- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- মে ২৪, ২০২৬
আক্ষেপ
চিত্রকর্ম : গোলাম রসুল সন্তোষ
‘ফকির… ফকির…’
অন্ধকার রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফকিরের উদ্দেশ্যে হাঁক পাড়ে গৌর মোদক।
দোকান ঘরের ভিতর থেকে নিচু গলায় সাড়া দেয় ফকির।
‘বলছি মোষের মত সারা রাত ঘুম মারবি না। শোন, বাড়তি পঞ্চাশ টাকা দিচ্ছি, রাতের খাবার দিচ্ছি, সে সব এমনি এমনি নয়। জেগে থাকবি রাতে। আমি দেখতে আসবো, বলে দিলাম।’
কথাগুলো বলে হাওয়াই চটির চটর পটর শব্দ তুলে বাড়ির দিকে হাঁটা দেয় গৌর। রাত শেষের প্রতীক্ষায় দোকান ঘরের ভিতরে বসে থাকে ফকির।
দোকানে পাহারা দেওয়া নিয়ে আজ সকাল থেকে গৌর মোদকের সঙ্গে খিটিমিটি বেঁধেছে ফকিরের, সন্ধ্যা বেলায় ঝামেলা চরমে ওঠে।
আজ সন্ধ্যাবেলায় দোকানের ভিতরে বেশ ভির, খরিদ্দারদের মধ্যে ঠেলাঠেলি, উল্টে যায় সর্ষের তেলের টিন। দোষ হয় ফকিরের। সবার সামনে ফকিরকে জুতো পেটা করতে যায় গৌর। বলে, ‘হাজার টাকার লোকসান, তোর বাপ দেবে টাকা শোওর?’
গৌরের কথা হজম করে নিজের মেজাজে বাঁধ দেয় ফকির। তারপর রাত শেষ হবার অপেক্ষায় থেকেছে, ভোরের আলোয় ফোটার …।
আজ সকালের ঘটনা।
রোজ দিনের মত দোকান ঘর খুলে মালপত্র গোছগাছ করছিল ফকির। গৌর এসে বলে, ‘হরি হারামজাদা জবাব দিয়েছে, রাতে দোকান পাহারা দেবে না। আজ থেকে তুই থাকবি ফকির, মাইনে পঞ্চাশ টাকা বেশি পাবি।’
গৌর মোদকের দোকান মালপত্রে ঠাসা। রাত বিরেতে চুরি হওয়ার ভয় থাকে। তাই পাহারা দেবার প্রয়োজন পড়ে। এতদিন বাগদি পাড়ার হরি রাতের বেলায় দোকান পাহারা দিত। মাসের শেষে তিনশ টাকা দিত গৌর। টাকা না বাড়ালে কাজ করবে না হরি, বলছে কয় মাস আগে থেকে। গৌর একটাকা বেশি দেবে না। না পোষালে ছেড়ে দে কাজ, শুনিয়ে দিয়েছে গৌর। কাজে আসবে না হরি। সকাল থেকেই মাথা গরম গৌরের। ফকিরকে জোর করে, তুই পাহারা দিবি পঞ্চাশ টাকা বেশি দেব। সে কাজে নারাজ ফকির। সারা দিনের হাড় ভাঙা খাটুনি। একা হাতে দেশ দুনিয়ার সব খরিদ্দার সামলাতে হয় ফকিরকে। তারপরে গৌর মোদকের বাড়ির ফাই-ফরমাস আছে। সামান্য কয়েক শ টাকার মাস মাইনে দিয়ে হাজার কাজ করিয়ে নেয় গৌর। দুপুরের খাওয়ার সময় সামান্য বিশ্রাম পায় ফকির। রাতের বেলায় হাত পা মেলে না ঘুমালে শরীর চলে না।
ফকির বলে, ‘রেতে দোকানে থাকবো নে।’
‘কেন? রাতে দোকানে থাকতে তোর কি অসুবিধা শুনি?’ গলা চড়িয়ে বলে গৌর।
দোকান ঘরের ভিতরে হওয়া বাতাস নেই, ভ্যাপসা গরম। ইঁদুর ছুঁচোর উপদ্রব। মাইনে বেশি দিলেও দোকানে শোবে না ফকির। শুনিয়ে দেয় গৌরকে।
দাঁত খিঁচিয়ে গৌর বলে, ‘ওহ বাগদি ঘরের জমিদার পুত্তুর এসেছে। দোকান ঘরে গরম! আর তোমার তালপাতার ভাঙ্গা ঘরে দখিনা বাতাস দেয়! কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিলে খাবি কি রে শোওর? রাতে দোকানেই থাকবি, এই বলে দিলাম।’
গৌরের কথা অসহ্য লাগে ফকিরের। বলে, ‘কাজে রাখবে নে তাই সই। রোজ রোজ বাখান করবে নে বলে দিলেম। আজ থেকে কাজে জবাব দিলেম আমি।’
‘জবাব বললেই জবাব ! জুতিয়ে পিঠের ছাল তুলে নেবো তোর। একটাও কথা বলবি না।’
দামাল রাগ মুহূর্তে ঝেঁপে আসে ফকিরের মনে। মনে হয় দোকান পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। এতদিন মুখ বুজে সব সহ্য করে এসেছে ফকির। আজ থেকে কাজের ভার আরো ভারী হতে চলেছে। গৌর যা বলবে তাই করতে হবে ফকিরকে! নিজের পছন্দ অপছন্দের মূল্য নেই? দিন এখানে দুর্বিসহ হয়ে উঠছে দিনে দিনে। শ্রম দিয়ে তার মূল্য নেই। পালাতেই হবে গৌরের জাল কেটে।
এই মুহূর্তে মনে তুমুল রাগ এলেও সংযত রাখে নিজেকে। গৌরের সঙ্গে এখন আর দপদপিয়ে লাভ নেই। হিতে বিপরীত হবে। এখুনি দু-কথা শুনিয়ে দিতেই পারে ফকির, ফল মন্দ হবে তাতে। কাজে জবাব দিয়ে বাড়ি যাবে আর ময়না ছেলের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আবার ঠেলে পাঠাবে এখানেই। মায়ের কান্না শুনে ফকিরের মনটাও কেমন ভারী হয়। তাই মুখ বুজে গৌরের কথার ঝাল কানে নেয়। এমন ঘটনা আগেও বেশ কয়বার ঘটেছে। তবে আজ হাজার রাগ হলেও চুপ থাকবে ফকির। গৌর, ময়না কাউকে কিছু জানতেই দেবে না। রাত ফুরালে ভেগে যাবে, সোজা সিউড়ি, ছকুদার কাছে।
মন আনন্দে থৈ থৈ, সে রাতে ঘরের নিটুট আঁধারে এক অন্য জীবনের স্বপ্ন দেখে ফকির। ট্যুর কোম্পানির বাসে কাজ পেয়েছে সে। গ্রাম, শহর, জনপদ পিছনে ফেলে হুহু করে ছুটে চলেছে বাস। হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে যায় । ক্ষণিকের স্বপ্ন খুশির দোলা দিয়ে যায় ফকিরের মনে
ভিতরে ভিতরে একটা আপসোস ঘোরাফেরা করে। ময়নার জন্যই কাজের সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে ফকিরের। নয়তো ছকুর সঙ্গে কবেই সিউড়ি চলে যেত। ময়নাই যেতে দেয়নি, কেঁদে কেটে হাত পা বেঁধে রেখেছে ফকিরের।
রোজ রোজ গৌরের দুর্ব্যবহারের কথা ময়নাকে বলে ফকির, রাতের বেলায়। ময়না একই কথা শোনায় রোজ, ‘গোর মোদক মালিক। মোদের ভাত দেছে। এট্টু মিজাজ দেখায় দেখাক না। তুই মিজাজ খাটো রাখিস বাপ। কাজ গেলে খাবো কি বল?’
ফকির ময়নাকে বলে, ‘ছকুদা বলেছে সিউড়ি গেলে বাসে কাজ মিলবে।’
ফকিরের কথা শুনে আঁতকে ওঠে ময়না। বলে, ‘এই সব্বনেশে কথা মুখেও আনবি নে ফকির। আমার দিব্যি। তোর বাপ…।’
কাজের খোঁজে বাইরে গিয়ে আর ঘর ফেরেনি ফকিরের বাপ।
সে বছর ষোলো সতেরো আগের কথা, ফকির তখন কচি বাচ্চা। কাজের আশায় গ্রাম ছেড়েছে ময়নার মরদ। ফেরেনি আর। সে যে কি দুর্দিন গেছে! তারপর থেকে ফকিরের মুখ চেয়েই বেঁচে রয়েছে ময়না। সময়ের সঙ্গে স্বামী ফিরে না আসবার যন্ত্রণা ফিকে হয়ে এসেছে। ইদানিং মাঝে মধ্যে ফকির বাইরে কাজে যাবার কথা বলে ময়নাকে। আর স্তিমিত যন্ত্রণা মাথা তুলে ফোঁস করে আবার, ভয়ে দুরদুর করে ওঠে ময়নার বুক। নিজের ভীষণ ভয়ের কথা ফকিরকে শোনায়। মায়ের কান্না দেখে ভিতর থেকে গুটিয়ে যায় ফকির। বাইরে কাজে যাবার ইচ্ছেটা মিইয়ে আসে।
ময়নার ভয়ের কথা ছকুকে একবার বলেছিল ফকির। ছকু বলে, কিসের ভয়? কত লোক বাইরে কাজে যায় ফকির। দেশ ছেড়ে বিদেশও যায়। সবাই কি হারিয়ে যাচ্ছে? জীবনে কত কিই তো ঘটতে পারে, তার জন্য কি ঘরে বসে থাকলে চলে! ফকির, হাভাতে মানুষের ভয় থাকলে চলে না। আমাদের মালিক বলে সংগ্রাম ঘরে বসে হয় না। মনে রাখিস রাস্তায় না নামলে রাস্তা চেনা যায় না।
ছকুর সব কথার মানে বোঝে না ফকির তবে একটা মশাল দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে ফকিরের বুকের মধ্যে। ইচ্ছে যায় এই মুহূর্তে বাইরের পৃথিবীতে পা রাখতে। কাজ করবে ফকির, শ্রমের সম্মান পাবে। কারো কথার ঝাল সইতে হবে না।
‘আমি কাজ করবো ছকুদা। কাজ জুটিয়ে দাও আমাকে।’ ছকুকে সেদিন বলেছিল ফকির।
ছকু বলে, ‘চেষ্টা করব নিশ্চয়।’
গেলো সপ্তাহে গ্রামে এসেছিল ছকু। ফকিরকে বলেছিল,’চল ফকির, সিউড়ি স্টেশন বাজারে আমার সঙ্গে কয়টা দিন থাকবি। সামনের এগারোই কার্তিক আমাদের ট্যুর কোম্পানির বাস পুরী যাবে। তোর কথা আমি বলেছি, মালিক বলেছে ব্যবস্থা একটা হবে।’
ছকুকে আনন্দে জড়িয়ে ধরেছিল ফকির। ‘যাবো, যাবো ছকুদা।’
মন আনন্দে থৈ থৈ, সে রাতে ঘরের নিটুট আঁধারে এক অন্য জীবনের স্বপ্ন দেখে ফকির। ট্যুর কোম্পানির বাসে কাজ পেয়েছে ফকির। গ্রাম, শহর, জনপদ পিছনে ফেলে হুহু করে ছুটে চলেছে বাস। হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে যায় ফকিরের। ক্ষণিকের স্বপ্ন খুশির দোলা দিয়ে যায় ফকিরের মনে। হেসে ওঠে ফকির। ময়নার ঘুমে ফাটল ধরে।
‘ফকিররে হাসিস যে বড়ো?’
‘হাসির কথা যে।’
‘কেমন? কেমন? বল এট্টু শুনি।’
‘ …বাসে কাজ করে আনন্দ।’
‘মানে? কেমন ? বল এট্টু।’
ছকুর কথা বলে ময়নাকে। কার্তিকের এগারো তারিখে বাস ছাড়বে। পুরী যাবে ফকির।
ছেলের কথা শুনে ধরফরিয়ে উঠে বসে ময়না। ফকিরকে টেনে নেয় বুকে। বলে, ‘ফকিররে কোটি মানুষের ভিড়ে তুই হারিয়ে যাবি ফকির।’ নিজের উপলব্ধ যন্ত্রণার কথা বলে ময়না।
ফকির বলে, ‘ভয় পাসনে তুই। কত জন কাজের নেগে বাইরে যায়, সবাই কি হারিয়ে যেচে।’
ময়না, বলে ‘বাইরে যে যেচে সে যেচে। তোকে কিছুতেই ছাড়বো নে।’
মায়ের কথা পরদিন ছকুকে বলে ফকির। ছকু শুনে বলে ঘর ছাড়তে দম লাগে ফকির। ভীতু মানুষের হাজার পিছুটান থাকে। হিম্মত রাখ নিজের উপর। নয়ত গৌর মোদকের লাল চোখ দেখে জীবন কাটবে। এই ফাঁদ কেটে বেরিয়ে আয় ফকির।
ঠিক কথা বলেছিল ছকুদা। গৌর মোদকের হাত থেকে নিস্তার চায় ফকির। চলেই যাবে সিউড়ি। আজ কার্তিকের দশ তারিখ। কাল ভোরের ট্রেন ধরলে ঠিক সময়ে সিউড়ি পৌছে যাবে। মনের কথা আড়ালে রাখতে হবে, ময়নাকে টের পেতে দিলে চলবে না কিছুতেই।
‘মনে মনে কোন কু মতলব ভাবছিস আবার? খরিদ্দার দাঁড়িয়ে রয়েছে, দেখ চেয়ে…’ গলা তোলে গৌর।
আনমনে অনেক কথা ভাবছিল ফকির। গৌরের গলা কানে আসতে সম্বিত ফেরে। খরিদ্দার ছাড়তে থাকে ফকির। তবে ভাবনায় চলে অন্য কথা। কাউকে কিছু না জানিয়ে ফকির সিউড়ি যাবে কাল। অন্য ভাবনাও হাজির হয় মনে। যদি সঠিক ট্রেনে উঠতে না পারে, তাহলে? আগে কখনো ট্রেনে চড়ে যায়নি কোথাও। যদি ভুল করে অন্য ট্রেনে চেপে পড়ে! তাছাড়া ফকির চলে গেলে ময়নারই বা কি হবে? ভিতরে ভিতরে ফকিরের মন দু-টুকরো হয়ে রশি টানাটানি করে। শেষে ভাবে আর কয়টা দিন মুখ বুজে কাটিয়ে দেবে এখানেই। পরে ছকুদার কাছ থেকে সবটা শুনে, সময় সুযোগ বুঝে গ্রাম ছাড়বে। আবার পরক্ষণেই নিজেকে ভীতু মনে হয় ফকিরের। কি যে দোটানা চলে!
এক অদ্ভুত দোলাচাল চলতে থাকে মনে। দুপুর বেলায় বাড়ি আসে ফকির। মনের ভাব গতিক আড়াল করে থাকে। বুঝতে দিতে চায় না ময়নাকে।
ভাত খেয়ে বাজারের দিকে পা ফেলে ফকির। হরি পাহারা দেবার কাজ ছেড়ে দিয়েছে সে কথা ময়নাকে বলে। আমাকে পঞ্চাশ টেকা মাইনে বেশি দেবে, রেতে গোরের দোকানে পাহারায় থাকবো। ভালোই হলো, কয়টা টাকা বেশি পাবো। তুই সাবধানে থাকিস। মাকে বলে চলে যায় ফকির। মনে মনে খুশিই হয় ময়না ফকিরের কথা শুনে।
সন্ধ্যা বেলায় গোল বাঁধে দোকানে। অনেক লোকজনের সামনে ভীষন বেইজ্জত হয় ফকির। তেলের টিন উল্টে যায় আর জুতো হাতে নিয়ে তেড়ে আসে গৌর মোদক। তখনও মনের তীব্র আঁচ বাইরে আসতে দেয় না ফকির। বরং মনের সমস্ত সংশয় ঝেড়ে ফেলে সিউড়ি চলে যাবার সিদ্ধান্ত পাকা করে ফেলে।
রাত্রি নেমেছে গ্রামে। বাজারের সব দোকান পাট বন্ধ হয়েছে। দোকানের ভিতরের দাঁড়িয়ে ফকির। কি ভাবে ছকুদার কাছে পৌঁছানো যাবে সে সব বৃত্তান্ত ছকুর বাবার কাছে গিয়ে শুনে এসেছে ফকির। সময় সময় সিউড়ি পৌঁছাতে গেলে ভোর রাতের ট্রেন ধরতেই হবে ফকিরকে। রাত শেষ প্রহরে পা রাখলেই রওনা দেবে স্টেশনের উদ্দেশ্য।
সারাদিনের পরিশ্রম। শরীর টেনে এসেছে এইবার। খোলের বস্তার গায়ে গা এলিয়ে বসে ফকির। হাজার ভাবনা মাথায় আসে। ময়নার কথা ভাবে। এইসময় দেখা করলে আবারও গ্রামে আটকা পড়বে ফকির। থাক। এখন মায়ের সঙ্গে দেখা করবার প্রয়োজন নেই। কাজ পাকা হলে ফকির ফিরে আসবে। নিয়ে যাবে ময়নাকে। ফকির ছাড়া তার আর কেই বা আছে! ভাবনার তালে তালে কখন দু চোখ লেগে এসেছিল খেয়াল করেনি ফকির। হঠাৎ করেই দোকান ঘরের পিছন দরজায় টোকা পড়ে। চমকে ওঠে, ঘুম ছুটে যায়, সজাগ হয় ফকির।
কে? ভিতর থেকে সাড়া নিতে চায় ফকির।
করো কোনো সাড়া শব্দ নেই। কান খাঁড়া করে দাঁড়িয়ে থাকে ফকির। মৃদু পদশব্দ মিলিয়ে যায় দ্রুত। গৌর মোদক এসেছিল হয়তো, ফকির জেগে পাহারা দিচ্ছে কি না পরখ করতে। আর চোখ বন্ধ রাখলে চলবে না। টুলের উপর বসে ফকির। রাত এগিয়ে চলে।
রাস্তায় লোক নেমেছে। কথাবার্তা কানে আসে। সবজি নিয়ে চাষীদের হাটে যাওয়া শুরু হয়েছে। রাত প্রায় শেষ ভাগে পা রেখেছে। পিছন দিকের ছোটো দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ায় ফকির। আকাশের দিকে তাকায়। আঁধার পাতলা হয়ে এসেছে। এইবার রওনা না দিলে ট্রেন পাবে না। পিছনের দরজাটা আলগা করে বন্ধ রাখে। এ সময় চুরি হবার সম্ভাবনা নেই। খানিক পরেই হাজির হবে গৌর।
কার্তিক মাস। ভোরের বাতাসে ঠাণ্ডার আলতো কামড়। আল পথে হাঁটা লাগায় ফকির। দ্রুত পায়ে পথ শেষ করে । স্টেশনে এসে ট্রেনটা পেয়ে যায় কোনোক্রমে। ভাগ্যিস দরজার টোকায় ঘুম ভেঙে ছিলো, নয়তো এই ট্রেন আজ পাওয়া হতো না ফকিরের।
ফকির চলে গেছে। দুর থেকে ছেলেকে ট্রেনে উঠতে দেখেছে ময়না। বাধা দেয়নি। ছেলের গ্রাম ছাড়বার দুর্নিবার ইচ্ছের সামনে আর পাথর খাঁড়া করতে চায়নি ময়না। বাঁচার আনন্দ নিয়েই বেঁচে থাক ফকির।
এতকাল গৌরের সঙ্গে কখন কি হয়েছে, গৌর কি কি বলেছে, ফকিরই বা কি বলতে চেয়ে ময়নার কথা ভেবে বলেনি, সারাদিনের সব সব কথা ময়নাকে রাতের বেলায় শুনিয়েছে ফকির। আর রোজ রোজ ছেলেকে শান্ত করেছে ময়না, নিজের যন্ত্রণার কথা বলে।
গতকাল সকাল থেকে এতো কিছু ঘটেছে, সে সব বিষয়ে ময়নাকে আড়ালে রেখেছে ফকির! ছকুর বাবার মুখে সব কথা শুনে বুঝেছে ময়না এরপর আর বেঁধে রাখা চলে না ফকিরকে।
সারারাত নির্ঘুম রাত কাটিয়ে ছেলেকে একবার দেখতে চেয়ে মন কেঁদেছে ময়নার, তাই ফকিরের আগেই স্টেশনে পৌঁছেছিল।
গ্রাম থেকে স্টেশন যাবার পথে গৌর মোদকের দোকানের দরজায় টোকা দিয়েছিল ময়না নিজে। ক্লান্তি ভারে ফকির ঘুমিয়ে পড়লে সময়ে সিউড়ি পৌঁছান হবে না, তাই। শুধু এই কথাটা ফকিরকে বলবে বলে ছেলের সামনে আজ একটিবার দাঁড়াতে চেয়েছিল ময়না। ফকির রে, তোরে আমি আটকাতে চাই নে। যা, যেখানে ইচ্ছে যা। শুধু মনে রাখিস বাপ ময়না তোর নেগে বসে থাকবে পথ চেয়ে। ছেলের হাত ধরে বলবে বলে ভেবেছিল ময়না। শেষমেষ সে কথা আর বলা হয়নি। মরদের ঘর ছড়ার যন্ত্রণা মনে করে আবার যদি ছেলের পায়ে বেড়ি পড়িয়ে দেয় অবাধ্য অভ্যাস বশে! তাই ফকিরের সামনে আসেনি ময়না। ট্রেন চলে গেছে সিউড়ির দিকে। এক অন্য জীবনের স্বাদ পাবে ছেলে। নিজের মত বাঁচবে ফকির। দুই চোখে জল আসে ময়নার।
মরদটা গেছে, ফেরেনি। হয়তো ফিরবে না আর কোনোদিন। ফকির কি ফিরবে আর ? ছেলের হাত ধরে ময়না যদি একবার বলতে পারতো ফকিররে আবার ফিরে আসিস বাপ তাহলে শান্তি পেত ময়না। এখন সে উপায় নেই আর। এক জমাট আক্ষেপ বুকে নিয়ে গ্রামের পথে পা এগিয়ে চলে ময়না।
♦—♦•♦—♦♦—♦•♦—♦
❤ Support Us







