Advertisement
  • গ | ল্প
  • মে ৩১, ২০২৬

বুক পকেটের ঘড়ি

পুলক কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
বুক পকেটের ঘড়ি

চিত্রকর্ম : সালভাদোর দালি

   অনেকেই অনেকের কথা শুনেছেন, অনেক কথা পড়েছেন; কিন্তু আমার কথা হয়তো শোনা হয়নি কারও। শুনবেন কোত্থেকে, আমার কথা কখনো লেখেইনি কেউ। আমি সামান্য একটা বুক পকেটের ঘড়ি। আজ নিজের কথা জানাবো বলে ঠিক করেছি। কি হলো আমার পরিচয় শুনেই নাক সিটকাচ্ছেন ? ভাবছেন না তো, সামান্য একটা বুক-পকেটের ঘড়ি, তার গল্প শুনতে হবে
বসে-বসে ! তবে, আমার সব কথা জানার পরে, আমাকে আর সামান্য মনে হবে না কারও !

   এই মুহূর্তে আমি আছি, দক্ষিণ কলকাতার সব থেকে বড়ো শপিংমলের দোতলায়; শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘড়ি-বিপণীতে। একটা চোখ ধাঁধানো সাদা ভেলভেটের বাক্সের মধ্যে। আমাকে দেখার জন্য দোকানের ভিতরে ঢোকার প্রয়োজন হয় না। এস্ক্যালেটর বেয়ে দোতলায় উঠে, করিডরের উপর দিয়ে চলতে চলতে ঘড়ির দোকানের কাচের ভিতর দিয়ে উঁকি মারলেই আমার দর্শন পায় সকলে। আমার দাম তিন লক্ষ তিরিশ হাজার টাকা। কিন্তু, আজকালকার মানুষ আমার মুখ দেখার পরে, আমার জন্ম-সময়, বিনিময় মূল্য আর প্রস্তুতকারকের নাম-লেখা ট্যাগের উপরে একবার চোখ বুলিয়েই, নিজেদের মধ্যে কনুই মারামারি করে, ফিসফাস করে, ‘মান্ধাতা আমলের জিনিস, অথচ কেমন মাথা ঘোরানো দাম ! সাধারণ মানুষের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে ! কোটিপতি ব্যবসায়ীরা ছাড়া এ-ঘড়ি কেনার সামর্থ্য নেই কারও; কিনে নিয়ে গিয়ে তারাও ঘরে সাজিয়ে রাখবে ! ইউজলেস্‌ !’

   সত্যি বলতে আমার বয়স তো কম হলো না। দেখতে-দেখতে চার-চারটে শতাব্দী অতিক্রান্ত হয়ে গিয়েছে, আমার জন্মের পরে।শুধু আমি কেন, আচ্ছা-আচ্ছা জ্ঞানী-গুণী মানুষজনের জীবনেও দেখেছি, তাদের বার্ধক্যে তারা তাদের পরিবার, সন্তান-সন্ততি, অধস্তন ব্যক্তিবর্গ, সকলের কাছেই মুল্যহীন, ইউজলেস্‌ হিসাবে পরিগণিত হয়। আর আমি তো সামান্য একটা বুক পকেটের ঘড়ি।


লন্ডনের পথেঘাটে ঘোড়ার পিঠে চড়েযে সব শিকারিরা শিয়াল মেরে বেড়াত রাতের অন্ধকারেতারা ডান হাতে ঘোড়ার লাগাম ধরেবাঁহাতে জামার বুকপকেট থেকে ঘড়ি বের করেআঙুলের টোকায় ঢাকা বা কেস খুলে সময় দেখে নিতেন অনায়াসে


   কিন্তু একটা সময় ছিল সমগ্র বিশ্বের প্রত্যেকটা দেশে আমাদের বংশের প্রত্যেকের একটা আলাদা সম্মান ছিল, কদর ছিল। ১৫৫০ সালে জার্মান সাহেব পিটার হেনলিন প্রথম যখন বুক পকেটের ঘড়ি প্রস্তুত করলেন, তখন ডিম্বাকৃতি ওই ঘড়ির নাম ছিল ‘ন্যুরেম্বার্গ এগ’ ঘড়ি। এর পরে তৈরি হলো ‘হাণ্টার-কেস’ পকেট ওয়াচ। লণ্ডনের পথেঘাটে ঘোড়ার পিঠে চড়ে, যে সব শিকারিরা শিয়াল মেরে বেড়াত রাতের অন্ধকারে, তারা ডান হাতে ঘোড়ার লাগাম ধরে, বাঁ-হাতে জামার বুক-পকেট থেকে ঘড়ি বের করে, আঙুলের টোকায় ঢাকা বা কেস খুলে সময় দেখে নিতেন অনায়াসে। ঐসব ঘড়ির ঢাকনার নিচে কোন কাচের আবরণ থাকত না। ফলে, ঘষা লেগে, আঘাত লেগে ঘড়ির কাঁটা ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েই যেত সব সময়।

   ১৬১০ সালে উদ্ভব হলো কাচের ঢাকনা দেওয়া নতুন ধরণের ঘড়ি; তার উপরে অবশ্য অনেক ক্ষেত্রেই হাণ্টার-কেস বসানো থাকত। তবে আমাদের আভিজাত্য বৃদ্ধি পেল ১৬৭৫ সালে। যখন ইংল্যাণ্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস্‌ তার পোশাকের মধ্যে ‘ওয়েস্টকোট’ প্রচলন করলেন। তিনি ওয়েস্টকোটের পকেটের মধ্যে রাখতে শুরু করলেন চেন দিয়ে বাঁধা পকেট ওয়াচ। সেইসব পকেট-ঘড়ির বুকে একটা মাত্র কাঁটা থাকত’। এরপরে বিভিন্ন দেশে পকেট-ঘড়ি নিয়ে শুরু নানান রকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা গোটা অষ্টাদশ শতাব্দী জুড়ে। জার্মানী, স্যুইৎজারল্যাণ্ড, আমেরিকা, জাপান-সহ বিভিন্ন দেশের বড়ো-বড়ো কোম্পানী এগিয়ে এল
রং-বেরঙের পকেট-ঘড়ি নির্মাণে।

   ১৮৫১ সালে পকেট-ঘড়ি নিয়ে লণ্ডন শহরে ‘গ্রেট এক্সিবিশন অব্‌ লণ্ডন’ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ‘পটেক ফিলিপ’ কোম্পানীর তৈরি এক নতুন ধরণের ঘড়ি প্রদর্শিত হয়েছিল। সে ঘড়ির ডায়ালে প্রথমবারের জন্য দেখা মিলল ঘণ্টা ও মিনিটের কাঁটা। ঘড়ির ছয়ের ঘরে বসানো সেকেণ্ডের কাঁটা, আর বারো’র ঘরের ঠিক মাথায় বসানো দম-দেওয়ার চাবি। আর সেই চাবিকে ঘিরে বসানো হলো একটা রিং ; যে রিং-এর সঙ্গে লাগানো লম্বা চেন, যার সাহায্যে অনায়াসে ঘড়িটাকে বুক-পকেটের মধ্যে রেখে মানুষজনের পক্ষে নিশ্চিন্ত চিত্তে ঘুরে বেড়ানো সম্ভব। ১৮৫৩ সালে, সম্পূর্ণ সোনার তৈরি এই অভিনব পকেট ঘড়ির প্রথম মালিক হলেন ইংল্যাণ্ডের মহারানী ভিক্টোরিয়া ও প্রিন্স এ্যালবার্ট।


ইংরেজ সাহেবদের পকেটে রক্ষিত ঘড়ি খুব শীঘ্রই মন কেড়ে নিল এদেশের সব বাবুসম্প্রদায়ের ধনী মানুষজনের । বিশেষ রে যাদের দিনরাতের ওঠাবসা ছিল ইংরেজ সাহেবদের সঙ্গে তাদের ঘরেঘরেপকেটেপকেটে শোভা পেতে লাগল’ সুদৃশ্য সব পকেটঘড়ি নামক অলঙ্কারটি


   আপনারা হয়তো ভাবছেন, নিজের কথা বলতে গিয়ে, হঠাৎ করে কেন পকেট-ঘড়ির ইতিহাস আওড়াতে শুরু করলাম ! এর প্রধান কারণ হচ্ছে, আমিও ঐ বংশোদ্ভূত। বংশ-পরিচয় না দিয়ে কি আর নিজের গল্প বলা যায় ! এই বৃদ্ধ-বয়সে পৌঁছেও আমার যা রূপ বর্তমান, তা দেখে বহু লোক রীতিমত ভিরমি খেয়ে যায়। আমার ডায়ালের বুকে খচিত এক থেকে বারোর প্রতিটা সংখ্যা সোনার। কাঁটা তিনটে সোনার,  গলায় ঝোলানোর চেন, দম দেওয়ার চাবি-সহ পিছনের ঢাকনাটাও সোনার। বহু বছর পূর্বে আমার শরীরের ভিতরের পুরো যন্ত্রাংশ সবই ছিল সোনার।

   ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সাহেবদের হাত থেকে ভারতবর্ষের শাসনভার মহারানী ভিক্টোরিয়ার হাতে চলে যেতেই, ব্রিটিশ শাসকদল দলে-দলে পা বাড়ালেন ভারতবর্ষের উদ্দেশ্যে। প্রশাসক, অধ্যাপক, ধর্মযাজক, বিচারক প্রভৃতি সকল পেশার মানুষের ঢল নামল এ দেশের বুকে। আমিও এসে হাজির হলাম ইংরেজ বিচারকের পকেট-বন্দি হয়ে। পার্ক স্ট্রীটের বিশাল প্রাসাদে আমার ঠিকানা। বিচারক মালিকের শরীরের সঙ্গে সারাটা ক্ষণ লেপটে থাকতাম আমি। আমার মুখ না দেখে, কোনো কাজ করতেন না তিনি। ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে, প্রাতঃরাশ, ন্যায়ালয় অভিমুখে যাত্রা করা, ন্যায়ালয়ের কার্যাবলি সমাপণ করে বাড়ি ফিরে আসা, সান্ধ্যকালীন প্রমোদ-যাত্রা, সকল কিছুই তিনি করতেন আমার দেখানো সময় মেনে। শৃঙ্খলা ভঙ্গ করতে হলে, তাও করতেন সময়ের কড়া নির্দেশ মেনে।

    যে সময়ের কথা বলছি, তখন ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, উচ্চবিত্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘড়ি দেখে দৈনন্দিন জীবনের কার্যাবলি সম্পাদনের কোনো চলই ছিল না। তাদের সময়ের হিসাব-নিকাশ চলত— পলক, ক্ষণ, নিমেষ, দণ্ড, মুহূর্ত, প্রহর এ সকল সময় গণনার মাধ্যমে। কি হলো, আমার কথা শুনে আকাশ থেকে পড়লেন মনে হচ্ছে ?  ভাবছেন, এসব শব্দ আমি আবার কোত্থেকে সংগ্রহ করলাম ! আরে বাব্বাঃ ! এক পলক মানে হচ্ছে চব্বিশ সেকেণ্ড, এক ক্ষণ মানে হচ্ছে চার মিনিট, এক নিমেষ মানে ষোলো মিনিট, এক দণ্ড হচ্ছে চব্বিশ মিনিট, এক মুহূর্ত মানে হচ্ছে আটচল্লিশ মিনিট, আর এক প্রহরের অর্থ হচ্ছে তিন ঘণ্টা !

    সে যে যার রীতি মেনে জীবন চালনা করতেই পারে ! তবে ইংরেজ সাহেবদের পকেটে রক্ষিত ঘড়ি খুব শীঘ্রই মন কেড়ে নিল এদেশের সব বাবু-সম্প্রদায়ের ধনী মানুষজনের । বিশেষ করে যাদের দিনরাতের ওঠাবসা ছিল ইংরেজ সাহেবদের সঙ্গে। তাদের ঘরে-ঘরে, পকেটে-পকেটে শোভা পেতে লাগল’ সুদৃশ্য সব পকেট-ঘড়ি নামক অলঙ্কারটি। ‘অলঙ্কার’ শব্দটি ব্যবহার করলাম কারণ, তখনকার দিনে কি ইউরোপে, কি ভারতবর্ষ, পকেট ঘড়িকে অলঙ্কার-সম মুল্যবান বলেই মনে করা হতো। আমার স্মৃতিতে এখনো জ্বলজ্বল করছে, দেশী-বিদেশী বিভিন্ন ইংরাজি সংবাদপত্রে প্রকাশিত বেশ কিছু বিজ্ঞাপণের কথা ; ‘হারানো পকেট-ঘড়ির সন্ধান দিতে পারলে এক থেকে পাঁচ গিনি পর্যন্ত পুরষ্কার!’

   যাই হোক, দারুণ সুখেই আমাদের দিন অতিবাহিত হচ্ছিল। দুঃখের বীজটি রোপণ করলেন এ্যাব্রাহাম লুই ব্রেগুয়েট নামের এক ঘড়ি প্রস্তুত-কারক। ১৮১০ সালে তিনি সর্বপ্রথম একখানি ‘রিস্টওয়াচ’ মানে ‘কব্জি-ঘড়ি’ প্রস্তুত করে দিলেন নেপলসের রাণী ক্যারোলিন মুরাটের জন্য। সেকথা বিশ্বের খুব বিশেষ কারও কানে না পৌঁছলেও, সর্বনাশ নেমে এলো ১৮৬৮ সালে। হাঙ্গেরির কাউণ্টেস ‘কসকোভিজ’ যখন স্যুইস ঘড়ি নির্মাতা কোম্পানী ‘পটেক ফিলিপ’-এর তৈরি ব্রেসলেট-ঘড়ি কব্জিতে ধারণ করলেন। খবর রটে গেল বিশ্বের ঘরে-ঘরে। পকেটে লুকানো ঘড়ির তুলনায় কব্জিতে সদা প্রকাশমানা সুন্দরীর লোভে বিশ্ববাসীর মন উত্তাল হয়ে উঠল। এর মধ্যে বিংশ-শতাব্দীর শুরুতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজতেই, যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল সৈন্যবর্গের কব্জিতে শোভা পেতে শুরু করল কব্জি-ঘড়ি।


খবর রটে গেল বিশ্বের ঘরেঘরে। পকেটে লুকানো ঘড়ির তুলনায় কব্জিতে সদা প্রকাশমানা সুন্দরীর লোভে বিশ্ববাসীর মন উত্তাল হয়ে উঠল এর মধ্যে বিংশশতাব্দীর শুরুতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজতেইযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল সৈন্যবর্গের কব্জিতে শোভা পেতে শুরু করল কব্জিঘড়ি


   প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজতে না বাজতে কলকাতার মাটিতে আছড়ে পড়ল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে হিংস্র আন্দোলনের ঢেউ। দিনে-দুপুরে প্রকাশ্য দিবালোক হত্যা করা হতে লাগল ইংরেজদের। আমার মালিক এতে ভয় পেয়ে, গোপনে এদেশ ছাড়লেন। দেশ ছাড়তে যিনি তাকে সহায়তা করেছিলেন, সেই বাঙালি পাচককে পুরষ্কার-স্বরূপ প্রদান করলেন ওনার পকেট-ঘড়িটি অর্থাৎ আমাকে। পাচক ঘড়ির মর্ম কী বুঝবে! রাত ফুরানোর আগেই আমাকে রাধাবাজারের ঘড়ি মার্কেটে গিয়ে বিক্রি করে দিল।

   রাধাবাজারের সেই ঘড়ি কারিগর আমার শরীরের ভিতর থেকে সোনার তৈরি সব যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে, ইস্পাতের দেশী যন্ত্রাংশ ভরে দিয়ে বেচে দিল মহাকরণের এক আধিকারিকের হাতে। স্বর্ণ-নির্মিত উপরের খোলস দেখে তখনো সবাই মোহিত। এরপরে সময়ের ভাটার টানে চার-পাঁচ হাত ঘুরে আমার ঠাঁই হলো বর্তমান মালিকের ঘরে, দক্ষিণ কলকাতার মলের ঘড়ি-বিপণির শো-কেসের ভিতরে। আমার আশপাশের সব ঘড়ি বিক্রি হয়ে যায়, আমার দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না। আমার মতো সেকেলে একটা পকেট-ঘড়িকে পছন্দ করে না কেউ। একথা আমার মালিকও খুব ভালো করেই জানেন। শুনেছি আমার মালিক লোকটা না কি ভালো নয়। এই ঝাঁ-চকচকে ঘড়ির দোকানের আড়ালে তিনি না কি কালো বাজারির ব্যবসা করেন।

   ভেলভেটের বাক্সবন্দি হয়ে থাকতে-থাকতে ভিতরে-ভিতরে ভীষণ কষ্টবোধ হয় আমার। কিন্তু আজ সকালে একটা খবর শুনে নড়েচড়ে বসলাম। কোনো একজন কাস্টমস্‌-এর বড়ো অফিসার বিপণীতে আসছেন আজ। ম্যানেজার সাহেব আমাকে ঝাঁড়পোছ করে, আমার মুখটা বিপণীর অভ্যন্তরমুখী করে দিয়ে, আমার কাণে-কাণে শোনালেন, ‘মনে হচ্ছে আজ তোমার বন্দি-দশা ঘুঁচতে চলেছে। কাস্টমস্‌-এর হাতে বড়ো-সড়ো জালিয়াতিতে ফেঁসেছিল মালিক। তার থেকে মুক্তি পেতেই তোমার হস্তান্তর ঘটতে চলেছে আজ !’

   বেলা গড়াতেই বুঝতে পারলাম, ম্যানেজার সাহেবের কথা সত্য। জনা পাঁচেক পারিষদের সঙ্গে মালিক এসে ঢুকলেন কাচের দরজা ঠেলে। মালিককে দেখামাত্র ম্যনেজার-সহ সকল কর্মচারীরা হাত জোড় করে এগিয়ে এল সামনে। মালিকের পাশে নীল রঙের প্যান্টের উপরে মেরুন রঙের ব্লেজার পরা,  প্রায় ছ-ফুট উচ্চতার এক ভদ্রলোক। বুঝতে পারলাম ইনিই কাস্টমস্‌-কর্তা। বিপণীতে প্রবেশ করা মাত্র সাহেবের চোখ যেন একেবারে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মালিক তা খেয়াল করে দু-হাত প্রসারিত করে জানালেন, ‘মনে করুন, এ আপনার নিজের দোকান ! ইউ ক্যান পিক আপ এনিথিং ইউ লাইক !’

   ভদ্রলোক ঘুরতে-ঘুরতে যে-যে সামগ্রী স্পর্শ করে একটু উল্টে-পাল্টে দেখলেন, মালিক সঙ্গে-সঙ্গে তার চোখের ইশারায় কর্মচারীদেরকে সেগুলো প্যাক করে দিতে বললেন। তারপরে স্বতঃপ্রনোদিত হয়ে, ভেলভেট বাক্স থেকে আমাকে বের করে, সোজা ভদ্রলোকের গলায় চেনখানি গলিয়ে দিয়ে, আমাকে ওনার বুক-পকেটের ভিতরে গুঁজে দিলেন। তারপর, ভদ্রলোকের কানের কাছে মুখ এনে বললেন, ‘এটা এই শো-রুমের সবচেয়ে পুরাণো ঐতিহাসিক আর্টিকল্‌। এর যা কিছু সোনালী, পুরোটাই সোনার। ইট কস্ট মোর দ্যান থ্রি ল্যাক্স ! এছাড়াও, আপনার স্পর্শ পাওয়া সবকিছুই আমি প্যাক করে আপনার গাড়িতে তুলে দিয়েছি স্যার !’

   নতুন বক্ষে স্থান পেতেই, আমার বুকের ভিতরে তখন একটা দারুণ ভালোলাগা আমাকে যেন আচ্ছন্ন করে ফেলল’ মুক্তির আনন্দে আমার শরীর-মন শিহরিত। মল থেকে বেরিয়ে আমার নতুন মালিক তার গাড়িতে উঠে বসলেন, পাশে প্রাক্তন মালিক। একটা লেদার ব্রিফকেস অফিসারের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘এখানে পুরোটাই আছে; চিন্তা করবেন না আমার সব আয়োজন তৈরিই আছে। আমি শিয়ালদহে গিয়ে দার্জিলিং মেলে উঠিয়ে দিয়ে আসব আপনাকে। এসি ফার্স্ট ক্লাস ক্যুপ ! ট্রেনের টিকিট, দার্জিলিং-এর হোটেলের কাগজপত্র সব এই ফোল্ডারে দিয়ে দিলাম !’— বলে একটা ছোট্ট ফোল্ডার ফাইল হস্তান্তর করলেন আমার প্রাক্তন মালিক।

   দীর্ঘদিন বাদে ট্রেনে চেপে দার্জিলিং যাওয়ার ভাবনায় আমার ঔৎফুল্ল আর ধরে না ! শিয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছে ট্রেনে উঠে পড়লেন নতুন মালিক। এসি ক্যুপের মধ্যে ঢুকেই, বাঁ-হাতেই পিছনের দরজা ঠেলে বন্ধ করে দিলেন। ভেবেছিলাম, ফাঁকা ক্যুপে শুধু আমরা দু-জন, আমাকে বুক-পকেট থেকে বের করে অন্তত  সোহাগের দৃষ্টি লেপন করবেন আমার মুখমণ্ডলে ! কিন্তু সমস্ত প্রত্যাশায় জল ঢেলে দিতে, ক্যুপের ভিতরে একেবারে জানালার ধারে এক মধ্যবয়সী সুন্দরী সেখানে উপস্থিত। নতুন মালিক তার পাশে বসেই, বলা নেই, কওয়া নেই সোজা ডান হাতখানি পিছন থেকে সুন্দরীর শরীরের উপরে স্থাপন করে, তাকে নিজের বুকের দিকে আকর্ষন করলেন।

‘তাড়া কেন এত ?’ ; দার্জিলিং-এর হোটেলে থাকছি তো দু-দিন !’

 ‘তারপর !’— সুন্দরীর কথার পিঠে প্রশ্ন করলেন নতুন মালিক।

   ‘তারপর, নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে আমি কলকাতা ফেরার ট্রেন ধরব, আর আপনি আপনার দেশের বাড়ি চালশায় !’ নতুন মালিকের মুখের দিকে না তাকিয়েই জবাব দিল সুন্দরী।

   সুন্দরীকে নিজের বুকের মধ্যে টানতেই দুটো মানুষের হৃদয়ের ধুকপুকানি অনুভব করলাম আমি। দু-জনেই ক্ষণিকের জন্য নিচের দিকে নিজেদের হৃদয়ের উপরে নজর ফেলে কি যেন খুঁজলেন। বুঝলাম, আমার উপস্থিতি দুটি হৃদয়ের মিলনে বাধ সাধছে। নতুন মালিক মুহূর্তের মধ্যে আমাকে তার বুক-পকেট থেকে নির্গত করে, চেন খুলে নিজের গলা থেকে সুন্দরীর গলায় গলান্তরিত করলেন আমাকে। সুন্দরীর বক্ষ-উপত্যকায় আন্দোলিত হতে-হতে, অনাস্বাদিত একটা অনুভূতি আমাকে যেন আবিষ্ট করে ফেলল’।

   দার্জিলিং মেল তার গতি বাড়াচ্ছে, আর দুটি মানুষের গোপণ পরকীয়ার দৌলতে ক্যুপের ভিতরে যে দৃশ্যের অবতারণা হলো, তা আর বিবৃত করা এখানে মোটেও সমীচিন হবে না। গোপন পরকীয়ার কল্যাণে দুটি পরষ্পরের অপরিচিত মানুষ যতই ফূর্তি অনুভব করুক না কেন, আমার নতুন দুঃখের দিন শুরু হলো। আমার স্থান হলো সুন্দরীর কাঁধে-ঝোলানো ব্যাগের ভিতরে। নতুন বন্দিদশায় পরকীয়ার কাহিনি আর গোচরে এল না আমার।

   তিনদিন পর আলোর মুখ দেখলাম সুন্দরীর কলকাতার বাড়িতে ফেরার পরে। আমাকে তার ব্যাগের ভিতর থেকে বের করে, সুন্দরী আমাকে এক পুরুষের গলান্তরিত করে জানাল’, ‘দেড়শ বছরের ঐতিহাসিক সামগ্রী ; এর যা কিছু সোনালী, সবটাই সোনার। তোমার বুক-পকেটে মানাবে ভালো !’


আমার প্রতি সান্যাল সাহেবের ধীরেধীরে যে হৃদয়ের টান বাড়ছেতা দিব্যি বুঝতে পারছিলাম আমি যখন যেখানেই যান না কেনআমাকে সঙ্গে নিতে কখনো ভুলতেন না ওনার সাথে ঘোরাফেরা করেকত নতুননতুন মানুষ দেখলামনতুন জায়গা দেখলামসমাজের কত কাদা ঘাটাঘাঁটির তথ্য জানলামকত নতুননতুন শব্দ শিখলাম আমিঅল্প কদিনের মধ্যে কিন্তু আমার ভাগ্যে তো সুখ বেশিদিন সয় না


   আবার মালিক পরিবর্তন হলো। কথোপকথনে বুঝতে পারলাম, এখন থেকে আমার নতুন মালিক হলেন সুন্দরীর স্বামী তথাগত সান্যাল। পেশায় রাজনীতিবিদ, দলের সবসময়ের কর্মী। আমার নতুন মালিক এই বুঁর্জোয়া সমাজ-ব্যবস্থায় অর্থোপার্জনে অনাগ্রহী, তাই সংসার টানার দায় সুন্দরীর। ওনার সময় কাটে সভা-সমাবেশ, প্রতিবাদ মিছিলে তাত্ত্বিক ভাষণ প্রদানের মাধ্যমে।

    সে যাই করুন না কেন, আমার প্রতি সান্যাল সাহেবের ধীরে-ধীরে যে হৃদয়ের টান বাড়ছে, তা দিব্যি বুঝতে পারছিলাম আমি। যখন যেখানেই যান না কেন, আমাকে সঙ্গে নিতে কখনো ভুলতেন না। ওনার সাথে ঘোরাফেরা করে, কত নতুন-নতুন মানুষ দেখলাম, নতুন জায়গা দেখলাম, সমাজের কত কাদা ঘাটাঘাঁটির তথ্য জানলাম, কত নতুন–নতুন শব্দ শিখলাম আমি, অল্প ক-দিনের মধ্যে। কিন্তু আমার ভাগ্যে তো সুখ বেশিদিন সয় না !

   সেদিন দুপুরে শিক্ষা দফতর ঘেরাও অভিযানে যোগ দেওয়ার কথা ছিল সান্যাল সাহেবের। গত আট-দশ বছর ধরে যেসব পরীক্ষার্থীরা স্কুল-শিক্ষা দফতরের চাকরি পেয়েও পাচ্ছে না, তাদেরকে আদালত ও মিটিং-মিছিল, ঘেরাও-প্রতিবাদ অভিযানে সামিল করার পিছনে থাকা তাত্ত্বিক নেতার কর্ম-পদ্ধতিতে বিচলিত ছিল সরকার পক্ষ থেকে শুরু করে একদল চাকরি-প্রার্থীরাও। উভয় পক্ষই চাইছিল এর থেকে মুক্তি ! ঘেরাও অভিযানের মাঝে সেদিন পুলিশ লাঠি আর কাঁদানে গ্যাস চার্জ করা শুরু করতেই, জমায়েত ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে সান্যাল সাহেব ভিড়ের ধাক্কায় মাটিতে পড়ে যেতেই, ওনার বুক পকেট থেকে ছিটকে মাটিতে পড়ে গেলাম আমি। আমার বুকের উপরে নেমে এল একের পর এক পদাঘাত, ভেঙ্গে টুকরো-টুকরো হয়ে গেলাম আমি।

   কাগজকুড়ানিদের দ্বারা বেশ কয়েকবার হাত বদল হয়ে আমার ঠাঁই হলো আবার সেই রাধাবাজার স্ট্রীটের ঘড়ি-বাজারের এক দোকানে। ডায়ালের উপর থেকে খুঁটে-খুঁটে সোনার নম্বরগুলো উৎখাত করে, সেখানে নকল সোনালী ধাতব পাত বসানো হলো। আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বদল করা হলো। আমার স্থান হলো রাধাবাজারের ঘড়ির দোকানের এক ধুলো পড়া কাচ দিয়ে ঢাকা এক ঘড়ির বাক্সের মধ্যে। বুঝতে পারলাম, এখন খুবই সস্তার জিনিস হয়ে গিয়েছি আমি।

   লোকে বলবে, যেমন কর্ম তেমন ফল। আচ্ছা, একটা কথা আপনারা সবাই নিশ্চয়ই মানবেন ; একটা বুক-পকেটের ঘড়ি এই সমাজের মানুষকে আভিজাত্য, সময়ানুবর্তীতা আর শৃঙ্খলাবোধ ছাড়া আর কিই বা দিতে পারে ! আমি প্রথম থেকে এইগুলোই তো দিয়ে গিয়েছি সকলকে। তবুও কেন এমন করুণ পরিণতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে আমাকে ! তবে এই অস্তিত্বসঙ্কট শুধু আমার একার নয়, নামী-দামী মানুষজন-সহ সমগ্র সমাজের ! মানুষজনের লোভের মাত্রা দিনের পর দিন এতই বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে যে, দ্রুত উপরে ওঠার তাগিদে, প্রত্যেকটা মানুষ তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস, বংশগরিমা, আভিজাত্য, সততা, সময়ানুবর্তীতা, শৃঙ্খলাবোধ সবকিছু বিসর্জন দিয়ে, সবকিছু বিস্মৃত হয়ে, যান্ত্রিক এক শ্রীবৃদ্ধির খোঁজে সদাই মশগুল !

♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!