- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুলাই ২৫, ২০২৬
অসমে আরও ঘনীভূত বন্যা পরিস্থিতি ! মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬২, ক্ষতিগ্রস্ত ১২ জেলায় ৭ লক্ষেরও বেশি মানুষ। ৫০ হাজার হেক্টরেরও বেশি ফসলি-জমি প্লাবিত
অসমে বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২-এ। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দফতরের রিপোর্টে জানানো হয়েছে। রাজ্যের ১২টি জেলায় এখনো ৭ লক্ষেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, আর বহু এলাকা কার্যত জলের তলায়। শিবসাগর, চড়াইদেউ ও জোরহাটে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৭,০৫,১৪৮ জন মানুষ এ পর্যন্ত বন্যায় প্রভাবিত হয়েছেন। ৮৫৬টি গ্রাম প্লাবিত। উদ্ধার ও ত্রাণকাজের জন্য ৩৬৩টি ত্রাণশিবির ও ত্রাণ-বিতরণ কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এ সব শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন ১,১৫,২০৫ জন মানুষ। আরও দু লক্ষেরও বেশি মানুষকে ত্রাণ-বিতরণ কেন্দ্রের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
জেলাভিত্তিক ক্ষতির পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, শিবসাগরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। সেখানে ৩,৪৮,৫৫৫ জন মানুষ প্রভাবিত। চড়াইদেউতে ক্ষতিগ্রস্ত ১,৮৮,৪০৪ জন এবং জোরহাটে ১,২৬,৭৯৩ জন। গোলাঘাট, ডিব্রুগড়, হোজাই, নগাঁও, বিশ্বনাথ, ধেমাজি, সোনিতপুর, কামরূপ (মেট্রো) ও কার্বি আংলং-সহ একাধিক জেলা এখনও বন্যার কবলে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, দিখৌ, ডিসাং, ধানসিরি (দক্ষিণ) এবং কুশিয়ারা নদী বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে। ফলে নতুন করে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকছে। উদ্ধারকাজ জোরকদমে চলছে। শুক্রবার এনডিআরএফ, এসডিআরএফ ও স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ অভিযানে প্রায় ১,০০০ জনকে উপদ্রুত এলাকা থেকে নিরাপদ স্থানে সরানো হয়েছে। তবে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়েছেন যে, বহু এলাকা এখনো অপ্রবেশযোগ্য ফলে সে সব অঞ্চলে উদ্ধার কাজ ব্যহত হচ্ছে। নাজিরা বিধানসভা এলাকা এবং শিৱসাগরের বিস্তীর্ণ অংশে মোট ৮০,০০০-র কাছাকাছি মানুষ এখনো ত্রাণ ও উদ্ধার দলের নাগালের বাইরে।
বন্যার প্রভাব কৃষিক্ষেত্রের পরিস্থিতি ভয়াবহ। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ৫৬,৬০৬.৭৭৭ হেক্টর ফসলি জমি এখন জলের নিচে। ফলে কৃষকদের সামনে বড়োসড়ো অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে পশুপালন ক্ষেত্রেও বিপুল ক্ষতি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৭,১০৭টি পশু ও হাঁস-মুরগি ভেসে গেছে। মোট ক্ষতিগ্রস্ত পশু ও হাঁস-মুরগির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩,৩৪,০২০। এ পরিস্থিতিতে ডেরগাঁওয়ের একটি ত্রাণশিবির পরিদর্শন করে অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা পরিস্থিতিকে ‘গুরুতর’ বলে বর্ণনা করেন। তাঁর দাবি, নাগাল্যান্ড ও অসমের কিছু অংশে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণেই চড়াইদেউ ও শিবসাগরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তিনি জানান, সেনা, বায়ুসেনা, এনডিআরএফ এবং রাজ্য প্রশাসন যৌথভাবে কাজ করছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন বলে মুখ্যমন্ত্রীর দাবি। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও আশ্বাস দিয়েছেন যে, অসমের এ পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুসারে সমগ্র কেন্দ্র থেকে সব রকমের সহায়তা করা হবে। একই সঙ্গে একটি কেন্দ্রীয় দল শনিবার রাজ্যে এসে ক্ষতির পরিধি ও পুনর্বাসনের চাহিদা নির্ধারণ করবে।
মুখ্যমন্ত্রী বিশ্ব শর্মা বিশ্লেষণ মতে, ভয়াবহ এ বন্যা নানা কারণে এমন বিপুল ক্ষয়ক্ষতি বয়ে এনেছে। নাগাল্যান্ডে ১৮ ও ১৯ জুলাই অতিরিক্ত বৃষ্টি (৪৩৫–৪৯৩ শতাংশ বেশি) রেকর্ড করা হয়; সে বর্ষণই নিম্নভাগের নদীগুলোতে নিমেষের মধ্যেই বিপুল জলপ্রবাহ বয়ে আনে। একই সঙ্গে অসমের চাবাইদেরও অস্বাভাবিক বর্ষণের সম্মুখীন হওয়ায় উপরের অংশ একযোগে ভেসে নেমে এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘প্রকৃতির এই আকস্মিক রণহুঙ্কারের জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। কয়েক ঘণ্টায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে, ফলে পদক্ষেপ নেবার সময়ও মেলেনি।’ পাশাপাশি, মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, নাগাল্যান্ডের গোলাঘাটে ডোয়াং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে প্রচুর পরিমাণে জল ছাড়ার ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বিভিন্ন নদিতে তোড়জল বিপদসীমার ওপরে বইছে। বিশেষ সতর্কতা জারি করে হিমন্ত বিশ্বশর্মা আরও বলেছেন— জোরাবত এলাকা ও আশপাশের পাহাড় কেটে যে উন্নয়ন হচ্ছে তা প্রকৃতির অব্যবস্থাপনা বাড়াচ্ছে, গুয়াহাটি শহরও ভবিষ্যতে বড়ো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তিনি মেঘালয়ের কর্তৃপক্ষদের অনুরোধ করেছেন উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, পড়শি রাজ্যে নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে তৈরি হওয়া নিচু সমভূমি অঞ্চল অসম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে রাজ্যের ভিতরে ও বাইরে থেকে একের পর এক পাশে থাকার বার্তা এসছে। অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খাণ্ডু, মিজোরামের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জোরামথাঙ্গা এবং অন্ধ্র প্রদেশের উপ-মুখ্যমন্ত্রী পবন কল্যাণ অসমের পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন। তবে, বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ না-থাকায় পরিস্থিতি আপাতত আরও উদ্বেগজনক। রাজ্যের বিস্তীর্ণ অংশে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়েছে। বিমানবাহিনী বা ড্রোন দিয়ে ত্রাণ পৌঁছানোর চেষ্টা করার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। বানভাসি রাস্তাঘাট দ্রুত পুনরুদ্ধারে কাজও চালাচ্ছে সেনাবাহিনী ও বিপর্যয় মোকাবিলা দলগুলি। ফলে, জল নামলেই তবেই প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন প্রশাসনিক কর্তারা। আপাতত লক্ষ্য একটাই, জলবন্দি মানুষকে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া, ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া, আর বিপর্যস্ত জনজীবনকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পথে ফেরানো।
❤ Support Us





