Advertisement
  • ব | ই | চ | র্যা রোব-e-বর্ণ
  • আগস্ট ২৩, ২০২৬

ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াই

জিয়া হক
ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াই

এ শুধু স্মৃতির বই নয়। ক্ষমতার বিরুদ্ধে যেন এক দীর্ঘ সাক্ষ্য-বয়ান। আত্মজীবনীও নয়। আবার নিছক প্রবন্ধসংকলনও নয়। বরং লেখিকার রাজনৈতিক চেতনার সুলুকসন্ধান মেলে, যেন এক আকাশজোড়া সমাজ-মনস্তত্ত্বের মানচিত্র। অরুন্ধতী রায়ের ‘মাদার মেরি কামস টু মি’ পড়তে গিয়ে এটাই আমার প্রাথমিক ধারণা।

অরুন্ধতীর লেখার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জনজীবন, বৃহত্তর অর্থে মানুষ। কিন্তু সব মানুষ ‘সমান’ নয়। তিনি খোঁজেন সেই মানুষকে, যাকে রাষ্ট্র চেপে রাখতে দমভর প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। যাকে বাজার অদৃশ্য করে দিতে তৎপর। যাকে ইতিহাসের সরকারি সংস্করণ ‘গায়েব’ করে দিতে পারলে ‘বাঁচে’। বইয়ের নামেই সু-নরম কোমলতা আছে। আছে পেলবতা। কিন্তু এই কোমলতা, এই পেলবতা কার্যত বিভ্রম। ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায় রাষ্ট্র, যুদ্ধ, কর্পোরেট পুঁজি, জাতপাত, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এ এক নিরলস ভাষ্য-প্রতর্ক। ব্যক্তিগত স্মৃতি এখানে কখনো আর কেবলমাত্র ‘ব্যক্তিগত’ থাকে না। তা হয়ে ওঠে সামাজিক। দ্রুত। হয়ে ওঠে আমাদের যৌথ ইতিহাসের অংশ-খণ্ড।

সাহিত্যকে তার বস্তুগত বাস্তবতার মধ্যে রেখেও পাঠ করে যেতে হয়। নিরলস। উৎপাদন, সম্পত্তি, শ্রেণি ও রাষ্ট্রের সম্পর্কের অর্ধ-চেনা ছকের মধ্যে রেখেই বুঝে নিতে হয় লেখকের আন্তরিক ইচ্ছে-অনিচ্ছে। অরুন্ধতীর লেখাও সেই পথ বরাবরই হাঁটে। তিনি কোথাও সরাসরি মার্কসের ভাষা ব্যবহার করেন না। কিন্তু তাঁর প্রশ্নগুলি মার্কসবাদী। ক্ষমতা কার ? সম্পদ কার ? উন্নয়নের লাভ কে পায় ? ক্ষতি কার কাঁধে পড়ে ? এইরকম সব ‘অ-প্রিয়’ প্রশ্ন। এ বইয়ের সবচেয়ে বড়ো শক্তি এখানেই। উন্নয়নের সরকারি ‘গল্পে’ বিশ্বাস করেন না অরুন্ধতী। বাঁধ, খনি, কর্পোরেট প্রকল্প কিংবা যুদ্ধ— সব ক্ষেত্রেই তিনি আলাদা করে নজর ফেলেন উদ্বাস্তু মানুষের মুখের ক্ষয়িষ্ণু বলিরেখার দিকে। রাষ্ট্র যেখানে শুধুই পরিসংখ্যান দেখে, তিনি সেখানে দেখেন শ্রমজীবী মানুষের সদা-কম্পমান জীবন। এখানে উৎপাদনের ভাষার বদলে উঠে আসে উৎপাদনের মূল্য চুকিয়ে দিতে দিতে সারশূন্য হয়ে যাওয়া, চর্মসার মানুষের স্বর।

রাষ্ট্রের সমালোচনা এ লেখার অন্যতম গম্বুজ-স্তম্ভ। অথচ সমালোচনা নেহাতই বিমূর্ত নয়।  তিনি রাষ্ট্রকে তিনি দেখেন শাসক শ্রেণির যন্ত্র হিসেবে। আইন, সেনাবাহিনী, আদালত, সংবাদমাধ্যম—সব কিছুর মধ্যেই তিনি ক্ষমতার ‘টুল’, ‘মেশিনারি’ ও বিন্যাস খুঁজে-হাতড়ে দেখেন। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত যে হতেই হবে, এমনটা কেউ বলছে না। কেউ ‘বাধ্য’ নন। কিন্তু তাঁর প্রশ্নগুলি এড়িয়ে যাওয়াও মোটেই সহজ নয়। ‘মাদার মেরি’তে জাতপাত ঘিরে দীর্ঘ অস্বস্তিকর আলোচনা আছে। সে পর্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় আর্থ-সামাজিক নীতিতে পুরনো একটা সীমাবদ্ধতা ছিল। আর তা হলো, অনেক সময় শ্রেণির তুলনায় জাতপাতের প্রশ্নকে ‘যথেষ্ট’ গুরুত্ব না দেওয়া। অরুন্ধতী সেই ঘাটতি পূরণের নিবিড় চেষ্টা করেছেন। তাঁর কাছে ‘জাত’ এবং ‘শ্রেণি’ আলাদা নয়। এগুলি একে অন্যকে জোরদার করে তোলে। ফলে শোষণের যে ছবি শেষ পর্যন্ত আমাদের কাছে এসে পৌঁছয় তা বেশ জটিল ও বহুমাত্রিক। এখানেই এই হয়ে ওঠে সমসাময়িক সময়ের ‘ডার্ক’ দলিল।

কর্পোরেট পুঁজির সমালোচনাও করা হয়েছে ধারাবাহিকভাবে। বহুজাতিক সংস্থা, খনিজ সম্পদের দখল, পরিবেশ ধ্বংস এবং আদিবাসী উচ্ছেদ—সবকিছুকে তিনি একই কাঠামোর মধ্যে দেখেন। পুঁজির বিস্তার কেবল একটা ‘অর্থনৈতিক দুর্ঘটনা’ নয়। মূলধনী ব্যবস্থা বদলে দেয় সংস্কৃতিকেই। বদলে দেয় ভাষা। বেদম ধাক্কা লাগে স্মৃতিবলয়ে। মানুষের সম্পর্কও আর ‘আগের’ মতো এক থাকে না। বদলে দেয়। এই উপলব্ধি বইটির রাজনৈতিক গভীরতাকে অ-তলের দিকে নিয়ে গেছে। আলাদা করে বলতে হয় অরুন্ধতীর ভাষা ব্যবহারের ঝোঁক ও কৌশলকে। তিনি তথাকথিত তাত্ত্বিক নন। তিনি গল্প বলেন। ছবি আঁকেন। একটি বাক্যে যদি কবিতা নিয়ে আসেন, তো পরের বাক্যেই তথ্য। এই মিশেল পাঠককে বইয়ের পাতায় টেনে রাখে। উঠতে দেয় না। তবে কখনো কখনো অলংকারই বিশ্লেষণকে ঢেকে দেয়। তথ্যের ওপর চেয়ে বসে ব্যক্তি-আবেগ।  যুক্তির বদলে নৈতিক ক্ষোভ বেশি জায়গা করে নেয়।

আরও প্রশ্ন আমাকে ভাবিয়েছে। অরুন্ধতীর লেখায় প্রতিরোধের ছবি খুবই উজ্জ্বল, স্পষ্ট ও নির্ভীক। কিন্তু বিকল্প সমাজের রূপরেখা তিনি কি দিলেন ? এই জায়গাটা তুলনামূলকভাবে ধূসর, ঝাপসা। পুঁজিবাদের সমালোচনা রয়েছে। রয়েছে রাষ্ট্রের সমালোচনাও। কিন্তু তার পরের রাজনৈতিক নির্মাণ নিয়ে তিনি খুব বেশি বাক-বিস্তার করেন না। তবু এই ‘সীমাবদ্ধতা’ ‘মাদার মেরি’র গুরুত্ব একটুও কমিয়ে দেয় না; কারণ কোনও দলীয় ইশতেহার লেখা অরুন্ধতীর লক্ষ্য নয়। তিনি বিবেককে অস্বস্তিতে ফেলতে চান। নাড়া দিয়ে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন। চান প্রশ্ন তুলতে। প্রচলিত ‘সত্য’কে আগাপাশতলা খতিয়ে দেখতেই তাঁর বেশি আগ্রহ। এই কাজ তিনি সফলভাবেই করেছেন।

বইটি পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে, অরুন্ধতীর আসল শক্তি তাঁর নৈতিক সাহস। জনপ্রিয় মতের সঙ্গে ভেসে যাওয়ার প্রবণতা তাঁর নেই বললেই চলে। রাষ্ট্র যখন শানিত যুদ্ধের ভাষায় কথা বলে, তিনি তখন প্রাণিত শান্তির কথা বলেন। বাজার যখন মুনাফার ভাষায় কথা বলে, তিনি মানুষের অকথ্য দুর্দশার কথা বলে চলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ যখন উল্লাস করে, তিনি সংখ্যালঘুর পাশে পরম সহমর্মিতা নিয়ে দাঁড়ান। এই অবস্থান নিঃসন্দেহে ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু সাহিত্যও তো শেষ পর্যন্ত ‘ঝুঁকি নেওয়ার শিল্প’।
আমার মনে হয়েছে, ‘মাদার মেরি কামস টু মি’ মূলত স্মৃতির ভেতর দিয়ে ইতিহাসকে পুনরায় পড়বার বই। আর ইতিহাসের ভেতর দিয়ে ক্ষমতার গঠন-প্রকৃতিকে বুঝে নেওয়ার বই। এই বইকে নিছক ‘আত্মকথা’ বললে ভুল হবে। কেবল রাজনৈতিক প্রবন্ধ বললেও কম বলা হবে। এ এক ধরনের নৈতিক মহাফেজখানা; যেখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং সাহিত্যিক কল্পনা একই স্রোতে মিশে গেছে।

শেষ পর্যন্ত বইটি আমাকে নিজের দিকে টানতে পারল ? সব সময় নয় হয়ত। আমি রায়ের প্রতিটি সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারিনি। কোথাও তাঁর অবস্থান অতিরিক্ত রোমান্টিক লেগেছে। কিন্তু বড় সাহিত্য সব সময় ‘সম্মতি’ দাবি করে না। বড় সাহিত্য চায় চিন্তা। চায় বিতর্ক। তৈরি করে এক প্রকাণ্ড অস্বস্তি। অতএব, ‘মাদার মেরি কামস টু মি’ জরুরি বই। বিশেষ করে এ সময়ে। কেননা উন্নয়ন, জাতীয়তাবাদ এবং বাজারকে প্রায় প্রশ্নহীন সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে এখন। সে আবরণের নিচে লুকিয়ে থাকা শ্রেণিসংঘাতকে ফুটিয়ে তোলে এই বই। আর অরুন্ধতী রায়ের এই বই সেই পাঠের জন্য পর্যাপ্ত সমৃদ্ধ উপাদান খুঁজে এনে দেয় নিরন্তর। বইটি পড়ে শুধু একজন লেখককে চিনিনি, বরং চিনেছি ক্ষমতার বিরুদ্ধে সাহিত্যের দীর্ঘ, কঠিন এবং অপরিহার্য লড়াইকেও।

মাদার মেরি কামস টু মি
অরুন্ধতী রায়
পেঙ্গুইন র্যামন্ডম হাউস ইন্ডিয়া প্রাঃ লিঃ ৮৯৯ টাকা

♦–♦ • ♦–♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!