- ব | ই | চ | র্যা রোব-e-বর্ণ
- আগস্ট ১৬, ২০২৬
স্মৃতির ভিতর, ইতিহাসের কাছে
রোমিলা থাপারের ‘জাস্ট বিয়িং’ পড়তে গিয়ে প্রথম যে কথাটি মনে আসতে পারে, তা হল, এটি আসলে তথাকথিত আত্মজীবনী নয়। অন্তত প্রচলিত অর্থে নয়। এখানে জীবনের আটপৌরে, রঙিন ও চিত্রল ঘটনা রয়েছে। রয়েছে শৈশব। দেশভাগের হৃদয়বিদারক স্মৃতি রয়েছে। শিক্ষাজীবনের বিবরণ রয়েছে। রয়েছে গবেষণা-দিনের খুঁটিনাটি। জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ পর্ব আছে। আছে ভ্রমণ। বন্ধুত্ব। বার্ধক্য। কিন্তু এগুলির কোনওটিই এই বইয়ের একক বা একমাত্র বিষয় নয়। বিষয়টি আরও গভীরে।
কী ভাবে একজন মানুষ নিজের ‘সময়’কে বোঝেন ?
আরও জরুরি প্রশ্ন, কী ভাবে একটি সমাজ তার ‘অতীত’কে মনে রাখে ?
এই দুই প্রশ্নের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে রয়েছে ‘জাস্ট বিয়িং’।
থাপারের জীবন শুরু হয়েছিল ঔপনিবেশিক ভারতের অনিশ্চয়তায় ভরা সময়ে। সেই জীবন স্বাধীনতার পর ‘বদলে যাওয়া’ ভারতের সঙ্গে সঙ্গেই চলেছে। ফলে তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতি আসলে একটি দেশের পরিবর্তনেরও স্মৃতি। শৈশবের ভূগোল বদলেছে। রাষ্ট্র বদলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় বদলেছে। ইতিহাস-চর্চার পদ্ধতি বদলেছে। কিন্তু অতীতকে নিয়ে মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও বেদনা কখনও বদলায়নি।
বরং এখন তা আরও তীব্র।
এই জায়গাতেই বইটির রাজনৈতিক গুরুত্ব।
থাপার ইতিহাসকে কখনও নিছক অতীতের ধারাবিবরণ হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে ইতিহাস একটি পদ্ধতি। প্রমাণের প্রশ্ন। উৎস যাচাইয়ের প্রশ্ন। ব্যাখ্যার প্রশ্ন। অর্থাৎ অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সম্পর্ক বোঝা-পড়ার একটি বৌদ্ধিক প্রক্রিয়া। এই বইয়ে নিজের দীর্ঘ গবেষণাজীবনের দিকে ফিরে তাকিয়েও তিনি সেই অবস্থান থেকে সরেননি। বইটির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে প্রমাণনির্ভর অতীত-বোধের কথা বলেছে প্রকাশকও।
এখানেই তাঁর বইটির সঙ্গে আজকের ভারতের সংঘাত। কারণ আজ ইতিহাস নিয়ে শুধু মতের পার্থক্য নেই। আছে ‘স্মৃতির রাজনীতি’। আছে ‘নির্বাচিত’ স্মৃতি। আছে অর্ধসত্যকে পূর্ণসত্যে পরিণত করার প্রবণতা। আছে পৌরাণিক কাহিনিকে ইতিহাস হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। সাম্প্রতিক পর্যালোচনাগুলিও বইটির এই দিকটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
থাপারের আপত্তি তাই কোনও একটি রাজনৈতিক দলের প্রতি বিরাগে সীমাবদ্ধ নয়। আপত্তি পদ্ধতিতে। ইতিহাস যদি প্রমাণের বদলে বিশ্বাসের হাতে চলে যায়, তবে ইতিহাস আর ‘ইতিহাস’ থাকে না। তা হয়ে যায় রাজনৈতিক উপকরণ।
এই পার্থক্যটি আজ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভুয়ো ইতিহাস সাধারণত মিথ্যা দিয়ে শুরু হয় না। শুরু হয় অর্ধসত্য দিয়ে। কালপ্রবাহ থেকে একটি ঘটনা তুলে নেওয়া হয়। অন্যটি বাদ দেওয়া হয়। একটি সূত্রকে চূড়ান্ত সত্য বলা হয়। অন্য সূত্রকে অগ্রাহ্য করা হয়। তারপর সেই নির্বাচিত তথ্যের চারপাশে তৈরি হয় একটি আবেগময় ‘কাহিনি’। শেষ পর্যন্ত কাহিনিটিই সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হয়।
অতীত শুধু অতীত নয়। তা পরিচয়ের মূলগত ভিত্তি। মানুষ নিজের সম্পর্কে যে গল্পটি বিশ্বাস করে, জাতিও অনেক সময় নিজের সম্পর্কে তেমন একটি ‘গল্প’ তৈরি করে। সেই গল্পে গৌরব থাকে। অপমান থাকে। শত্রু থাকে। নায়ক থাকে। ফলে ইতিহাস হয়ে ওঠে আত্মপরিচয়ের নির্মাণ
থাপারের ইতিহাসচর্চা এই পদ্ধতির ঠিক বিপরীতে দাঁড়ায়। তিনি প্রশ্ন করেন। প্রমাণ খোঁজেন। প্রত্নতত্ত্বের সঙ্গে সাহিত্যিক উৎস মিলিয়ে দেখেন। শিলালিপি, মুদ্রা, বস্তুগত নিদর্শন এবং বিভিন্ন ধরনের লিখিত সূত্রকে পাশাপাশি রাখেন। কারণ কোনো একটি উৎস নিজে থেকেই সম্পূর্ণ অতীতকে প্রকাশ করে না।
এখানে তাঁর সমাজ-মনস্তত্ত্বের পাঠও গুরুত্বপূর্ণ। একটি সমাজ কেন একটি নির্দিষ্ট অতীতকে আঁকড়ে ধরে ? কারণ অতীত শুধু অতীত নয়। তা পরিচয়ের মূলগত ভিত্তি। মানুষ নিজের সম্পর্কে যে গল্পটি বিশ্বাস করে, জাতিও অনেক সময় নিজের সম্পর্কে তেমন একটি ‘গল্প’ তৈরি করে। সেই গল্পে গৌরব থাকে। অপমান থাকে। শত্রু থাকে। নায়ক থাকে। ফলে ইতিহাস হয়ে ওঠে আত্মপরিচয়ের নির্মাণ।
এই জায়গায় ইতিহাসবিদের কাজ অত্যন্ত অস্বস্তিকর। কারণ ইতিহাসবিদকে কখনো কখনো সমাজের প্রিয় গল্পটির বিরুদ্ধেই দাঁড়াতে হয়। থাপারের দীর্ঘ কর্মজীবন সেই অস্বস্তির ইতিহাসও। তাঁকে আক্রমণ করা হয়েছে। তাঁকে ‘অ্যান্টি-ইন্ডিয়ান’ বলার চেষ্টাও হয়েছে। কিন্তু তাঁর অবস্থান ছিল অন্য রকম। তিনি রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের ক্ষেত্রেও নিজের স্বাধীনতা নিয়ে আপসহীন ছিলেন। দু’বার পদ্মভূষণ প্রত্যাখ্যান করার ঘটনাটি সেই বৌদ্ধিক স্বাতন্ত্র্যেরই পরিচায়ক।
তবে ‘জাস্ট বিয়িং’-এর মূল্য শুধু তাঁর বিরোধীদের তুখোড় সমালোচনায় নয়। বরং তাঁর নিজের জীবনকে দেখার ভঙ্গিতেও। তিনি নিজেকে ইতিহাসের বাইরে রাখেন না। ইতিহাসের ভিতরেই রেখে দেখেন। এই আত্মসচেতনতা বইটির বড় শক্তি। একজন ইতিহাসবিদ জানেন, স্মৃতিও সম্পূর্ণ নির্ভুল নয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যায়। আমরা যা মনে রাখি, তার মতোই গুরুত্বপূর্ণ আমরা যা ভুলে যাই।
এই কারণে ‘মেমোয়ার’ এবং ‘হিস্ট্রিওগ্রাফি’ এখানে অদ্ভুত ভাবে একে অন্যের কাছাকাছি চলে আসে। আমার কাছে বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক এই আত্মসংশয়। থাপার প্রশ্ন করতে শেখান। কেবল অন্যকে নয়। নিজেকেও। এই বৌদ্ধিক অভ্যাসই সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তর ‘ভুয়ো ইতিহাসে’র কাছে। কারণ ভুয়ো ইতিহাস নিশ্চিত হতে চায়। সত্যিকারের ইতিহাস সন্দেহ করতে শেখায়।
ভুয়ো ইতিহাস সরল উত্তর দেয়। ইতিহাসবিদ জটিলতাকে ঘুরিয়ে ও ফিরিয়ে আনেন। ভুয়ো ইতিহাস নায়ক খোঁজে। ইতিহাসবিদ প্রক্রিয়া খোঁজেন। ভুয়ো ইতিহাস অতীতকে বর্তমানের রাজনৈতিক অস্ত্র বানায়। ইতিহাসবিদ চেষ্টা করেন অতীতকে তার নিজের সময়ের ভিতরে বুঝতে।
এই তফাতটি শুধু একাডেমিক নয়। গভীর ভাবে সামাজিক। একটি সমাজ যদি তার অতীতকে প্রশ্ন করতে না পারে, তবে তার বর্তমানও প্রশ্নহীন হয়ে যায়। আর প্রশ্নহীন সমাজে গণতন্ত্রের জায়গা সংকুচিত হয়। থাপারের দীর্ঘ বৌদ্ধিক জীবন তাই ইতিহাসচর্চার ইতিহাসের পাশাপাশি প্রশ্ন করার অধিকারের ইতিহাসও।
‘জাস্ট বিয়িং’ এক ইতিহাসবিদের আত্মপক্ষসমর্থন নয়। বরং ইতিহাসের পক্ষে একটি দীর্ঘ, শান্ত এবং দৃঢ় বক্তব্য। যে ইতিহাসকে বিশ্বাসের জায়গা থেকে উদ্ধার করে অনুসন্ধানের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এই সময়ের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কথাটি হয়তো সেটিই। কারণ ইতিহাস ভুল হলে শুধু অতীত ভুল হয় না। বর্তমানও ভুল পথে হাঁটে। আর ভবিষ্যৎ তখন দাঁড়িয়ে যায় এমন এক স্মৃতির উপর, যার ভিত দুর্বল
তবু বইটির একটি সীমাও আছে। এত দীর্ঘ এবং সমৃদ্ধ জীবনের স্মৃতি কখনো কখনো ছড়িয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত ঘটনার বিস্তার মূল বৌদ্ধিক সুরকে কখনও আড়াল করে দেয় যেন। এটিকে প্রচলিত আত্মজীবনী হিসেবে পড়লে কেউ কেউ ধীরগতিরও মনে করতে পারেন। সমকালীন কিছু পর্যালোচনাতেও বইটির ‘অ্যানেকডটাল’ বা স্মৃতিনির্ভর চরিত্রের কথা এসেছে। কিন্তু সেই ধীরতাই হয়ত বইটির প্রকৃতি। এই বই দৌড়ে ইতিহাসের কাছে পৌঁছতে চায় না। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছতে চায়।
শেষ পর্যন্ত ‘জাস্ট বিয়িং’ এক ইতিহাসবিদের আত্মপক্ষসমর্থন নয়। বরং ইতিহাসের পক্ষে একটি দীর্ঘ, শান্ত এবং দৃঢ় বক্তব্য। যে ইতিহাসকে বিশ্বাসের জায়গা থেকে উদ্ধার করে অনুসন্ধানের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এই সময়ের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কথাটি হয়তো সেটিই। কারণ ইতিহাস ভুল হলে শুধু অতীত ভুল হয় না। বর্তমানও ভুল পথে হাঁটে। আর ভবিষ্যৎ তখন দাঁড়িয়ে যায় এমন এক স্মৃতির উপর, যার ভিত দুর্বল।
রোমিলা থাপার সেই দুর্বল ভিতের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। তাঁর অস্ত্র কোনও স্লোগান নয়। প্রশ্ন। প্রমাণ। সংশয়। এবং যুক্তি। সেই জন্যই ‘জাস্ট বিয়িং’ কেবল একজন ইতিহাসবিদের জীবনকথা নয়। এটি ইতিহাস কী ভাবে লেখা উচিত, কী ভাবে মনে রাখা উচিত এবং সবচেয়ে বড় কথা, ইতিহাসকে কারও রাজনৈতিক সম্পত্তি হতে না দেওয়ার একটি বৌদ্ধিক ঘোষণা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বইটির প্রকাশিত সূচি ও সমকালীন পর্যালোচনাগুলিতে মেমোয়ারের ব্যক্তিগত স্মৃতি, ইতিহাসচর্চা, জেএনইউ, গণতন্ত্র এবং সমসাময়িক ইতিহাস-রাজনীতির সংঘাত—এই স্তরগুলি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

জাস্ট বিয়িং: এ মেমোয়ার
রোমিলা থাপার
সিগাল বুকস লন্ডন লিমিটেড । ৯৫৭ টাকা
♦•–♦••♦–•♦
❤ Support Us







