- ব | ই | চ | র্যা রোব-e-বর্ণ
- এপ্রিল ৫, ২০২৬
মননচর্চায় বিস্মৃত বিগ্রহ
বাঙালি সমাজ আজ এক ভয়ংকর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ! সীমান্তের এপারে-ওপারে এখন মৌলবাদের করালগ্রাস। বাঙালির বিপন্নতার বহু কারণের মধ্যে একটি প্রধান কারণ সমাজের এক বৃহদাংশ বাংলার মনীষীদের দর্শানো মানবতা ও সহিষ্ণুতার পথকে উপেক্ষা করে সার করেছেন ধর্মান্ধতা, অসহিষ্ণুতা এবং সাম্প্রদায়িক বিভেদ-বিদ্বেষ।
আজকের এই সংকটময়য় সন্ধিক্ষণে আমাদের চেতনায় ঝাঁকুনি দিতে চেয়ে কলম ধরেছেন অগ্রজ বন্ধু লেখক বিধায়ক ভট্টাচার্য। লালন সাঁইএর মতো একজন যুগস্রষ্টাকে নিজের মতো করে আরেকবার পাঠক সমাজে ফেরানোর এক পরিশ্রমী প্রয়াস তাঁর সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ “লালন – এক নিঃসঙ্গ বিগ্রহ”। তাঁর মূল্যবান প্রয়াসকে সাধুবাদ জানাতেই আমার এই পাঠ প্রতিক্রিয়া এবং কিছু আনুষঙ্গিক কথা।
একজন বাঙালি হিসেবে আমার বারবার মনে হয়েছে যে, ‘যত মত, তত পথ’ আদর্শের প্রচারক ঠাকুর রামকৃষ্ণ আর ‘মনের মানুষ’ তত্ত্বের সাধক লালন এই দুই মহামানবের জীবন দর্শনকে বাঙালি জাতি একসঙ্গে আরও গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারলে এবং তাঁদের ভাবনাকে একত্রে নিয়ে চলতে পারলে সারা বিশ্বে আরও সুপরিচিত হতে পারত। বাঙালির জীবনবোধও আরও সমৃদ্ধ হতে পারত। কিন্তু দুঃখের বিষয় লালন সে আলোকে অপেক্ষাকৃত কম চর্চিত। আর তার সঙ্গে আছে কিছু অযাচিত সংঘাত, যা মূলত মৌলবাদী ভাবনা-প্রসূত। বলাই বাহুল্য এগুলো লালন-সুলভ মানবতাবাদী দর্শনের পরিপন্থী।
মানবতার পথদ্রষ্টা বাঙালি মনীষীদের মধ্যে অন্যতম লালন অনেকের কাছেই গত সহস্রাব্দের সংস্কৃতি জগতের শ্রেষ্ঠ পুরুষ বলে আখ্যায়িত। লালনকে নিয়ে বহু চর্চা হয়েছে এর আগে। কিন্তু সমকালীন সমাজে বাঙালির সাহিত্য চর্চায় লালনের উপস্থিতি অপ্রতুল বলেই আমার ধারণা, যার প্রতিফলন আমাদের সহজাত আত্মবিস্মৃতিতে বারবার পরিলক্ষিত হয়। অথচ মানুষ ভজে সোনার মানুষ হয়ে ওঠা এই মহামানব আজকের ক্রম-বর্ধমান সাম্প্রদায়িক ও জাতভিত্তিক হানাহানির সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, এবং ঠিক সে কারণেই তাঁকে নিয়ে এখন আরও অনেক বেশি চর্চা হওয়ার কথা।
কেউ তাঁকে বলেছেন কেবলই সুফি সম্রাট, কেউ বলেছেন ফকির, কেউ বলেছেন বাউল, আরও অনেকের চোখে তিনি অন্য অনেক কিছু। আবার কেউ কেউ তাঁর সবকটা সত্ত্বাই নিজেদের মতো খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছেন। লেখকের বিশ্লেষণেও এগুলোর সবকটাই কমবেশি ছুঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা থাকলেও, এখানে লালন মূলত বাউল সাধক বলেই চর্চিত। কিন্তু এর আগের কিছু লেখকের মধ্যে নিজস্ব অভিমতের বাইরে সবকিছুকে নস্যাৎ করার যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা কিন্তু এই লেখকের মধ্যে দেখা যায়নি
লালন মুসলমানের সেবা-শুশ্রূষায় একবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন বলে, যে হিন্দু পরিবারে তাঁর জন্ম, সেই পরিবার বা সমাজ তাঁকে গ্রহণ করেনি। এমনকি এটাও বলা হয় যে, নিজের পরিবার ও সমাজ থেকে ত্যাজ্য হওয়ার পর অনেক মুসলমান তাঁকে আপনজন বলে গ্রহণ করেননি, কারণ, তাঁর জন্ম ও লালনপালন অন্য সম্প্রদায়ে। অথচ সেই মানুষটিই সবাইকে আপন করে তাঁর এক শতাব্দীরও অধিক দীর্ঘ জীবনকালের একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্ব মানবতার জয়গান গেয়ে যাওয়ার নিরলস ব্রত পালন করে গেছেন। এসবের মধ্যেই রয়েছে আলোচিত গ্রন্থের নামকরণের সার্থকতা।
লালন নিয়ে যাঁরাই চর্চা করেছেন, তাঁদের মতের ঐক্য-অনৈক্য সবই এই অনুশীলনকে সমৃদ্ধ করেছে বলে আমি মনে করি। কেউ তাঁকে বলেছেন কেবলই সুফি সম্রাট, কেউ বলেছেন ফকির, কেউ বলেছেন বাউল, আরও অনেকের চোখে তিনি অন্য অনেক কিছু। আবার কেউ কেউ তাঁর সবকটা সত্ত্বাই নিজেদের মতো খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছেন। বর্তমান লেখকের বিশ্লেষণেও এগুলোর সবকটাই কমবেশি ছুঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা থাকলেও, এখানে লালন মূলত বাউল সাধক বলেই চর্চিত। কিন্তু এর আগের কিছু লেখকের মধ্যে নিজস্ব অভিমতের বাইরে সবকিছুকে নস্যাৎ করার যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা কিন্তু এই লেখকের মধ্যে দেখা যায়নি। এ ব্যাপারে তাঁকে আমার যথেষ্ট উদার বলে মনে হয়েছে।
লালনকে নিয়ে রচিত গবেষণালব্ধ এই বইয়ের শুরুতে লেখক প্রাসঙ্গিকভাবেই বাউল তত্ত্ব নিয়ে এক নীতিনিষ্ঠ আলোচনা করেছেন। পরবর্তী অধ্যায়গুলোতেও বারবার নানা বিষয় নিয়ে বহু কথা প্রসঙ্গক্রমে এসেছে। প্রাসঙ্গিকভাবেই লেখক নিয়ে এসেছেন বাংলার আরেক মনীষী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। দুই যুগস্রষ্টার কি কখনো সাক্ষাৎ হয়েছিল ? একটি প্রবন্ধে, লেখক কেবল এ প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজেছেন তাঁর অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি দিয়ে। যথারীতি বেশ কিছু চিত্তাকর্ষক তথ্য এসে এখানে জমা হয়েছে, যা লালন চর্চায় এক মূল্যবান সংযোজন।
মফস্বল সাংবাদিকতার পথিকৃৎ তথা বাউল সাধক কাঙাল হরিনাথ ছিলেন লালনের সমসাময়িক। তাঁর বিভিন্ন লেখা থেকে মনে হয়েছে যে, লালনকে তিনি একাধারে অগ্রজ, গুরু-স্থানীয়, বন্ধু, স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবেই দেখতেন। এখানেও হরিনাথকে নিয়ে লেখা একটি অত্যন্ত মনোগ্রাহী প্রবন্ধ জায়গা পেয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে ওই প্রবন্ধে জমিদার দেবেন ঠাকুরের কথাও এসেছে। হরিনাথ কী চোখে দেখতেন দেবেন ঠাকুরকে ? কেন দেখতেন ? লালন সাঁইয়ের মানবতাবাদী আন্দোলনের উপর তাঁর প্রভাব কেমন ছিল ? সমকালীন সমাজে দেবেন ঠাকুর তথা ঠাকুর পরিবারের অন্য জমিদারদের ভূমিকা কেন আরও বেশি চর্চিত হওয়া উচিত ? এইসব প্রশ্নের তথ্যসমৃদ্ধ উত্তরের অনুসন্ধান আশাকরি পাঠক সমাজকে নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করবে।
লালন মনে করতেন যে, মানুষ মানুষের কাছ থেকেই যথার্থ জ্ঞান লাভ করে। এ ভাবনাই তাঁকে অন্য অনেকের থেকে আলাদা করে রাখে। এটাই লালনের ‘মনের মানুষ’ তত্ত্বের আধার, যা নিয়ে লেখক আলোচনা করেছেন ঠিক পরবর্তী প্রবন্ধে। লালন গীতি নিয়ে এ পর্যন্ত যেসব গবেষণা হয়েছে তার উপর আলোকপাত করেছেন আরেকটি প্রবন্ধে, যা আগ্রহী পাঠককে সমৃদ্ধ করবে
অবধারিতভাবেই পরবর্তী অধ্যায়ে এসেছে শাহজাদপুরের কৃষক বিদ্রোহের কথা নিয়ে একটি প্রবন্ধ। বহু তর্ক-বিতর্ক এবং তথ্য-সম্বলিত প্রবন্ধে আরও অন্য সব প্রেক্ষিতের পাশাপাশি বিদ্রোহ দমনে ঠাকুর জমিদারদের ভূমিকা নিয়েও গভীরে গিয়ে চর্চা করেছেন লেখক।
লালন মনে করতেন যে, মানুষ মানুষের কাছ থেকেই যথার্থ জ্ঞান লাভ করে। এ ভাবনাই তাঁকে অন্য অনেকের থেকে আলাদা করে রাখে। এটাই লালনের ‘মনের মানুষ’ তত্ত্বের আধার, যা নিয়ে লেখক আলোচনা করেছেন ঠিক পরবর্তী প্রবন্ধে। লালন গীতি নিয়ে এ পর্যন্ত যেসব গবেষণা হয়েছে তার উপর আলোকপাত করেছেন আরেকটি প্রবন্ধে, যা আগ্রহী পাঠককে সমৃদ্ধ করবে বলেই আমার বিশ্বাস।
লালন যেমন হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মুক্তমনা মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন এবং তাঁদের পরম শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে উঠেছিলেন, ঠিক তেমনি ভয়ঙ্করভাবে উভয় সম্প্রদায়ের কট্টরপন্থীদের রোষানলেও পড়েছিলেন। এ বিষয়ে আলোকপাত না করলে লালনকে নিয়ে যে কোনো চর্চাই অসম্পূর্ণ। লেখককে এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন মনে হয়েছে। যথারীতি গ্রন্থের সর্বশেষ প্রবন্ধে বিষয়টি আলোচনা করেছেন, যার শিরোনাম ‘নিন্দিত লালন’। আজকের ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে মাতোয়ারা অস্থির সময়ে এই তথ্য-সমৃদ্ধ আলোচনার প্রাসঙ্গিকতা প্রশ্নাতীত।
যদিও লালন বাঙালির মননে-চিন্তনে অনেকটাই উপেক্ষিত থেকেছেন, এখনও হয়তো সময় পেরিয়ে যায়নি। কিন্তু আমরা জাতি হিসেবে কি আজও একটি মানবিক সমাজ গড়ার উজ্জল সম্ভাবনাকে উপলব্ধি করতে, তাকে নিয়ে এগিয়ে চলতে প্রস্তুত ? প্রশ্ন থেকেই যায়। তবুও বলি, এই গ্রন্থ সেই সম্ভাবনাকে জিইয়ে রাখার এবং নতুন প্রজন্মকে তা উপলব্ধি করানোর আরেকটি আন্তরিক প্রয়াস। নয়টি গভীর অধ্যয়ন-প্রসূত প্রবন্ধে সজ্জিত এই গ্রন্থটি বিশেষ করে নতুন পাঠক প্রজন্মকে লালন চর্চায় এবং লালন দর্শনে আরও আগ্রহী করুক, এটাই কামনা করি নিরন্তর আন্তরিকতায়।
♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦

প্রকাশক: তৌরীন পাবলিকেশন | মুদ্রিত মূল্য – ২৫০ টাকা |
অনলাইনে বই সংগ্রহ করার লিংক: https://amzn.in/d/0eHfy8GS
❤ Support Us








