Advertisement
  • ব | ই | চ | র্যা রোব-e-বর্ণ
  • আগস্ট ৯, ২০২৬

‘ঘর’ কোথায় ?

জিয়া হক
‘ঘর’ কোথায় ?

অমর্ত্য সেনের ‘হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ পড়তে গিয়ে প্রথমেই মনে হয়, এটি নিছক ‘আত্মজীবনী’ নয়। এ এক বহুরৈখিক পরিচয়ের অনুসন্ধান। স্মৃতিরও। মানুষের মন কীভাবে সমাজের ভিতরে ‘তৈরি’ হয়ে ওঠে, তার এক নির্জলা ও দীর্ঘ বিবরণ। বইয়ের নামেই আছে জিজ্ঞাসা। ঘর কোথায় ? জন্মভূমিতে ? ভাষায় ? পরিবারে ? নাকি স্মৃতিতে ? অর্থশাস্ত্রী এর কোনো ‘সহজ’ উত্তর দেন না। বরং প্রশ্নটিকেই দীর্ঘায়িত করতে থাকেন, আর বইটির নিভৃত সৌন্দর্য এখানেই। মানুষ একা নন। সমাজের ভিতরে থাকা এক ‘এনটিটি’। পরিবার, শিক্ষা, ইতিহাস, রাজনীতি আর সংস্কৃতি তাঁকে ধীরে ধীরে, ধাপে ধাপে নির্মাণ করে। আবার তিনিও সেই সমাজকেই প্রশ্ন করেন। এও এক প্রকার আত্মজিজ্ঞাসা।

অমর্ত্য সেনের শৈশবের বর্ণনা খুব শান্ত-সমাহিত, মেদুর। কোথাও বাড়তি ‘নাটকীয়তা’ নেই। অথচ সেই নিবিড় শান্তির ভিতরেই ঢুকে পড়ে ইতিহাস, ঢুকে পড়ে শান্তিনিকেতন, ঢাকা। অমোঘ কলকাতা। আসে দেশভাগ। দুর্ভিক্ষ। সাম্প্রদায়িক হিংসা। শিশুর চোখ দিয়ে দেখা পৃথিবী ধীরে ধীরে ‘জটিল’ হয়ে ওঠার ধারাভাষ্য। এখানেই এ লেখার সবচেয়ে বড়ো জোর। লেখক স্মৃতিকে নেহাত নস্টালজিয়া বানাননি। স্মৃতি তাঁর কাছে বিশ্লেষণের উপাদান। মানুষ কীভাবে চিনতে শেখে, সেটাই তাঁর আগ্রহের জায়গা।

মানুষের ‘আত্মপরিচয়’ তৈরি দীর্ঘ, বিবিধ পথে । পরিবার, স্কুল তাকে ভাষা শেখায়। সমাজ তাকে নানা পরিচয়ের মধ্যে আচমকা হুড়মুড়িয়ে টেনে এনে ফেলে তাকিয়ে দেখতে থাকে। সে পরিচয় কখনো যৌথ ও ইতিবাচক, আবার কখনো সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। অমর্ত্য সেনের জীবনও তেমনই। তিনি বাঙালি। ভারতীয়। বিশ্বনাগরিক। অর্থনীতিবিদ। শিক্ষক। মানবতাবাদী। বহুমাত্রিক পরিচয়গুলির কোনোটিকেই তিনি একমাত্র পরিচয় বলে মনে করেন না। সহাবস্থানকেই গুরুত্ব দেন বারবার। আজকের পৃথিবীতে এই কথাটি আরও বেশি জরুরি হয়ে পড়েনি কি?

মানুষ একাধিক পরিচয়ে বেঁচে থাকে; বহুত্বই তার শক্তি। সহনশীলতা জন্মগত নয়। কৌতূহলের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। এগুলি সামাজিকভাবে তৈরি হয়। শিক্ষার মাধ্যমে। কথোপকথনের মাধ্যমে। ভিন্ন মানুষকে জানার মাধ্যমে। আশ্চর্যের বিষয় হলোসংকীর্ণতাও একইভাবে তৈরি হয়

বইটি পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে, মানুষের মন আসলে সামাজিক নির্মাণ। আমরা যা ভাবি, তার বড়ো অংশই আমাদের চারপাশ গড়ে দেয় ‘অজান্তে’। লেখক সেই নির্মাণের স্তরগুলি পরতে পরতে খুলে খুলে দেখিয়ে দেন পাঠককে। কখনো শিক্ষকের দৃষ্টি ও ভঙ্গি দিয়ে। কখনো বন্ধুর চোখ দিয়ে। কখনো পারিবারিক অভিজ্ঞতাকে দিয়ে। রবীন্দ্রনাথের প্রভাব রয়েছে সমস্ত লেখা জুড়ে। কিন্তু তা আজকের লব্জে ‘অন্ধ-ভক্তি’ নয়। শান্তিনিকেতন লেখককে কৌতূহলী হতে শিখিয়েছে। প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে। ভিন্ন মতকে সম্মান করতে শিখিয়েছে। রবি-লালিত শান্তিনিকেতন উন্মুক্ত শিক্ষার পরিবেশ দিয়েছে তাঁকে। যেখানে পরিচয়-ভাবনা ছোটো, খাটো, খর্ব বা সংকুচিত হয় না; বরং ক্রমশ প্রসারিত হতে থাকে।

দেশভাগের প্রসঙ্গ সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়। দেশভাগ শুধু ভূগোলকে ভাঙচুর করে দেয় আন। ভেঙে দেয় মানুষের মনও। ‘বুলডোজার’ চালায় বিশ্বাসে। প্রতিবেশীর ধারণা বদলে দেয়। লেখক সেই পরিবর্তনকে কোনো ‘সস্তা’ আবেগে ভাসিয়ে দেননি। তিনি দেখিয়ে দেন, ঘৃণাও বস্তুত সামাজিকভাবেই শেখা যায়। আবার শেখা যায় সহাবস্থানও। দুর্ভিক্ষের অভিজ্ঞতাও এ বইয়ের  গুরুত্বপূর্ণ স্তর। ক্ষুধা এখানে কেবল অর্থনীতির বিষয় নয়। মানসিক অভিঘাতেরও বিষয়। শিশু যখন অনাহার দেখে, তখন তার ন্যায়বোধটাই বদলে যায়। ভবিষ্যতের অর্থনীতিবিদের ভিত সম্ভবত সেখানেই তৈরি হয়ে যায় যেন।

এই বইয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য লেখকের সংযম। অমর্ত্য সেন নিজের কৃতিত্ব, প্রাপ্তি, অর্জন নিয়ে খুব কম কথা বলেন। আত্মপ্রচারের কোনো ঢাক-নিনাদ বা তাড়না নেই। বরং তিনি মানুষ ও ঘটনাকেই সামনে এগিয়ে রেখেছেন।  নিজের জীবনকে ব্যবহার করেছেন এক বৃহত্তর ইতিহাসকে বোঝার জন্য। সংযমই এ লেখাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। অনেকের আত্মজীবনী পড়লে মনে হয়, লেখক নিজেই কেন্দ্র। নিজেই আলোকবর্তিকা। এখানে তা নয়। কেন্দ্রে রয়েছে সময়। সমাজ। মানুষ। লেখক তাঁদের মধ্যে একটা ‘ইউনিট’  মাত্র।

নিবিড় শান্তির ভিতরেই ঢুকে পড়ে ইতিহাস, ঢুকে পড়ে শান্তিনিকেতনঢাকা। অমোঘ কলকাতা। আসে দেশভাগ। দুর্ভিক্ষ। সাম্প্রদায়িক হিংসা। শিশুর চোখ দিয়ে দেখা পৃথিবী ধীরে ধীরে জটিল’ হয়ে ওঠার ধারাভাষ্য।

অমর্ত্য সেনের গদ্য ঝরঝরে, স্পষ্ট। যুক্তিনির্ভর। কিন্তু সব সময় সাহিত্যিক তাপ-আঁচ ধরে রাখতে পারেন নি। কোথাও কোথাও বিশ্লেষণ স্মৃতির প্রবাহকে থামিয়ে দেয়। পাঠককে আবেগের চেয়ে বুদ্ধিকে বেশি সক্রিয় রাখতে হয়। এটা কোনো মতেই সীমাবদ্ধতা নয়। জাগরণ-প্রক্রিয়া এভাবেই সম্ভবপর হয়ে ওঠে বলে ধারণা। আরও একটি বিষয় পাঠককে ভাবাতে পারে। এ বইয়ে লেখকের ব্যক্তিগত সম্পর্কের অনেক অংশই সংযত। এই সংযম লেখকের স্বভাবের সঙ্গে মানানসই সন্দেহাতীতভাবে। কিন্তু পাঠক হিসেবে কখনো কখনো আরও অন্তরঙ্গ মানুষের সন্ধান করতে ইচ্ছা জাগে। তবু এই দূরত্বেরও বিশেষ অর্থ রয়েছে। অমর্ত্য সেন ব্যক্তিগত জীবনকে কখনো প্রদর্শনীর সামগ্রী বানাতে চাননি। তিনি বিশ্বাস করেন, ব্যক্তির অভিজ্ঞতা তখনই মূল্যবান, যখন তা বৃহত্তর সমাজকে বুঝতে সাহায্য করে।

এই মুহূর্তে পরিচয়ের রাজনীতি ক্রমশ আক্রমণাত্মক ও রক্তময়, লিঞ্চিং-কলুষিত। মানুষকে একটি মাত্র পরিচয়ে বেঁধে ফেলার চেষ্টা চলছে দীর্ঘদিন ধরেই। ধর্ম। জাতি। ভাষা। রাষ্ট্র। এ আবহে ‘হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ অন্য কথা বলে চলে। মানুষ একাধিক পরিচয়ে বেঁচে থাকে; বহুত্বই তার শক্তি। সহনশীলতা জন্মগত নয়। কৌতূহলের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। এগুলি সামাজিকভাবে তৈরি হয়। শিক্ষার মাধ্যমে। কথোপকথনের মাধ্যমে। ভিন্ন মানুষকে জানার মাধ্যমে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংকীর্ণতাও একইভাবে তৈরি হয়।

অমর্ত্য সেন শেষ পর্যন্ত ‘ঘরে’র সংজ্ঞা বদলে দিয়েছেন। আসলে ঘর কোনো স্থির ঠিকানা নয়। এ এক মানসিক পরিসর। যেখানে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা আছে। মতভেদের জায়গা আছে। অন্যকে গ্রহণ করার ক্ষমতা আছে। সে ঘর পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে তৈরি হতে পারে। ‘হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ ‘সহায়িকা’ নয়, সব উত্তরও দিয়ে দেয় না। সে প্রশ্ন করতে শেখায়। আত্মপরিচয় নিয়ে ভাবায়। আমরা কোথায় থাকি, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— আমি কীভাবে অন্য মানুষকে দেখি ? ভিন্নতাকে কতটা স্বীকার করি ? নিজের পরিচয়ের বিষয়ে আমি কতটা নমনীয় ?এ কারণেই বইটি শুধু এক নোবেলজয়ী প্রাজ্ঞ অর্থনীতিবিদের স্মৃতিকথা নয়। মানুষের মন গড়ে ওঠার ইতিহাস। সহাবস্থানের দর্শন। আর ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসা পৃথিবীতে উদারতার এক নীরব, অথচ গভীর পাঠ।

♦–♦♦–♦♦–♦

‘হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ | অমর্ত্য সেন | পেঙ্গুইন র‍্যান্ডম হাউস 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!