনাও জটিল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সংকটের মুখে মানুষ যখন দিশাহারা হয়ে পড়ে, তখন শুষ্ক ঐতিহাসিক তথ্যের চেয়ে পৌরাণিক ও রূপকধর্মী বয়ান তাদেরকে অধিক মানসিক সান্ত্বনা, স্থৈর্য এবং আত্মিক শক্তি জোগায়।

বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যভিত্তিক ইতিহাস চর্চা আধুনিক ইউরোপীয় ধারার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলেও, ভারতীয় ঐতিহ্যে এর ভিন্নতর উপস্থিতি কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতা নির্দেশ করে না। এটি মূলত মহাজাগতিক শৃঙ্খলার অংশীদার বলেই একক গভীর অধিবিদ্যক উপলব্ধি। সময়ের চক্রাকার ধারণায় অতীত কখনো চিরতরে হারিয়ে যায় না; বরং মহাজাগতিক নিয়মে তা বারবার ফিরে আসে। এই কারণে ভারতীয় মানসে ইতিহাস এবং পৌরাণিক কল্পকাহিনির সীমারেখা সবসময় পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে অবস্থান করেছে। সময়ের এই বৃত্তাকার ধারণা কেবল ভারতীয় দর্শনেই সীমাবদ্ধ নয়; পশ্চিমের বহু মনীষীও এর দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। ওসওয়াল্ড স্পেংলার এবং আর্নল্ড টয়নবির মতো ইতিহাসবিদ সভ্যতার উত্থান-পতনকে চক্রাকার রূপেই ব্যাখ্যা করেছেন এবং এই ঐতিহ্য অনুসরণ করে মূল্যবান ইতিহাস দর্শন রচনা করেছেন। ইতিহাসের স্বরূপ উন্মোচনে ব্রিটিশ চিন্তাবিদ আর. জি. কলিংউড তাঁর ‘দ্য আইডিয়া অফ হিস্টরি’-তে ইতিহাসকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের অনুকরণ থেকে মুক্ত করে মানুষের চিন্তার পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর বিখ্যাত উক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ— ‘সমস্ত ইতিহাসই সমসাময়িক ইতিহাস।’ এর অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, একজন ইতিহাসবিদ বর্তমানের জিজ্ঞাসা ও সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অতীতের মানুষের চিন্তাকে নিজের মনের মধ্যে পুনর্গঠিত করেন।

ভারতবর্ষে সাধারণ মানুষ শুষ্ক ও রৈখিক কালপঞ্জির চেয়ে মহাভারত বা রামায়ণের মতো মহাকাব্যিক মিথ বা কল্পকাহিনির ভেতরে নিজেদের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক পরিচয় খুঁজে পায়। কলিংউডের দর্শনের আলোকে আমরা বলতে পারি, এইসব কল্পকাহিনি মানুষের অবচেতনকে তাদের বর্তমান সমাজচেতনাকে নিরন্তর পরিচালিত করছে। বিশেষ করে, ঔপনিবেশিক  শাসনের নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও ভারতীয় সমাজ নিজের ঐতিহ্যগত ও আত্মিক পরিচয় রক্ষার্থে পুরাণ ও কল্পকাহিনিগুলোকে শক্তিশালী মানসিক প্রতিরোধ ও আত্মবিশ্বাসের হাতিয়ার হিসেবে সফলভাবে ব্যবহার করেছে । সময়ের স্বরূপ উন্মোচনে আধুনিক বিজ্ঞান ও দর্শনও যুগান্তকারী ভাবনার জন্ম দিয়েছে: ব্রিটিশ দার্শনিক জন এম. ই. ম্যাকট্যাগার্ট ‘দ্য আনরিয়ালিটি অফ টাইম’ প্রবন্ধে সময়কে প্রবহমান  অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ এবং অপরিবর্তনীয় শৃঙ্খলের পূর্বাপর সম্পর্কের ক্রমে ভাগ কর এক প্রকার মায়াবী বা আপেক্ষিক ধারণা হিসেবে তুলে ধরেছেন। অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এবং আধুনিক অ্যাস্ট্রোফিজিক্স সময়কে স্থান-কালের অবিচ্ছেদ্য অংশ বা ‘স্পেস-টাইম কন্টিনিউয়াম’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এটি বৈজ্ঞানিকভাবেই প্রমাণ করে যে, সময় নিরপেক্ষ, পরম বা রৈখিক বিষয় নয়।

সময়ের চক্রাকার ধারণা এবং পৌরাণিক ঐতিহ্যের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্রটিকে সমসাময়িক রাজনীতি তার রাজনৈতিক এজেন্ডার সুকৌশল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, যা ইতিহাস চর্চা ও চিন্তার পরিসরে প্রবল বিতর্ক ও সংকটের জন্ম দিচ্ছে। আধুনিক ইতিহাস চর্চার প্রত্নতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের পরিবর্তে পৌরাণিক রূপক এবং লোকায়ত আখ্যানকে যখন চূড়ান্ত ঐতিহাসিক সত্য বলে চালিয়ে দেওয়া হয়, তখন সাধারণ মানুষ যেকোনো ঐতিহাসিক আলোচনায় যুক্তির চেয়ে আবেগকে এবং বাস্তব তথ্যের চেয়ে কাল্পনিক বয়ানে অধিকতর প্রভাবিত হয়। প্রাচীনকালকে নিখুঁত, গৌরবময় ও অখণ্ড ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে উপস্থাপন করে, মধ্যযুগকে কেবলই আক্রমণ, পতন ও ধ্বংসের কাল হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ইতিহাসের এই খণ্ডিত ও পক্ষপাতদুষ্ট ব্যাখ্যা সমাজের কৃত্রিম মেরুকরণ ও বিভাজন ত্বরান্বিত করছে। দার্শনিক কার্ল পপার এরকম প্রবণতার সমালোচনা করে দেখিয়েছেন যে, ইতিহাসের নির্দিষ্ট ও পূর্বনির্ধারিত গতিপথ বা অবশ্যম্ভাবী গন্তব্যের দাবি—যাকে ‘হিস্টোরিসিজম’ বলা হয়, তা সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক এবং এখান থেকেই কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি জন্ম নেয়। পপার যেখানে সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে স্তরে স্তরে পরীক্ষামূলক ‘খণ্ডিত সামাজিক প্রকৌশল’-এর সমর্থনে সওয়াল করেছেন, সেখানে এখনকার রাজনৈতিক প্রচার ইতিহাসকে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের কারখানায় পরিণত করছে।

ইতিহাস কোনো স্থির বা একক রৈখিক প্রবাহ নয়; এটি বহুমাত্রিক ও গতিশীল প্রক্রিয়া, যা ‘প্যালিম্পসেস্ট’ বা প্রাচীন পাণ্ডুলিপির মতো মানবসভ্যতার নানা রূপান্তর ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণকে ধারণ করে। নির্দিষ্ট কালখণ্ডকে কৃত্রিম উপায়ে মুছে ফেলা বা অবমূল্যায়ন করার অর্থ হলো সমাজের ধারাবাহিক বিবর্তনের পথকে রুদ্ধ করা। ইতিহাস যেখানে আত্মোপলব্ধি, প্রজ্ঞা ও যুক্তিবাদী সমাজ গঠনের প্রধান মাধ্যম হওয়া উচিত, সেখানে সংকীর্ণতা বহুত্ববাদী সংস্কৃতির টিকে থাকার ক্ষেত্রে গভীর অন্তরায় তৈরি হয়। ভারত বহু ধর্মীয়, বহু ভাষিক, বহু সংস্কৃতির অনন্য ভূখণ্ড। এর মূল ভিত্তিটি গড়ে উঠেছে শত শত বছরের মিশ্র সংস্কৃতির যৌথ চেতনার ওপর। ভারতের শিল্প, স্থাপত্য, সঙ্গীত এবং প্রশাসনিক কাঠামো এই সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মধ্যযুগীয় ঐতিহ্যকে শুধুমাত্র ‘বিদেশি’ সংস্কৃতি হিসেবে চিহ্নিত করলে দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক দেওয়া আর নেওয়াকে অস্বীকার করা হয়, যা ভারতের বহুত্ববাদী চরিত্র নয়। সমাজবিজ্ঞানীদের ধারণা, কোনো জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় কেবল কাল্পনিক, পৌরাণিক অতীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; এটি তৈরি হয় বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং প্রজন্ম ধরে সঞ্চিত শত শত বছরের যৌথ স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে। রাষ্ট্রীয় আদেশে নাম পরিবর্তন বা ইতিহাস পুনর্লিখনের প্রচেষ্টা কেবল অতীতকে অস্বীকার করা নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা যৌথ অভ্যাসের ওপর  একধরনের জবরদস্তি। সহনশীল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে সব সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং অতীতের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন জরুরি। অতএব ইতিহাসকে রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ার না বানিয়ে, তাকে পারস্পরিক সহাবস্থান ও আত্মোপলব্ধির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করাটাই বহুত্ববাদী সমাজের মৌলিক দাবি।

আল-বেরুনি থেকে শুরু করে রমেশচন্দ্র মজুমদার এবং পশ্চিমেত বহু ভারততাত্ত্বিক বলেছেন, ভারতীয় দর্শনে সময়ের  ‘বৃত্তাকার’ ধারণার কারণেই প্রাচীন ভারতীয়দের মধ্যে কালক্রম বা ক্রনোলজির প্রতি আগ্রহের অভাব ছিল। রমিলা থাপার ও ইরফান হাবিবের মতো আধুনিক ইতিহাসবিদদের ধারণা, এটা কোনো ঐতিহাসিক অবহেলা বা বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতা নয়,  বরং সময় সম্পর্কে এক মহাজাগতিক ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধি, যেখানে পার্থিব ও খণ্ডিত ঘটনার চেয়ে চিরন্তন দার্শনিক সত্যের প্রাধান্য অনেক বেশি।

♦–♦•♦–♦ ♦–♦•♦–♦ ♦–♦•♦–♦

[মতামত লেখকের নিজস্ব]

 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!