- ব | ই | চ | র্যা রোব-e-বর্ণ
- নভেম্বর ২৩, ২০২৫
শেখর দাশের গল্পবিশ্ব, সময় ও পরিসরের মানবী আখ্যান
শেখর দাসের গল্পের নির্মাণ ও সীমান্তহীন পটভূমি বিশ্লেষণ করলেন মুক্তচিন্তার অপ্রতিদ্বন্দ্বী পাঠক অশোক দাস
দ্রুত বদলে যাচ্ছে বাংলা ছোটগল্পের আখ্যান । বদলে যাচ্ছে গল্প বলার ধরনা। গল্পগড়ার কৌশলের কারিগরেরা তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন অভিনব পন্থার নির্মাণ শৈলীতে । কাহিনিকারেরা টেক্কা দিচ্ছেন কেবল রূপান্তরের প্রতিবেদনেই নয়, শিল্পিত ভাবনার চিন্তা বিকাশের ক্ষেত্রে অভিনব ভাবনার নিত্য নতুন পন্থাকে উপস্থাপনার মাধ্যমে । গল্প লেখকদের রণ-কৌশলের কাছে পাঠকবর্গ যেমন বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকেন : আবার ভাবাদর্শগত চিন্তাবিশ্বকে জাগ্রত রাখতে পাঠককূলও নবভাষ্য ও নতুন নতুন প্রতিবেদনের অনুসন্ধানেও সংযুক্ত। সংশয় ও উৎসাহকে সমানতালে জাগিয়ে রেখে লেখকবর্গের পথচলা আজও অব্যাহত।
যাত্রা লগ্ন থেকে বাংলা ছোটোগল্পে বহু পথ অতিক্রম করেছে । নিছক গল্প বলার দায় থেকে দূরে সরে এলেও-গল্প পাঠ কিংবা পড়ুয়ার আধিক্য কোনো অংশেই কম নয় । ‘ছোটগল্প’ নামক শিল্পমাধ্যমটির যাদুমন্ত্র এখানেই । বিরল ব্যাপ্তি ও অসামন্য গভীরতা নিয়েই ছোটগল্প আজও মুক্তার মতো টলটল । পালাবদলের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে অন্বয়-অনন্বয়ে, ঘাত-প্রতিঘাতে গল্পের অন্তর্বয়নের বৈচিত্রে অনবরত রূপান্তর ঘটলেও গল্পের প্রতিবেদনের কাছে পাঠকের টান আজও ঝুঁকে আছে । এ পথচলা প্রাচীন । তাতে কোনো খামতি নেই । গুজবে ভারি হয়ে ওঠা বাতাসকে পাত্তা না দিয়েও, নিশ্চিতভাবে ছোটগল্পের জোরালো সমর্থন রয়েছে মানুষের কথায় । অগুছালো বিচ্ছিন্ন ঘটনার সংকেত, অনৈক্যের সমাবেশ কাহিনির আখ্যান ও প্রতিবেদনে উথাল-পাতাল নিয়ে এলেও : ছোটগল্পের এই শক্তিটুকু প্রমাণিত হয়েছে যে, তার মৃত্যু ঘটানো সহজ কথা নয় । একথা আজ ঘোষণার মতো সোচ্চার । এক অঞ্জলি পারদের মতো হাতের মুঠোয় টিপে ধরে তার কণ্ঠরোধ করতে চাইলেও সে পিছলে ভিন্ন পথে ফসকে বের হয়ে পড়বে। ফারাক শুধু ভিন্ন চেহারা ও মাপের । আড়ালে-আবডালে তাচ্ছিল্যতার মূল্যে গেল-গেল বলে যতই স্বর হাঁকান না কেন, গল্পের জগত এখনও চলমান সজীব গভীর ও বৈচিত্র্যময়।
সময়ের পরিসরে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে শেখরবাবুর গল্পে উপস্থিত হয়েছে মানুষেরা । ছোটগল্পের অনুপম লাবণ্যকে অক্ষুন্ন রেখেও কোথাও না কোথাও, তিনি হয়ে রইলেন আলাদা । কথাশিল্পীর গল্পভুবনে উঁকি মারলে তাঁর হৃদয়যন্ত্রণা কোন উপলদ্ধিতে পৌঁছায় তা স্পষ্টভাবে ধরা দেয়
বরাক উপত্যকার গল্পঘরানার এক ব্যতিক্রমী গল্পকার শেখর দাশ । সত্তরের দশকের স্থবির জনজীবন ও নীরব জনপদের মধ্যেই যে কজন গল্পকাহিনিকার উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো চোখে পড়েন, শেখর দাশ তাঁদের একজন । ১৯৭৬ র জুলাই মাসে ‘শতক্রতু’ পত্রিকার জন্ম হয়েছিল, কিংবা যাঁদের সমাবেশে ‘শতক্রতু’র হয়ে ওঠার সংগ্রাম, তাঁদের অন্যতম সেনানী শেখর দাশ । সত্তরের এ উপত্যকার আলো ছায়া ও রৌদ্রকে গায়ে মেখেই তার পথচলা । সেদিনকার সফরসঙ্গীর শরিকদার হলেও-কোথাও যেন ব্যতিক্রম ছিলেন কথাকার শেখর। তবে শ্যামলেন্দু চক্রবর্তীর সম্পাদনায় সম্ভবত ১৯৬৯ সালে ‘অনিশ’ পত্রিকা বরাক উপত্যকার গল্প আন্দোলনের উৎস মুখ সূচনা করেছিল । প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতাকে পাথেয় করে এ উপত্যকতার লিটল ম্যাগাজিন যেমন ভাষা-সংস্কৃতি-সাহিত্য এর জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে; অন্যদিকে গল্প কথার ঘরানাকে সতেজ ও সম্পূর্ণ রাখতে এ পত্রিকাগুলোর অবদান ভোলবার নয় । লিটল ম্যাগাজিনের লেখক ও পাঠকবর্গ কেমন হবেন, তাঁরও এক ধরণের প্রস্তুতিপর্ব ছিলো । শতক্রতু পত্রিকার অগ্রহায়ণ, ১৩৮১ সংখ্যার সম্পাদকীয়তে এরই এক পূর্বলেখ তৈরি হয় এভাবে — ‘ লিটল ম্যাগাজিনের লেখক সদা সর্বদা ভিন্নতর আঙ্গিক নির্বাচনের মাধ্যমে পরীক্ষা নিরীক্ষায় ব্যপৃত থাকেন, অন্যকিছুতে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই… লিটল ম্যাগাজিনের গদ্যপাদ্য তাবৎ লেখাজোখা প্রায় প্রতিসময় প্রচলিত রচনা রীতির বেড়াজাল ছিন্ন করে একটা লন্ডভন্ড কান্ড ঘটাতে চায় এবং অবধারিতভাবে এইসব ঘর উঁচু বেপরোয়া রচনা কারো পক্ষে শুয়ে বসা হাই ভাংগতে ভাংগতে কিম্বা দৈনন্দিন ঘর গেরস্থালী সামলাতে সামলাতে কখনও পড়ে ফেলা সম্ভব নয় । যারা এরকম করে থাকে তাদের পক্ষে লিটল ম্যাগাজিনের রচনা থেকে নিরাপদ দূরত্বে বসবাস করাই যে বাঞ্ছনীয়।’
সময়ের পরিসরে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে শেখরবাবুর গল্পে উপস্থিত হয়েছে মানুষেরা । ছোটগল্পের অনুপম লাবণ্যকে অক্ষুন্ন রেখেও কোথাও না কোথাও, তিনি হয়ে রইলেন আলাদা । কথাশিল্পীর গল্পভুবনে উঁকি মারলে তাঁর হৃদয়যন্ত্রণা কোন উপলদ্ধিতে পৌঁছায় তা স্পষ্টভাবে ধরা দেয় । ‘ক্রমশ তাপ’ কাহিনি গল্পের শিল্পী মনের স্বভাবকে ধরতে গিয়ে উচ্চারিত হয়– ‘ কবোষ্ণ অন্ধকারে বসে বসে সেই একঘেয়ে বহু পুরানো বৃষ্টির শব্দ । নতুন করে হয়তো শুনতে ভাল লাগে । জল, বৃষ্টি বন্যা অনেক প্রাচীন। নিজেই নতুন করে শুনতে হয় । জল দেখতে দেখতে স্বামী স্ত্রীকে ধর্ষণ করে । স্ত্রী ও স্বামীকে ছাড়ছে না । কোনও ফারাক না রেখেই সব তো এক । ‘
অ্যাবসার্ডিটির নতুন প্রকরণ গল্পকথাকে যেমন আচ্ছন্ন করে রেখেছে, তেমনি গল্পভাবনায় এসেছে ভিন্ন আদল । জীবনে কঠিন থেকে কঠিনতর বাস্তবকে চ্যালেঞ্জ জানাতে গিয়ে শেখর আকাঙ্খা ও স্বপ্নভঙ্গের মাঝামাঝিতে তলিয়ে গেছেন । বাস্তববের বিষন্নতা গল্প ভাষাকে বিনির্মিত করতে বাধ্য । নিজেকে ক্রমান্বয়ে ভাঙতে ভাঙতে যিনি নিজেকে গড়েছেন, তাঁর গড়া ভাঙার খেলাই তো গল্প কাহিনিকে নির্মাণ করে । বিচিত্র গঠন কৌশল, কাহিনির রকমফের এর মাঝে উঠে আসা চিন্তন কাহিনিকারকে বাধ্য করে ভিন্ন ভাবনায় ভাবাতে । কাহিনি আখ্যানের ভুবনে ভুবনে কোথাও প্রকাশ্যে কোথাও প্রচ্ছন্নভাবে বর্ষিত হয়েছে এই দ্রোহ । বেদনা ও আঘাতে সমকালীন নিজের শহরকে ‘শূন্যের শহর’ বলে চিহ্নিত করে, যে ইংগিত দিয়েছেন তাতে কথাশিল্পীর ভাবাবেগকে স্পষ্ট করেছে ।
জীবন সম্পর্কে আশাবাদী হলেও কোথাও না কোথাও এক নেতিবাচক বোধ তাকে তাড়া করেছে । আমাদের মতো প্রান্তিকায়িত অঞ্চলে অহর্নিশি জীবনযুদ্ধ সেখানে বাস্তব যেখানে ‘ফেরারি’র মতো গল্প শেখর দাশকে আবারও চিনিয়ে দেয় । গল্পকারের গল্পে নব্য বাস্তবের গভীর মনন ও আত্মঅনুসন্ধিৎসা, নব্যবাস্তবের এক অন্য অনুভবের নির্মাণ ‘ফেরারি’ । সময় পরিসরের ভাবকল্পগুলোর প্রতিনিধিত্ব করেছে এ গল্প
গল্পকথার কারিগর শেখর দাশ ভেঙে টুকরো টুকরো করেছেন গল্পবলার ধরন । নিজের জগতকে যিনি নিজের মতো নির্মাণ করতে পারেন- তাঁর কাছে কাহিনি গল্পের গড়ন নির্মিত হয় নবভাষ্যে । নতুন আলোয় । ‘ডায়নোসোরের ফুসফুস’ গল্পে তার উচ্চারণ এরকম সংকেতই দেয় । প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্যে সহজ প্রতিষ্ঠার লোভনীয় বিষয়শৈলীকে আগলে রেখে একক উচ্চারণে লেখক কতভাবে দীপ্যমান তা তাঁর পাঠকৃতিতে উজ্জ্বল । শিল্পীমনের স্বভাবধর্মে গল্পের কথকথায় মানব মানবীর সম্পর্কের জটিল রহস্যময়তার প্রধান বিষয় সময় । জীবন সম্পর্ক অত্যাশ্চর্য জীবনোলব্ধী শেখর দাশের গল্পবীক্ষার অনন্য সম্পদ । রতীশ ও পূরবীর দাম্পত্য জীবনের পথচলার মধ্যেই রয়েছে স্বতন্ত্র সত্তার অনুসন্ধান । না, নেই কোনো জোৎস্নার জাদু বলয় । মায়াবী সম্মোহনে আচ্ছন্ন না রেখে জীবনের গাঢ় ও গূঢ় সত্যকে খুঁজে ফিরেছেন । গল্পের বাচন পদ্ধতিতে ধরা পড়ে জীবনে ভালোবাসার ক্ষয় ধরলেও সামাজিক সম্পর্ক ও মর্যাদাবোধ কীভাবে অক্ষুন্ন রাখা যায় । জীবন ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সঞ্চয়কে নতুন নতুন পরিসরে খুঁজতে গিয়ে আশ্চর্য শৈল্পিক বিন্যাসে পাল্টে যায় গল্পের বয়ান । গল্পকারের ভাষা বয়নের ব্যঞ্জনাময় দ্বিবাচনিকতায় ভালোবাসার গভীরতা কেমন যেন কৃত্রিম ঝাপসার পথ ধরে চেনা জগত অচেনা হয়ে যায় । তবু বিপন্ন বিষন্ন মানুষের মানবতাবোধই যেন লেখকের আশ্রয় । বাস্তবতার নগ্ন চেহারার মাঝে উকি দেয় তাঁর স্পষ্ট বিবেকবোধ – ‘ছেড়া পেটিকোট পরা প্রায় নগ্ন স্ত্রী লোক, কোলের বাচ্চা ও নিজেকে খাওয়ায় জলে ভেজা বাসিভাত । লোহার কড়াই নিয়ে বসেছে ক্রমশ কড়াই দখল করছে আরো চার পাঁচটা বিভিন্ন বয়সের বাচ্চা । দূরে ক্ষুধার্ত কুকুর তাদের খাওয়া কোলের শিশু দেখছে । একটু পরেই ডাইভ করে নামল একটা কাক, একটু কাঁদল এবং কুকুরটা ভাদের বিপর্যয়ের সুযোগ নিল ।’ ( গল্প: ডায়নোসোরের ফুসফুস)
মানবিক প্রতিবাদ এরকম শেখরই করতে পারেন। ছবিকথার সমাহারে টুকরো ছবির অসংখা ব্যবহার তাঁর গল্পকথার আকরণকে নির্মাণ করেছে । বরাক উপত্যকার জীবনবোধের সংগে দার্শনিক ভাবনার আশ্চর্য সমন্বয় যে বীজ ভাবনার জন্ম দিয়েছে শিল্পের প্রকাশে ঘটেছে তার বিস্তার, ফুরিয়ে যাওয়া সময়বোধের মাঝেই সবকিছু শূন্য মনে হয় রতীশের কাছে । ছাই ভস্মের উষ্ণতায় গল্পকথায় লেখকের উচ্চারণ হয় সংকেতগর্ভ – “মেঘ নেই । রাত । ঘরে ঢোকে রতীশ আলো নেই, বিজলি বাতির আজ দারুণ অভাব । বাইরে বৃষ্টির শব্দ নেই । জানালা বন্ধ… একটা হলুদ মোমবাতি । মোমবাতির মাথায় নিঃশব্দ চাঁপাফুল আর ঘরের সমস্ত দেওয়াল জুড়ে কাঁপছে বতীশের ছায়া ।”
জীবনকে দেখার পদ্ধতি ও প্রক্রিয়াগত ভিন্নতা নিয়েই শেখর দাশের গল্পভূবন । প্রতিবাদের কতোই না বিচিত্র ধরণ । মানুষের মানবিক বিপন্নতাকে প্রতিবেদনধর্মী বিন্যাসে হাজির করতে গিয়ে উপন্যাসও ছোটগল্পের বিকাশ । এই বিকাশ ও বিস্তারের পটভূমি কতইনা বিচিত্র । জীবন সম্পর্কে আশাবাদী হলেও কোথাও না কোথাও এক নেতিবাচক বোধ তাকে তাড়া করেছে । আমাদের মতো প্রান্তিকায়িত অঞ্চলে অহর্নিশি জীবনযুদ্ধ সেখানে বাস্তব যেখানে ‘ফেরারি’র মতো গল্প শেখর দাশকে আবারও চিনিয়ে দেয় । গল্পকারের গল্পে নব্য বাস্তবের গভীর মনন ও আত্মঅনুসন্ধিৎসা, নব্যবাস্তবের এক অন্য অনুভবের নির্মাণ ‘ফেরারি’ । সময় পরিসরের ভাবকল্পগুলোর প্রতিনিধিত্ব করেছে এ গল্প। গল্পের অনুভবকে ধরতে গিয়ে সমালোচকের মুখে উঠে আসে এরকম উচ্চারণ– ‘ চেতনার চেয়ে বড়ো অবচেতন, ভাষার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পরাভাষার । মোটর মেকানিকের প্রান্তিক অস্তিত্বে পৃথিবী সমাজ সময় গল্পকারের কাছে বুঝি বা ঘষা কাঁচের দেওয়ালের ওপারে । বাস্তব আর অবাস্তব, জৈবিক আর যান্ত্রিক অনুপুল তাই পরস্পর সম্পৃক্ত মোহনপুরের অপরতা থেকে বরাক উপত্যকার কেন্দ্রীয় শহর শিলচর এবং পরিচিত সম্পর্কের বিন্যাসকে কীভাবে দেখেছিল শেখর তারই অসামান্য পাঠকৃতি ‘ফেরারি ‘ । ‘
গল্পকারের গল্পভাষার তৈরি হয় যে বাক্যগড়ন, তা কবিতার পরক্তির মতোই যেন চিত্ত আকর্ষণ করে চলে । প্রাতিষ্ঠানিক গল্প বলার ধরণকে কত আগেই যেন শেখর ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন । গল্পকথায় উঠে আসা যে জগতের সন্ধান লেখক দিয়েছেন- তাতে কেবল অভিজ্ঞতার সঞ্চয় নয়, বিশ্বাসও স্বপ্নভঙ্গের কাহিনিও সংযোজিত । নিজের শহরের প্রতি যেমন ভালোবাসা ছিল, ছিলো অনেক আক্ষেপ । দেখার অভিজ্ঞতার অর্জনকে যেমন লেখক বর্ণনায় গল্পের কৌশলে নির্মাণ করেছেন, অন্যদিকে হৃদয়ের যন্ত্রণাকেও স্থান দিয়েছেন কথা বয়ানে– ‘এই শহরটা শহর নয় ছাউনি । অস্থায়ী । একদিন সবকিছু গুটিয়ে ফেলবে ওরা, চলে যাবে অন্য কোথাও । শহর তখন হয়ে পড়বে তেপান্তরের মাঠ । মানুষ নিজের খেয়ালে বসতগড়ে ভেঙেও ফেলে, যেভাবে নিয়তির খেয়ালে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় যত বিশ্বাস-স্বপ্ন-সম্পর্ক । জীবনের কোনে স্থিরতা নেই ।’ ( গল্প: ফেরারি )
সৈকত নীলুদির কথা বয়ানে কোথাও যেন আশ্রয়ের আশ্বাস খুঁজে পাঠক । সঙ্গহীন জীবন বড় একা । তাই আশ্রয়ে ঠাঁই চায় মানুষ। বস্তুত সৈকত নীলুদির অর্ডবয়নে অন্তহীন গ্রন্থনা নির্মিত হয় গল্পের বয়ানে । ভালোলাগা ও ভালোবাসার মানুষটির কাছে সৈকত যেন আত্মসমর্পিত । নীলুদির কাছে সে কোথাও না কোথাও বনলতা সেন এর পরশ খুঁজে পায় । গল্পের আঙ্গিক গড়নে পুরাতনের গন্ডিকে টুকরো করে মহাসময়ের ক্রমপাঠে কতভাবেই না শেখর রঞ্জিত করতে পারেন তা তার লেখনীতে স্পষ্ট । গল্পকারের ব্যক্তিত্বের ছাপ সৈকতের সঙ্গে অনুভবের ব্যঞ্জনায় মিলেমিশে গেছে । স্মৃতির গ্রন্থনায় গল্পের নির্মাণ হয়েছে অনন্য । অতীত স্মৃতির রোমন্থনে ভবিষ্যৎ স্বপ্নের হাতছানিতে লেখকের জাতিসত্তার অভিব্যক্তি লাভ করে সৈকতের মাঝে– ‘তোমরা যদি রাচী যাও তো সেখানকার আকাশ বাতাসকে বলে দিও আমি ভাল আছি। কিন্তু সাবধান মোরাবাদী, মাঠের সেই ঘুমন্ত স্বপ্নের ঘুম যেন ভুলেও ভেঙে দিও না ।’
দেশভাগের প্রেক্ষিত, টুকরো মা মাটির আখ্যান শেখর দাশের গল্পের অন্যতম আকরণ হলেও সামাজিক প্রেম, সম্প্রীতি ঐক্যের মজবুত প্রতিবেদন সর্বদাই ঠাঁই পেয়েছে কাহিনি কথায় । ঝকঝকে লিখনশৈলী, মানবিক আবেদনে সমৃদ্ধ তাজ্য বাস্তবের সাক্ষর ‘আজান’ গল্প । দাঙ্গার মিথ্যা বাস্তবকে গল্পকথার পরতে পরতে নিরাকৃত করেছেন- কতভাবে, পড়তে গিয়ে তা টের পাওয়া যায় । গল্প অনুভবে ঘাটতি না রেখে বিকল্প বাস্তব ও অভিবাক্তি, বিকল্প নন্দনের সুসামঞ্জসের ব্যবহারে গল্প হয়ে উঠেছে চমৎকার। প্রগাঢ় অন্ধকারের মাঝেও উজ্জ্বল আলোর শিখা হয়ে জ্বলতে থাকা ঘোর অবিশ্বাসের মধ্যে প্রজ্জ্বলিত হয়ে থাকে বিশ্বাসের ভিন্ন এক রঙিন ভোর । যে আলোর অংশিদারের শরিক মোহনবাবু ও রইস আলির অন্বয়। দাঙ্গার বিষাক্ত আবহ যা দাঙ্গার চেয়েও ভয়ঙ্কর গুজবের বিচিত্র বিভিষিকা সত্যমিথ্যার ফারাককে গুছিয়ে দেয় । তবুও বিশ্বাস ভঙ্গের খেলা ও আক্রোশে আক্রান্ত হয়ে গুন্ডাদের হাতে প্রাণ দিতে গিয়ে যে উচ্চারণ রইস করেছে তা বিভিন্ন সময়ের চিহ্নায়ক । ‘বড় ভুল সময় বাছলে জোয়াদ ভাই’ কেবল তা নয় রইসের মৃত্যুর আকল্পের পাশাপাশি তারক চক্রবর্তীর মৃত্যুকে নিয়ে এলেও মেয়ে সরলার সংলাপে যে অসাম্প্রদায়িক উচ্চারণ ধ্বনিত হয়েছে, তাতে প্রবহমান রয়েছে ঐক্যবোধ ও ভালোবাসার স্মৃতি চিহ্ন – ‘ মনো থাকতে না কেনে। ঠিক ভোর বেলা। স্পষ্ট মনে আছে ওপারে মসজিদে যখন ভোরের আজান পড়ছিল, একটু পরেই ত বাবা…।’ ( গল্প: আজান )
গল্পকারের গল্পভাষা জীবনের অনুভূতির সংগে অন্তরঙ্গের স্পর্শে মিলে গিয়ে শিল্পরূপের অনবদ্য প্রকাশ ঘটে যায় । আমাদের ভাবনা জীবনের যে অভিন্ন ঐক্যের সংযোগ, তারই প্রকাশ এ আখ্যান । মিথ্যার অন্ধকার বেশিদিন স্থায়ী হয় না । সবরকমের তমসাচ্ছন্ন কুৎসিতকে কাঠিয়ে উঠে নতুন সূর্যের প্রতীক্ষার সংকেত আসে গল্প অবসানে – ‘কোনো সংকটই বেশিদিন স্থায়ী হয়না, অনন্ত তীব্রতা । কোনো কুয়াশাও বেশিদিন থাকে না । একদিন শীত গেল । কুয়াশা কাটল । অনেক আগাছা এধারে । বর্ষার আগে বাগান সাফ না করলে আর হবে না ।’
সত্যের আকল্পে আবেগের নিষ্ঠুরতা নির্যাস নিয়ে তৈরি ‘কোষাগার’ কাহিনির আখ্যান । বাস্তব জীবনের নিরূপায় নিষ্ঠুরতার প্রতিবেদনে গড়ে ওঠা এগল্পে রয়েছে জীবন্ত কাহিনিচিত্র । খন্ড খন্ড কাহিনির ঘটনা নির্মাণকে সংঘবদ্ধ করেই গল্পের মূল বয়ান তৈরি হয়েছে । আজ সবকিছুই বাণিজ্যকরণেই পৌঁছে গেছে । প্রচারের প্রসার ও প্রতিযোগিতার কৌশলের কাছে মানুষ নামক জীব এতো বেশি মগ্ন হয়ে যায়, কোনো সর্বনাশের কথাই তারা ভাবতে নারাজ । বর্তমানে সবকিছুই বড় বেশি পণ্য হয়ে গেছে । লিপ্সার বাণিজ্যকরণ লেখকে যে সবসময় যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত করে তার প্রতিবেদন তৈরি করেন এভাবে – ‘ বিমান ছিনতাইর সংবাদ এক নাগাড়ে প্রচারিত করে, বিভিন্ন নেতা মহানেতার উদ্বেগ বিজ্ঞাপিত করে, বুলেটিন শেষ করার একটু আগে মেলবোর্ন ক্রিকেটের খবর কেন জুড়ে দেওয়া হয় দূরদর্শণ ও বেতারে– রাষ্ট্রীয় উদ্বেগ সংকট কি আর সর্বজনীন নয় মিডিয়ার বিচারে ।’ ( গল্প: কোষাগার )
জীবনযন্ত্রণার এমনই কত কথকতা গল্প কাহিনির নির্মাণের পথে সহায়ক হয়েছে । ব্যক্তিগত জীবনকাহিনির রসদ নিয়ে সম্বন্ধ হয়ে ওঠা আলো-আঁধারের নিজস্ব যন্ত্রণা জটিল অবস্থানের কথ্য প্রকাশ করতে গিয়ে, কথক জানিয়ে দেন তার দাদার মৃত্যুর কথা, স্থানীয় খবরের কাগজের তৃতীয় পৃষ্ঠায় বের হয়েছে । বাড়ির লোক বিহ্বল মর্মান্তিক সময়েও পাশের বাড়ির ‘শান্তনীড়ে’ চলে বাবা সায়গলের অ্যালবামের গান । এতে আবারও আমরা হারিয়ে ফেলি শোকের নীরবতাকে । বরং শোক আর সংক্রামিত করেনা কাউকে । বাস্তব সুখ-দুঃখের সমান অংশিদার হয়ে ব্যস্তক জীবনকাহিনির অনন্য সংমিশ্রণের ছবি আঁকতে সর্বদা শেখর দাশ ছিলেন শ্রেষ্ঠ কৌশলী । ব্যাক্তিত্ব বোধের নিরিখে গল্পকারের কথনবিন্যাস পরম প্রকৃত সত্যের কাছকাছি যেমন পৌঁছয়, তেমনি সামাজিক দায়িত্ববোধের সংকেত ধ্বনিত হয় গল্প কথায় – ‘ অদিতি কি তলিয়ে যাবে ? বিষন্নতা তো চোরাবালির মতো একবার ছিটকে পড়লে আর কথা নেই। কেউ টেনে তুললেও ওঠা যায় না । কলিয়ে যাবে ।
অদিতিও কি ? নাঃ । ওকে তুলতে হবে, তুলতেই হবে ।’
শাণিত সময়ের পথে চলতে চলতে গল্পে উপস্থাপিত হয় বিজন অদিতি, বিকাশ এর মতো মানুষজন । আখ্যানের রূপান্তরের মাঝে ধরা পড়েছে তাদের অজস্ত্র স্ববিরোধিতা । অন্তর্ঘাতের বিপ্রতীপতার বয়ানে বারংবার উঠে এসেছে বহুগুরিক দ্বন্দসংকুল চেহারা । শেখর এ ধরণের নির্মাণে অভ্যস্থ । আর এখানেই তিনি হয়ে রইলেন অনন্য, অনবদ্য ।
জীবনবোধের প্রচ্ছন্ন আবেগের আলো ছায়ায় দেখা যায় ‘নগ্ন’ গল্পের শৈলিতে । অভিনব কৌশলে জীবনচিত্রের অন্য চেহারা ‘নগ্ন’ গল্পের পরিসরকে নির্মাণ করেছে । অভিজ্ঞতার অর্জনে পাওয়া বাস্তবের শিল্প নির্মাণের সাক্ষর এ আখ্যান । মাতৃহারা হারু, স্কুলের পাঠকে চুকিয়ে দিয়ে আজ চায়ের দোকানের কারবারি । তরুণ চঞ্চল মন বার বার উঁকি দেয় যতীন মাস্টারের স্কুলে পড়তে । উপত্যকার কথ্যভাষাতে হারুর উচ্চারণ ভাবনার অন্যপথকে চিনিয়ে দেয়– ‘ পরিমলের লাথ-থাপ্পড় খাইতে ভাল্লাগেনা । কাঁপের ডেটা ভাঙলে পাঁচ কিল মারে পিঠে । হাড্ডি কণকণায়। সামনের বচ্ছর ইস্কুলে যাইতে দিবা, কও ?…। যতীন মাস্টারের স্কুলে যায় না হারু । অবকাশ পায়না উনোনের নীল ধোঁয়া গরম চায়ের বাষ্প খদ্দেরের উদামীন্য ও পরিমলের প্রহার সারা কৈশোর শুষে নেয় ।’
( অমৃতলোক ২০০১ সংখ্যায় প্রকাশিত গল্প ‘নগ্ন’)
এ সময় বড় সুখেরও নয় এ সময় বড় দুঃখেরও নয় । ভয়ঙ্কর কুৎসিতের চেহেরা নিয়ে সুন্দর পৃথিবীর মুখটিকে বারবার কারা ঢেকে দিতে চায় । চলমান জীবন যাত্রার বিন্যাসকে থমকে দিয়ে চ্যালেঞ্জ জানায় ভিন্ন আরেক সময় । তারই চেহারার ভিন্ন ভিন্ন পাঠে নির্মিত হয় শেখরের পাঠককৃতি
পাঠকৃতি ও পাঠক্রিয়ার মাঝেই শেখরের প্রতিবেদধর্মী প্রতিষ্ঠা । তিনি বড়ো দুর্গম আর বিচিত্র পথের অংশিদার করে রাখেন পাঠককে । পড়তে গিয়ে থমকে দাঁড়াতে হয় । আধিপত্য বর্গের প্রতিনিধি পরিমলের মতো প্রতীকী মানুষ যে ছেলে-পিলেদের কৈশোর কেড়ে নেয়, তারই নিষ্ঠুর বেদনাদায়ক যন্ত্রণার, করুণ সুরের গ্রন্থনা এ গল্প । নির্মম বিবেকহীন জগতের কাছে দু-হাত তোলে যেদিন সব সম্পর্ক ছিন্ন করে বিদায় নিয়েছে হারু, সেদিন নিবারণ বুঝতে পারে– আরেকবার, কাকে বলে জীবন । শিশুমনের অংশিদার হয়ে শেখর যে জীবনভাবনার খোঁজ নিয়েছেন, তাতে অন্য আরেক শেখরের খোঁজ মেলে গল্প বয়নে । বিচিত্র্য সন্ধানী বিষয় ভাবনার অনুভূতির সংশ্লেষণে গল্পের আকল্প তৈরি হয় এমন উচ্চারণে– ‘ আগুন দাউ দাউ জ্বলে। সহসা বুকের একেবারে ভিতরে ছেঁকা লাগে নিবারণের। এই তো, কয়েকদিন আগে হারু ক্ষীম্বস্বরে বলেছিল আমি মইরলে তুমি একলা হইবা আগুনের তাপে নিবারণের গলা শুকোয়। অদূরে হারুর চিতায় আগুনের অজস্র হাত। মুছে দেয় সব ।’
ব্যক্তিগত জীবনের রসদ নিয়ে সমৃদ্ধ হয়ে উঠা এবং নিজস্ব যন্ত্রণা জটিল জীবনের আলো আধাবিকে আশ্রয় করেই গল্পের লয় ও স্বর ব্যজিত হয় বলেই শেখরের গল্পভাষা হয়ে ওঠে তার ব্যক্তিগত । সৃষ্টি কর্মের শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছান শেখর এভাবেই । পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলেও মানুষের প্রতি ভালোবাসার টানে গল্পকার এগিয়ে চলেন, আমাদের এগিয়ে রাখেন । যুদ্ধ বিধস্ত, রাজনৈতিক উথাল পাতালের সময় নিয়ে গড়ে উঠেছে আপাৎকালীন গল্পের আখ্যান । ভাঙাগড়ার নিষ্ঠুর খেলায় মানুষের নিপীড়ন ও যাতনার কাহিনি রয়েছে- এর পুরোভাগে । যুদ্ধের বিভীষিকা পাশাপাশি বেঁচে থাকার লড়াই মানুষের ভাবনাবিশ্ব ও চিন্তাজগতকে খান খান করে দিয়েছিল, তারই এক দরদী প্রতিবেদন এই কাহিনি । পৌর ও রাজনৈতিক সমাজব্যবস্থায় গভীর থেকে গভীরতর অসুখের প্রতিচ্ছবি গল্পে বারংবার প্রতিবিম্বিত হয়েছে । সময় ও পরিসরের অনবরত দ্বিরালাগে গল্পের জগত কতভাবে যে বদলে যেতে লাগলো তারই যেমন আদল শেখর আমাদের শেখান, বিপ্রতীপে গল্পহীন গল্পের আখ্যানে ওই কাহিনি জীবনের ভিন্ন আরেক অমোঘ বার্তাকে বয়ে আনে — ‘ জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অগুন্তি মানুষ নিস্পলক চেয়ে থাকে আকাশের দিকে। ভারী ভারী বিমানগুলো হঠাৎ উড়ে যায় মানুষের সব আশা আকালাকে খুবলে দিয়ে। তবে তো সেই রিফুজিরা আবার আসবে তাই না ।… এক সময় । প্রায় আর্তনাদ করে নলিনী ভগবান, ঐ ক্ষুধার্ত হায়নাগুলো এলে আর রক্ষে নেই ।’ ( গল্প : আপাৎকালীন, শতক্রতু , অগ্রহায়ণ ১৩৮১ )
কী আশ্চর্য রচনা কৌশল । শেখর এধরণের পাঠককৃতির আখ্যান তৈরি করেন তাঁর গল্পে । যেমন জীবনে তেমনই সৃজনের চর্চায় সমস্ত প্রতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে এ এক সুউন্নত দ্রোহ । ছবি চিত্রের মতো মানুষের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের হতাশাকে শেখর যে অনায়াসে আঁকতে পারেন, তা সময়চিহ্নিত গল্পে স্পষ্ট । ভাষা বয়ানের উপস্থাপনায় শেখর দাশের সমান্তরালতায় তিনি নিজেই নিজের উদাহরণ । সম্বলহীন মানুষের চোখে যুদ্ধের যে আতঙ্ক, জ্বালাময় তিক্ততা তিনি দেখেছেন-গল্পের বয়ান বিন্যাসে তা স্পষ্ট— “এভাবে নিস্তব্ধ প্রান্তরে যুদ্ধের খবর এসে পৌঁছায় বাতাসের বেগে। সেই খবর শুনে কেউ হাসে, কেউ কাঁদে । অনেকে আবার শিউরে উঠে বিগত যুদ্ধের কথা ভেবে । এই শহরে এখনো অনেক লোক আছে যারা যুদ্ধ তাড়িত । যাদের সমস্ত শরীরে আজো যুদ্ধ জড়িয়ে আছে ।’
অস্থির বিশ্ব আবহের বিষন্নতার ঘ্রাণ কাহিনি কথায় বারবার ফিরে এসেছে । মানুষের মন ও তার অসুখের দিকটাই সব ধরণের কাহিনিতে । অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ মিলে মিশে একাকার হয়ে টুকরো টুকরো বিন্যাসে একীভূত হয়ে আছে নিবিড় সংমিশ্রণে তাঁর। গল্পভাষা কখনও কখনও আমাদের চমকে দেয়— ‘ উপোস । হ্যাঁ উপোসই । বহুকাল আমরা কেউ আর পেট পুরে খেতে পাব না । জানো গো, আমার যেন কেন ভয় হয় । উফ এভাবে গাদাগাদি করে আর কতকাল যে…’
‘খেলার ঘর’ গল্পটি শেখর দাশের গল্পহীন গল্পের ভিন্নব্যঞ্জনা নিয়ে এসেছে । জীবন নামক খেলাঘরের রঙ্গমঞ্চে মানুষ নামক জীব বুদবুদের মতো ক্ষণস্থায়ী । তবুও খেলাগুছানোর খেলায় আমাদের কোনো ছেদ নেই । আধা-জাগরণ আধা-চেতনা চরিত্রকে শেখর রাঙিয়ে তুলেছেন ভিন্ন ভিন্ন বাচনের সমাহারে — ‘ ঐ মাঠে খেলা চলছে । বিরাট মাঠ । অনেক রাস্তা আছে ছুটে যেতে দেখানো ছোটরাস্তা । বড় রাস্তা । পাথর ছড়ানো পথও আছে । কংক্রিটেও পিচট কত রাস্তা যে আছে মাঠে পৌঁছে যাবার । সেখানে বিরাট এক খেলা চলছে ।’
সূচনামুখে গল্পের প্লট এভাবেই তৈরি করেন শেখর । অস্তির সময় মাঝে বন্ধ্যা ভবিষ্যতের ইশারা দেয়, আর হয়তো এভাবেই বদলে যায় গল্পকারের বিশ্ববীক্ষা ও চিন্তা ভাবনার পরিসর । আধুনিক যুগ ও মননের প্লট দ্রুত পাল্টে যাওয়ার সাথে সাথে গল্পকথায়, অনিবার্য হয়ে পড়েছে গল্পহীন গল্পের আকর । সংকেতগর্ভ ও প্রতীকি ব্যঞ্জনায় মূর্ত ‘খেলার ঘর’ গল্পে মানুষের জীবনে আবেগঘন ভালোবাসা যে ক্ষণস্থায়ী, তারই ইঙ্গিত ধ্বনিত । চলতে চলতে মানুষের জীবনের সার্বিক মৃত্যুচেতনা ও যন্ত্রণার মাঝখানে বয়ে চলেছে এক গাঢ়তর সময়ের বার্তা । তারই আভাস আছড়ে পড়েছে গল্পকথার উপকরণে— ‘ হাতে ওষুধের বাক্সে মরা ওষুধের ইতিহাস দেখলাম-কবুতরের গলায় নীল রোদে উকি দেয় আমার মৃত সন্তান । আর সিগারেটের বাক্স হাতে করে শহুরে ঝিঁ ঝিঁর ডাক শুনে হাউ হাউ করে কাঁদে বিদ্যাসুন্দর : নদীর মন খারাপ রহিল । ‘
এ সময় বড় সুখেরও নয় এ সময় বড় দুঃখেরও নয় । ভয়ঙ্কর কুৎসিতের চেহেরা নিয়ে সুন্দর পৃথিবীর মুখটিকে বারবার কারা ঢেকে দিতে চায় । চলমান জীবন যাত্রার বিন্যাসকে থমকে দিয়ে চ্যালেঞ্জ জানায় ভিন্ন আরেক সময় । তারই চেহারার ভিন্ন ভিন্ন পাঠে নির্মিত হয় শেখরের পাঠককৃতি । ক্রমশতাপ’, ‘শ্বেতরক্তকণা’, ‘হরিণ, ভিক্ষুক, আসন্ন বিকেলের শেষে’, শব্দের প্রতিচ্ছবি, ‘দ্রাঘিমা’ ইত্যাদি গল্পকথায় শেখর দাশের নির্মাণভাবনা ক্রমান্বয়ে প্রসারিত হয়েছে এক বিন্দু থেকে আরেক বিন্দুতে । শিল্পরূপের নতুন ছক আবার সে ছককে ভাঙতে চাওয়ার মধ্যদিয়েই তো ছোটগল্পের হয়ে ওঠা । প্রতিকূলতার নানা বিভঙ্গ, প্রদীপ মালার মতো ছোটগল্পের জ্বলে উঠতে চাওয়া থেকে সুবৃহৎ দীপ প্রজ্জলিত করে নিয়েছিলেন শেখর, তাঁর মতো করে । স্বাধীন স্বনির্ভর বিকাশে শেখর আজও উজ্জ্বল । বরাক উপত্যকার আঞ্চলিক ভাষাশৈলী ও প্রকরণ ভাবনায় ছোটগল্পের নির্মাণ শিল্পকে তিনি করে তুলেছেন বহুরৈখিক ও বহুস্বরিক । সময়বাহিত পরিসরে দাঁড়িয়ে শেখর অবিরত । খুঁজতে থাকেন জগত সংসারের ভিন্ন ভিন্ন গলিপথ । শেখরের এ পথ চলা নিরন্তর । একজন বিশ্লেষকের কথায় এরকম উচ্চারণ তাঁর সম্পর্কে সবসময় প্রাসঙ্গিক – ‘ বরাক উপত্যকার বাংলা গল্পে ‘শতক্রতু’র আবিষ্কার শেখর দাশ। সত্তর দশকের এক উজ্জীবন । তিনি যেন ভিন্ন পথের পথিক । ভাবে ভাষায় আঙ্গিকে সব কিছুতেই তাঁর গল্প নূতন । প্রচলিত নিয়মে তিনি এক ব্যতিক্রম । প্রথাসিদ্ধ নির্মিতির চেনা রীতি ভেঙে তছনছ করে তিনি কাছাড়ে বাংলা গল্পের এক নতুন সম্ভাবনার ইংগিত দিয়েছেন । ‘ (বরাক উপত্যকার বাংলা সাহিত্যচর্চা : রমা পুরকায়স্থ )।
♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦
লেখক আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক
❤ Support Us








