- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- জুন ৭, ২০২৬
নিখোঁজ
চিত্রকর্ম: শ্যামল দত্ত রায়
চেন্নাইমেলে উঠে পড়েচি। ঘুম পেয়েচে। ক্লান্ত আমি। টানা শুয়ে থাকব। তোমাকে ফোন করতে হবেনা। জেগে উঠে যোগাযোগ করব। সুইচঅফ করে দিচ্চি।
গতকালের হোয়াটসআপের ম্যাসেজ বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে ববিতা। সকাল হয়েছে এক নতুন দিনের আশা নিয়ে। মানুষের জীবনে এক একটা দিন বিষাদ নিয়ে চলে যায়। যেমন রিক্ত নির্জন কোনো স্টেশান ছেড়ে যাওয়া। নতুন কোনো উজ্জ্বল স্টেশানের স্বপ্ন আঁকা ছবিতে প্রবেশ করা। নিজে কেসে এক স্বপ্নের গুটিপোকায় বন্দী করেছে।
ঘরদোর আজ উন্মুখ তার। খেতের ফসল মানে পটল নিয়ে শেয়ালদা পাইকারি মার্কেটে গেছে রফিক মিয়া। ফিরতে দুপুর গড়িয়ে যাবে। মা বারান্দায় ঘুমের ভেতর কোথায় পাড়ি দিয়েছে। বাড়ির কোনো কাজে মন নেই। আজকে শুধু গভীরভাবে দূরের কোনো ট্রেনের বাঁশি শুনতে থাকবে। এক-একদিন এমন তো হয়। কাজের চেয়ে অকাজে মন যায়। এখন মেঘ হয়ে একপশলা বৃ্ষ্টি হলে তাতে ভেজা যেত।
কাল ম্যানেজারকে জানিয়েছে, আজকে যাবে না। হাড়োয়া মোকামে নতুন খুলেছে—বিদ্যাধরী নার্সিংহোম। সেখানে সেবিকার কাজ। রত্না বদলি হিসেবে তার কাজ করে দেবে।
সকালের রোদ উঠোনে এসে নেমেছে। ডালিমগাছে বুলবুলি এসে গান গাইছে। এই যে অপেক্ষাটুকু মন্দ লাগছে না। মানুষের মন এমন। পাওয়ার চেয়ে অপেক্ষা অনেক রঙিন স্বপ্নের জাল বোনে। সে অবশ্য অনেক দুঃস্বপ্নের রাত পেরিয়ে এমন দিনের প্রতীক্ষায় আছে।
বছরদুয়েক আগের কথা। জালাল তার মাকে এখানে ভর্তি করেছিল। তখন সবে সেবিকার কাজ নিয়েছে। তেমন পাশকরা নয়। তবুও আন্তরিকতা ছুঁয়ে যায় সবার মন। মানুষের শরীরের ভেতর আরেক শরীর থাকে। তাকে দেখা যায়না। তবে তার অস্তিত্ব অস্বীকার করবে কে ? ববিতার অনেক দিনের মরচেভুবনে নতুন কুঁড়ি ফোটে। দিন পনেরোর পরিচয়ে রঙের পোঁচ পড়ে।
সেদিন ছুটির পর আনমনে বেরিয়েছে। বেলতলার মোড়ে টোটোর অপেক্ষায়। একটা বাইক আচমকা সামনে এসে দাঁড়ায়। ছেলেটা অচেনা নয়—মুখচেনা। নার্সিংহোমে কাজের সুবাদে এমন কতই তো মুখচেনা। সে একটু অবাক হয়। সে কী বলতে চায়?
তোমার সঙ্গে দেকা হলো, ভালো হয়েচে।
কোনো দরকার আচে ? ববিতা অবাক হয়। রাস্তায় বাইক থামিয়ে সে কী বলতে চায় ?
তোমাকে একটা কথা জানানোর ছিল।
কী কথা ?
ইতস্তত করে জালাল। ডাকাবুকো হলেও অনেক সময় বুকের সংলাপ মুখে এসে থেমে যায়। কথার আড়াল খোঁজে। পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মোছে। বাইক থেকে নেমে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে, আমার মায়ের কথা মনে আচে ?
ভুরু কোঁচকায়। তারপর খানিক আন্দাজে বলে, দশনম্বর বেড়ের পেশেন্ট চিল ?
খুশিতে ঘাড় নেড়ে জলিলবলে, তোমাকে পছন্দ করেচে। নিজের কথাটুকু উহ্য রাখে।
মাথা নিচু করে জুতো দিয়ে রাস্তায় আঁকিবুঁকি কাটে ববিতা। শুধু এমন কথা বলার জন্যে কেউ পথ আটকায়? দ্বিধা বাড়ে। ভেতরে রক্তস্রোত দ্রুত হয়। নিজেকে সামলে মৃদু বলে, আমার আর কি বলার আচে !
মানুষকে চেনা কি সহজ ? জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে চিনতে হয়। তা অবশ্য কম কি ? সেখানে কোন দুর্ভসন্দির ছায়া চোখে পড়ে ? মনের ভেতর অনেক রকম কথা ঘোরাফেরা করে। তার চোখে মুখে কেমন একটা আকুতি না ? বাইরের শক্ত খোলস যেন টলে যায় ববিতার
কিছুই বলার নেই ? একটু ক্ষুণ্ণ হয়সে। হয়তো ভেবেছে, তার কথা শুনে, ববিতা খুশি হয়ে জালালের মনের কথা জিজ্ঞেস করবে তখন নিজেকে উন্মুক্ত করবে সে। একটু চাপখাওয়া গলায় বলে, তুমি কি আমার কথা বুজবে না ?
আপনার মা-কে আমার সালাম দেবেন। ববিতা এবার নিজেকে পথ দেখায়। একটা টোটো এসে থেমেছে, সেদিকে এগিয়ে যায়।
ঠিক আচে। সে তো বেশ কথা। তবে আমি কিন্তু… আমি কিন্তু… তোমাকে… তার দিকে তাকিয়ে কথা অসমাপ্ত রাখে। মুখে ফুটে ওঠে হাসি যার কোনো ব্যাখ্যা নেই। কিংবা আছে। হয়তো প্রশ্রয় চায়।
ববিতা অবাক হয় না। এরকম গায়ে পড়ে খেজুরে আলাপ অনেক সহ্য করতে হয়। মুখের আলগা শ্রী কি তার কারণ না অন্য কিছু? পুরুষ মানুষেরা কীভাবে ? ঘরেবাইরে মেয়েমানুষেরা শুধু শরীর নিয়ে ঘুরে বেড়ায় ?
আপনার কথা সে তো আপনি জানেন। এবার শক্ত হয় ববিতা।
সে জন্যি বলচি।
কী বলচেন ? এবার তার মুখের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকায়। মানুষের মুখ চেনা কি সহজ ? জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে চিনতে হয়। তা অবশ্য কম কি? সেখানে কোন দুর্ভসন্দির ছায়া চোখে পড়ে? মনের ভেতর অনেক রকম কথা ঘোরাফেরা করে। তার চোখে মুখে কেমন একটা আকুতি না? বাইরের শক্ত খোলস যেন টলে যায় ববিতার। তবুও নিজেকে আপ্রাণ ধরে রাখার চেষ্টা করে। সে বলে, এ আপনার সাময়িক মতিভ্রম।
আমিও তাই ভেবেচি।
তাহলি…!
মানুষ তো ভ্রম নিয়ে চলে।
পথ ছাড়ুন।
রাগ করলে ?
আর কোনো ভ্রমের সঙ্গে নিজেকে জড়াতে চাইনে। টোটোতে উঠে পড়ে সে।
ববিতা বাড়ি এসে অন্যমনস্ক হয়েছে। চড়া কথা বলতে পারে না। মানুষটাকে অনর্থক আঘাত দিয়েছে? গায়েপড়া কথা এড়াবে কীভাবে? তারপর মনে হয়েছে তার বাসিপড়া জীবনের কথা কে শুনবে? কী বা তার দাম !
নার্সিংহোম থেকে তার মা সুস্থ হয়ে চলে গেছে, কতদিন হলো। তবু চাঁদনির মোড়ে একদিন ববিতা এসেছে জামা কিনতে। ব্লাউজ মিউজিয়াম মোড় থেকে খানিক পশ্চিমে। দোকান থেকে বেরিয়ে সাইকেলে করে মোড়ের মাথায় এসেছে, তখন কে একজন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। যাতাযাতের সুবিধের জন্যে ক-দিন হলো কিনেছে। সাইকেল থেকে নেমে দেখলো, হাতছানি দেওয়া ছেলেটা তার দিকে এগিয়ে আসছে। কাছে এলে চিনতে পারে। তার পরণে পোশাকের দিকে তাকিয়ে বলে, আপনি সিভিক পুলিশ নাকি ?
নীলজামা প্যান্ট পরা তার মুখ ম্লান হয়ে যায়, কী আর করি, বলো !
চাকরি তো বটে !
ইতিহাসে এমএ পাশ করে আপাতত এই।
খারাপ কি। তবুও তো পেয়েচেন।
তা ঠিক! নিজেকে সান্ত্বনা দেয় জালাল।
মুসলিম গাঁয়ে তারা প্রথম প্রজন্মের শিক্ষিত মানুষ। লেখাপড়া করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনেক চেতনার উন্মেষ হয়েছে। তবে এখন বাস্তব জীবন বড়ো কঠিন। তাদের অনেক স্বপ্ন জীবনের রুক্ষ মাটিতে আছড়ে পড়ে। জালাল এসব কথা ভাবছে। তারপর ঘোর কাটিয়ে হঠাৎই বলে ওঠে, পাইকগাছার সর্দার পাড়ায় তোমাদের বাড়ি ?
বাড়ির খোঁজ নিচ্চেন? গোয়েন্দাগিরি করচেন না কি ?
ঠিক তা না। নার্সিংহোমের ম্যানেজারের কাছ থেকে জেনেচি।
তাই বলুন।
আমার মা… জালাল অসংলগ্নভাবে শুরু করে।
সে তো শুনেচি।
আমার কথা সেদিন তো বলতি পারিনি।
দেরি হয়ে যাচ্চে।
হ্যাঁ। তাই তো! যে কথা বলার জন্যে তোমাকে দাঁড় করিয়েচি।
কী কথা ?
তহমিনা বলে কোনো মেয়েকে চেনো ?
আচমকা ফ্যাকাসে হয়ে যায় ববিতা। কেন বলুন তো ? শুকনো মুখে জিজ্ঞেস করে।
থানায় কেস ঘাঁটাঘাঁটি হতে বড়োবাবুর মুখে শুনলুম।
নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনা ববিতা। বিষণ্ণ কণ্ঠে বলে, কাল আমার ছুটি। আসবেন ?
আসবেন কি ? আসবে বলো…!
হয়তো তাই ! বাড়িতে এস তা হলি ! একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে তার।
দুই মেয়ে নিয়ে রফিক সর্দারের সহজ জীবন। কিন্তু তা জটিল হতে সময় নেয় না। হাসপাতালমোড় থেকে যে রাস্তা দেগঙ্গা চলে গেছে পাইকগাছা গাঁয়ে সর্দারপাড়ায় বাড়ি। হাড়োয়া বালিকা বিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছে। ওদিকে ডাগরডোগর হয়ে উঠেছে। নজরে বেশ ধরে। একদিন ঘটক জয়নাল এসে হাজির। তার মা ফজিলার দূরসম্পর্কের আত্মীয়।ববিতা তখন কন্যাশ্রীর টাকা নিয়ে বারাসাতে এক সংস্থায় নার্সিং নিয়ে পড়বে ভেবেছে। কিন্তু তা আর হয় কই ?
ওসব করে কী হবে ? মাঠঘাট নিয়ে পড়ে থাকা রফিক মিয়ার চিন্তার জগতে সময়ের পরিবর্তনটুকু ধরা পড়েনা। ঘরের মেয়ে হাসপাতালে কাজ করবে ? গাঁয়ের লোক কী বলবে ? তাছাড়া এসব তার কাছে অনিশ্চিত। এমন ভবিষ্যতের কথা ভাবতেও পারেনা। মেয়েদের বিয়েশাদি ঘরসংসার এইতো চিরন্তন ! বাপকে অনেক বুঝিয়েছে। রফিক মিয়া সব কথা শোনে। তারপর মাথা নাড়ে, আমাদের জগতটা অত এগোয়নিকো। বইপুস্তকে অনেক কথাই লেকা থাকে। আমাদের কপালে চাষবাস আর মাটি। বুজিস তো মা! লেখাপড়া শেকাতি পেরেচি—এই না বড়ো কথা !
বাপের অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে সে ঠিক বুঝতে পারে না। নিজের পায়ে দাঁড়াতে দিতে আপত্তি কোথায় ? মেয়েদের যত দুর্বল ভাবা হয় তত কি ? না কি সবটাই সমাজ সংসারের সাজানো ব্যাপার ? এই অকূলপাথারে থই পায়না ববিতা। তবে শেষমেষ বাপের কথা ফেলতে পারেনা। নিজের ইচ্ছে পূরণের জন্যে বাপের মনে দুঃখ দেবে ?
মরে গেলে তো মাটির নিচে আঁধারের শান্তি। কিন্তু বেঁচে থাকলে রসদ জোগাতে হয় শরীরে। বাপও ফিরবে আড়াইটার আপ ট্রেনে। আর চেন্নাইমেলে ফিরবে জালাল। মনে কোনো শান্তি নেই। সবার জন্যে উনুন জ্বালাতে হয়
চাঁপাতলা বাজারে শের আলির খাসিবকরির দোকান। খুচরো মাংস বিক্রি যেমন, তেমন বিয়েবাড়ি অনুষ্ঠানবাড়িতে সাপ্লাই দেয়। এসব করে ভালো দু-পয়সা কামিয়েছে। দু-তলা পাকা বাড়ি। তার বড়ো ছেলে মোহনের সাথে পাকা কথাবার্তা।
বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে অস্বস্তি আর অস্বস্তি। গন্ধ চারিদিকে। ঘরবার আর শরীরে। মেয়েদের মানিয়ে নিতে হয়। সেও মানিয়ে নেবে। কিন্তু মন ? মনের স্বস্তি কোথায় ? ক-দিন যেতে বুঝতে দেরি না, সংসারে তাদের অস্তিত্ব কোথায়। সংসার চলে শ্বশুর আর দেওরের কথায়। মোহন মুখ বুজে খেটে যায়। কিন্তু তার কোনো সত্তা নেই। মোহনের বৌ হয়ে এমন অপমান সহ্য হয়না। একদিন নির্জন দুপুরে মোহনকে কাছে পেয়ে কথাকটি বলে। বাড়ির মানুষ যেত এত উদাসীনতা টের পায়নি। ক-দিন তার চারপাশ যেন চুপচাপ। অবিবাহিতা ননদ সাবিনার সাথে কিছুটা মনের মিল হয়েছে। সেও তাকে এড়িয়ে চলছে। পরে বুঝতে পারে মনের কথা আপনলোকের কাছে ফাঁস করে হিতে বিপরীত হয়েছে। শ্বশুর বাড়িতে সাব্যস্ত হয় এমেয়ে এসেই ঘর ভাঙাতে চায়। বাড়াবাড়ি করলে ফল ভালো হবে না। এই রায়ে সে যতটা দুঃখ না পেল মোহনের তালতামাশা হতাশ করল বেশি। শুধু তো শরীর নয় তার কাছে মন পাওয়া যাবে কি ?
এ অপবাদ মেনে নিয়ে সংসার করতে হয়। তবু ভাঙন যখন ধরে তাকে আটকানো যায় না। তারা বুঝল না। সে ভাঙন চায় নি, চেয়েছে আত্মমর্যাদা। মাসতিনেক বাদে বাড়িতে রাখা কয়েকটা খাসি মারা গেল। শ্বশুরের সন্দেহ বাড়ির নতুন বৌয়ের হাত থাকতে পারে। আজকাল মেয়েমানুষের মন বোঝা দায়। কী থেকে কী করতে পারে? কোনদিন দেওর-শ্বশুরের নামে কলঙ্ক রটিয়ে দেবে। বড়ো ক্ষতির আগে মোহনকে ডেকে বলে, বাপ ! তুই বুজেসুজে দেক। তুই যে বড়ো ! দেশে মেয়ের অভাব হবে না।
মোহন যেন টিকি বন্দক রেখেছে। ওদের হাতে পুতুল। ভালোমন্দ ন্যায়অন্যায় একবার প্রশ্ন তুলল না। তার পা জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিল কিন্তু পুতুলের কি চোখ ফোটে ? সামান্য এই কারণে বিচ্ছেদ—তালাক ? মেয়েদের জীবন খেলনা বটে, তা নিয়ে ছিনিমিনি খেলা যায়।
ভাবতে ভাবতে তত দিনে নিজেকে শক্ত করে নিয়েছে। আল্লা যা করে ভালোর জন্যে। এভাবে পণবন্দী হয়ে ঘরসংসার করা যায় না। বাপ-মা হাহাকার করলেও এ একপ্রকার মুক্তি। এবার নিজের পথ বেছে নিতে কোনো বাধা থাকবে না। কিছু গয়নাগাটি নিয়ে ফিরতে পেরেছে। তাই বিক্রি করে ভর্তি হয়েছে বেসরকারি নার্সিং সংস্থায়।
পরের দিন বাইক হাঁকিয়ে চলে এল। তাকে দেখে ফজিলা বিবি বলে, বাবা ! তুমি কেডা ?
আপনার এক ছেলে বলতি পারেন।
তাহলি তো মন্দ না।
কী কর তুমি?
থানায় কাজ করি।
পুলিশ না কি ?
তা বলতি পারেন।
এতক্ষণ স্বাভাবিক কথা বলছিল। এবার কথা জড়িয়ে যায়। তার মাথার গোলমালটা আবার চাগাড় দেয়। জালালের দিকে তাকিয়ে বলে, বাপ! তুমি তো পুলিশ… পুলিশি চাকরি… মেয়েডারে…। জটা মাথা নড়ে বাতাসে। কতদিন মাথায় চিরুনি দেয়নি সে।
আকাশে আগুন ঝরে না। মনের ভেতর ধোঁয়া ওড়ে। তারা পিঠোপিঠি বোন। বড়োবোনের অবস্থা দেখে তহমিনা হয় বেপরোয়া। বাপমায়ের কোনো কথা শুনতে চায়না। আমি আমার ইচ্ছে মতো চলব। পড়াশুনোয় বেশ ভালো। বোটানি নিয়ে অনার্স পাশ করে এদিক-ওদিক চাকরির জন্যে ঘুরছে। এলাকায় ছেলে বন্ধু তার কম না। এর তার সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। কোনো বদনামের পরোয়া করে না। হাড়োয়ার পয়সাওয়ালা ছেলে বিল্টুর সঙ্গে তার ঘনিষ্টতা বেশি। একদিন তার মোটরবাইকে নিউটাউনে এক জায়গায় ইন্টারভিউ দিতে গেল।
তারপর…? চায়ে লম্বা চুমুক দেয় জালাল।
বারান্দায় পাতা গোটা তিনেক প্লাস্টিকের চেয়ার। তাতে বসে আছে তারা। রফিক মিয়া বাড়ি নেই। বাজারে কাঁকরোল বিক্রি করতে গেছে।
তারপর ? কিন্তু কেউ কোনো জবাব দেয়না। আসলে ববিতা কী বলবে ? বলার তো অনেক কিছু আছে। তাদের ছিমছাম ছোটো সংসার। কিন্তু তার গভীর তলদেশে বেদনার গাঢ় আঁধার। তার মুখে তহমিনার নাম শুনে কিছুটা বিহ্বল হয়ে পড়ে ববিতা। নিজের ভালোলাগার চেয়ে একটা খড়কুটো বেয়ে কিনারায় পৌঁছুতে চায় বোধহয়।
চা খাওয়া শেষ হয়েছে। জালালের মুখের অপলক তাকায়। মনে দোলাচল। সব শুনে জালাল মুখ ঘুরিয়ে নেবে না তো? হয়তো সে ববিতাকে ভালোবাসতে চেয়েছে। কিন্তু সে তো ডিভোর্সি মেয়ে। তা জানার পর কতখানি ভালোবাসবে? তবে তাকে ভালোবাসার জন্যে বাড়িতে আমন্ত্রণ করেনি। তহমিনার সেই হাসি ভরা মুখ যেন সবসময় তাড়া করে।
ডেকে যখন এনেছে, কথা তো বলতে হবে। ববিতার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে আগ্রহ ভরে। সব শুনে কোনো চটজলদি উত্তর দেয় না জালাল। শুধু ববিতার ফোন নাম্বার সেভ করে।
তারপর আরো ক-দিন এসেছে জালাল। তখন ফজিলা বিবি জেদ ধরে, বাপ! তুমি যে পুলিশির অফিসার ! মেয়েডারে ফিরিয়ে আনতি পারবা নিশ্চয়ই।
সে কোনো পুলিশের হোমরাচোমরা না। মিথ্যে সান্ত্বনায় সিক্ত করে উন্মাদের প্রলাপ।
ওদিকে ভেতরে ভেতরে বেদনায় বিষাক্ত হয় জালাল। তার বাড়ির অবস্থা তেমন আহামরি নয়। এদের মতো চাষিবাসী পরিবার। খাওয়াপরার ব্যবস্থাটুকু হয়। এদিকে সে তো মাত্তর সিভিকপুলিশ। দিন প্রতি চারশো টাকা আয়। তার চেয়ে বড়ো কথা সরকারি খাতায় নাম নেই। বড়োবাবু সুরেশ রায়ের মনমেজাজের খাতায় আছে। তবুও সে স্বপ্ন দেখে। জামিলা তাকে ছেড়ে চলে গেছে। ভালোবাসার নাম কী এমন? বড়োলোকের ছেলে মিলুর হাত ধরে চলে গেল। জীবন এভাবে কাটাবে। কিন্ত ববিতাকে দেখার পর মনে হয়েছে বিষণ্ণতার শেষ আছে। আঁধারের পর আলো আছে।
অকপটে স্বীকার করেছে সে। দোষ কার, সে বিচারে যাচ্ছেনা জালাল। তবে বোঝে, ডিভোর্সি মেয়েটা জীবনের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। তাকে শুধু ভালোবাসার আবেগ দিয়ে মুছে ফেলা যাবে? যাবেনা? জালাল বুকে দ্বন্দ্ব নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।
ট্রেন অ্যাক্সিডেন্ট করেছে এক জঙ্গলের ধারে। সামনে আরও হাঁটাপথ। সে বেঁচে আছে। ফিরতে অনেক দেরি হবে। তবে বোধহয় সে তহমিনার জন্যে লড়াইটা চালাতে পারবে। যতটা মাইনে পেয়েছে ওভারটাইম খেটেছে ততটা
বেলা বাড়ছে। চেন্নাইমেল হয়তো এগিয়ে আসছে। ফজিলাবিবি কখনো ভালো। কখনো প্রায় উন্মাদ। ছোটোমেয়েকে হারিয়ে দিবাস্বপ্ন দেখে, মাঝেমাঝে মনে হয়, চারপাশে সে যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে। অকারণে হেসে ওঠে কেঁদে ওঠে। কখনো বাড়ির সামনে গভীর পুকুরে ঝাঁপ দিতে চায়। যেমন এই মুহূর্তে বারান্দা থেকে—ঘুমের ঘোরে। ছোটোমেয়েকে তুলে আনতে নইলে কী যে হবে ? এমন অনাসৃষ্টি কাণ্ড সকালবেলা ! ভেজাকাপড়ে তুলে আনে । স্বস্তির চেয়ে বিরক্ত গলায় ববিতা বলে,কী যে করিস, তুই ?
শূন্যচোখে বলে ফজিলা, মেয়েড়ারে যেন ডুবে যেতি দেকলুম। তাইতো…তাইতো… দাঁতে দাঁত লেগে যায় তার।
মা-কে সামাল দিয়ে রান্নাঘরে ঢোকে। মরে গেলে তো মাটির নিচে আঁধারের শান্তি। কিন্তু বেঁচে থাকলে রসদ জোগাতে হয় শরীরে। বাপও ফিরবে আড়াইটার আপ ট্রেনে। আর চেন্নাইমেলে ফিরবে জালাল। মনে কোনো শান্তি নেই। সবার জন্যে উনুন জ্বালাতে হয়।
প্রথমে অনেক ভেবেছে। শিক্ষা মানে কী? বিবেকের আলো প্রজ্জ্বলিত করা? চারিদিকে আঁধারের অসহ্য দামামা। তবু বুকে অদম্য সাহস নিয়ে থানার ঝুলেভরা আলমারি রাখা ঘরে ঢোকে।
তোর এখানে কী দরকার ?
হঠাৎ চমকে দেখে আর্দালি মকবুল হোসেন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে।
ঝাড় পোঁচ করচি।
সবকিছুতে সন্দেহ করা তার স্বভাব। সে বলে, কে তোকে পারমিশান দিয়েচে।
কেউ না।
চ, বড়োবাবুর কাচে।
নিজেকে সামলে নেয়। ভয় পেলে চলবে না। সুরেশ স্যার জিজ্ঞেস করেন, ওখানে কী দরকার?
স্যার! একটা ফাইল খুঁজচি।
কার ?
তার কথা শুনে টেবিল চাপড়ে বড়োবাবু বলেন, তোর আস্পর্দা তো কম না! ধুলোঘেঁটে এ ফাইল তোকে কে বার করতে বলেছে?
স্যার ! তার বাপ-মা বেঁচে আচে।
তারা কি জানবে না, মেয়ে কোথায় নিখোঁজ হয়েচে?
আছান মিয়ার ছেলে রিন্টুকে তো জিজ্ঞেসবাদ করা হয়েছে।
তাতে কি কেসের ফয়সালা হয়েচে ?
ওরা কি তোকে টাকাপয়সা দিয়েছে ? দাঁতের ফাঁক দিয়ে কুটিল হাসির ছাপ ফেলেন।
কী যে বলেন, স্যার !
তবে তোর এত ইন্টারেস্ট কীসের ?
স্যার! জলজ্যান্ত একটা মেয়ে উধাও হয়ে যাবে ?
তোর বড়ো মাথা ভারি হয়েছে। সিভিকের চাকরি তোর জন্যে না।
দু-দিনের মাথায় সে একটা প্রেমপত্র পেল। সেটা নিয়ে ববিতাকে দেখাতে সে গুম মেরে গেল। কেমন স্বগোক্তির মতো বলে, আমাদের জন্যি তোমার এমন ক্ষতি হলো !
ক্ষতি বলো ক্ষতি! লাভ বলো লাভ !
এমন কথা বলচ কেন ? একটু অবাক হয় ববিতা।
আত্মগত হয় জালাল। কী উত্তর দেবে ? সে কি অগ্নিপরীক্ষা দেবে ? না কি এসব ঝামেলা এড়িয়ে চলে যাবে? এরা তার কে? তাদের জন্যে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে ? তবুও ববিতা ? লাভ তার কী ? প্রেমের দহনে আত্মবিসর্জন কি মুক্তি ? হয়তো আবেগ তাই বলে। আবেগ ছাড়া মানবজীবন সম্পূ্র্ণ হয়না। মানুষ পাথরের দোসর না। তবে আবেগ একতরফা নয়। পাল্টা যাচাই করে নিতে হয়। সে তার দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি কী ভাবচ ?
ভাবব তুমি একটা স্বপ্ন ছিলে বাস্তবে তা মুছে গেল। ববিতার চোখে পানি। ডিভোর্সের পরও সে এত ভেঙে পড়েনি।
জবাব দেওয়ার মতো সেও কিছু খুঁজে পায়নি। জীবনে সব অর্থ বোঝা যায় না। সে কী করবে? ভাবতে ভাবতে বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।
বাড়ির লোক চাপাচাপি করে — এমন সোনার চাকরি। দু-দিন পর বড়োবাবুর সঙ্গে দেখা করে জালাল। আজকে তাঁর মনমেজাজ ভালো আছে। নরম গলায় বলেন, কিছু বলবি ?
স্যার…!
বুঝেছি। কিন্তু তুই এক্তিয়ারের বাইরে চলে গেছিস।
কিন্তু আমার চাকরিটা ?
সব প্রশ্নের জবাব নেই।
তাহলি…?
তোকে একটা সৎ পরামর্শ দিই। তুই উকিলের সঙ্গে দেখা কর।
হাড়োয়া গঞ্জের নামকরা হারাধন মিত্তির। সব শুনে বলেন, তোমার চাকরির তো কোনো নিরাপত্তা নেই। এল কি গেল!
ধরুন, তা না হয় হলো।
তবে ? আবার কী ?
জালাল এবার কানেকানে কিছু বলে। হারাধনবাবু গম্ভীর হয়ে যান, মানুষের নিরাপত্তা খুঁজতে এসেচ?
মাথা নাড়ে জালাল, সবই বুজি। তবে মনের ভেতর কে যেন ফুঁসে ওঠে। এত লেখাপড়া শিখলাম…।
বিবেকের দায় ? পাথর মাথার ওপর চেপে আছে। সরানো ঢের শক্ত। সমাজ শক্তি আর অর্থ চায়, বিবেক নয়। তোমার কত আছে ?
তার বাড়ির অবস্থা এ লড়াইয়ের উপযুক্ত নয়। তারা তিনভাই, যে যার মতো আলাদা। অনেক ঘুরে চাকরির কোনো সুরাহা হলো না। ন্যায়ের কথা বলা তার অন্যায় হয়ে গেছে। কোথাও কোনো সহানুভূতি নেই। উল্টে সিভিকপুলিশের চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়ে লোকের হাসিঠাট্টার খোরাক হয়েছে। ববিতার ফোন আসে। দেখা করার মতো মনের জোর খুঁজে পায় না। ববিতা ভাবে তাদের দুর্ভাগ্যের সঙ্গে জালাল জড়িয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে তা না। একটা মেয়ে হাপিশ হয়ে যাবে তাতে কারো কোনো হেলদোল নেই? সমাজ এত উদাসীন?এ ব্যাপারটা ভাবায় জালালকে। ববিতার কান্নাকাটি তাকে দুর্বল করে। মনে হয়, যা গেছে তা নিয়ে আর নিজের ক্ষতি করা কেন? যখন তার আর ফেরার কোনো আশা নেই।
তখন এই অফার পায়। তার পরিচিত সারুক আলম খবর দেয়। ভালো মাইনে। কেরালায় সমুদ্রের ধারে নারকোল বাগানে ম্যানেজারি। ছ-মাসের চুক্তি। তাই সই। কাজ শেষে ফিরছে সে। এরমধ্যে ববিতার সঙ্গে অনেক কথার ভেতর বলেছে হারাধনবাবুকে খাড়া করবে। কথা বলবে, তহমিনার কেস নতুন করে কোর্টে তোলা যাবে কি বসিরহাটে ?
বেলা আড়াইটের ট্রেনে ফিরে এল রফিক মিয়া। কাঁধের বোঝা উঠোনে নামাতে নামাতে বলল, খবর শুনেচিস মা?
কী খবর? মোবাইলে অবশ্য সে কোনো খবর দেখে না।
ওদিকে কোথায় রেলে অ্যাক্সিডেন্ট হয়েচে।
কোথায় ?
হাওড়ার ওদিকে।
আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে না। ঘরে গিয়ে ফোনটা হাতে নেয়। খুব নাম্বারগুলো টেপে। রিং হচ্ছে। ওদিকে এখুনি পরিচিত গলা ভেসে আসবে। কিন্তু তার বদলে এক যান্ত্রিককণ্ঠ, যেখানে ফোন করেছেন সেখানে পৌঁছোনো যাচ্ছে না। ফোন কেটে আবার ফোন। বারবার একই উত্তর। বিছানায় লুটিয়ে পড়ে। মাথার ভেতর ভাঙচুরের শব্দ আর আর্তনাদ। তাদের জীবন বুঝি এমন। জালাল সেখানে পৌঁছে গেছে যেখানে শুধু দুঃস্বপ্নের মেঘ ভরা। কোনো উত্তর আসতে পারে না।
কতক্ষণ হতচেতন ছিল কে জানে। হয়তো দু-ঘণ্টা বা আরো বেশি। মোবাইলের শব্দে ঘোর কাটে। ফোন ধরতে ভরসা পায় না। রিং হয়ে হয়ে কেটে যায়। মিনিটখানেক বাদে আবার। ফোনটা পাশের টেবিলে রাখা আছে। অবশেষে টেনে হিঁচড়ে নিজের শরীরটা তোলে।
ফোন পেয়ে থম মেরে যায় ববিতা। অন্যদিকে জালালের গলা, ফোন ধরচ না যে! কী ভেবেচ?
ফুঁপিয়ে ওঠে ববিতা। হাজার প্রশ্ন বুকের ভেতর ঠেলাঠেলি করে। কোনোমতে বলে, কেমন আচ ? কিচু হয়নি তো ?
হয়নি আবার !
কী হয়েচে? উদ্বেগ গলা ধরে ববিতার।
প্রাণে তো বেঁচে গেচি।
সেই তো ঢের! উচ্ছ্বাস তার।
জিনিস পত্তর সব খোয়া গেচে।
যাকগে !
তোমার জন্যে শাড়ি আর চুড়ি ছিল।
ওসব ভাবতে হবে না।
অবশ্য টাকা পয়সা তেমন যায়নি। ক্যাশ তো কাচে বেশি ছিল না। অনলাইনে সব ব্যাংকে জমা আচে।
তারপর আরো অনেক কথা হয়। তারা—বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা হাঁটতে হাঁটতে অনেকদূর এসে মোবাইলের টাওয়ার পেয়েছে। ট্রেন অ্যাক্সিডেন্ট করেছে একজঙ্গলের ধারে। সামনে আরও হাঁটাপথ। সে বেঁচে আছে। ফিরতে অনেক দেরি হবে। তবে বোধহয় সে তহমিনার জন্যে লড়াইটা চালাতে পারবে। যতটা মাইনে পেয়েছে ওভারটাইম খেটেছে ততটা। হারাধনবাবুর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। পয়সা দিলে বাঘের দুধ মেলে আর পুরোনো কেস নতুন হবে না ?
অনেক হৈহট্টগোলের মধ্যে তার গলা হারিয়ে গেল।
ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে ববিতা। তার উদ্বেগটুকু আর নেই। কিন্তু নতুন এক ভাবনা তাকে গ্রাস করে। শেষের কথাবার্তা সবটাই তহমিনাকে জুড়ে। হঠাৎ সে সন্দিহান হয়। তার মনের অবস্থা কেমন? সে খোঁজ তো করল না জালাল। শাড়ি আর চুড়ির সঙ্গে সেও কি ঠিকানা হারিয়েছে ? ভালোবাসা কার জন্যে ? নিখোঁজ বোন তার প্রতিদ্বন্দ্বী ? সেরকম কি হয় ? উৎকণ্ঠা নয় হতাশা নয় হিংসা নয়। বিচিত্র এক অনুভূতি তাকে জর্জরিত করে। তার সামনে যেন দাঁড়িয়ে আছে তহমিনা। সে ক্ষেপে গিয়ে, হারামজাদি! তুই নিখোঁজ হলি কেন? তুই নেই কিন্তু তোর সব্বোনাশ রয়ে গেচে।
ঘরের দেয়ালে একটা টাঙানো ছবি, বিয়ের আগের। তাতে আলোআঁধারির ছাপ। কী করবে সে ? অপলক তাকিয়ে থাকে সেদিকে। নিজেকে আর সামাল দিতেপারেনা। আত্মরতিতে মগ্ন হবে তাহলে ?
♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦
❤ Support Us








