Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • অক্টোবর ১১, ২০২৬

রাজা কোথায় থাকেন ?

অয়ন মুখোপাধ্যায়
রাজা কোথায় থাকেন ?

গঙ্গার জল সেদিন অস্বাভাবিক শান্ত। শীত পড়তে তখনো দেরি । দুপুরের রোদ নদীর গায়ে পড়ে এমন সাদা আলো তুলেছিল, মনে হচ্ছিল কেউ একটা বিশাল পিতলের থালাকে ঘষে মেলে রেখে দিয়েছে । নৌকার ছইয়ের নিচে বসে বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কার মাঝেমধ্যে নদীর দিকে তাকাচ্ছিলেন, আবার চোখ নামিয়ে নিজের হাঁটুর উপর রাখা পুঁটলিটার দিকে তাকাচ্ছিলেন ।

ওপারের এক জমিদারবাড়িতে নিমন্ত্রণ । বাণেশ্বর পুঁটলির মধ্যে একখানা ধূতি, তুলট কাগজ, দোয়াত, কলম আর ছোটো একটা সংস্কৃত পুঁথি রেখে দিয়েছেন । এই সামান্য কয়েকটি জিনিস নিয়েই তিনি বহু পথ চলেছেন। কৃষ্ণনগর । বর্ধমান । কলকাতা । পুরী । কখনো রাজা বদলেছে, কোথাও আবার রাজসভা বদলেছে, তখন আবার বদলে গেছে মানুষের সমীহ, কিন্তু তাঁর আসল সম্বল বদলায়নি – শব্দ ।

বাণেশ্বর বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীতে মানুষের শেষ আশ্রয় শব্দের কাছেই । তরোয়াল মানুষের গলা কাটতে পারে, কিন্তু ঠিক সময়ে একটি ঠিক বাক্য বলতে পারলে তরোয়ালও থমকে দাঁড়ায় । এমনকি বাণেশ্বর একবার কথার জোরে তরোয়ালও নামিয়েছিলেন ।

ঘটনা অনেকদিন আগের । একবার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজপ্রাসাদ থেকে কালীর সোনার মুকুট চুরি গেল । সন্দেহ পড়ল হর নামের ব্রাহ্মণের উপর । সৈন্যরা লোকটাকে ধরে রাজসভায় আনল । হর থরথর করে কাঁপছিল । মৃত্যুভয় মানুষের শরীরকে যে কত দ্রুত ছোটো করে দেয়, সেটা সেদিন বাণেশ্বর প্রথম দেখেছিলেন ।

সেদিন বুদ্ধি করে বাণেশ্বর একটি শ্লোক বলেছিলেন —

‘ জলে লবণবল্লীনং মানসং তম্মনোহরম্।
মনোজিহীর্ষয়া দেব্যাঃ কিরীটং হুরতে হরঃ ।। ’

শব্দের সামান্য খেলায় মানুষের ‘হর’ হয়ে গেলেন মহাদেব ‘হর’। বাণেশ্বর বলেছিলেন, দেবীর মন মুকুটে আটকে ছিল, তাই দেবীর মন চুরি করার জন্য শিব মুকুটটাকেই নিয়ে গেছেন । বাণেশ্বরের এ কথা শোনার পর তিনি দেখেছিলেন কৃষ্ণচন্দ্রের চোখে জল । মানুষটি প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল । সেদিন থেকে বাণেশ্বরের মনে একটা গোপন অহংকার জন্মেছিল ।

ঠিক সেই সময় ঘাটের দিক থেকে একটা চিৎকার এল – নৌকা ফেরাও !
মাঝি শুনেও দাঁড় থামাল না। আবার ডাক এল ।

— ও মাঝি ! কানে যায় না ? নবাবের পেয়াদা বলছি। নৌকা ফেরাও !

দাঁড়টা আচমকা থেমে গেল । বাণেশ্বর মুখ তুললেন । দেখলেন, দূরের ঘাটে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে । গায়ে গাঢ় লাল পোশাক । মাথায় পাগড়ি । মুখে ঘন দাড়ি । কোমরে চওড়া বেল্ট । মাঝি সঙ্গে সঙ্গে নৌকা ঘোরাতে শুরু করল ।

বাণেশ্বর বললেন – ফিরছ কেন ?

মাঝি বিস্মিত হয়ে তাঁর দিকে তাকাল ।

– নবাবের পেয়াদা ডাকছে, ঠাকুরমশাই।

– তাতে কী ?

মাঝি আর উত্তর দিল না । তার মুখটাই তখন উত্তর ।

বাণেশ্বর আবার ঘাটের দিকে তাকালেন । অদ্ভুত ব্যাপার, এতক্ষণ নদীর উপর যে রোদ ছিল, সে রোদ হঠাৎ ম্লান হয়ে গেছে । তিনি নিজের মনকে ধমক দিলেন । ভয় পাচ্ছি কেন ? আমি কি চোর ? রাজদ্রোহ করেছি ? না কি আমার খাজনা বাকি ? তা-ও তো নয় । তবু বুকের মাঝে ছোট্ট একটা অস্বস্তি যেন হঠাৎ এসে বসল । বাণেশ্বর বুঝলেন, যুক্তি আর ভয় একই পথে হাঁটে না ।

নৌকা যত ঘাটের কাছে আসে, লাল জামাটা তত বড়ো বলে মনে হয়। লোকটা কি আস্তে আস্তে বাণেশ্বরের চোখে বড়ো হয়ে উঠছে? বাণেশ্বর মনে মনে ভাবতে লাগলেন, ক্ষমতার পোশাক কি দূর থেকেই মানুষকে বড়ো দেখায়? এই প্রশ্নটা তাঁর মাথায় এল, কিন্তু উত্তর এল না ।

নৌকা ঘাটে ঠেকতেই লোকটি উঠে পড়ল। মাঝি মাথা নিচু করল। বাণেশ্বর সোজা হয়ে বসলেন । লোকটা তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল । কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল । তারপর আচমকা ঝুঁকে পড়ে তাঁর পা ছুঁয়ে প্রণাম করল ।

– দাদা ।

বাণেশ্বর প্রথমে শব্দটা বুঝতেই পারলেন না ।

— কী ?

লোকটি মুখ তুলে হাসল ।

— চিনতে পারছ না ?

বাণেশ্বর তাকিয়ে রইলেন। দাড়ির ফাঁকে ঠোঁটের বাঁকটা বহুদিনের পরিচিত । চোখ দুটোও ।

— রামকান্ত !

লোকটা হেসে উঠল ।

— অবশেষে চিনলে !

বাণেশ্বরের শরীরে যতটা রক্ত শুকিয়ে গিয়েছিল, সব যেন একসঙ্গে ফিরে এল। সঙ্গে সঙ্গে রাগও এল ।
— এই পোশাক পরে এসেছিস কেন ?

রামকান্ত মুখটা গম্ভীর করল ।

— সরকারি কাজ ।

— কীসের সরকারি কাজ ?

সে কোমর থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বার করে বাণেশ্বরকে দেখাল।

— নবাবের হুকুম এনেছি।

এবার বাণেশ্বরের মুখটা আবার শক্ত হলো। মনে পড়ে গেল কয়েক মাস আগের একটা দুপুরের কথা। তাঁর ভাই রামকান্ত তাঁকে বলেছিল,

— দাদা, বিষয় ভাগ করে দাও।

বাণেশ্বর অবাক হয়েছিলেন।

— কোন বিষয়?

— যা কিছু আছে।

— এসব তো আমার উপার্জন।

রামকান্ত বলেছিল — তুমি উপার্জন করেছ, ঠিক। কিন্তু আমরা এক সংসারে আছি।

বাণেশ্বর তর্ক তুলেছিলেন। শাস্ত্রের কথা বলেছিলেন। স্বোপার্জিত সম্পত্তির অধিকার বোঝাতে চেয়েছিলেন। রামকান্ত শাস্ত্র জানত না। সে শুধু বলেছিল — তুমি যা বলছ, সেটা তোমার পক্ষে খুব সুবিধার শাস্ত্র।

বাণেশ্বর রেগে গিয়েছিলেন। শেষে বাড়ির পিছনের খড়ের ছাউনি দেওয়া পুরনো কুটির দেখিয়ে বলেছিলেন — পৈতৃক সম্পত্তি বলতে ওটাই । অর্ধেক নে ।
রামকান্ত সেদিন আর তর্ক করেনি। দরজার কাছে গিয়ে শুধু বলেছিল — তাহলে অন্য দরজায় বিচার চাইব।
বাণেশ্বর ভেবেছিলেন, রাগের কথা । আজ তিনি বুঝলেন, ভাই কথাটা সত্যি সত্যিই বলেছিল ।

— কোথায় গিয়েছিলি? তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

— মুর্শিদাবাদ।

— নবাবের কাছে ?

— হ্যাঁ।

— আমার নামে অভিযোগ করেছিস?

— করেছি।

বাণেশ্বর কাগজটার দিকে তাকালেন। রামকান্ত এবার হাসল না । বলল — দাদা, একটা কথা বলি ? তুমি রাজসভায় কত মানুষের বিচার নিয়ে কথা বলো । এমনকি হরের প্রাণও বাঁচালে । কৃষ্ণচন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে তুমি কথা বলে মানুষকে ন্যায্য বিচার পাইয়ে দাও । অথচ নিজের ঘরে এসে তুমি অন্য মানুষ ।
বাণেশ্বর চুপ করে গেলেন । কথাটা তাঁর পছন্দ হলো না । কিন্তু বাণেশ্বর নিজের মনকেই প্রশ্ন করলেন, রামকান্ত যা বলল, তার সবটাই কি মিথ্যে ?
রামকান্ত বলে চলল — নবাব বলেছেন, তুমি আমাকে অর্ধেক সম্পত্তি দেবে।

— আর এই সাজ ?
এবার রামকান্ত হেসে ফেলল।

— আমাকে পাঠানোর সময় কোনো পেয়াদা কাছে ছিল না। তাই বললেন, পোশাক পরে হুকুমটা পৌঁছে দাও।
বাণেশ্বর কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন — আগে জামাটা খোল।

— কেন ?
— খোল।
— ভয় করছে ?

বাণেশ্বর ধমকে উঠলেন— রামকান্ত!

মাঝি মুখ নামিয়ে ফেলল। রামকান্ত নবাবি পোশাক খুলল। পাগড়ি নামাল। আর তখনই আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। যে মানুষটিকে কয়েক মুহূর্ত আগে বাণেশ্বর ভয় পাচ্ছিলেন, সে হঠাৎ তাঁর ছোটো ভাই হয়ে গেল। একই মুখ, একই শরীর। রামকান্তের গায়ে তখন আর নবাবি পোশাক নেই।
বাণেশ্বরের মনে হলো, ভয়েরও কি তবে একটা পোশাক থাকে ? বাণেশ্বর ভাবলেন, মানুষ মানুষকে যতটা ভয় পায়, তার চেয়ে বেশি কি সে পদ, চিহ্ন, রাজমোহর, উর্দি—এসবকে ভয় পায় ?

তিনি কাগজটা হাতে নিলেন। মন দিয়ে পড়লেন। তারপর পুঁটলি খুলে তুলট কাগজ বার করলেন। দোয়াতে কলম ডুবিয়ে লিখতে শুরু করলেন।
রামকান্ত অবাক হয়ে বলল — এখনই ?
— হ্যাঁ।
— নিমন্ত্রণে যাবে না ?
— যাব।
— তাহলে ফিরে গিয়ে লিখতে পারতে।
বাণেশ্বর মাথা না তুলেই বললেন — কিছু বিচার দেরি করলে অন্যায়টা বড়ো হয়ে যায়।
রামকান্ত আর কথা বলল না।
গঙ্গার হাওয়া কাগজের কোণটা নাড়ছিল। বাণেশ্বর কাগজে হাত চেপে লিখলেন। বাড়ি, জমি, ধান, আয় — অর্ধেক। শেষে সই করে কাগজটা ভাইয়ের হাতে দিলেন।
— নে।
রামকান্ত পড়ে বলল — আমার উপর রাগ করেছ ?
— করেছি।
— তবু অর্ধেক দিলে ?
বাণেশ্বর নদীর দিকে তাকালেন।
— রাগ আর ন্যায় এক জিনিস নয়।
রামকান্ত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল । তারপর বলল — তুমি আজ একটা জিনিস শিখলে, দাদা।
বাণেশ্বর ভুরু তুললেন।
— আমি ?
— হ্যাঁ।
— কী শিখলাম ?
— শাস্ত্র না পড়েও মানুষ মাঝে মাঝে পণ্ডিতকে পড়াতে পারে।
বাণেশ্বর হেসে ফেললেন। নৌকা আবার ওপারের দিকে চলতে শুরু করল।
কিছু দূর যাওয়ার পর ত্রিবেণীর পুরনো এক দিনের কথা তাঁর মনে পড়ল। সেদিন কৃষ্ণচন্দ্র জিজ্ঞেস করেছিলেন – এখানে ভাগীরথী এত ধীরে চলে কেন ?
বাণেশ্বর সঙ্গে সঙ্গে শ্লোক বলেছিলেন —

‘ সগরসন্ততিসন্তরণেচ্ছয়া প্রচলিতাতিযবেন হিমালয়াৎ।
ইহ মন্দমুপৈতি সরস্বতী যমুনয়োর্ব্বিরহাদিব জাহ্নবী।।’

সরস্বতী আর যমুনা দুই সখী বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, তাই জাহ্নবী বিরহে ধীরে চলছেন। কৃষ্ণচন্দ্র মুগ্ধ হয়েছিলেন। আজ বাণেশ্বর সেই একই নদীর দিকে তাকিয়ে ভাবলেন, নদীর গতি বোঝানো সহজ, মানুষের গতি বোঝানো কঠিন। মানুষ কখন রাজদরবার ছেড়ে যায়, কখন আবার ফিরে আসে, কখন ভাইকে বঞ্চিত করে, কখন অপরিচিতের প্রাণ বাঁচায় — তার কোনো সরল ব্যাকরণ নেই।

তিনি নিজেই তো কৃষ্ণচন্দ্রের সভা ছেড়েছিলেন অপমান সইতে না পেরে । শোভাবাজারের বসাকদের বাড়ির শ্রাদ্ধসভায় গিয়েছিলেন বলে কৃষ্ণচন্দ্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন । বাণেশ্বর খবর পেয়ে একদিনও থাকেননি। সোজা বর্ধমান চলে গিয়েছিলেন । চিত্রসেন তাঁকে প্রধান আসন দিয়েছিলেন । তবু আবার একদিন তিনি কৃষ্ণনগরে ফিরেছিলেন । কেন ? সম্মান ? স্নেহ ? অভ্যাস ? না কি মানুষ যেখানে আহত হয়, শেষ পর্যন্ত সেই জায়গাতেই ফিরে গিয়ে নিজের ক্ষতটা কত বড়ো, সেটাই কি একবার দেখে আসতে চায় ? উত্তর তিনি জানতেন না ।
রামকান্ত পাশে বসে বলল – দাদা, একটা কথা বলব ?

– আবার কী ?

– রাজসভায় আজকের গল্পটা বললে কেমন হয় ?
বাণেশ্বর সোজা হয়ে বসলেন ।

– খবরদার !

– কেন ? মহারাজ তো খুব হাসবেন।

– রামকান্ত !

– ব লব, যিনি বলরামের রথ থেকে পড়ে যাওয়া দেখে সঙ্গে সঙ্গে শ্লোক বানান, তিনি একটা লাল জামা দেখে নিজের ভাইকে চিনতে পারেননি।
মাঝি এবার আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। বাণেশ্বর প্রথমে রেগে গেলেন। তারপর তিনিও হাসলেন। হাসতে হাসতেই তাঁর চোখ আবার সেই লাল জামাটার দিকে গেল। জামাটা নৌকার এক কোণে পড়ে ছিল। তার নিজের কোনো শক্তি নেই। কেউ পরলেই সেটাই পেয়াদার পোশাক, সেটাই ক্ষমতার চিহ্ন হয়ে ওঠে। তবু বাণেশ্বর মনে মনে স্বীকার করলেন, কয়েক মুহূর্ত আগে সেই কাপড় তাঁর গলা শুকিয়ে দিয়েছিল।
বাণেশ্বর হঠাৎ বললেন — রামকান্ত ।

– কী ?

– পোশাকটা কে যত্ন করে রাখিস।

– কেন ?

– আজ ওটা আমাকে একটা শ্লোকের চেয়েও বেশি কিছু শিখিয়েছে।

– কী শিখিয়েছে ?

বাণেশ্বর একটুক্ষণ চুপ করে থাকলেন । তারপর বললেন — রাজা সব সময় সিংহাসনের ওপর বসে থাকেন না । বরং তিনি কখনো কখনো মানুষের মাথার ভিতরে ঢুকে পড়েন ।

রামকান্তের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল । নদীর উপর তখন বিকেলের ছায়া নামছে । দুই তীরে মানুষ যে যার কাজে ব্যস্ত । কেউ জানে না, এই ছোট্ট নৌকার মধ্যে একজন পণ্ডিত আজ নিজের সম্পর্কে এমন একটা সত্য জেনে ফেলেছেন, যা কোনো রাজসভা, কোনো শাস্ত্র তাঁকে শেখায়নি । বাণেশ্বর নদীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। আর দেখলেন, নদীর জল এগিয়ে চলেছে । সেই জলকে কোনো রাজা থামাতে পারে না, কোনো পেয়াদা পাহারা দিতে পারে না । শুধু মানুষই মাঝেমধ্যে নিজের ভিতরের অদৃশ্য ঘাট থেকে নিজেকে ডেকে বলে — ফিরে আয় । আর কী আশ্চর্য, সে ডাক শুনে মানুষও কেমন করে মাঝগঙ্গা থেকে তার নৌকা ঘুরিয়ে নেয় ।

♦–♦•♦–♦ ♦–♦•♦–♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!