- ব | ই | চ | র্যা রোব-e-বর্ণ
- ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৬
তত্ত্বই যখন তথ্য, অর্ধ তখন সত্য !
কিছু কিছু বই সমাজ গবেষক বা সমাজকর্মীদের দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য হয়ে থেকে যায়। বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক তথা অধ্যাপক ইমানুল হকএর ২২টি স্বরচিত প্রবন্ধ সংকলিত ‘ইতিহাস পুরাণ – মিথ ও মিথ্যা’ আমার কাছে ঠিক সেরকমই এক সম্পদ। প্রথম প্রকাশের পরপরই সংগ্রহ করি, সঙ্গে সঙ্গে পড়েও ফেলি। তারপর থেকেই এটা আমার নিত্যসঙ্গী। কখনও বা নিজের কোনো লেখার ক্রস রেফারেন্স হিসেবে, কখনও বা সমমনস্ক সমাজকর্মী বন্ধুদের সঙ্গে সমকালীন সামাজিক বিষয় নিয়ে আলোচনায় বসলে কিংবা গবেষক ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে এ এক অত্যন্ত উপযোগী রেফারেন্স।
ইতিহাস আর পুরাণ কখন একাকার হয় ? কীভাবে হয় ? মিথ আর মিথ্যাই বা কখন কীভাবে একাকার হয়ে যায় ? এমনি এমনি তো আর তা হয় না ! তারজন্য দরকার নিপুণ কৌশলে ব্যবহৃত প্রচার যন্ত্রের। সমকালীন সমাজে ব্যবহৃত এই প্রচার যন্ত্রই প্রোপাগ্যান্ডা তৈরি করে আমাদের প্রতিনিয়ত মগজ ধোলাই করতে থাকে। আমরাও তা গিলতে থাকি অনায়াসে, গোগ্রাসে। যখন আমাদের কাণ্ডজ্ঞান মহাশূন্যে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়, ঠিক তখনই আমরা নিজেদেরকে মহাজ্ঞানী ভাবতে শুরু করি। আমরা তখন ভাবতে ভুলে যাই শিবাজীর মুসলিম দেহরক্ষী কীভাবে এবং কেন তাঁকে আওরঙ্গজেবের বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করতে যান। তখন আমরা আর মনে রাখতে চাই না কেন এবং কীভাবে হিন্দু রাজা হর্ষ মন্দির ভাঙেন, আর আওরঙ্গজেব মসজিদ ভাঙেন।
ইতিহাস আরও বলে, আকবরের রাজপুত সেনাপতি মানসিংহ যখন পূজাপাঠ করে আরেক রাজপুত প্রতাপ সিংহের বিরুদ্ধে লড়তে যাচ্ছেন তখন সেই প্রতাপের সেনাপতি হাকিম শূর নামাজ পড়ে যাচ্ছেন আকবরের বিরুদ্ধে লড়তে। অর্থাৎ লড়াইটা কখনোই হিন্দু-মুসলমানের ছিল না, ছিল ক্ষমতার । অথচ আজ আমরা দেখছি সেইসব ইতিহাস খন্ডিত এবং বিকৃত হয়ে ধর্মের তাসের রূপ নিয়েছে, আর ব্যবহৃত হচ্ছে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে। ইতিহাস থেকে এরকম আরও অনেক উদাহরণ প্রসঙ্গক্রমে এই বইতে এসেছে।
ইতিহাস হোক বা পুরাণ, মিথ কিংবা মিথ্যা, তার কোপ আমাদের দেশে মনে হয় সবচেয়ে বেশি গিয়ে পড়েছে বাঙালি জাতির উপর। বহমান এই নির্মমতার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে বাঙালিরাই মূলত আক্রান্ত, নিষ্পেষিত, নির্যাতিত। এই বইটাতে বারবার চেষ্টা হয়েছে পাঠকদের মনের দরজায় কড়া নাড়ার – কখনো সাদরে লেখকের ভাবনার বহিঃপ্রকাশে, কখনো সজোরে, মনের সদরে গিয়ে সরাসরি এই প্রশ্ন করে – আমরা সত্যিই কি ভাবের ঘরে চুরি করছি না ? ফ্যাসিবাদীদের টার্গেট যে বাংলার মাটি ও সম্পদ, বাঙালির জন্য ওদের কোনো সহানুভূতি নেই সেটা বাঙালি কবে বুঝবে ?
ইতিহাস-পুরাণের কথা একসঙ্গে বলতে গেলে রামায়ণ-মহাভারতের কথা আসা তো অবধারিত, তাই এসেছে। অসাধারণ এই দুটো সৃষ্টি নিয়ে লেখকের যে গভীর অধ্যয়ন রয়েছে তার প্রতিফলন ঘটেছে এই সংকলনে। দুটো গ্রন্থ আন্তরিকভাবে পড়তে পারলে নিঃসন্দেহে মানুষের মধ্যে এক উন্নত মানের জীবন বোধ তৈরি হয়। অথচ আমরা কী করেছি ! সম্পূর্ণ উল্টো পথে হেঁটেছি। আজ এইসব অনন্য সৃষ্টিকে আমরা রাজনৈতিক নেতাদের হাতে তুলে দিয়েছি যাতে তাঁরা সেগুলোকে সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন, সমাজকে বিদ্বেষের উৎসবে মাতিয়ে রেখে নিজেরা রাজনৈতিক ফসল ঘরে তুলতে পারেন।
একাধিক প্রবন্ধে মিথ্যে নিয়ে কিছু সত্যের তথ্যবহুল উপস্থাপন করতে গিয়ে যথেষ্ট ঘাম ঝরিয়েছেন লেখক। যে ৩৩ রকম মিথ্যে নিয়ে লেখক আলোচনা করেছেন সেগুলোর অধিকাংশই আমাদের সমাজে অবলীলায় সত্যের মতোই বলা হয়ে থাকে। একটা অধ্যায়ে ‘ধর্মের নামে মানুষের মন বিষিয়ে মানুষ খুন’ হয়ে যাওয়া কী করে আজ নব-ভারতের গরিমায় গরীয়ান হচ্ছে, সেই বিষয়টি নিয়ে লেখকের উদ্বেগের সঙ্গে আমার নিজের আশঙ্কা একাকার হয়ে যায়।
‘গো-সন্ত্রাস’ শব্দের সাহসী এবং যথাযথ প্রয়োগের জন্য লেখককে কুর্নিশ। আর তা সেন্সর না করে গ্রন্থে ন্যায্য স্থান দেওয়ার জন্য প্রকাশক পত্রভারতীর কাছেও একজন সমাজ গবেষক, সমাজকর্মী এবং সর্বোপরি পাঠক হিসেবে কৃতজ্ঞ আমি। এই সাহসী লেখকের সবরকম লেখাই আমি মনোযোগ দিয়ে পড়ি, যথারীতি সমৃদ্ধ হই। আর পত্রভারতীও ঠিক এই সাহসিকতার জন্যই আমার প্রিয়তম প্রকাশকদের অন্যতম। গো-সন্ত্রাস নিয়ে লেখকের তথ্যসমৃদ্ধ এবং যুক্তিনিষ্ঠ বিশ্লেষণ সমকালীন ভারতীয় সমাজের এক মূল্যবান দলিল।
বইটাতে বারবার চেষ্টা হয়েছে পাঠকদের মনের দরজায় কড়া নাড়ার – কখনো সাদরে লেখকের ভাবনার বহিঃপ্রকাশে, কখনো সজোরে, মনের সদরে গিয়ে সরাসরি এই প্রশ্ন করে – আমরা সত্যিই কি ভাবের ঘরে চুরি করছি না ? ফ্যাসিবাদীদের টার্গেট যে বাংলার মাটি ও সম্পদ, বাঙালির জন্য ওদের কোনো সহানুভূতি নেই সেটা বাঙালি কবে বুঝবে ? এরকম আশঙ্কাও প্রকাশ পেয়েছে লেখকের কলমে
যাঁরা মূল রামায়ণ পড়েছেন তাঁরা কোনোমতেই গো-সন্ত্রাসী হতে পারেন না। রামায়ণ না পড়েই যাঁরা রামভক্ত হয়ে যান, তাঁদের পক্ষেই সম্ভব ‘জয় শ্রী রাম’ বলতে বলতে মানুষকে খুন করা কিংবা এরকম হিংসাকে সমর্থন করা। বেদ-পুরাণ, রামায়ণ-মহাভারত পড়লে সেসব চরিত্রের সঙ্গে গো-বধ কিংবা গোমাংসের যোগসূত্রটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তার চেয়ে সাম্প্রদায়িক হিংসা-ঘৃণা-বিদ্বেষের উৎসবে মাতোয়ারা একটি সমাজে গোরক্ষার নামে মানুষ খুন করা যে ধর্মান্ধদের কাছে অনেক বেশি গৌরবের ! গো-মাতার নাম করে মানুষ খুন করার উন্মাদনা গো-সন্ত্রাসীদের রীতিমতো অন্য সব সন্ত্রাসীদের প্রতিরূপ বানিয়ে ছেড়েছে। এয়ার ফোর্সের সেনানী মহম্মদ সরতাজের পিতা মহম্মদ আখলাকের মতো আরও অগণন নীরিহ মানুষের মব লিঞ্চ হওয়া ঠিক যেন ‘আল্লাহু আকবর’ আর ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বলতে ভিনধর্মী মানুষ মারার হিংস্র সন্ত্রাসী আনন্দ।
বিদ্বেষ-প্রসূত ভাবাবেগ যে দেশপ্রেমের ঢেউ তোলে থাকে, তার মধ্যে দেশ কিংবা প্রেম কোনোটাই থাকে না। এটা প্রমাণ হতেও যে খুব একটা সময় লাগে না, ২০১৯ সালে পুলওয়ামার মতো ঘটনা আপামর ভারতবাসীকে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে অজস্র রগরগে সেন্টিমেন্ট চাগানো বিবৃতি, ছড়া আর কবিতায় ছয়লাপ করে দিয়েছিলেন তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ। কিন্তু তারপর বহু বছর কেটে গেছে, কেন একটাও তদন্ত কমিশন বসেনি ? সেই প্রশ্ন তথাকথিত দেশপ্রেমী সভ্য সমাজ করেনি! এই তথাকথিত সুশীল সমাজ থেকে কেউ এসব নিয়ে প্রশ্ন করবেন এমন আশা করাও কি বাতুলতা নয় ? বইটা পড়ে এরকম প্রশ্ন নতুন করে মনে জাগে! এরকম প্রশ্নে অসহায় বোধ করলেই আমি বারবার আমার ঠাকুর, বাঙালির প্রাণের ঠাকুর রবীন্দ্রনাথের কাছে যাই। এবেলাও তাই করি। ঠাকুর বলেন, ‘ওগো কেন মিছে এ দুরাশা!’ অগত্যা আবার এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা।
এক জায়গায় বিহারের আর্থসামাজিক অবস্থার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের একটা তুলনামূলক আলোচনা করতে গিয়ে লেখকের বিশ্লেষণ সহ মতামত: ‘পশ্চিমবঙ্গে তুলনায় অনাহারী মানুষ কম। অনাহার কম, ফলে অপুষ্টিও কম।’ আমি পড়ামাত্রই ভাবলাম, এবার এই বাংলার তথাকথিত সুশীল সমাজের রোষানলে পড়বেন না তো লেখক ? কারণ ২০১১ সালের পর থেকেই এই রাজ্যে ভাল কিছু হতে পারে এমন বিশ্বাস তাঁদের মন থেকে মনে হয় চিরকালের মতো বিদায় নিয়েছে। কাউকে এরকম ভাবনার প্রকাশ করতে দেখলে তাঁরা রে রে করে তেড়ে আসেন। যুক্তি কিংবা তথ্যের তোয়াক্কা না করে রাজ্য সরকারের চাটুকার বলে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করেন। তাই লেখকের জন্য আমার চিন্তা হয়।
খিদে নিয়ে আলোচনায় তথাকথিত প্রগতিশীল সমাজের একাংশের উদাসীনতায় হতাশ হয়ে একটা জায়গায় লেখকের বক্তব্য – ‘আমরা এ সব দেখেও দেখব না কেন না, খিদে কোনও সামাজিক সমস্যা নয়।’ হয়তো এই কারণেই আমাদের দেশের সরকার অবলীলায় বিশ্ব খুধা সূচকের নিরীখে আমাদের অবনতির কথাটা উদ্বেগের বলে ভাবেন না। এক কথায় নাকচ করে দেন।
একইভাবে এসেছে পূর্বোত্তরের রাজ্য অসমের কথা। অনেকগুলো প্রাসঙ্গিক ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ (স্ন্যাপশট) দিয়ে পরে একটা জায়গায় লেখককে সংগত কারণেই ক্লান্ত মনে হয়েছে । বলতে বাধ্য হয়েছেন, ‘মানবতার বদ্ধভূমিতে হওয়া এই অসম রাজ্যের স্ন্যাপশট লিখে শেষ করা যাবে না !’ লেখকের সঙ্গে আমি একশো ভাগ সহমত। সত্যি সত্যিই মানবতার মৃত্যু হয় প্রতিদিন আমার জন্মভূমি অসমে। এই হালেই কার্বি আংলং জেলা কিছু নৃশংস হত্যার সাক্ষী থেকেছে।
তাছাড়া, বছরের পর বছর অসমের ডিটেনশন ক্যাম্পে বিদেশী সন্দেহে বন্দী হওয়া স্বদেশীদের অধিকাংশই সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মে বিশ্বাসী। অল্পসংখ্যক ভিন্নধর্মীও আছেন। রাষ্ট্র পরিচালিত প্রোপাগ্যান্ডা মেশিন এদের মধ্যে স্থায়ীভাবে বিভেদ ও বিদ্বেষের চাষ করতে সফল হলেও দুর্ভাগ্য তাঁদেরকে এক করে দিয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই গরিব মানুষ নিজেদের স্বদেশী প্রমান করার জন্য আইনি লড়াই লড়তে গিয়ে যথাসর্বস্ব খুইয়েছেন। যাঁদের বিক্রি করার মতো ভিটেমাটি নেই তাঁদের কেউ কেউ জেলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আশ্চর্যভাবে মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই তাঁদের বিদেশী তকমা চিরতরে ঘুচে যায়। জেল কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি বাড়ির লোকজনকে খবর দেন মরদেহ নিয়ে যাবার জন্য। জীবিত থাকতে ডি-ভোটার, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই খাঁটি স্বদেশী লাশ ! এই ব্যাপারটাকে মিথ বলব নাকি মিথ্যা বলব বুঝতেই পারি না, আমার মতো আরও অনেক পাঠক হয়তো এই ধন্দে থাকবেন। তবে এঁদের নিয়তি যে এক করুণ ইতিহাস তৈরি করছে, তা কিন্তু পুরাণের কথা নয় । এ এক নগ্ন নির্লজ্জ বাস্তব।
ইতিহাস হোক বা পুরাণ, মিথ কিংবা মিথ্যা, তার কোপ আমাদের দেশে মনে হয় সবচেয়ে বেশি গিয়ে পড়েছে বাঙালি জাতির উপর। বহমান এই নির্মমতার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে বাঙালিরাই মূলত আক্রান্ত, নিষ্পেষিত, নির্যাতিত। এই বইটাতে বারবার চেষ্টা হয়েছে পাঠকদের মনের দরজায় কড়া নাড়ার – কখনো সাদরে লেখকের ভাবনার বহিঃপ্রকাশে, কখনো সজোরে, মনের সদরে গিয়ে সরাসরি এই প্রশ্ন করে – আমরা সত্যিই কি ভাবের ঘরে চুরি করছি না ? ফ্যাসিবাদীদের টার্গেট যে বাংলার মাটি ও সম্পদ, বাঙালির জন্য ওদের কোনো সহানুভূতি নেই সেটা বাঙালি কবে বুঝবে ? এরকম আশঙ্কাও প্রকাশ পেয়েছে লেখকের কলমে । কিন্তু ইতিহাসের নির্মমতম সত্য এটাই, যে আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিই না । জানি না কতটা তফাৎ গড়বে লেখকের এই অধ্যবসায় আর তাঁর অত্যন্ত পরিশ্রমী এই লেখা । প্রশ্ন তো থেকেই যায় ! কজন সজ্জন নতুন করে রামায়ণ-মহাভারত পড়বেন আর তার সারবস্তু আত্মস্ত করবেন ? কীভাবে তাঁরা আজন্ম লালিত সাম্প্রদায়িক হিংসা-ঘৃণা-বিদ্বেষের করাল গ্রাস থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করবেন ? প্রশ্নের শেষ নেই…
♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦
❤ Support Us








