Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬

কৃষ্ণগহ্বর

জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকার
কৃষ্ণগহ্বর

চিত্রকর্ম : দেব সরকার

এই ক্ষ্যাপা কম্পিউটারটা আমাকে সত্যি সত্যি হয়রানি করছে। প্রকাশ তার কফি জোরালো ভাবে ঝাঁকায়। ‘গত হপ্তায় আমি কম করে পঞ্চাশবার, অনুসন্ধান করেছি, কিন্তু সে একই জবাব দিয়েছে।’

‘কম্পিউটার কী বলছে ?’ সঞ্জয় তাঁকে প্রশ্ন করে সরলতার ভানে। শুদ্ধ গণিতের ছাত্র সঞ্জয় কম্পিউটারের দিকে মাথা নুইয়ে একজন শিল্পীর চোখ দিয়ে যেন বাড়ির রং করার লোকটিকে দেখছে।

‘কম্পিউটার আমার সব সিদ্ধান্তকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। আমি ভেবেছি যে প্রফেসারের কাছ থেকে যত তথ্য পাব সব দিয়ে দেব কম্পিউটারকে। দিনের শেষে সব ঠিকঠাক করে পরিকল্পনা মাফিক এগিয়ে যাব। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে, মানুষ ভাবে এক আর কম্পিউটার তার মতো সীমাংসা করে।’

ইউএস-এর ইয়ার্কেস অবজারভেটরি থেকে বৃহস্পতি সংক্রান্ত কিছু নতুন উপাত্ত পেয়েছে প্রকাশ এবং সে ওগুলো যাচাই করার অপেক্ষায় আছে।

‘ তুমি হয় তো হিসেবে কোথাও গরমিল করে ফেলেছ।’

সঞ্জয় একজন নিখুঁত গাণিতিকের বিশ্বাসে পদার্থবিজ্ঞানীরা যে গণিতে কাঁচা হয় তা বুঝিয়ে দিল।

‘দেখ, যদি এখানে কোনো ভুল থেকে থাকে, তবে তা আমার নয়, নিউটন ও আইনস্টাইনের। তোমার সীমিত জ্ঞান দিয়ে তুমি জানো যে গ্রহের কক্ষপথ নির্ধারিত হয় তাদের গতিসূত্র অনুযায়ী। তবু, কম্পিউটার বলছে যে নতুন উপাত্ত তার বিধিমালার সঙ্গে মিলছে না। অধ্যাপক কিন্তু নিশ্চিত যে তার তথ্য সঠিক। তাহলে কোথায় বাধা ?’

‘ আমার মনে হয় এবার তোমার দশাবতারের নাম জপ করা উচিত। জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিখ্যাত দশজনকে ডাকা দরকার অনুপ্রেরণার জন্য।’ সঞ্জয় তাকে উপহাস করে। ‘যেমন মহামহিম নিউটন, মহামহিম হ্যালে, মহামহিম হার্শেল, মহামহিম এডিংটন…’

‘অ্যাডামস-অ্যাডামস – জন কাউচ অ্যাডামস – তুমি এইমাত্র একটি বিস্ময়কর কথা বললে ! জ্ঞানের কথা সব সময় মান্য করা উচিত, এমনকি শিশুর মুখ থেকে উচ্চারিত হলেও।’ প্রকাশ তার পিঠে চাপড় মেরে অতি সত্বর অপসৃত হয়।

সঞ্জয় তার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে। এই প্রতিষ্ঠানে, গণিতজ্ঞদেরই উৎকেন্দ্রিক হওয়ার একচেটিয়া অধিকার রয়েছে, তাই মনে হয় সে প্রকাশের ব্যাপারটা মানতে পারে না।

এখানে অধ্যাপক মানে অধ্যাপক রমেশ আগরওয়াল, জ্যোতির্বিজ্ঞানের একজন খ্যাতনামা অধ্যাপক যিনি এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তিনি মহাজাগতিক বলবিদ্যা বিষয়ে বিশ্বব্যাপী খ্যাতির অধিকারী – তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি শাখা যা মহাজাগতিক বস্তুর, নক্ষত্র আদির গতিবেগ আকলন করে। একুশ শতকের শুরুতে খুব কম সংখ্যক বিজ্ঞানীই এই বিষয়ে গবেষণা করেছেন, এবং যখনই কোনো অনধিগম্য সমস্যা দেখা দিয়েছে, এই বিষয়ে গবেষণারত বিজ্ঞানীরা নিশ্চিতভাবে তাঁর পরামর্শ নিয়েছে। এর জন্যই জুপিটার সংক্রান্ত নতুন তথ্যপাতি তাঁর কাছে পাঠানো হয়।

প্রকাশ পাওয়াটে তাঁর প্রিয় ছাত্র। তিনি সাম্প্রতিক পাওয়া তথ্যগুলি খুঁটিয়ে দেখে প্রকাশের কাছে পাঠিয়ে দেন বিস্তারিত পরীক্ষার জন্য। এর জন্য তাঁকে বলে দিতে হয় না, ‘একটা নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তুমি আমার সঙ্গে দেখা করবে না।’

এক হপ্তা পর্যন্ত প্রকাশের কাছ থেকে কোনো জবাব না পেয়ে অধ্যাপক অবাক হয়ে এই বিষয় নিয়ে ভাবতে থাকেন। আর যখন তিনিই প্রকাশের সঙ্গে দেখা করবেন বলে ভাবছেন তখনই প্রকাশ এসে সশরীরে তার ঘরে ঢোকে।

শান্ত হও, শান্ত হও ! শান্ত হয়ে মিনিটে একটা করে শব্দ বল যাতে তোমার বক্তব্য বুঝতে আমার সুবিধা হয়। তিনি মৃদুস্বরে হাসিমুখে বলেন।

স্যার ! ১৮৪৬ এর কাছাকাছি সময়ে অ্যাডামস ইউরেনাসের গতিপথে কিছু অসাঞ্জস্য পর্যবেক্ষণ করেন আর যৌক্তিক অনুমান ও গণিতের সাহায্যে এক নতুন গ্রহ নেপচুন আবিষ্কার করেন। এখন আমি নিশ্চিত যে আর একটি নতুন মহাজাগতিক বস্তুপুঞ্জের আগমন ঘটেছে জুপিটারের সান্নিধ্যে। কম্পিউটার দেওয়া জবাব নিশ্চিতভাবে সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

যুক্তি ছাড়া কখনও কোনো বিবৃতি দেবে না – অধ্যাপক তার ছাত্রের সঙ্গে এই মৌলিক নীতির মানসিকতায় দৃঢ়ভাবে সংবদ্ধ হয়ে আছেন। যদিও প্রকাশের এই মৌলিক প্রতিবেদন এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল যে তিনি নিজেই এই লড়াইয়ে নেমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর পরবর্তী দশ দিনে, প্রচুর জোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত পদ্ধতির প্রয়োগ করে এই অনুকল্প পরীক্ষা করেছেন, তারা দুজনেই শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে তাদের প্রতিবেদনটিই সঠিক।

যখন লন্ডন থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত বিজ্ঞান সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘নেচার’ – এ আগরওয়াল ও পাওয়াতে লিখিত প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, তখন তা জ্যোতির্বিজ্ঞানের দুনিয়ায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। নতুন মহাজাগতিক বস্তুপিণ্ড জুপিটারের কাছাকাছি পৌঁছে গতি ও নিদৃষ্ট প্রক্ষেপণ পথের যে অসামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হয় তাই নিবন্ধের সারাংশে বলা হয়েছে।

তারা সাময়িকভাবে এই বস্তুপিণ্ডের নাম দিয়েছে এক্স এবং জুপিটারের সম্পর্কে তার ওজন, গতিবেগ ও প্রক্ষেপণ পথের বিশদ আলোচনা প্রকাশিত হয়েছে। এক্স-এর গতিপ্রকৃতি নিয়ে সবরকম জল্পনা শুরু হয়ে যায়। কারো কারো মতে, এটি একটি নতুন গ্রহ যা কিছু পথভ্রষ্ট গ্রহাণুর সমষ্টি যা মঙ্গল আর বৃহস্পতির কক্ষপথের মিলনে সৃষ্টি হয়েছে। আবার কারো মতো এটা একটা ধূমকেতু যা বাইরে থেকে সৌরমণ্ডলে ঢুকে গেছে। দেখতে দেখতে দুনিয়ার জ্যোতির্বিজ্ঞান মানমন্দিরগুলিতে স্বচক্ষে ‘এক্স’ দেখার জন্য হুড়োহুড়ি লেগে গেছে।

কিন্তু কেউই কিছু পর্যবেক্ষণ করতে পারে না !

তিন বছর পেরিয়ে যায়, যদিও ‘এক্স’ দেখা যায় না, কিন্তু বিজ্ঞানীরা তার অস্তিত্বে নিশ্চিত হয়, তাই সিদ্ধান্ত হয় যে একটি মহাকাশযান এক্স-এর দিকে পাঠানো হবে। কারণ এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতি প্রাচীন মধ্যাকর্ষণ সূত্রের ভবিষ্যৎ এর উপর নির্ভর করে আছে। যেহেতু ভারতীয় বিজ্ঞানীরা এক্স আবিষ্কার করেছে, তাই মহাকাশযানও ভারতের শ্রীহরিকোটা ঘাঁটি থেকে উৎক্ষিপ্ত হওয়া উচিত। প্রকাশ পাওয়াটেকে বিজ্ঞানী-যাত্রী হওয়ার মর্যাদা দেওয়া হয় আর তার একজন মাত্র সহযাত্রী, ইউএস-এর জন ফকনার। ফকনার একজন দক্ষ প্রযুক্তিবিদ। এটা ভারত থেকে উৎক্ষিপ্ত দশম অন্তরীক্ষযান জুপিটারের দিকে পাঠানো হচ্ছে। এটার নাম দেওয়া হয় WIJ10 । ডব্লুআইজে ১০ বা উইজ টেন। মহাকাশযান উৎক্ষেপনের একটা উপযুক্ত দিন ঠিক হওয়ার পর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়।

এই তিন বছরের মধ্যে, প্রকাশ পাওয়াটে আর সঞ্জয় যোশি তাদের ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্মানিত সদস্য হিসেবে কাজও করতে থাকে। এক বছর হয়ে গেল সঞ্জয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, কিন্তু প্রকাশ এখনও একা। তাদের বন্ধুত্ব আগের মতোই রয়েছে। তাদের আড্ডা এবং মৌখিক লড়াইও আছে যথাপূর্বম। মহাকাশযান উৎক্ষেপণের এক হপ্তা আগে, প্রকাশ সঞ্জয়ের বাড়িতে বেড়াতে যায় সঞ্জয়ের নবজাতক কন্যার নামাকরণ অনুষ্ঠানে। সে উপহার হিসেবে একটি খেলনা ভালুক নিয়ে যায়।

‘বাহিনী, কী নাম রেখেছ তোমার মেয়ের ?’ সে টেডি বিয়ার তার হাতে দিয়ে প্রশ্ন করে।

‘অনুপমা। তুমি কি ওকে কোলে নেবে ?’

‘আরে না ! দূর থেকেই ভালো। বাচ্চাকে কোলে নিতে আমার খুব ভয় করে।’

‘ঠিক আছে, তাহলে দূর থেকে দেখেই বলো আমাদের মেয়েকে কার মতো দেখতে হয়েছে ?’

‘ও তোমাদের দুজনের মতো দেখতে হয়েছে।’ প্রকাশ কৌশলে জবাব দেয়। ‘ও সত্যিই খুব মিষ্টি। ওর বয়স আঠেরো কুড়ি হলে ছেলেরা দেখবে কেমন ওর দিকে আকৃষ্ট হবে।’

‘সে ক্ষেত্রে, তুমিই কেন আরও আঠেরো কুড়ি বছর অপেক্ষা করো না ? আমরা হাসিমুখে তোমাকে জামাই বলে মেনে নেব, অনুপমার মা ইতিমধ্যে তার মেয়ের জামাই খোঁজার কাজে লেগে পড়েছে। যখনই তার বিয়ের কথা ওঠে — সে আঠেরো দিন বা আঠেরো বছর পরের কথা হোক, সে অপ্রতিভ হয়ে তড়িঘড়ি তখনই সেখান থেকে বিদায় নেয় এবং প্রায় পালিয়ে বাঁচে।

‘ অকারণে বেচারা কুমার সাহেবকে ভয় পাইয়ে দিলে।’ সঞ্জয় তাকে তিরস্কার করে।

উইজড টেন যথারীতি পরিকল্পনা মতো উৎক্ষেপন হয়। তার যাত্রাপথে পৃথিবীর অনেক ঘাঁটির সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখে। যোগাযোগ ততক্ষণ পর্যন্ত স্বাভাবিক থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত WIJ 10 জুপিটারের পরিমণ্ডলে ঢুকে যায়। প্রকাশ অভিযান নিয়ন্ত্রণ কক্ষে এই বার্তাটি প্রেরন করে, ‘ আমার মনে হচ্ছে আমরা এখন এক্স এর কাছাকাছি চলে এসেছি, কিন্ত আমরা এখনও কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু আমরা শুধু দেখছি উল্কাপিণ্ড এবং গ্রহাণুর মতো বস্তু মহাশূন্যে এক্স-এর দিকে ছুটে চলেছে। এক্স যদি একটি আলোকিত বস্তু হত তাহলে বলতে পারতাম যে এটা ভগবত গীতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে যেখানে বর্ণনা করা হয়েছে পতঙ্গগুলি আলোর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে…’

‘ ঠিক আছে। অনেক হয়েছে তোমার কাব্যিক কল্পণা। তোমার পরবর্তী পরিকল্পনা কী জানাও ?’ অভিযান নিয়ন্ত্রণ কক্ষ তাকে সংক্ষিপ্ত করে।

‘শোনো, যখন ওপেনহাইমার আণবিক বিষ্ফোরণ দেখেছিলেন, তিনিও ভগবত গীতার কথা ভেবেছিলেন। আমি যা দেখছি আর যা দেখছি না তা আণবিক বিস্ফোরণ থেকে অনেকটাই অস্বাভাবিক। অনুমতি পেলে আমি তা খুব কাছে থেকে দেখতে চাই।

‘ অনুমতি দেওয়া হল, তবে যদি কোনো বিপদের গন্ধ পাও সঙ্গে সঙ্গে গুটিয়ে নেবে।’

‘ অবশ্যই আমি WIJ 10 এর সম্পূর্ণ খেয়াল রাখব।

এই হল প্রকাশের সঙ্গে শেষ স্পষ্ট বাক্য অভিযান নিয়ন্ত্রণ কক্ষের।

জন মহাকাশযানের গতিপথ এক্স-এর দিকে ঘুরিয়ে দেয়। ক্রমান্বয়ে তার গতিবৃদ্ধি হয়। ‘ স্বাভাবিক ভাবে চালাও জন। আমরা খুব কাছে যাব না।’ প্রকাশ জনকে সাবধান করে।

‘ আমি তো কখনই ইঞ্জিন থামিয়ে দিয়েছি। বুঝতে পারছি না তাও কেন গতি বৃদ্ধি পাচ্ছে !’ জন দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে দ্রুতিমাপক যন্ত্রের দিকে তাকায়, তার ভিতরের কাঁটা যে প্রবলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

তখনই প্রকাশের মাথায় বিদ্যুচ্চমক খেলে যায়। সে মহাকাশযানের ভিতরের কম্পিউটারের কাছে যায়, ড্রয়ার থেকে একটা প্রোগ্রাম বের করে আর কম্পিউটারে লোড করে দেয়। এই প্রোগ্রামটি এখন পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়নি। একে বলে কৃষ্ণ গহ্বর। সে বোতাম টিপে দ্রুত গতি বেড়ে যাওয়ার তথ্য ঢুকিয়ে দেয় আর কম্পিউটারে কয়েক সেকেন্ডের ভিতর জবাব দিয়ে দেয়। সে তা পড়ে নিয়ে জনকে জানায়।

‘ জন, জন, এক্স এর রহস্য উন্মোচিত হয়ে গেছে। কিন্তু খুব দেরি হয়ে গেল আমাদের জন্য। এক্স একটি কৃষ্ণ গহ্বর। আর আমরা তার দিকে দ্রুত ছুটে যাচ্ছি।’

কৃষ্ণগহ্বর একটি ঘন পদার্থের চরম সংকোচনে সৃষ্টি হয়। এটার শক্তিশালী মাধ্যাকর্ষণ এত প্রচণ্ড হয় যে আলো তার ভিতর দিয়ে যেতে পারে না। এটাই কারন যার জন্য এক্সকে পৃথিবীর থেকে দেখা যায় না কিংবা WIJ 10 যা তার অনেক কাছাকাছি তবু দেখা যাচ্ছে না। আইনস্টাইনের মধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব মতে কৃষ্ণ গহ্বর মহাবিশ্বে বিদ্যমান আছে কিন্তু এখনও বিজ্ঞানীরা তার খোঁজ পাননি। স্বল্প কয়েক জন বিজ্ঞানী এই তত্ত্ব প্রচার করেছেন। কিন্তু বেশির ভাগই অস্বীকার করেছেন।

‘ তাহলে এর পরে কী ?’ জন প্রশ্ন করে, যদিও সে প্রায় নিশ্চিত ভাবে এর উত্তর জানে।

‘আমরা সম্ভবত সোজাসোজি এক্স এর মুখগহ্বরের দিকে এগিয়ে চলেছি। কিন্তু একটা আলোর রশ্মিও আছে। আমাদের আসল গতিপথ কিন্তু তার কেন্দ্রের দিকে নয় বরং তার চারপাশে। কম্পূটার এখনও নির্ভুল ভাবে আমাদের বলতে পারছে না। তার কক্ষপথের আরও কিছু উপাত্ত তার চাই। আমি তাকে পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা করছি। ততক্ষণ পর্যন্ত, তুমি অভিযান নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা কর।

জন একটা বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করেছিল। অভিয়ান নিয়ন্ত্রণ কক্ষ কিছু বার্তা পাঠাচ্ছে, কিন্তু সেগুলি বিকৃত হয়ে আসছে, যেন কথাগুলো অতি দ্রুততার সঙ্গে বলা হচ্ছে যার জন্য বোধগম্য হচ্ছে না। ঠিক তখনই প্রকাশ বেরিয়ে আসে, তার মুখমণ্ডল ছাইবর্ণ।

‘জন, কম্পিউটার কার্যত আমাদের জবাব দিয়ে দিয়েছে, মৃত্যুর ভবিষ্যৎ বাণী করে দিয়েছে। সে বলছে আমরা এক্স এর দিকে এগোচ্ছি, দশ লক্ষবার আবর্তনের পর আমরা তার মধ্যে পড়ে ধ্বংস হয়ে যাব। অভিযান নিয়ন্ত্রণ কক্ষ কী বলে ?’

জন তাকে অবস্থা বুঝিয়ে বলে। প্রকাশ বুঝতে পারে যে অভিযান নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে চিরকালের জন্য, আর এখন থেকে তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হবে।


যখন WIJ 10 শ্রীহরিকোটা ঘাঁটিতে নামে, ওখানকার প্রযুক্তিবিদরা বিষ্মিত হয়। কেউই মনে করতে পারে না এই নামের নভোযানকে। এর পৌঁছাসংবাদ নিয়ে কোনো পূর্বঘোষণাও ছিল না। তারা এই অনাহুত অজানা মহাকাশযান ভালো করে পরীক্ষা করে, তার পর ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা দুই কুম্ভকর্নকে বের করে, এবং সরাসরি তাদের ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি মেডিকেল সেকশন (MSMS)-এ নিয়ে যায়। এই দুজন মানুষের নাম এবং মুখমণ্ডল সম্পূর্ণ অচেনা সবার কাছে


‘এখনও আমাদের আশার আলো রয়েছে। আমরা এখন কৃষ্ণ গহ্বরের চক্রাকার কক্ষপথের পরিবেষ্টিত এলাকা দিয়ে যাচ্ছি। আমি এখন এই পথের অনির্দিষ্ট চরিত্রের সুযোগ নেব। আমরা যদি সময় সুযোগ মতো একটা রকেট ছুঁড়তে পারি ঠিকঠাক তাহলে এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থেকে আমাদের মহাকাশযান ‘এক্স’ থেকে দূরে চলে যাবে। যদি তা ঘটে তাহলে তো ভালো। আর না হলে আমরা পৃথিবীকে বিদায় জানাব। আমরা আমাদের নভশ্চর পোষাক পরে নেব এক্ষুণি।’

‘ নভশ্চর পোষাকের আর কী দরকার ?’ জন প্রশ্ন করে।

‘ আমরা যত এক্স এর দিকে এগোব জোয়ার শক্তির মধ্যাকর্ষণ বল তত বেশি করে অনুভব করব, যেরকম পৃথিবী চাঁদের মধ্যাকর্ষণ বল অনুভব করে, যার জন্যে সমুদ্রে ভরা জোয়ার হয়। এখন মনে কর তুমি ‘এক্স’-এর দিকে যত এগোচ্ছ তোমার মাথা এক্স এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আর পা থাকছে দূরে, এই অবস্থায় তোমার মাথা বৃহত্তর মাধ্যাকর্ষণ বলের কবলে পড়বে তোমার পায়ের থেকে। ভাবতে পারছ তখন কি হবে ?’

‘ আমার শরীর মাথা থেকে পায়ের দিকে প্রসারিত হয়ে যাবে ? ’ জন এখন ভাবতে শুরু করে।

‘ ঠিক ! আর এই টান এত বিশাল হবে যে আমরা সহ্য করতে পারব না ! কিন্তু আমরা যদি নভশ্চর পোষাকে থাকি তাহলে আমাদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ গুলি তেমন প্রভাবিত হবে না।’ প্রকাশ বুঝিয়ে বলে।

‘তুমি নভশ্চর পোষাকটি স্বয়ংক্রিয় চালন ব্যবস্থায় রেখে দাও যাতে কম্পূটার একে পৃথিবীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নির্দেশ দিতে পারে। যদি আমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়, ঘাঁটির মানুষ আমাদের জাগিয়ে দেবে সময়মতো।’

সবরকম প্রস্তুতি নেওয়ার পর নভশ্চর পোষাক পরার আগে, তাদের চোখ আশে পাশের ছায়াপথের মহাশূন্য দেখে নেয়। নক্ষত্রপুঞ্জকে উজ্জ্বলতর মনে হয়। এটাই কি তাদের শেষ দেখা মহাবিশ্ব ?

যখন WIJ 10 শ্রীহরিকোটা ঘাঁটিতে নামে, ওখানকার প্রযুক্তিবিদরা বিষ্মিত হয়। কেউই মনে করতে পারে না এই নামের নভোযানকে। এর পৌঁছাসংবাদ নিয়ে কোনো পূর্বঘোষণাও ছিল না। তারা এই অনাহুত অজানা মহাকাশযান ভালো করে পরীক্ষা করে, তার পর ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা দুই কুম্ভকর্নকে বের করে, এবং সরাসরি তাদের ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি মেডিকেল সেকশন (MSMS)-এ নিয়ে যায়। এই দুজন মানুষের নাম এবং মুখমণ্ডল সম্পূর্ণ অচেনা সবার কাছে।

‘স্যার, নিশ্চিন্ত থাকুন। ডাক্তার আপনাকে নড়াচড়া বা চিন্তা করতে বারণ করেছেন।’ MSMS এর সিস্টার অনুপমা প্রকাশকে বলেন। ‘খুব তাড়াতাড়ি প্রধান বিজ্ঞানী আপনার কাছে আসবেন, সব কথা তাঁকে খুলে বলবেন দয়া করে।’

কয়েকজন বন্ধুকে ফোন করতে দিন না আমাকে, শুধু আমি যে এসে গেছি এই কথা তাদের বলব। আমি ভালো আছি এই কথা তাদের বলব। আমার এই স্বয়ংক্রিয় ঘড়ি বলছে আমি তিন বছর আগে এই জায়গা ছেড়ে গেছি। তারা সবাই আমার অবস্থান নিয়ে চিন্তিত…’

তিন বছর, প্রধান বিজ্ঞানী ডাঃ রামস্বামী বিস্মিত হন, তিনি এই মাত্র ঘরে ঢুকলেন। গত তিন বছরে আমাদের এখান থেকে কোনো মহাকাশযান যায়নি। গত পাঁচ বছরে আমরা শুধু মনুষ্যবিহীন মহাকাশযান পাঠিয়েছি।’

এ অসম্ভব ! আপনাদের রেকর্ড পরীক্ষা করে দেখুন, প্রকাশ প্রচণ্ড বিষ্ময়ে বলে, ‘ আমার ঘড়ি বলছে, আমিও জন ফকনার তিন বছর পনের দিন আগে জুপিটারের দিকে রওনা হয়েছি। জনকে জিজ্ঞেস করুন কিংবা প্রফেসর রমেশ আগরওয়ালকে বলুন যাতে তিনি নিশ্চিত করতে পারেন।’

‘ জন এখনও সচেতন নয়, কিন্তু ড. আগরওয়াল, যার কথা বললেন, সম্প্রতি অবসর নিয়েছেন। দেখি যদি তার ঠিকানা যোগাড় করতে পারি।’ ডাঃ রামস্বামী বললেন।

প্রকাশের মাথা ঘুরছিল। সে যখন WIJ-10 এ পর্যটন শুরু করেছিল অধ্যাপক তখন ছিলেন চল্লিশ। সে যথেষ্ট আশঙ্কার সঙ্গে বলে, ‘ এখন কোন সাল চলছে ?’

ডাঃ রামস্বামী জবাবে তার হাতে দৈনিক সমাচার পত্র ধরিয়ে দেন। তবে প্রকাশ প্রায় ভিরমি খাওয়ার অবস্থা যখন সে সংবাদপত্রের উপর তারিখ দেখে।

সে পৃথিবীতে কুড়ি বছর পরে ফিরেছে।

‘ দু হপ্তা লাগে প্রকাশের সম্পূর্ণ সুস্থ হতে। সিস্টার অনুপমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে তার স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে। এসব দেখে মনে হচ্ছিল একটি চিরকুমারকে যেন আপাদমস্তক পাল্টে ফেলা হচ্চে। ডাক্তাররা অনুপমাকে সাবধান করে দিয়েছে যাতে তার মহাকাশ ভ্রমণের কথা তাদের প্রণয়ালাপে উত্থাপিত না হয়। তাই সে তার সব পর্যবেক্ষণ চিঠিতে লিখে রেখেছে।

সুস্থ হওয়ার পর ডাঃ রামস্বামী, প্রকাশ ও ড. আগরওয়ালের দেখা করিয়ে দেন। ড. আগরওয়াল তার সুস্থভাবে ফিরে আসার জন্য অভিনন্দিত করেন আর বিবাহের জন্য একটি মনমতো পাত্রী খুঁজে পাওয়ার জন্যও। তারপর তিনি সময়ের চলে যাওয়ার কথা বুঝিয়ে বলেন, এটা ব্ল্যাকহোলের রাক্ষুসে মাধ্যাকর্ষণ বলের এক অপরাসায়নিক প্রভাব। প্রকাশ আর জন ব্ল্যাক হোলের কক্ষপথে সময়ের মাত্র এক সেকেন্ড কাটিয়েছে ঘুমিয়ে, মধ্যাকর্ষণ বল তাদের কাটানো সময়কে হিমায়িত করে রেখে দিয়েছে। সেই সময় পৃথিবী সতেরবার পাক খেয়ে এগিয়ে গেছে। আর তাই প্রকাশ এখনও তার কুড়িতেই আছে, আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের জীবন্ত প্রমাণ হয়ে।

‘ ঠিক আছে, এখন বলো, সঞ্জয় কোথায় ? সে আমাকে দেখে খুব হতবাক হয়ে যাবে।’ প্রকাশ মৃদু হেসে বলে।
‘ কে সঞ্জয় ?’ অনুপমা প্রশ্ন করে।

‘সঞ্জয় যোশী আমার বন্ধু। আমরা দুজন গবেষক একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। আমরা প্রায়ই তর্ক করতাম – ওহ ! কী হয়েছে ? তুমি কাঁদছ কেন ?’

‘ তিনি আমার বাবা। তিনি এবং আমার মা, দুজনই এরোপ্লেন দুর্ঘটনায় মারা যান আমাকে অনাথ করে।’ – অনুপমা কান্নার মধ্যে বুঝিয়ে বলে।

এইভাবে, অনুপমার মায়ের ঘটকালি সফল হয়। ধন্যবাদ কৃষ্ণ গহ্বর।

♦•–♦• ♦•–♦• ♦•–♦•


  • Tags:
❤ Support Us
বিবর্ণ এপিটাফের সজল বৃত্তান্ত পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
বাস্তবের ভিতরে যে-স্বপ্ন থাকে ব | ই | চ | র্যা রোব-e-বর্ণ
মহা-ভারতে খণ্ডচিহ্ন পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
error: Content is protected !!